আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

আওয়ামী সন্ত্রাসীদের গুলিতে প্রাণ হারান সা‌ব্বির

আরিফুল আবেদীন টি‌টো, ঝিনাইদহ

আওয়ামী সন্ত্রাসীদের গুলিতে প্রাণ হারান সা‌ব্বির

টগব‌গে যুবক হা‌ফেজ মো. সা‌ব্বির হো‌সেন। বয়স ছিল মাত্র ২২ বছর। অভা‌বের তাড়নায় সংসা‌রের হাল ধর‌তে ঢাকায় অফিস সহকারীর চাকরি শুরু ক‌রেন। সারা‌ মাস খে‌টে চাকরির সামান্য বেতন ও গ্রা‌মের বা‌ড়ি‌তে বাবার চাষাবা‌দের আ‌য়ে চলত তা‌দের সংসার।

কিন্তু দেশব্যাপী জুলাই বিপ্ল‌বে রাজধানীর উত্তরার আজমপু‌রে বৈষম্য‌বি‌রোধী ছাত্র আন্দোল‌নে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী‌দের চালানো গু‌লি গলায় বিদ্ধ হয়ে শহীদ হন কোরআনের এই হাফেজ।

বিজ্ঞাপন

ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপ‌জেলার মির্জাপুর গ্রামের মো. আমোদ আলী মণ্ডলের তিন সন্তা‌নের ম‌ধ্যে সবার বড় হা‌ফেজ সা‌ব্বির হো‌সেন।

শৈলকুপা হাবিবপুর হাফেজিয়া মাদ্রাসা থে‌কে হাফেজি পাস করা সাব্বির সংস‌া‌রের অভাব মেটা‌তে ২০২৪ সা‌লের ফেব্রুয়ারি মা‌সে ঢাকা‌য় পা‌ড়ি জমান। রাজধানীর উত্তরায় একটি বেসরকারি কোম্পানিতে অফিস সহকারী হিসে‌বে চাকরি শুরু ক‌রেন হা‌ফেজ সা‌ব্বির। জুলাই মা‌সে দে‌শে শুরু হয় বৈষম্য‌বি‌রোধী ছাত্র আন্দোলন। শুরু থেকেই আন্দোলনে যুক্ত ছি‌লেন সা‌ব্বির।

চাচা‌তো ভাই শৈলকুপা সাব-রে‌জিস্ট্রি অফিসের দ‌লিল লেখক আব্দুল হা‌লিম মণ্ডল জানান, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই কাকডাকা ভোর থে‌কেই ঢাকার রাস্তায় না‌মেন আন্দোলনরত ছাত্র-ছাত্রীরা। আন্দোলনকারীদের পা‌নি আর জুস খাওয়া‌নোর দা‌য়িত্ব প‌ড়ে শহীদ সা‌ব্বিরের ওপ‌র।

আন্দোলন দমনে সমগ্র উত্তরা এলাকায় ওই দিন পু‌লি‌শের সঙ্গে যোগ দেয় আওয়ামী লী‌গের অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা। সারা‌দিন আন্দোলনরত শিক্ষার্থী, প‌ুলিশ ও ছাত্রলীগ-যুবলী‌গের ত্রিমুখী সংঘ‌র্ষে উত্তরার আজমপুর এলাকা রণ‌ক্ষে‌ত্রে প‌রিণত হয়। ঢাকা বিশ্ব‌বিদ্যালয়ের ক‌য়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে সা‌ব্বির প‌কে‌টের টাকায় পা‌নি আর জুস কি‌নে সারা‌দিন পিপাসার্ত আন্দোলনকা‌রী‌দের মা‌ঝে তা বণ্টন ক‌রেন। এটা দূর থে‌কেই ফ্যা‌সিবা‌দের দোসররা খেয়াল ক‌রে।

আব্দুল হা‌লিম মণ্ডল আরো জানান, ঘ‌ড়ির কাঁটায় তখন ঠিক পাঁচটা। উত্তরার আজমপুর ক্রি‌সেন্ট হাসপাতা‌লের সাম‌নে পু‌লি‌শের টিয়ার‌শে‌লে আন্দোলনরতরা যখন আত্মরক্ষায় ব্যস্ত, ঠিক তখন ছাত্রলীগ-যুবলী‌গের সন্ত্রাসীরা শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য ক‌রে গু‌লি চালায়। এ সময় হঠাৎ এক‌টি বু‌লেট এসে হা‌ফেজ সা‌ব্বি‌রের গলায় বিদ্ধ হ‌লে তিনি রাস্তায় লু‌টি‌য়ে প‌ড়েন। ফিন‌কি দি‌য়ে রক্ত বে‌রি‌য়ে রাজপথ লাল হ‌য়ে যায়। আন্দোলনরত ছাত্ররা উত্তরা ক্রি‌সেন্ট হাসপাতা‌লে নি‌য়ে গে‌লে চিকিৎসকরা হা‌ফেজ সা‌ব্বির‌কে মৃত ঘোষণা ক‌রেন।

শহীদ সা‌ব্বি‌রের এক প্র‌তি‌বেশী জানান, রাত ২টার দি‌কে‌ শহীদ সা‌ব্বি‌রের লাশ ময়নাতদন্ত ছাড়াই মির্জাপুর গ্রা‌মের বা‌ড়ি‌তে এসে পৌঁছায়। কিন্তু শৈলকুপা থানার একদল পু‌লিশ লাশ দ্রুত দাফন করার জন্য প‌রিবা‌রের সদস্য‌দের ওপ‌র চাপ সৃ‌ষ্টি ক‌রে। প‌রে এলাকাবা‌সীর পাল্টা চাপের মু‌খে পু‌লিশ তা‌দের সিদ্ধান্ত থে‌কে স‌রে আসে। সকাল ৯টা পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয় লাশ দাফ‌নের জন্য।

এলাকাবা‌সী জানান, সা‌ব্বির শহীদ হওয়ার পর থে‌কে তার বাবা আমোদ আলী মণ্ডল ও মা রা‌শিদা খাতুন ঠিকম‌তো কা‌রো সঙ্গে কথাবার্তা ব‌লেন না। সন্তান হা‌রি‌য়ে মা রা‌শিদা খাতুন একরকম পাগলপ্রায়।

চাচা‌তো ভাই আব্দুল হা‌লিম মণ্ডল জানান, সা‌ব্বি‌রের ছোট বোন শৈলকুপা দুঃ‌খী মাহমুদ ডি‌গ্রি ক‌লে‌জে উচ্চ মাধ্য‌মিক দ্বিতীয় ব‌র্ষে আর ছোট ভাই ঝিনাইদহ শহ‌রের বাস টা‌র্মিনাল এলাকার এক‌টি মাদ্রাসায়‌ হা‌ফেজি পড়‌ছে। প‌রিবা‌রের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হা‌রি‌য়ে ছোট দুই ভাই-বোনের পড়া‌শোনা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দি‌য়ে‌ছে। তা ছাড়া হা‌ফেজ সা‌ব্বি‌রের বাবা আমোদ মণ্ডলও দীর্ঘ‌দিন ধরে অসুস্থ।

সন্তানের হত্যার বিচার চেয়ে সা‌ব্বি‌রের বাবা আমোদ আলী মণ্ডল বলেন, হা‌সিনার দোসররা আমার সন্তান‌কে হত্যা‌ ক‌রে‌ছে। সা‌ব্বিরসহ জুলাই বিপ্ল‌বে হত্যার শিকার সবার বিচার হ‌লে আগামীতে বাংলা‌দে‌শে আর কেউ রাজপ‌থে ছাত্রহত্যার সাহস দেখা‌বে না। বুক খা‌লি হ‌বে না কোনো বাবা-মা‌য়ের।

ঝিনাইদহ জেলা বৈষম্য‌বি‌রোধী ছাত্র আন্দোলনের যুগ্ম-আহ্বায়ক আনিচুর রহমান বলেন, আহত-নিহত‌দের বিষয়ে‌ অধিকতর যাচাই-বাছাই চল‌ছে। নিহত‌দের প‌রিবারগু‌লো যা‌তে আর্থিক ও সামা‌জিকভা‌বে সুরক্ষা পায়, সে ল‌ক্ষ্যে কাজ কর‌ছে সরকা‌র।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন