জীবনের লক্ষ্য ও বাস্তবতা নিয়ে তরুণীদের ভাবনা

জীবনের লক্ষ্য ও বাস্তবতা নিয়ে তরুণীদের ভাবনা

সবার জীবনেরই একটি লক্ষ্য থাকে। তবে কজনই বা পারেন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে জীবনযুদ্ধে টিকে থেকে সেই লক্ষ্য পূরণ করতে? বেশিরভাগই আর্থিক সমস্যা, নিরাপত্তাহীনতা, মানসিক চাপ ও প্রতিকূল পরিস্থিতির কাছে হেরে যান। তরুণীরা তাদের জীবনের লক্ষ্য পূরণ এবং বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে নিজেদের অভিজ্ঞতা ও মতামত ব্যক্ত করেছেন। তাদের মতামতগুলো সাজিয়ে তুলে ধরেছেন মুহিবুল হাসান রাফি

নাদিরা জাহান প্রীতি
নাদিরা জাহান প্রীতি

বিজ্ঞাপন

ব্যর্থতা সফলতার প্রথম ধাপ

নাদিরা জাহান প্রীতি

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজ

একেকজনের একেক রকম স্বপ্ন থাকে। কেউ শিক্ষক হতে চান, কেউ আইনজীবী, আবার কেউ কেউ সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু স্বপ্ন দেখা আর স্বপ্ন পূরণ করার মধ্যে যেন আকাশ-পাতাল পার্থক্য। শুধু স্বপ্ন দেখলেই লক্ষ্য পূরণ হয়ে যায় না। লক্ষ্য অর্জনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে সেই অনুযায়ী সামনে এগিয়ে চলা।

বাস্তবতা সবসময় স্বপ্নের মতো সুন্দর হয় না। বাস্তবতায় থাকে অর্থনৈতিক সংকট, পারিবারিক দায়িত্ব, ব্যর্থতা, প্রতিযোগিতা, কখনো সবচেয়ে কাছের বন্ধুর দ্বারা প্রতারিত হওয়ার মানসিক যন্ত্রণা। অনেকেই এসব বাস্তবতাকে বাধা মনে করে নিজের স্বপ্নপূরণ থেকে সরে দাঁড়ায়। অথচ সফল মানুষদের জীবনী পড়লে দেখা যায়, তারা ব্যর্থতাকেই সফলতার প্রথম সোপান বলে আখ্যা দিয়েছেন।

লক্ষ্যপূরণের প্রথম এবং অন্যতম বিষয় হলো নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস রাখা। আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান মানুষ যেন অসাধ্যকে সাধন করতে পারে, বাস্তবতা যতই কঠিন হোক না কেন। বাস্তবতা যেন আমাদের পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করে। বাস্তবতা আমাদের শেখায়, সবকিছু আমাদের ইচ্ছামতো হয় না। কখনো পথ পরিবর্তন করতে হয়, কখনো নতুন দক্ষতা অর্জন করতে হয়, কখনো বা কিছু স্বপ্নকে সাময়িকভাবে স্থগিত রাখতে হয়।

বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের সাফল্য দেখে অনেকেই হতাশ হয়ে পড়েন। অন্যের সঙ্গে নিজেকে তুলনা না করে নিজের উন্নতির দিকে মনোযোগ দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। কেননা প্রতিটি মানুষের জীবন, সুযোগ ও সংগ্রাম ভিন্ন। বাস্তবতাকে বাধা নয়, বরং পথপ্রদর্শক হিসেবে মেনে নিয়ে ধৈর্য, পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস ও অধ্যবসায়ের সঙ্গে নিজেকে পরিচালনা করতে হবে। তাহলেই আকাশছোঁয়া স্বপ্নগুলো বাস্তবে রূপ নেবে এবং জীবনের লক্ষ্য পূরণ হবে।

রওশন আক্তার অরিন
রওশন আক্তার অরিন

কঠিন সময়ে হার না মানা

রওশন আক্তার অরিন

চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হসপিটাল

ছোটবেলা থেকেই আমার ইচ্ছা ছিল মেডিকেল সেক্টরে কাজ করার। হাসপাতাল, ডাক্তার, নার্স—সবকিছুই আমাকে খুব আকৃষ্ট করত। তবে আমার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল একদিন আইসিইউতে (ICU) কাজ করা, কারণ আমার বিশ্বাস ছিল, একজন আইসিইউ নার্স একজন মুমূর্ষু রোগীর শেষ সময়ে পাশে থাকেন। কিন্তু জীবনে সবসময় সবকিছু আমাদের ইচ্ছামতো হয় না। এইচএসসি শেষ করার পর শারীরিক অবস্থার কিছুটা অবনতির কারণে অনেক ঝড়ঝাপটা পেরিয়ে স্বপ্নের প্রতি আমার একাগ্রতা দেখে পরের বছর পরিবার আমাকে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার অনুমতি দেয়। পরিবার আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাওয়ার পরও তারা আমার স্বপ্নকে গুরুত্ব দিয়েছে। অবশেষে নার্সিংয়ে সুযোগ হয়। বাইরের মানুষের কটু কথায়ও আমার পরিবার কখনো আমার ওপর থেকে বিশ্বাস হারায়নি। আমার জীবনে সবচেয়ে বড় শক্তি ছিলেন আমার মা। সবাই যখন বিভিন্ন কথা বলছিল, তখন মা-ই একা আমার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি শুধু আমাকে সাহসই দেননি, পরিবারের সবাইকে বুঝিয়েছেন। আমি যখন হতাশ হয়ে পড়েছি, তখন তিনি আমাকে আবার উঠে দাঁড়াতে শিখিয়েছেন। আজ আমি নার্সিং পড়া শেষ করে ইন্টার্নশিপ করছি। এই জায়গায় পৌঁছানোর পেছনে আমার মায়ের অবদান ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আমার বাবার অবদানও কোনো অংশে কম নয়। তার নীরব ত্যাগ আমি প্রতিটি পদক্ষেপে অনুভব করেছি। সংসারে আর্থিক সংকট থাকা সত্ত্বেও তিনি কখনো আমার স্বপ্নকে থামিয়ে দেননি। সবসময় চেষ্টা করেছেন, যেন আমার পড়াশোনা বন্ধ না হয়ে যায়। অনেক সময় নিজের চাওয়া-পাওয়ার চেয়ে আমার ভবিষ্যৎকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। আর আমার ছোট বোনের অবদানও কোনো অংশে কম নয়। এই পথচলা আমাকে একটা বড় শিক্ষা দিয়েছে। জীবনে শুধু স্বপ্ন দেখলেই হয় না, সেই স্বপ্নের জন্য ধৈর্য ধরে লড়াইও করতে হয়।

শারমিন উদ্দিন
শারমিন উদ্দিন

লক্ষ্যপূরণে সুষ্ঠু পরিকল্পনা চাই

শারমিন উদ্দিন

ইডেন মহিলা কলেজ

জীবনে লক্ষ্যপূরণের স্বপ্ন আমরা সবাই দেখি। কেউ হতে চায় সফল উদ্যোক্তা, কেউ সরকারি কর্মকর্তা, কেউ লেখক, শিল্পী কিংবা অন্য কোনো পেশাজীবী। কিন্তু স্বপ্নের পথে হাঁটতে গিয়ে খুব দ্রুতই আমরা বাস্তবতার মুখোমুখি হই। অর্থনৈতিক সংকট, পারিবারিক দায়িত্ব, সামাজিক চাপ, সুযোগের অভাব, সময়ের সীমাবদ্ধতা কিংবা বারবার ব্যর্থতা—সবকিছু মিলিয়ে অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানোর পথ কঠিন হয়ে ওঠে।

কখনো অর্থের অভাবে মেধা ও ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও পড়াশোনা বা প্রশিক্ষণ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। কখনো পরিবারের দায়িত্ব নিজের স্বপ্নকে পিছিয়ে দিতে বাধ্য করে। আবার অনেক সময় সমাজের নেতিবাচক মন্তব্য, অন্যের সঙ্গে তুলনা কিংবা বয়স ও সময় নিয়ে তৈরি হওয়া চাপ মানুষকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেয়। দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও যখন কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসে না, তখন হতাশা গ্রাস করে। তবু বাস্তবতা মানেই থেমে যাওয়া নয়। বরং বাস্তবতাকে বুঝে নিজের পরিকল্পনা নতুন করে সাজানোই বুদ্ধিমানের কাজ। সব স্বপ্ন হয়তো একই পথে পূরণ হয় না, কিন্তু চেষ্টা, ধৈর্য ও আত্মবিশ্বাস থাকলে পথ বদলে গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...