আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটছে সুজনের

আলীম আকন্দ, ভূঞাপুর (টাঙ্গাইল)

অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটছে সুজনের

জুলাই বিপ্লবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোনে অংশ নিয়ে প্রায় ৩০০ গুলির স্প্লিন্টার শরীরে বহন করে দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার সুজন (৪৪)। তিনি উপজেলার অলোয়া ইউনিয়নের আকালু গ্রামের মৃত আনছার আলীর ছেলে। বাবার তিন সন্তানের মধ্যে সুজন বড়। ৩০ বছর আগে প্রাথমিকে পড়ার সময় বাবাকে হারান। পরিবারের হাল ধরতে সে সময় পড়াশোনা বন্ধ করে পাড়ি জমান রাজধানীতে।

ঢাকায় রিকশা চালানোর পাশাপাশি স্থানীয় শ্রমিকদলের রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন সুজন। তিনি ভূঞাপুর উপজেলার অলোয়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। ঢাকায় থাকাকালীন তিনি বিএনপির একজন কর্মী হিসেবে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিতেন। সর্বশেষ রাজধানীর বাড্ডায় ভাড়ায় সিএনজি অটোরিকশা চালাতেন। অটোরিকশা চালানোর পাশাপাশি চব্বিশের গণআন্দোলনে অংশ নেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

গত ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ঢাকার বাড্ডা থানা ঘেড়াও কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে পুলিশের গুলিতে মারাত্মক আহত হন। পরে তাকে উদ্ধার করে প্রথমে আফতাবনগর নাগরিক হাসপাতাল, পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক) নেওয়া হয়।

কিন্তু অতিরিক্ত হতাহতদের চিকিৎসার কারণে তাকে ঢামেকে ভর্তি নেওয়া হয়নি। পরে টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। সেখানে ১২ দিন চিকিৎসা করেও কোনো উন্নতি না হওয়ায় ভূঞাপুর উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় ঘাটাইলের সিএমএইচে চিকিৎসা নেন।

১৫ দিন সেখানে চিকিৎসা নেওয়ার পর তার শরীর থেকে ৩৯টি গুলি বের করা হয়। কিন্তু শরীরের প্রচণ্ড ব্যথা ও ফুলা না কমায় থেরাপি দেওয়ার জন্য ঢাকার ধানমন্ডির গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে এক মাসেরও বেশি সময় চিকিৎসা নেন। তবে এখনো স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছেন না সুজন।

তার শরীরে এখনো প্রায় ৩০০ ছররা গুলি রয়েছে। ফলে তিনি সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছেন না। ক্র্যাচে ভর দিয়ে একটু-আধটু হাঁটতে পারলেও পরক্ষণেই শরীরে ব্যথা বেড়ে যায়। শরীর স্বাভাবিক না হওয়ার কারণে এখন পর্যন্ত কোনো কাজ করতে পারছেন না। ফলে তার পরিবারটি অনাহারে-অর্ধাহারে দিনাতিপাত করছে।

স্ত্রী নূপুর বলেন, স্বামী আহত হওয়ার দিন ৫ আগস্ট আমার সংসারে একটি টাকা ও কোনো খাদ্যসামগ্রী ছিল না। বাবার বাড়ি বরিশালের বিভিন্ন জনের সহযোগিতায় ৮০০ টাকা সংগ্রহ করে স্বামীকে উদ্ধার করার জন্য ঢাকায় যাই। তার আহত হওয়ার পর থেকে সংসারে কোনো আয় নেই। বর্তমানে আমার শ্বশুরবাড়ি এলাকার বিভিন্ন জনের কাছ থেকে হাত পেতে চেয়ে-চিন্তে খেয়ে- না খেয়ে জীবন পার করছি। এমনও দিন যাচ্ছে চুলায় আগুন জ্বলে না। এমন অবস্থায় আমার তিন সন্তানের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

নূপুর বলেন, উপজেলা পরিষদ থেকে আমরা কিছু সাহায্য পেয়েছিলাম, যা আমাদের বেশ উপকার হয়েছে। এ অবস্থায় আমাদের শুধু বেঁচে থাকার জন্য সবার সাহায্য কামনা করছি।

আহত সুজন বলেন, আমার মৃত বাবাও একজন প্রতিবাদী মানুষ ছিলেন। আমি দরিদ্র লোক হলেও অন্যায়-অত্যাচার অবিচার সহ্য করতে পারি না। ৫ আগস্টের আগেও আমি অবৈধ সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মিছিল-মিটিংয়ে অংশ নিয়েছি।

সুজন আরো বলেন, গুলি শরীরে থাকার কারণে আমি চলাফেরা করতে পারি না। ক্র্যাচের মাধ্যমে একটু হাঁটলেও ব্যথা বেড়ে যায় ও শরীর ফুলে শক্ত হয়ে যায়। এমন অবস্থায় আমার উন্নত চিকিৎসা ও আর্থিক সহযোগিতা দরকার।

এ বিষয়ে ভূঞাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পপি খাতুন বলেন, জুলাই বিপ্লবে এ উপজেলায় একজন নিহত ও ১৬ জন আহত রয়েছেন। নিহত ও আহতদের পরিবারকে সরকারি ও ব্যক্তিগতভাবে সহযোগিতা দিয়ে আসছি। সরকারিভাবে এখনো আহতদের কর্মসংস্থানের কোনো নির্দেশ আসেনি। তবে আহত পরিবারগুলো যাতে কোনো সমস্যায় না পড়ে সে ব্যাপারে প্রশাসন কাজ করছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন