হেলিকপ্টারের গুলিতে প্রাণ হারান মেধাবী আহসান, ন্যায়বিচার প্রত্যাশা পরিবারের

হেলিকপ্টারের গুলিতে প্রাণ হারান মেধাবী আহসান, ন্যায়বিচার প্রত্যাশা পরিবারের
শহীদ আহসান কবীর শরীফ

‘বাবা, তুই বাইরে যাইস না’—২০২৪ সালের ২১ জুলাই ঢাকাজুড়ে সংঘাত, গুলির শব্দ ও আতঙ্কের মধ্যে ছেলে আহসান কবীর শরীফকে বারবার এভাবেই অনুরোধ করেছিলেন মা খালেদা কবির। কিন্তু চলমান আন্দোলনে অংশ নিতে ঘর থেকে বেরিয়ে যান তিনি। তবে তার আর জীবিত ফিরে আসা হয়নি।

ঢাকার ডেমরা থানার দক্ষিণ সানারপাড় এলাকার বাসিন্দা শরীফ (৩৩) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন।

বিজ্ঞাপন

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ২১ জুলাই দুপুরে তিনি সাইনবোর্ড এলাকায় অবস্থান করছিলেন এবং আন্দোলনের বিভিন্ন দৃশ্য মোবাইল ফোনে রেকর্ড করছিলেন। বেলা ৩টার দিকে আকাশে থাকা একটি হেলিকপ্টার থেকে গুলিবর্ষণ শুরু হলে একটি গুলি তার বুক ভেদ করে বেরিয়ে যায়। ফলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান তার বাবা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, গিয়ে দেখি ছেলের নিথর দেহটা রাস্তায় পড়ে আছে। আশপাশে কোনো গাড়ি নেই। পরে এক সবজি বিক্রেতার ভ্যানে উঠিয়ে নিজেই ভ্যান টেনে হাসপাতালে নিই। ডাক্তারকে বলেছিলাম, আমার ছেলেটাকে বাঁচান। কিন্তু ডাক্তার জানান, আপনার ছেলে আর বেঁচে নেই।

পরিবারের অভিযোগ, শরীফকে হাসপাতালে নেওয়ার পর আওয়ামী লীগপন্থি স্থানীয় কয়েক ব্যক্তি দ্রুত দাফনের জন্য চাপ সৃষ্টি করে এবং পোস্টমর্টেম না করার বিষয়ে ভয়ভীতি দেখায়। নিরাপত্তা শঙ্কায় সেদিনই মাগরিবের নামাজের পর ডেমরার শুকুরসী কবরস্থানে শরীফকে দাফন করা হয়।

পরে বাবা হুমায়ুন কবির বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রধান আসামি করা হয়। এছাড়া সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক এবং সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানসহ কয়েকজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এজাহারে উল্লেখ করা হয়, পরিকল্পিতভাবে হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালিয়ে শরীফকে হত্যা করা হয়েছে এবং পরে পোস্টমর্টেম না করার জন্য পরিবারকে হুমকি দেওয়া হয়।

আহসান কবীর শরীফের পরিবারে রয়েছেন বাবা, অসুস্থ মা, এক প্রবাসী বড় ভাই ও এক বোন। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, সংসারের নানা দায়িত্বে তিনিই ছিলেন সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য।

মা খালেদা কবির বলেন, আমার হাঁটুর অপারেশন হয়েছে। ঠিকমতো হাঁটতে পারি না। শরীফ অফিস থেকে এসে আমার পায়ে মালিশ করত। যা দরকার হতো, সব ব্যবস্থা করত। আল্লাহ আমার ছেলেকে নিয়ে গেছে, আমি কেমনে বাঁচি?

বোন রোকেয়া বলেন, হেলিকপ্টার থেকে পাখি শিকারের মতো গুলি করে আমার ভাইকে মেরে ফেলা হয়েছে। ভাইয়ের মৃত্যুর পর পরিবারটা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। বাবা ঘরে থাকতে পারেন না, বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ান।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, শরীফের মৃত্যুর পর জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে দুই লাখ টাকা এবং জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন থেকে পাঁচ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

শরীফের বাবা হুমায়ুন কবির বলেন, আমার ছেলেটা সোনার টুকরা ছিল। ওকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিল। আমি এর বিচার চাই। শুধু আমার ছেলের নয়, যেসব মা-বাবা তাদের সন্তান হারিয়েছেন, সবার হত্যারই বিচার চাই।

এ বিষয়ে উই আর ভলান্টিয়ারের প্রতিষ্ঠাতা আহমেদুর রহমান তনু বলেন, আহসান কবীর শরীফের মৃত্যু আমাদের সামনে সে সময়ের নির্মম বাস্তবতাকে তুলে ধরে। তার পরিবারের মতো আরো অনেক পরিবার আজও ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন