সাহিত্য শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়। পাঠের সঙ্গে যখন মঞ্চ, অভিনয়, ইতিহাস ও বাস্তব অভিজ্ঞতার সংযোগ ঘটে, তখন সাহিত্য হয়ে ওঠে আরো জীবন্ত, আরো অনুভবযোগ্য। সেই ভাবনা সামনে রেখে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থীদের নিয়ে পাঠকমেলা ইবি শাখার এক ভিন্নধর্মী সাহিত্য ও শিক্ষামূলক আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়েছে যশোরের সাগরদাঁড়িতে, বাংলা ভাষার সনেটের প্রবর্তক, মহাকাব্য রচয়িতা, কবি ও নাট্যকার মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্মভিটায়।
বাংলা বিভাগের ‘বাংলা নাটক’ কোর্সের অন্তর্ভুক্ত চারটি নাটক মঞ্চস্থ করার উদ্দেশ্যে শিক্ষার্থীরা সাগরদাঁড়িতে যায়। শিক্ষার্থীদের বাস্তব উপলব্ধি, অভিনয় দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য কোর্স শিক্ষক শ্রদ্ধেয় সাইফুজ্জামান স্যার নাটক পড়ানোর পাশাপাশি তা মঞ্চস্থ করার তাগিদ দেন। দ্বিতীয় বর্ষের দ্বিতীয় সেমিস্টারের ক্লাস শুরুর পরপরই শুরু হয় নাটকের রিহার্সাল। কোর্সের অন্তর্ভুক্ত চারটি নাটক মঞ্চায়নের জন্য শিক্ষার্থীরা চারটি দলে বিভক্ত হয়ে প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। প্রতিদিন ক্লাসের পর শিক্ষার্থীরা নিজেদের নির্ধারিত চরিত্র অনুযায়ী বারবার রিহার্সাল করেছে। চরিত্রের সংলাপ, অভিব্যক্তি ও অভিনয়ভঙ্গি আয়ত্ত করতে চলেছে নিরন্তর অনুশীলন। শুরুতে অনেকের মধ্যেই জড়তা ছিল। কিন্তু মঞ্চে ওঠার পর সেই সংকোচ অনেকটাই কেটে যায়। গত ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দে সাগরদাঁড়িতে নাটক মঞ্চস্থ করার সময় শিক্ষার্থীদের প্রত্যেকেই নিজেদের চরিত্রে প্রাণবন্ত অভিনয় করে।
২২ শ্রাবণ দুপুরের মধ্যেই আমরা মাইকেল মধুসূদন দত্তের বাড়িতে পৌঁছে যাই। কিছু সময় ঐতিহাসিক স্থানটি ঘুরে দেখা এবং দুপুরের খাবারের পর শুরু হয় নাটক মঞ্চায়ন। প্রথমেই মঞ্চস্থ হয় মাইকেল মধুসূদন দত্ত রচিত প্রহসন ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’। প্রহসনটিতে তৎকালীন বাংলার জমিদার শ্রেণির প্রজাশোষণ, সামাজিক ভণ্ডামি এবং বৃদ্ধ বয়সের লাম্পট্যপূর্ণ চরিত্রের মধ্য দিয়ে বকধার্মিক ভক্তপ্রসাদের স্বরূপ উন্মোচিত হয়েছে। মধুসূদনের জন্মভিটায় দাঁড়িয়ে তারই রচিত নাটক মঞ্চস্থ করা শিক্ষার্থীদের জন্য ছিল বিশেষ এক অনুভূতি।
এরপর মঞ্চস্থ হয় দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীলদর্পণ’। ইংরেজ নীলকরদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ বাংলার জনজীবন, কৃষকের নিপীড়ন ও শোষণের বাস্তব চিত্র এই নাটকের প্রধান বিষয়। শ্রেণিকক্ষে পাঠ করা নাটকটি সাগরদাঁড়ির ঐতিহাসিক পরিবেশে মঞ্চস্থ করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা সাহিত্যিক বর্ণনার পাশাপাশি সেই সময়ের সামাজিক বাস্তবতাকেও নতুনভাবে উপলব্ধি করার সুযোগ পায়।
তৃতীয় নাটক ছিল বুদ্ধদেব বসু রচিত ‘তপস্বী ও তরঙ্গিণী’। পৌরাণিক কাহিনি অবলম্বনে রচিত এই নাটকে তপস্বী ঋষ্যশৃঙ্গ ও বারাঙ্গনা তরঙ্গিণীর প্রেমকাহিনির পাশাপাশি রাজকন্যা শান্তার দেশপ্রেম এবং ঋষ্যশৃঙ্গের অন্তর্দ্বন্দ্ব উঠে এসেছে।
সবশেষে মঞ্চস্থ হয় বিজন ভট্টাচার্যের গণনাট্য ‘নবান্ন’। ১৩৫০ বঙ্গাব্দের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ এবং এর ফলে বাংলার মানুষের দুঃখ, দৈন্য, সংগ্রাম ও পুনরুত্থানের চিত্র এই নাটকের মূল উপজীব্য। চারটি নাটকের বিষয়, সময় ও প্রেক্ষাপট আলাদা হলেও প্রতিটি নাটকই শিক্ষার্থীদের সাহিত্যকে সমাজ এবং জীবনের সঙ্গে যুক্ত করে দেখার সুযোগ দিয়েছে।
নাটক মঞ্চস্থ করার মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের ভেতরের জড়তা অনেকটাই দূর হয়েছে। একই সঙ্গে প্রত্যেকেই নিজেদের মধ্যে অভিনয়ের নতুন সক্ষমতা আবিষ্কার করেছে। শ্রেণিকক্ষের পাঠ এখানে রূপ নিয়েছে সৃজনশীল অনুশীলনে আর সাহিত্য হয়ে উঠেছে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার অংশ।
পাঠকমেলার মূল ভাবনায়ও পাঠের সঙ্গে মানুষের সরাসরি সংযোগ তৈরির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। পাঠকের কাছে বই পৌঁছে দেওয়া যেমন পাঠকমেলার কাজ, তেমনি বইয়ের পাঠকে বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করাও সাহিত্যচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সাগরদাঁড়ির এই আয়োজন সেই অর্থে পাঠ, সাহিত্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে একই পরিসরে নিয়ে এসেছে।
এই আয়োজনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা ছিল কপোতাক্ষ নদে নৌভ্রমণ। এত দিন বইয়ের পাতায় যে কপোতাক্ষ নদের কথা পড়েছি, সেই নদেই নৌকায় ভ্রমণ ছিল এক অন্যরকম অনুভূতি। নদের দুই তীরে বড় বড় গাছ, পানিতে ভেসে থাকা কচুরিপানা আর নৌকায় বসে নদীর পানিতে পা ভেজানোর মুহূর্তগুলো শিক্ষার্থীদের জন্য হয়ে ওঠে স্মরণীয়। কবিতায় ও সাহিত্যে পড়া কপোতাক্ষকে এবার তারা চোখের সামনে দেখেছে, ছুঁয়েছে এবং অনুভব করেছে।
পাঠকমেলা ইবি শাখার সঙ্গে বাংলা বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের এই আয়োজন তাই শুধু একটি শিক্ষা সফর বা নাট্য মঞ্চায়ন নয়। এটি পাঠের সঙ্গে বাস্তবতার, সাহিত্যের সঙ্গে ইতিহাসের এবং শ্রেণিকক্ষের সঙ্গে জীবনের একটি সেতুবন্ধ। বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ না থেকে সাহিত্য যখন মঞ্চে, মানুষের অভিজ্ঞতায় ও ঐতিহাসিক পরিসরে জীবন্ত হয়ে ওঠে, তখন শিক্ষার পরিসরও বিস্তৃত হয়। এমন আয়োজন শিক্ষার্থীদের সাহিত্যপাঠে নতুন আগ্রহ তৈরি করবে এবং পাঠকমেলার পাঠভিত্তিক সাংস্কৃতিক চর্চাকে আরো সমৃদ্ধ করবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

