আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ছিটকে পড়ে মাসুমের মগজ রক্তে ভেসে যায়

ইব্রাহিম মাহমুদ

ছিটকে পড়ে মাসুমের মগজ রক্তে ভেসে যায়

ঘরে থেকেও শিশুরা মারা যাচ্ছে, আমিও প্রয়োজনে শহীদ হব। আমার ভাই তার কথা রেখেছেন। বেছে নিয়েছেন শাহাদতের মর্যাদা। মাকে দিয়ে গেছেন সীমাহীন বেদনার বোঝা। এসব কথা আমার দেশকে বলছিলেন শহীদ মাহবুব হাসান মাসুমের ভাই মনজুরুল ইসলাম।

বিজ্ঞাপন

শহীদ মাহবুব হাসান মাসুমের বয়স হয়েছিল মাত্র ২৫ বছর। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শুরু থেকেই যুক্ত ছিলেন তিনি। গত ৪ আগস্ট ফেনীর মহিপালে বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নিয়ে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের গুলিতে গুরুতর আহত হন মাসুম। ৭ আগস্ট চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান তিনি।

ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার চরচান্দিয়া ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডে জন্ম মাসুমের। চার ভাই ও তিন বোনের পরিবারে ভাইদের মধ্যে মাসুম তৃতীয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে এক দফা দাবির পক্ষে অবস্থান নেন মাসুম। লাল সবুজের পতাকা আর প্লাকার্ড হাতে আওয়াজ তোলেন সরকার পতনের। নতুন স্বাধীনতা অর্জনের।

একপর্যায়ে সেখানে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের গুলিতে গুরুতর আহত হন মাসুম। প্রথমে ফেনীতে ও পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয় তাকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর বাঁচানো যায়নি এই সাহসী যুবককে। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দুদিন পর নতুন বাংলাদেশের মাটিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন মাসুম।

মাসুমের ছোট ভাই মনজুরুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, ‘আমরা পরিবারের সবাই চট্টগ্রামে থাকি। শুধু মাসুম ভাই ফেনীতে। আমরা নিষেধ করলে ভাইয়া বলতেন, ঘরে থেকেও শিশুরা মারা যাচ্ছে, আমিও প্রয়োজনে শহীদ হব।’

বাদ জোহর আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের কয়েক দফা সংঘর্ষ হয়। পুলিশের গুলির মুখে ইট পাটকেল নিক্ষেপ করে আন্দোলনকারীরা। একপর্যায়ে বুলেট শেষ হয়ে গেলে পিছু হটতে বাধ্য হয় পুলিশ। যাওয়ার আগে হুমকির সুরে বলে যায়- আমরা চলে যাচ্ছি, এখন ছাত্রলীগ আসবে। কিছুক্ষণ পরেই শুরু হয় ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী বাহিনীর তাণ্ডব। বিদেশি অস্ত্র হাতে চারিদিকে মুহুর্মুহু গুলি ছুড়তে থাকে তারা। এতে ছত্রভঙ্গ হয়ে যান আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী-জনতা। নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে এদিক-সেদিক ছুটতে থাকেন সবাই।

একটি ভবনের ফাঁকা জায়গায় গিয়ে দাঁড়ান মাসুম। ঠিক তখনই কালো জ্যাকেট আর হেলমেট পরা একটা ছেলে বিদেশি অস্ত্র হাতে এসে পরপর তিনটি গুলি করে মাসুমের মাথায়। বুলেটের আঘাতে মগজ ছিটকে রাস্তায় গিয়ে পড়ে। হুমড়ি খেয়ে রাস্তার ওপর পড়ে যান তিনি। এতে তার নাক মুখ ছেঁচে যায়, রক্তে ভেসে যায় পিচঢালা রাস্তা।

ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা চলে যাওয়ার পর বন্ধুসহ কয়েকজন মিলে রিকশায় করে ফেনী সদর হাসপাতালে নিয়ে যান মাসুমকে। তবে সেখানে কোনো চিকিৎসা হয়নি তার। শুধু মাথা ও নাক-মুখে ব্যান্ডেজ করে দেওয়া হয়।

মাসুমের ভাই মনজুরুল হাসান আমার দেশকে বলেন, ‘আমরা সবাই চট্টগ্রাম থাকায় মাসুম ভাইয়ের গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর পেতে দেরি হয়। খবর পাওয়া মাত্রই আমরা অ্যাম্বুলেন্স খুঁজতে থাকি। কিন্তু কোনো অ্যাম্বুলেন্স যেতে রাজি হয় না। পরে জানতে পারি, ফেনীর এমপি নিজাম হাজারি আন্দোলনকারীদের চিকিৎসা দিতে নিষেধ করেছেন হাসপাতালগুলোকে। তাই কোনো অ্যাম্বুলেন্সই মহিপাল যাবে না।

ফলে আমরা চট্টগ্রাম থেকে অ্যাম্বুলেন্স পাঠাতে ব্যর্থ হই। অনেক চেষ্টার পরে একটা অ্যাম্বুলেন্স জোগাড় করে ভাইয়াকে চট্টগ্রাম এনে পার্কভিউ হাসপাতালে ভর্তি করা হয় সেদিন সন্ধ্যায়। সেখানে তিনি লাইফ সাপোর্টে ছিলেন তিন দিন।

গুলি মগজে ঢুকে যাওয়ায় ব্রেইন ডেড হয়ে যান তিনি। পরে ডাক্তারের পরামর্শে তৃতীয় দিন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয় তাকে। সেখানে নেওয়ার দুই থেকে তিন ঘণ্টা পরেই তার মৃত্যু হয়। পরদিন জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে বাবার কবরের পাশে তার লাশ দাফন করা হয়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন