২০২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থানের পর দুই বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। এর মধ্যে প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারে আয়ু ছিল ১৮ মাস। এরপর ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারি মাসে বহুল প্রতীক্ষিত জাতীয় নির্বাচন হয়। বাংলাদেশের ইতিহাস যে কয়টি সফল ও সার্থক নির্বাচন হয়েছে, এর মধ্যে ২০২৬-এর ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনটির কাহিনি ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। এই নির্বাচন নিয়েও বেশ কিছু সমালোচনা হয়েছে। কিন্তু জনগণ ছোটখাটো ত্রুটি-বিচ্যুতিকে আমলে নেয়নি।
এই নির্বাচনে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি আসনে জয়লাভ করেছে। তার মানে এই নয় যে, অন্য দলগুলোর প্রতি জনগণের কমণ্ডলু থেকে কোনো বারি বর্ষিত হয়নি। জামায়াত ও এনসিপি নিয়ে গঠিত বিরোধী দল সংসদে সত্যিকারের বিরোধী দলের ভূমিকা পালনের জন্য যথেষ্টসংখ্যক আসন লাভ করেছে। তারা সংসদে নিজ নিজ রাজনৈতিক অবস্থান থেকে খুবই সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। বাংলাদেশি গণতন্ত্রের অন্যতম দুর্বলতা হলো অধিকাংশ সংসদে বিরোধী দল সক্রিয় ও সরব ভূমিকা পালন করতে পারেনি। ২০২৪-এর মহাগণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে যে নির্বাচিত সংসদ গঠিত হয়েছে, সেই সংসদ বেশ প্রাণবন্ত ভূমিকা পালন করে চলছে। সংসদের যে চেহারা আমরা এখন দেখছি, এর জন্য আমাদের সব কৃতজ্ঞতা জুলাই শহীদদের জন্য। জুলাই শহীদদের আমরা ভুলতে পারিনি। জুলাইকে অবজ্ঞা করে বা অবমূল্যায়ন করে কোনো রাজনীতি বাংলাদেশে চলতে পারে না। যদি কেউ জুলাইকে অবজ্ঞা করে অথবা কলুষিত করে, তাদের জন্ম আমরা ‘নির্ণয় ন জানি’। তারা বিশ্বাসঘাতক, জাতির দুশমন এবং ফ্যাসিবাদের প্রেতাত্মা।
আগেই বলা হয়েছে, জুলাইয়ের বিশাল গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হওয়ার পর দুবছর কেটে গেছে। এ দুই বছরে জুলাই অভ্যুত্থানের বিজয়কে সুসংহত করার জন্য অনেক কিছুই করার ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়Ñএকটি আত্মবিস্মৃত জাতির মতো আমরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অনেক কাজ করতে পারিনি। সে কারণে আমাদের আত্মগ্লানিতে ভুগতে হবে। আমাদের আত্মসমালোচনা করতে হবে। ফ্যাসিবাদ এমনি এমনি করে আমাদের বুকের ওপর জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসেনি। সেই ৭১ থেকে তারা একটি বয়ান পেশ করে চলেছে, যে বয়ান দিয়ে তারা আমাদের চোখে ঠুলি পরিয়ে দিয়েছিল এবং কানে সিসা ঢেলে দিয়েছিল। আমরা দেখতে পাইনি, শুনতে পাইনি তাদের কথার বাইরে অন্য কোনো বয়ান হতে পারে। এটি আওয়ামী ফ্যাসিবাদবিরোধী একটি বয়ান। এই বয়ান স্বাধীনতার পক্ষ ও বিপক্ষ বলে জাতিকে যেভাবে বিভক্ত করে ফেলেছিল এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রটিকে ভারতীয় আধিপত্যবাদের কাছে নৈবেদ্য হিসেবে তুলে দিয়েছিল, দেশটাকে একজনের পিতার দেশ হিসেবে গণ্য করেছিল, দেশে পিতৃতন্ত্রের নামে কার্যত রাজতন্ত্রে পরিণত করেছিল, তার বিকল্প হিসেবে কোনো বয়ান বা ন্যারেটিভ দেশপ্রেমিকরা সৃষ্টি করতে পারেনি। দেশপ্রেমিকদের নতুন বয়ানে থাকবে কীভাবে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ বেহাত হয়ে যায়। বেহাত হওয়ার সেই স্বীকৃতি আমরা দেখতে পেয়েছি ভারতীয় লোকসভায় প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর ভাষণে। প্রিয়াঙ্কার ভাষণে কোনো রাখঢাক ছিল না। আমরা বুঝতে পেরেছি আমাদের স্বাধীনতা কীভাবে বেহাত হয়ে যায়। স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস যদি দেশের জনগণ জানতে না পারে, তাহলে একপর্যায়ে এসে আবার পরাজিত ও পালিয়ে যাওয়া ফ্যাসিবাদীদের মৌরসি পাট্টা প্রতিষ্ঠিত হবে। এমন অবস্থা ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করা যায় না। নতুন এই বয়ানের অন্যতম বিষয় হবে এদেশে কীভাবে গণতন্ত্রকে ব্যর্থ করে দেওয়া হয়েছে। শেখ হাসিনা আয়োজিত চার-চারটি ভুয়া নির্বাচন ভারতীয় আধিপত্যবাদীরা জায়েজ করে দিয়েছে। ভারতকে বলা হয় পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র। অথচ এই ভারতই প্রতিবেশী বাংলাদেশের ভুয়া নির্বাচনগুলোকে বৈধতা দিয়ে এবং সমর্থন ও সহযোগিতা দিয়ে বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে হত্যা করেছে। নতুন বয়ান অনুযায়ী ভারত তার প্রতিবেশী দেশে যেনতেন প্রকারে তার পদলেহী অনুগত গোষ্ঠীকে কীভাবে রাখা যায়, এর জন্য কোনো চেষ্টাতেই ত্রুটি করবে না। নতুন বয়ানে আরো বলতে হবে, ভারত কীভাবে সাত দফা গোপন চুক্তি চাপিয়ে দিয়ে ২৫ বছর মেয়াদি বন্ধুত্ব ও মৈত্রী চুক্তি চাপিয়ে দিয়ে এবং অভিন্ন নদীগুলো থেকে পানি প্রত্যাহার করে বাংলাদেশকে চিরতরে পঙ্গু করে রাখার জন্য আয়োজন করেছে, নতুন বয়ানে সেই কথাগুলো থাকতে হবে। দুর্ভাগ্যের বিষয়, জুলাই অভ্যুত্থানের পর এমন একটি নতুন বয়ান সৃষ্টিতে উল্লেখযোগ্য কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। জুলাই সনদ রচিত হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো সবাই বলছে, তারা অক্ষরে অক্ষরে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করবে। জুলাই সনদটিও জনগণের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়নি। এই জুলাই সনদকে আশ্রয় করে এবং এটিকে সুতীক্ষ্ণ ও স্পষ্টীকরণ করে তুলে ধরলে জাতি এবং যুগের প্রয়োজনে যে বয়ানটি জনগণের আকাঙ্ক্ষায় রয়েছে, তা জাতিকে পথ দেখাবে।
বাংলাদেশের সংবিধানের রূপটি কী হবে, তা নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। একদল বলছে, তারা সংবিধানের সংস্কার চায়, আরেক দল বলছে, তারা সংবিধানের সংশোধন চায়। সংস্কার ও সংশোধন কতটা পারস্পরিকভাবে ভিন্ন, তা আম-জনতার কাছে স্পষ্ট নয়। তবে একটা কথা স্পষ্ট যে, কোনো পক্ষের তরফ থেকে ১৯৭২-এর সংবিধান সম্পূর্ণভাবে পরিত্যাগ করতে হবে, যদিও একটি পক্ষের কথায় ১৯৭২-এর সংবিধান বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকা কোনো সংবিধান নয়। বর্তমান যে সংবিধান প্রচলিত আছে, তাতে আওয়ামী লীগ ক্ষমতার জোরে এমন সব উপাদান অন্তর্ভুক্ত করেছে, যা জাতির অস্তিত্ব ও ঐক্যের মূলে কুঠারাঘাত হেনেছে। সংবিধান থেকে সব ধরনের আপত্তিকর, গণবিরোধী ও জাতীয় ঐক্য সংহতিবিরোধী ধারাগুলোকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করতে হবে। এ নিয়ে আমি আশাবাদী হতে চাই যে, কোনো পক্ষের কাছে সংবিধান বিশুদ্ধকরণের মহৎ চেষ্টাটি পরিত্যাজ্য বলে গণ্য হবে না। এখানেই নিহিত রয়েছে আমাদের জাতীয় ঐক্যের নিশ্চয়তা।
নতুন সংসদের অধিবেশন বসার পর থেকে ট্রেজারি বেঞ্চ এবং অপজিশনের মধ্যে দূরত্ব বেড়ে চলেছে। অপজিশন বলছে গণভোটের রায় মেনে চলতে হবে। অন্যদিকে ট্রেজারি বেঞ্চের পক্ষে কেউ কেউ বলেছেন, জনগণ তাদের দলের প্রতি রায় দিয়েছে। সুতরাং তাদের অবস্থানকে খাটো করা যাবে না। গণভোটের পক্ষে রায় দেওয়ার জন্য বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একাধিকবার আহ্বান জানিয়েছিলেন। সুতরাং রাজনৈতিক বিচারে গণভোটের গুরুত্ব হ্রাস করার তেমন কোনো সুযোগ নেই।
উদ্বেগের বিষয় হলো, সংবিধান সংস্কার এবং সংবিধান সংশোধন নিয়ে যদি জাতির মধ্যে বড় আকারে ফাটল ধরে, তাহলে লাভবান হবে ভারতীয় আধিপত্যবাদ এবং তাদের দোসর পলাতক আওয়ামী লীগ। জাতি হিসেবে আমরা কি এত বড় ঝুঁকি নিতে পারি? একটি বিষয় আমাদের দুশ্চিন্তামুক্ত করে। প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান যখনই প্রয়োজন বোধ করেছেন, তখনই বিরোধীদলীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ করে নেন। তার এই উদারতা প্রশংসনীয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সংলাপ অব্যাহত থাকলে জাতীয় ঐক্য ও সংহতি সম্পর্কে নিরাপদ বোধ করা যায়। মনে রাখতে হবে, গণতন্ত্র হলো, ‘Rule of majority with the consent of minority.’ সংখ্যাগরিষ্ঠ গোষ্ঠীটি যতদিন সংখ্যালঘিষ্ঠ গোষ্ঠীকে শ্রদ্ধার চোখে দেখবে, ততদিন গণতন্ত্র হবে সুষ্ঠু ও সাবলীল। বাংলাদেশ এখন এক নাজুক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছে। ফ্যাসিবাদী শাসকরা যেভাবে অর্থনীতিকে ফোকলা করে ফেলেছে, তা থেকে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করা একটি কঠিন কাজ। এই কর্তব্য আমাদের অবশ্যই নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতে হবে। কোনো ধরনের দুর্নীতি, অনাচার, প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধ গ্রহণের স্পৃহায় যেন আমরা অন্ধ হয়ে না যাই। এই অন্ধ হওয়া মানে পথহারা হওয়া। পথহারা জাতি কখনোই উঠে দাঁড়াতে পারে না। এই চেতনা আমাদের সবার মর্মমূলে ধারণ করতে হবে।
সবশেষে সংবিধান, সংস্কার ও সংশোধন নিয়ে আমার বিনীত প্রস্তাব হলোÑপক্ষ দুটি যেন সংস্কার ও সংশোধনকৃত সংবিধানের দুটি খসড়া জাতির কাছে উপস্থাপন করে। তাহলেই আমরা বুঝতে পারব উভয় পক্ষ কতটা কাছে অথবা কতটা দূরে অবস্থান করছে। রাজনীতির মারপ্যাঁচে যেন জাতীয় ঐক্যের বন্ধনটি ছিন্ন হয়ে না যায়, সেই শুভ কামনায় আমি আমার আন্তরিক নিবেদনটি শেষ করছি।
লেখক : জাতীয় অধ্যাপক
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

