গণঅভ্যুত্থানের সাফল্য-ব্যর্থতা

গণঅভ্যুত্থানের সাফল্য-ব্যর্থতা

মার্কিন ইতিহাসবিদ ক্রেন ব্রিনটন তার ‘দি অ্যানাটমি অব রেভোলিউশন’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, পৃথিবীর প্রতিটি বড় বিপ্লবের একটি ঝড়ের মতো গতিপথ থাকে— উত্তাপ, সংকট, তারপর উপশম। উপশমের কালেই বিপ্লবের প্রকৃত পরীক্ষা; কারণ তখন আবেগের জায়গা নেয় হিসাব-নিকাশ, ঐক্যের জায়গা নেয় ক্ষমতার ভাগ-বাঁটোয়ারা। ফরাসি চিন্তাবিদ টকভিল আরো আগেই সতর্ক করেছিলেন— জনপ্রত্যাশা যখন আকাশছোঁয়া আর প্রাপ্তি মাটিতে হামাগুড়ি দেয়, তখনই বিপ্লব সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মুহূর্তে পৌঁছায়। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তির প্রাক্কালে, নির্বাচিত সরকারের ছয় মাসের মাথায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশকে আজ এই দুই তাত্ত্বিকের আয়নায় নিজেকে দেখতে হচ্ছে। জুলাই বিপ্লবের খতিয়ানে ইতিবাচক অর্জন যেমন সুবিশাল, নেতিবাচক উপসর্গও তেমনি উপেক্ষণীয় নয়। সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব দুটোকেই নির্মোহভাবে বিচার করা।

বিচারের শুরুতেই পটভূমির দিকে ফিরে তাকানো জরুরি। জুলাই অভ্যুত্থানকে কেবল কোটা সংস্কার আন্দোলনের ফল ভাবলে ইতিহাসের প্রতি অবিচার হবে। এর শিকড় প্রোথিত ছিল দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনে— ভোটাধিকার হরণ, গুম-খুন, আয়নাঘর, ব্যাংক লুণ্ঠন, বিচার বিভাগ ও প্রশাসনের নির্লজ্জ দলীয়করণ এবং ভিন্নমতের কণ্ঠরোধ। রাষ্ট্র যখন নাগরিককে প্রজা ভাবে এবং রাষ্ট্রযন্ত্রকে দলীয় লাঠিয়ালে পরিণত করে, তখন রুশো-কথিত সামাজিক চুক্তি ভেঙে পড়ে এবং শাসনের নৈতিক বৈধতা লোপ পায়। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে কোটাবিরোধী আন্দোলন ছিল সেই পুঞ্জীভূত ক্ষোভের অগ্নিস্ফুলিঙ্গমাত্র। শাসকগোষ্ঠী শক্তির দম্ভে আবু সাঈদ, মীর মুগ্ধসহ হাজারো তরুণের বুকের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত করল; সেই রক্তই আন্দোলনকে এক দফায় রূপান্তরিত করে ৫ আগস্টের ঐতিহাসিক গণবিস্ফোরণে স্বৈরশাসনের যবনিকা টেনে দিল। বায়ান্ন, ঊনসত্তর, একাত্তর ও নব্বইয়ের ধারাবাহিকতায় চব্বিশ হয়ে রইল নাগরিকের হৃত সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারের আরেক মহাকাব্য।

বিজ্ঞাপন

এই মহাকাব্যের অর্জনগুলো এখন ইতিহাসের সম্পদ। জুলাইয়ের প্রথম ও প্রধান অর্জন— ভয়ের দেয়াল ভেঙে পড়া। যে জাতি কথা বলতে ভুলে গিয়েছিল, সে ফিরে পেল কণ্ঠস্বর। দ্বিতীয় অর্জন— তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক জাগরণ; যাদের ‘রাজনীতিবিমুখ’ বলে তাচ্ছিল্য করা হতো, তারাই প্রমাণ করল ইতিহাসের চালিকাশক্তি তারাই। তৃতীয়ত, ‘বৈষম্যবিরোধিতা’ শব্দটি জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রীয় দর্শনে পরিণত হলো— রাষ্ট্র মেরামত, সংস্কার, জবাবদিহি এখন আর বুদ্ধিজীবীর সেমিনারের বিষয় নয়, চায়ের দোকানের আলোচ্য। চতুর্থত, ফ্যাসিবাদের আন্তর্জাতিক পৃষ্ঠপোষকতার মুখোশও উন্মোচিত হয়েছে; পররাষ্ট্রনীতিতে মর্যাদা ও ভারসাম্যের প্রশ্ন সামনে এসেছে। পঞ্চমত, এবং সম্ভবত সবচেয়ে গভীর অর্জনটি মনস্তাত্ত্বিক— জাতি শিখেছে যে কোনো স্বৈরশাসনই অজেয় নয়; জনগণ জাগলে প্রবলপ্রতাপ ক্ষমতার মসনদও তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। এই শিক্ষাই ভবিষ্যতের যে কোনো সম্ভাব্য স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে জাতির স্থায়ী রক্ষাকবচ হয়ে থাকবে।

অভ্যুত্থানোত্তর ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের অর্জন ইতিহাস স্বীকার করবে। ভঙ্গুর অর্থনীতিকে খাদের কিনারা থেকে ফেরানো, রিজার্ভ ও রেমিট্যান্সে স্থিতি আনা, সংবিধান-বিচার বিভাগ-নির্বাচনব্যবস্থা-পুলিশ সংস্কারে একগুচ্ছ কমিশন গঠন এবং জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের দীর্ঘ সংলাপের ফসল হিসেবে ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষরে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ প্রণয়ন— এসব ছোট কৃতিত্ব নয়। সর্বোপরি, একটি অংশগ্রহণমূলক, শান্তিপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন উপহার দিয়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের নজির স্থাপন— এটিই তাদের শ্রেষ্ঠ কীর্তি।

কিন্তু বর্জনের তালিকাও দীর্ঘ। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রত্যাশিত মাত্রায় স্বাভাবিক হয়নি; মব-সন্ত্রাস নতুন ব্যাধি হয়ে দেখা দিয়েছিল। নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস কমেনি। জুলাই গণহত্যার বিচার প্রত্যাশিত গতি পায়নি; প্রশাসনে ফ্যাসিবাদের দোসরদের অনেকে বহাল থেকে গেছে। আর সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা— সনদের বাস্তবায়ন আদেশ, নোট অব ডিসেন্ট ও গণভোটের পদ্ধতি নিয়ে দলগুলোর বিবাদ মেটাতে না পারা; ঐক্যের দলিলটিই হয়ে দাঁড়াল বিভাজনের উপলক্ষ। হান্না আরেন্ট যথার্থই বলেছিলেন— স্বৈরাচারের পতন ঘটানোর চেয়ে বহুগুণ কঠিন বিপ্লবী চেতনাকে টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় রূপ দেওয়া। অন্তর্বর্তী সরকারের সাফল্য-ব্যর্থতার এই মিশ্র খতিয়ান বিচারে অবশ্য একটি সতর্কতাও জরুরি— যে সরকার ধ্বংসপ্রাপ্ত রাষ্ট্রযন্ত্র, শূন্য কোষাগার ও অভ্যন্তরীণ-বহিরাগত ষড়যন্ত্রের ত্রিমুখী চাপ সামলে দেড় বছরের মধ্যে জাতিকে নির্বাচনের বন্দরে পৌঁছে দিয়েছে, তাদের সীমাবদ্ধতাগুলোকে ইতিহাস সম্ভবত সহানুভূতির চোখেই দেখবে।

তবু সব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই সনদের গণভোট একই দিনে অনুষ্ঠিত হলো; প্রায় ৬০ শতাংশ ভোটারের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে জনগণ দিল দুটি ঐতিহাসিক রায়— বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে বিজয়ী করে রাষ্ট্রপরিচালনার ম্যান্ডেট, আর গণভোটে ‘হ্যাঁ’ রায়ে জুলাই সনদের জাতীয় স্বীকৃতি। জামায়াতে ইসলামী বসল প্রধান বিরোধী দলের আসনে। দেড় যুগের ভোটাধিকারহীনতার পর ব্যালটের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর— এ কি কম প্রাপ্তি? দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী অপশাসনের অন্ধকার সুড়ঙ্গ পেরিয়ে জাতি গণতন্ত্রের আলোয় ফিরল। তবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের নির্মোহ সত্য মনে রাখতে হবে— নির্বাচন গণতন্ত্রের প্রবেশদ্বার মাত্র, গন্তব্য নয়।

গন্তব্যে পৌঁছানোর সেই যাত্রায় নিরঙ্কুশ বিজয় নিজেই এক পরীক্ষা। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা যেমন সংস্কারের অভূতপূর্ব সুযোগ, তেমনি ভয়ঙ্কর প্রলোভনও। আমাদের ইতিহাসে নিরঙ্কুশ ম্যান্ডেট বারবার ঔদ্ধত্য, বিরোধী দলন ও দলীয়করণের জন্ম দিয়েছে— তিয়াত্তরে দিয়েছে, দুই হাজার নয়ের পর এবং এবং অভ্যুত্থান পূর্ববর্তী সময়েও আমরা দেখেছি। স্বীকার করতে হবে, ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে এখন পর্যন্ত সদিচ্ছা, সহানুভূতি ও পেশাদারিত্বের পরিচয় দৃশ্যমান— বন্ধ শিল্পকারখানা চালুর নির্দেশনা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে মনোযোগ, শহীদ পরিবার ও আহতদের প্রতি সংবেদনশীলতা এবং ‘প্রতিহিংসা নয়, ক্ষমা’ জাতীয় বার্তা আশাব্যঞ্জক। কিন্তু কেন্দ্রের সুবাতাস তৃণমূলে পৌঁছাচ্ছে কি? চাঁদাবাজি, দখল ও ভোল পাল্টানো সুবিধাবাদীদের অনুপ্রবেশ নিয়ে খোদ শাসক দলের মহাসচিবকেই ক্ষোভ প্রকাশ করতে হচ্ছে— এটিই বাস্তবতার নির্মম সাক্ষ্য।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক নেতিবাচক উপসর্গ— জুলাই সনদের ব্যাখ্যা ঘিরে বিতর্ক এবং অভ্যুত্থানের শক্তিগুলোর পারস্পরিক সংঘাত। সরকার বলছে, সনদের প্রতিটি অঙ্গীকার বাস্তবায়িত হবে; বিরোধী শিবির ও তরুণদের দল এনসিপি বলছে, বাস্তবায়নের গতি মন্থর, কোথাও অস্বীকারের প্রবণতা স্পষ্ট। তর্ক গড়িয়েছে রাজপথে— বিএনপি ও এনসিপি নেতাকর্মীদের বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ, এনসিপি নেতার গাড়িবহরে হামলা, কর্মসূচিতে বাধা, পাল্টাপাল্টি উত্তপ্ত বাক্যবাণ। মানবাধিকার সংস্থার হিসাবে তিন মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় চল্লিশোর্ধ্ব প্রাণহানি ও শত শত আহতের পরিসংখ্যান যে কোনো বিবেচনায় অগ্রহণযোগ্য। শীর্ষ নেতৃত্বের সদিচ্ছা যতই থাকুক, মাঠের এই রক্তপাত জুলাইয়ের চেতনার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা। ইতিহাস সাক্ষী— বিপ্লবের শরিকদের অন্তঃলহই প্রতিবিপ্লবের সবচেয়ে উর্বর জমি তৈরি করে। পরাজিত ফ্যাসিবাদী শক্তি দেশে-বিদেশে বসে এই ফাটলের দিকেই লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে— এ কথা এক মুহূর্তের জন্যও ভোলা যাবে না। মনে রাখা দরকার, সনদ কোনো দলীয় দলিল নয়; গণভোটের রায়ে এটি এখন জাতীয় অঙ্গীকার। এর কোন ধারা কীভাবে, কোন আইনি প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়িত হবে— তা নিয়ে মতভেদ থাকা অস্বাভাবিক নয়; সাংবিধানিক রূপান্তরের প্রতিটি অধ্যায়ে পৃথিবীর সর্বত্রই এমন বিতর্ক হয়েছে। কিন্তু সেই বিতর্কের মীমাংসার জায়গা রাজপথের সংঘর্ষ নয়। সনদের ব্যাখ্যা নির্ধারিত হোক সংসদে, আদালতে, সংলাপের টেবিলে— লাঠির মাথায় নয়। সরকারের উচিত বড় দলের উদারতা দেখিয়ে সংলাপের দরজা খুলে দেওয়া, আর তরুণদের দলের উচিত রাষ্ট্রনৈতিক পরিপক্বতার পরিচয় দেওয়া।

তাহলে চূড়ান্ত হিসাবটা কী দাঁড়ায়? গ্লাসটি অর্ধেক খালি, নাকি অর্ধেক পূর্ণ? এই নিবন্ধকারের বিবেচনায়— পূর্ণতার পাল্লাই ভারী। একটি জাতি মাত্র দুই বছরে ফ্যাসিবাদের সমস্ত অপচেষ্টার পতন ঘটিয়েছে, রক্তপাতহীন উত্তরণ সম্পন্ন করেছে, ঐকমত্যের সনদ প্রণয়ন করেছে, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করেছে— বিশ্বের বিপ্লবোত্তর ইতিহাসে এমন দৃষ্টান্ত বিরল। ব্যর্থতাগুলো উত্তরণযোগ্য; কিন্তু অর্জনগুলো হারালে পুনরুদ্ধারের সুযোগ শতাব্দীতে একবারও আসে না। তাই সরকারের কাছে প্রত্যাশা— সনদ বাস্তবায়নের সময়াবদ্ধ রোডম্যাপ, গণহত্যার দ্রুত বিচার, প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা এবং সমালোচনা সহ্য করার সক্ষমতা। বিরোধী পক্ষ ও তরুণদের কাছে প্রত্যাশা— গঠনমূলক বিরোধিতা, ধ্বংসাত্মক সংঘাত নয়। আর সবার কাছে প্রত্যাশা— ন্যূনতম জাতীয় ইস্যুতে ঐক্য।

সচেতন নাগরিক সাধারণ হতাশ হতে চায় না; তারা আশাবাদ রাখতে চায়। তারা জানে, দুই বছর জাতির জীবনে এক পলক মাত্র; রোম এক দিনে গড়ে ওঠেনি, ফ্যাসিবাদের দেড় দশকের ক্ষতও এক নির্বাচনে সারবে না। কিন্তু যাত্রার অভিমুখটি সঠিক থাকলে গন্তব্য একদিন ধরা দেবেই— এই বিশ্বাসেই তারা ধৈর্য ধরে আছে। কারণ তারা জানে, আবু সাঈদের প্রসারিত বুক আর মুগ্ধর ‘পানি লাগবে, পানি’— এ কেবল স্মৃতি নয়, জাতির বিবেকের কাছে গচ্ছিত আমানত। সেই আমানতের মর্যাদা রক্ষাই হোক দুই বছর পূর্তিতে শাসক, বিরোধী ও নাগরিক সাধারণের একমাত্র অঙ্গীকার। ইতিবাচক-নেতিবাচকের দ্বন্দ্বে শেষ পর্যন্ত ইতিবাচকই জয়ী হোক; জুলাই যেন মরীচিকা না হয়, হয় মুক্তির মিনার।

লেখক : রাজনীতি বিশ্লেষক, সাবেক অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন