৩০ বছরের ভিক্ষুক ও আগস্টের বাংলাদেশ

৩০ বছরের ভিক্ষুক ও আগস্টের বাংলাদেশ
ফাইল ছবি

জুলাইয়ের কথা লিখতে গেলে কী মনে পড়া উচিত একজন মানুষের? বিশেষ করে, যেই মানুষটা জুলাইয়ের রক্তঝরা দিনগুলো নিজের চোখে দেখেছে, সেই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে তার জুলাইয়ের গল্প কেমন হওয়া উচিত? গুলির শব্দ? মানুষের রক্ত? আহতের আর্তনাদ? হেলিকপ্টারের গর্জন? নাকি স্লোগানে মুখরিত রাজপথ?

বিজ্ঞাপন

কমবেশি সব আন্দোলনকারীর অভিজ্ঞতা উল্লিখিত জিনিসগুলোর কিছু না কিছু মিলিয়ে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এর বাইরে কি জুলাইয়ে কিছু ছিল না? রক্তে ভাসা রাজপথের গল্পের বাইরেও কিছু গল্প আছে অচেনা মানুষকে দেখে হুট করে শান্তশিষ্ট একটা মেয়ের সাহসী হয়ে ওঠার গল্প, আছে অচেনা মানুষের আশ্রয়ে থেকে অকৃত্রিম স্নেহ পাওয়ার গল্প, আছে অদ্ভুত সব সহানুভূতির গল্প।

আমি জুলাইয়ের একজন অতিক্ষুদ্র অংশগ্রহণকারী হিসেবে আজকে রক্ত আর লাশের বাইরের কিছু গল্প বলি। যেই গল্পের কিছু চরিত্রের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে, কিছু চরিত্র অপরিচিত থেকেও অম্লান হয়ে আছে মনের মধ্যে ।

শুরু করি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে।

আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্রী তখন। কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হয়েছে। আমাদের সেমিস্টার ফাইনাল চলে। একটা পরীক্ষা হওয়ার পর বাকিগুলো বর্জন করা হলো সম্মিলিতভাবে। শামসুন নাহার হলে থাকি। প্রতিদিন আমরা মেয়েদের জড়ো করে ব্যানার নিয়ে আন্দোলনে যোগ দিই।

এর মধ্যে বাংলা ব্লকেড ঘোষণা হলো। এর আগে টুকটাক স্লোগান দিতাম, কিন্তু বক্তব্যের মঞ্চে ভিড়ের কারণে কখনো কথা বলতে আগ্রহী হইনি। সেদিন কী মনে করে কথা বললাম। একদম ইনফরমাল বক্তব্য। তত্ত্বকথার বাইরে গিয়ে শিক্ষার্থীদের ভাষাটা তুলে ধরলাম। বক্তব্যের মাঝেমধ্যে তুমুল করতালি পাচ্ছি। শেষ করে যখন বসার জায়গায় ফিরলাম, তখন আমার হলের একটা মেয়ে কেঁদে ফেলল হাত ধরে। বলল, ‘আপু, আমি সারাদিন পড়াশোনা করি। রুম থেকে বের হই না। আমার আম্মু ডিম বিক্রি করে, পুকুরের মাছ বিক্রি করে আমাকে খরচ পাঠায়। আপনার কথা শুনে সেসব মনে পড়ে গেল। আমি এই আন্দোলন শেষ না হওয়া পর্যন্ত থাকব।’

মেয়েটা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শাহবাগের তপ্ত গরমে বসে থেকে মাথাব্যথা নিয়ে প্রতিদিন পড়তে বসত। হাজার হাজার মানুষের ভিড়ে এই শান্ত, পড়ুয়া মেয়েটার হুট করে কেঁদে ফেলা দেখে সেদিন শপথ নিয়েছিলাম, আমাদের আর ফিরে যাওয়া চলে না। মেয়েটা প্রথম বিসিএস দিয়েই ক্যাডার হয়েছে। মাস্টার্স চলাকালে, হলে থাকাকালে মেয়েটা বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছে।

শুধু যে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে ছিল এমন তো না। আমি এক যুগ্মসচিবের মেয়েকে পড়াতাম। শাহবাগে আন্দোলন শেষে হেঁটে হেঁটে পড়াতে যেতাম। আন্টি প্রতিদিন আমাকে যত্ন করে বসিয়ে জানাতেন, উনি আমাদের সঙ্গে আছেন। একদিন হাতে কিছু টাকা দিয়ে বললেন, ‘মা, আমি তো যেতে পারি না আন্দোলনে, তোমরা পানি কিনো এই টাকা দিয়ে।’

আমরা কতভাবে এমন মা, বাবাদের সহযোগিতা যে পেয়েছি!

আন্দোলন যখন অভ্যুত্থানে রূপ নিল, তখনকার কথায় আসি। অভ্যুত্থানের একদম শেষপর্যায়ে এক জুনিয়রের টিউশনের বাসায় উঠলাম তার মাধ্যমে। সেই আপু আমাকে চেনে না। আমি মাত্র দুটো বাইরে পরার মতো জামা নিয়ে কোনোমতে হল থেকে বের হয়েছিলাম। আন্দোলন থেকে ফিরে আসার পর ওই আপু ডেইলি আমার জামাকাপড় ধুয়ে রাখার ব্যবস্থা করতেন, যেন পরদিন পরতে পারি। ওনার অসুস্থ শাশুড়ির দেখাশোনার জন্য হেল্পিং হ্যান্ড ছিল, তাকে বলতেন আমাদের পায়ে মালিশ করে দেওয়ার জন্য। আমরা বহু কষ্টে তাকে নিবৃত্ত করেছি। প্রতিদিন দেখতাম অনেক খাবার বানিয়ে নিয়ে যেতেন আন্দোলনকারীদের জন্য। আমাদের বলতেন, ‘তোমরা নিশ্চিন্তে ঘুমাও। আমি থাকতে তোমাদের বিপদ হবে না।’

এমন কতশত মানুষের সাহায্য পেয়েছি, তা বলে বোঝানো যাবে না। অচেনা নম্বর থেকে ফোনে রিচার্জ পেয়েছি। রাস্তায় বের হলে হাতের কাছে পানি পেয়েছি, খাবার পেয়েছি।

পানির কথায় মনে পড়ল অভ্যুত্থানকালে আমার দেখা সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তের কথা।

সেদিন ৩ আগস্ট। সবাই শহীদ মিনারে জড়ো হচ্ছে। আমিও অনেকটা দূর থেকে হেঁটে এসেছি। শহীদ মিনারে এসে এক কোনায় বসে পড়েছি ক্লান্ত হয়ে। হঠাৎ সামনে একজনকে দেখি পানির বোতল নিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে। তার পোশাক-আশাক জরাজীর্ণ, হাত-পায়ের চামড়া ভাঁজ পড়ে গেছে। আমি পানির বোতল নিয়ে তার দিকে টাকা এগিয়ে দিলাম। উনি টাকা নেবেন না। জিজ্ঞাসা করলাম, কেন নেবেন না?

জবাবে উনি বললেন, ‘মা, ৩০ বছর ধরে ঢাকায় ভিক্ষা করি। জীবনে এভাবে মানুষ মরতে দেখিনি। তুমি এই পানিটা নাও। আমি সারাদিন ভিক্ষা করে যত টাকা পাইছি তাই দিয়ে পানি কিনছি তোমাদের জন্য।’

আমি পানিটা তো হাত বাড়িয়ে নিলাম। কিন্তু ওই মুহূর্তে এত বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলাম যে মাথা কেমন ফাঁকা লাগছিল। তাকে ধন্যবাদটাও দিতে পারিনি। খানিকক্ষণ বসে বসে কেঁদেছি মানুষের এমন অকৃত্রিম ভালোবাসা দেখে। অথচ আশপাশের কেউ আমার দিকে একবারও অদ্ভুত চোখে দেখেনি।

পরে যতবার অভ্যুত্থান নিয়ে তর্কবিতর্ক দেখেছি, ততবার আমার ওই বৃদ্ধ মানুষটার বাড়িয়ে দেওয়া হাতটার কথা মনে পড়েছে। এমনকি অভ্যুত্থানের পর যেই বাংলাদেশের স্বপ্ন আমরা দেখেছি, সেই বাংলাদেশ আমি ৩ আগস্ট দেখেছি। ৫ আগস্টের পর স্বার্থের টানাপোড়েন, বহুত মানুষের আক্রোশ আর রাজনৈতিক মারামারি দেখে আমার বারবার মনে হয়েছে, ৩ আগস্টের বাংলাদেশটা আর পাওয়া হলো না আমাদের।

সেদিন শহীদ মিনারে ভিক্ষুক থেকে শুরু করে এসি গাড়িতে চড়ে বেড়ানো ধনী, হুজুর থেকে শুরু করে হাতে ট্যাটু আঁকা শিল্পী সবাই ছিলেন। কেউ কারো দিকে আড়চোখে তাকাননি। কেউ কাউকে অস্বস্তিতে ফেলেননি। কোনো নারী ওই ভিড়ের মধ্যে অপ্রীতিকর অবস্থায় পড়েননি।

এই বাংলাদেশ যারা সেদিন দেখেছেন, তাদের আজীবনের আকাঙ্ক্ষা থেকে যাবে তেমন বাংলাদেশ গড়ার, তেমন বাংলাদেশ পাওয়ার। আমি বাংলাদেশের সব মানুষের কাছে নিবেদন জানাই, ওই সহাবস্থান আর সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়াই হোক আমাদের শপথ। ওই বাংলাদেশই আমাদের জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা।

লেখক : ছাত্রনেতা

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন