পৃথিবী যতই উন্নতির পথে ধাবিত হচ্ছে, প্রযুক্তির উৎকর্ষও তত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমান সময়ে ডিজিটাল ডিভাইস আমাদের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্মার্টফোন, ট্যাব কিংবা ল্যাপটপ আমাদের জীবনকে সহজ, দ্রুত ও সংযুক্ত করেছে ঠিকই, কিন্তু এই সুবিধার আড়ালে নিঃশব্দে দানা বাঁধছে এক নতুন ব্যাধি—‘ডিভাইস আসক্তি’ (Device Addiction)। আজকে আমরা ডিভাইস আসক্তি নিয়ে বিস্তারিত জানব।
ডিভাইস ছাড়া এখন আমরা একটি মুহূর্তও কল্পনা করতে পারি না। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম নিজেদের অজান্তেই এই অদৃশ্য জালে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়ছে, যা তরুণদের কর্মমুখী করে তোলার চেয়ে ঘরকুনো আর পঙ্গু করে তুলছে। চিন্তাশক্তি, স্মৃতিশক্তি ও মানসিক শক্তি হ্রাস পাচ্ছে দিন দিন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই ডিভাইস আসক্তিকে ইন্টারনেট গেমিং ডিসঅর্ডার বা ‘ডিজিটাল ডিপেনডেন্সি’ বলা হয়। এটি অনেকটা মাদকাসক্তির মতোই একটি গুরুতর আচরণগত সমস্যা।
যখন একজন ব্যক্তি তার দৈনন্দিন গুরুত্বপূর্ণ কাজের (পড়াশোনা, পেশাগত দায়িত্ব বা সামাজিক যোগাযোগ) চেয়ে স্ক্রিন টাইমকে বেশি প্রাধান্য দেয় এবং ডিভাইস থেকে দূরে থাকলে অস্থিরতা বোধ করে, তখনই তাকে আসক্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। এটি অনেকটা মাদকাসক্তির মতোই আচরণগত সমস্যা হিসেবে পরিলক্ষিত হয়। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ‘স্ট্যাটিস্তা’র তথ্য অনুযায়ী, একজন মানুষ গড়ে প্রতিদিন ছয় থেকে আট ঘণ্টা স্ক্রিনে সময় ব্যয় করে। বাংলাদেশের শহরাঞ্চলেও চিত্রটি ভয়াবহ; প্রায় ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী দিনে চার ঘণ্টার বেশি সময় কাটায় মোবাইলে।
* কম্পিউটার ভিশন সিনড্রোম : একটানা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার ফলে চোখের এই সমস্যাটি দিন দিন প্রকট হচ্ছে।
* টেক্সট নেক সিনড্রোম : দীর্ঘক্ষণ ঘাড় নিচু করে ডিভাইস ব্যবহারের ফলে মেরুদণ্ডে স্থায়ী ও জটিল সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
ডিভাইস আসক্তির সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো মনোযোগের ক্ষমতা (Attention Span) হ্রাস পাওয়া। গবেষণায় দেখা গেছে, একবার মনোযোগ নষ্ট হলে আবার পূর্ণ মনোযোগ ফিরে পেতে মানুষের গড়ে ২৩ মিনিট ১৫ সেকেন্ড সময় লাগে। এই মনোযোগের ঘাটতি থেকে জন্ম নিচ্ছে বিষণ্ণতা, উদ্বেগ, অনিদ্রা এবং চরম ক্ষেত্রে আত্মহত্যার মতো ভয়াবহ প্রবণতা।
অন্যদিকে সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যের ‘সাজানো জীবন’ দেখে নিজেদের সঙ্গে তুলনা করার ফলে তৈরি হচ্ছে হীনম্মন্যতা। আধুনিক প্রযুক্তি আমাদের সামনে ‘ইনস্ট্যান্ট গ্র্যাটিফিকেশন’ বা তাৎক্ষণিক তৃপ্তির জগৎ খুলে দিয়েছে। আমরা এখন কোনো কিছুর জন্য আর অপেক্ষা করতে চাই না। অল্প দেরিতেই যেন আমরা অস্থির, অধৈর্য ও অস্থিতিশীল হয়ে উঠছি। ফলে আমাদের ধৈর্য কমে যাচ্ছে এবং আমরা মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছি। বর্তমানে আমরা শারীরিক দূরত্ব ঘোচাতে পারলেও ডিভাইস আমাদের আত্মিক দূরত্ব বাড়িয়ে দিচ্ছে। পরিবারের সদস্যরা বা বন্ধুবান্ধবেরা সবাই একসঙ্গে বসে কথা বলার বদলে নিজেদের সময় দেওয়ার বদলে প্রত্যেকে নিজের ফোনের স্ক্রিনে বুঁদ হয়ে থাকছে। একে বলা হয় ‘ফাবিং’ (Phubbing), যা পারিবারিক, সামাজিক ও আত্মিক বন্ধনকে শিথিল করে দিচ্ছে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো শিশুদের ডিভাইস আসক্তি। কান্না থামানো বা খাবার খাওয়ানোর জন্য শিশুদের হাতে ফোন তুলে দেওয়ার ফলে তাদের মস্তিষ্কের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষায়িত অটিজম ক্লিনিক ও থেরাপি সেন্টারগুলোর তথ্যমতে, খুব অল্প বয়সে স্ক্রিনের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার ফলে অনেক শিশু অটিজমের মতো জটিলতায় আক্রান্ত হচ্ছে। ডিভাইস আসক্তির বিষবাষ্প থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের নিজেদের সাথেই লড়াই করতে হবে। কিছু কার্যকর পদক্ষেপ আমাদের পথ দেখাতে পারে—
ডিজিটাল ডিটক্স : খেলাধুলা, বই পড়া, পরিবারকে সময় দেওয়া এবং ধর্মীয় ও সামাজিক কার্যক্রমে নিজেকে সক্রিয় রাখা।
ডিজিটাল ওয়েলবিয়িং : স্মার্টফোনের ট্র্যাকার ব্যবহার করে নিজের স্ক্রিন থেকে নিয়ন্ত্রণ করা।
নোটিফিকেশন নিয়ন্ত্রণ : অপ্রয়োজনীয় অ্যাপের নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা, যা আমাদের বারবার ফোন চেক করার তাড়না থেকে দূরে রাখবে।
অভিভাবকের ভূমিকা : শিশুদের ডিভাইসের বদলে খেলনা, বই কিংবা বাইরের পরিবেশের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। তাদের হাতে স্মার্টফোন নয়, বরং উৎসাহ ও উদ্দীপনা, ফলপ্রসূ সময় উপহার দিন, যা বাচ্চা ও অভিভাবকের মধ্যে আধ্যাত্মিক সম্পর্ক আরো মজবুত করবে।
* তাছাড়া ডিজিটাল ব্যালেন্স (Digital Balance), স্ক্রিন টাইম ম্যানেজমেন্ট, উদ্দেশ্যমূলক ব্যবহার (Purposeful Use) এবং অফলাইন অ্যাক্টিভিটি বাড়ানোর মাধ্যমে এই আসক্তি থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব।
প্রযুক্তি আমাদের শত্রু নয়, বরং আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সহায়ক। পরিমিত ব্যবহারের ফলে প্রযুক্তি আমাদের সবচেয়ে সহায়ক বন্ধু হিসেবে কাজ করে। ডিভাইসকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে একসময় ডিভাইস আমাদের নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করবে। সুস্থ, সুন্দর ও প্রোডাক্টিভ জীবনের জন্য সচেতনতা এবং সময়ের সঠিক ব্যবস্থাপনাই আমাদের রক্ষাকবচ। কারণ স্ক্রিনের নীল আলোর চেয়ে বাইরের পৃথিবীর সবুজ প্রকৃতি অনেক বেশি প্রাণবন্ত।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

