চট্টগ্রামে আটক ৬৩ বিদেশিই স্ক্যামিংয়ে পারদর্শী

চট্টগ্রামে আটক ৬৩ বিদেশিই স্ক্যামিংয়ে পারদর্শী
ছবি: আমার দেশ

চট্টগ্রামের খুলশীতে অভিযান চালিয়ে একটি নামফলকবিহীন আটতলা ভবন থেকে ৬৩ জন বিদেশি নাগরিককে আটক করেছে পুলিশ। প্রাথমিকভাবে ক্যাসিনো-সংক্রান্ত তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান শুরু হলেও এখন পুলিশ বলছে, আটক ব্যক্তিরা প্রত্যেকেই অনলাইন প্রতারণা বা স্ক্যামিংয়ে দক্ষ। তাদের কাছ থেকে জব্দ করা হয়েছে প্রায় ৭০টি ল্যাপটপ ও মুঠোফোন, যা এখন তদন্তের মূল ভরসা।

খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবদুর রহিমের ভাষ্যে, আটক সবাই স্ক্যামিংয়ে দক্ষ এবং জব্দ ডিভাইসগুলোর তথ্য বিশ্লেষণ করলে তাদের কর্মকাণ্ড ও নেটওয়ার্ক সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে। একই কথা বলেছেন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদও।

বিজ্ঞাপন

চট্টগ্রামের প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও বাংলাদেশ সাইবার এক্সপ্রেসের প্রধান নির্বাহী রিদুয়ান হৃদয়ের মতে, অনলাইন স্ক্যামিং মানে সাধারণত প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ, ব্যক্তিগত তথ্য বা অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ হাতিয়ে নেওয়া। কিন্তু খুলশীর এই চক্র ঠিক কোন কৌশলে কাজ করত-ভুয়া বিনিয়োগ, চাকরির প্রলোভন, পরিচয় গোপন করে সম্পর্ক তৈরি, নাকি প্রযুক্তিগত সহায়তার নামে প্রতারণা তা এখনো স্পষ্ট নয়। তাঁদের লক্ষ্য বিদেশি নাগরিক ছিলেন, নাকি বাংলাদেশি, সে প্রশ্নেরও উত্তর মেলেনি।

তবে জব্দ করা ডিভাইস ফরেনসিক বিশ্লেষণ করলে ব্যবহারকারীদের যোগাযোগ, ই-মেইল, সামাজিক মাধ্যমের কার্যক্রম ও লেনদেনের তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে বলে জানান রিদুয়ান। কোন ডিভাইস কে ব্যবহার করতেন, কোন দেশে যোগাযোগ হতো এবং অর্থের কোনো সূত্র আছে কি না এসব জানা গেলে বিষয়টি অনেকটাই পরিষ্কার হবে।

একটি আবাসিক এলাকার আটতলা ভবনে এতজন বিদেশি নাগরিক কীভাবে একসঙ্গে থাকছিলেন, সেটিও এখন বড় প্রশ্ন। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, অভিযানের আগের কয়েক সপ্তাহে ভবনটিতে বিদেশিদের চলাচল বেড়ে গিয়েছিল, তবে ভেতরে কী হচ্ছিল তা তারা জানতেন না। ভবনটি কারা ভাড়া নিয়েছিল, চুক্তি কার সঙ্গে হয়েছিল এসব তথ্যও এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

আটক ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন চীন, পাকিস্তান, লাওস ও ভিয়েতনামের নাগরিক। তাদের বাংলাদেশে আসার উদ্দেশ্য, ভিসার ধরন এবং কোন মাধ্যমে তারা দেশে ঢুকেছিলেন—তা যাচাই করছে পুলিশ। কেউ বৈধ ভিসায় এসে নির্ধারিত কাজের বাইরে অন্য কোনো কর্মকাণ্ডে জড়িয়েছিলেন কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

মূলত ক্যাসিনোর সন্দেহেই অভিযান চালানো হয়েছিল। কিন্তু অভিযান শেষে পুলিশ অনলাইন স্ক্যামিংয়ের কথা বলছে। ফলে এখন দুটি প্রশ্নই তদন্তের কেন্দ্রে-সত্যিই সেখানে জুয়া বা ক্যাসিনোর কার্যক্রম চলত কি না, আর তার আড়ালে সংগঠিত প্রতারণার নেটওয়ার্ক ছিল কি না।

অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ বলেন, প্রতারণার অর্থ থাকলে তা কোথায় জমা হতো, কার হিসাবে যেত এবং কীভাবে স্থানান্তরিত হতো তা এখনো স্পষ্ট নয়। ব্যাংক হিসাব, মোবাইল আর্থিক সেবা বা আন্তর্জাতিক লেনদেনের মাধ্যমে অর্থ সরানো হয়েছিল কি না, সেটি বের করা গেলে চক্রের পরিধি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে।

ভবন ভাড়া নেওয়া থেকে শুরু করে ইন্টারনেট সংযোগ, যাতায়াত কিংবা সরঞ্জাম সংগ্রহ-এসব একা করা কঠিন। তাই ভবনের মালিক, ব্যবস্থাপনা বা মধ্যস্থতাকারীদের জিজ্ঞাসাবাদ করে কোনো স্থানীয় নেটওয়ার্কের সন্ধান মেলে কি না, তা-ও দেখছে পুলিশ।

ওসি আব্দুর রহিম বলেন, আপাতত ঘটনা ৬৩ বিদেশি আটকেই সীমাবদ্ধ, তবে জব্দ করা ডিভাইসের ফরেনসিক পরীক্ষাই তদন্তের পরবর্তী ধাপ। সেখানে স্ক্যামিংয়ের স্ক্রিপ্ট, ভুক্তভোগীদের তথ্য বা লেনদেনের প্রমাণ মিললে চক্রের চিত্র স্পষ্ট হবে। আর বাংলাদেশে থাকা কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে বিষয়টি নিছক বিদেশি আটকের ঘটনায় সীমাবদ্ধ না থেকে দেশে সক্রিয় একটি বড় অনলাইন প্রতারণা নেটওয়ার্কের সন্ধান দিতে পারে।

এমএইচ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন