আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট : আপনার ছায়াও ইন্টারনেটে

আরিফ বিন নজরুল

ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট : আপনার ছায়াও ইন্টারনেটে

ইন্টারনেটে আমরা হেঁটে বেড়াই বা চলাচল করি প্রতিদিন। অর্থাৎ ইন্টারনেট ব্যবহার করি প্রতিনিয়ত। কখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করি। কখনো অনলাইনে কেনাকাটা। কখনো শুধু সার্চ করি একটি শব্দ। কিন্তু এই হাঁটার পথেই অদৃশ্যভাবে জমে থাকে আমাদের পদচিহ্ন। এই পদচিহ্নই হলো ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট। আমরা হয়তো মনে করি, একটি পোস্ট ডিলিট করলেই সব মুছে গেল। বাস্তবতা হলো—ইন্টারনেট খুব কমই কিছু পুরোপুরি ভুলে যায়।

ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট দুই ধরনেরÑসক্রিয় ও নিষ্ক্রিয়। সক্রিয় ফুটপ্রিন্ট তৈরি হয় যখন আমরা নিজে থেকে কিছু শেয়ার করি। ফেসবুকে ছবি আপলোড। ইউটিউবে কমেন্ট। কোনো ফর্মে তথ্য দেওয়া। আর নিষ্ক্রিয় ফুটপ্রিন্ট তৈরি হয় অজান্তেই। কুকিজ, আইপি ঠিকানা, লোকেশন ডেটা, ব্রাউজিং ইতিহাসের মাধ্যমে ইত্যাদি। আপনি শুধু একটি ওয়েবসাইটে ঢুকলেন, তাতেই আপনার ডিভাইস, ব্রাউজার ও অবস্থান সম্পর্কিত তথ্য কোথাও না কোথাও সংরক্ষিত হলো।

বিজ্ঞাপন

আজকের ডিজিটাল অর্থনীতিতে তথ্যই শক্তি। বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবহারকারীর আচরণ বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞাপন ও কনটেন্ট সাজায়। আপনি কী পছন্দ করেন? কোথায় ঘুরতে যান? কী কিনতে চান? এই তথ্যগুলো বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে মূল্যবান সম্পদ। ফলাফলÑআপনি একটি পণ্য সার্চ করার পর হঠাৎ করে বিভিন্ন সাইটে সেই পণ্যের বিজ্ঞাপন দেখতে শুরু করেন। এটি কাকতালীয় নয়। বরং আপনার ডিজিটাল ফুটপ্রিন্টের প্রতিফলন।

সমস্যা শুরু হয় যখন এই তথ্য ভুল হাতে পড়ে। ডেটা ব্রিচ বা হ্যাকিংয়ের ঘটনায় ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হলে পরিচয় চুরি, প্রতারণা বা আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হয়। এমনকি বহু বছর আগের কোনো পুরোনো পোস্টও ভবিষ্যতে চাকরি বা সামাজিক অবস্থানে প্রভাব ফেলতে পারে। ডিজিটাল জগতে একবার কিছু প্রকাশ হলে সেটি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন। ডিজিটাল ফুটপ্রিন্টের আরেকটি সূক্ষ্ম দিক হলো প্রোফাইলিং। অ্যালগরিদম আপনার আচরণের ভিত্তিতে একটি ডিজিটাল প্রোফাইল তৈরি করে। আপনি কী ধরনের মানুষ, কী বিশ্বাস করেন, কী পছন্দ করেন। এই প্রোফাইল ভবিষ্যতে আপনার সামনে কী তথ্য আসবে, তা নির্ধারণ করে। ফলে আপনার অনলাইন অভিজ্ঞতা ব্যক্তিকেন্দ্রিক হলেও, সেটি সীমাবদ্ধও হয়ে পড়তে পারে।

তবে সমাধানও আছে। সচেতনতা হলো প্রথম পদক্ষেপ। অপ্রয়োজনীয় অ্যাপ পারমিশন বন্ধ রাখা। নিয়মিত প্রাইভেসি সেটিংস পর্যালোচনা করা। শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার ও দুই ধাপ যাচাইকরণ চালু রাখা। এসব ছোট পদক্ষেপ বড় ঝুঁকি কমাতে পারে। পাশাপাশি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু শেয়ার করার আগে নিজেকে প্রশ্ন করা দরকারÑএটি কি ভবিষ্যতে সমস্যার কারণ হতে পারে?

সবশেষে বলা যায়, ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট মুছে ফেলা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। আমরা যত বেশি সচেতন হব, তত কম অপ্রয়োজনীয় ছায়া ইন্টারনেটে রেখে যাব। প্রযুক্তির যুগে নিজের তথ্যের দায়িত্বও নিজের। কারণ অনলাইনে ফেলে আসা পদচিহ্ন অনেক সময় আমাদের ধারণার চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী হয়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন