ভোলার হারানো মসজিদের খোঁজে

ভোলার হারানো মসজিদের খোঁজে
ছবি : মনজুরুল আলম বাবন

মেঘনা ও তেঁতুলিয়ার ভাঙনে দক্ষিণ শাহবাজপুর তথা ভোলার প্রাচীন জনপদের বিস্তীর্ণ এলাকা বিলীন হয়ে গেছে। হারিয়ে গেছে জনবসতি, পথঘাট ও বহু পুরোনো স্থাপনার চিহ্ন। সেই বিস্মৃত জনপদেরই কোনো এক অধ্যায়ের স্মৃতি হয়ে ঘন বন-জঙ্গলের আড়ালে টিকে আছে একটি মসজিদ।

ভোলা সদর উপজেলার বাংলাবাজার এলাকার স্থানীয় মাঝি বাড়ির সুপারি বাগানে সম্প্রতি একটি প্রাচীন মসজিদের দেখা পাওয়া গেছে। মসজিদটি দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত ছিল। দূর থেকে দেখলে স্থাপনাটিকে সাধারণ কোনো পুরোনো ভবন মনে হতে পারে। কিন্তু কাছে গেলে এর নির্মাণরীতি ও স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্যগুলো চোখে পড়ে। চুন-সুরকির গাঁথুনিতে বর্গাকার ভূমির ওপর নির্মিত একটি অর্ধগোলাকার গম্বুজে মসজিদটির ছাদ আচ্ছাদিত। দৈর্ঘ্য প্রায় সাড়ে ২৪ ফুট, প্রস্থ সাড়ে ১৯ ফুট; দেয়ালের পুরুত্ব প্রায় আড়াই ফুট।

বিজ্ঞাপন

মসজিদের সামনের দেয়ালে রয়েছে আয়তাকার প্যানেলিং ফ্রেম ও আবদ্ধ খিলানের নকশা। এসব অলংকরণ মোগল স্থাপত্যরীতির সঙ্গে মিলে যায়। তবে স্থাপনাটির এই বৈশিষ্ট্য এর নির্মাণকাল বা নির্মাতার পরিচয় নিশ্চিত করে না। কারণ, স্থাপনাটির সঙ্গে এখন পর্যন্ত কোনো শিলালিপি পাওয়া যায়নি। ফলে এর নির্মাণকাল কিংবা নির্মাতার পরিচয়ও অজানা রয়েছে। মসজিদটি ঠিক কত পুরোনো, কে এটি নির্মাণ করেছিলেন কিংবা কোন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে এর নির্মাণ—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা রয়ে গেছে।

মসজিদটিকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি কৌতূহল তৈরি হয়েছে এর সম্ভাব্য নির্মাতাকে নিয়ে। স্থানীয় প্রবীণরা মনে করেন, মসজিদটি মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে নির্মিত। জাহাঙ্গীরের শাসনকাল ছিল ১৬০৫ থেকে ১৬২৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। সে সময় ভোলা অঞ্চল ছিল চন্দ্রদ্বীপ রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। সে সময় ছবি খাঁকে এই অঞ্চলের ফৌজদার নিযুক্ত করা হয়। পূর্তকাজে দক্ষ এই কর্মকর্তা এ অঞ্চলে সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি মসজিদ নির্মাণ ও দিঘি খননের কাজ করেছিলেন বলে স্থানীয় অনেক কিংবদন্তি রয়েছে।

স্থানীয়ভাবে মসজিদটিকে প্রায় ৫০০ বছরের পুরোনো বলা হলেও জাহাঙ্গীরের শাসনকাল বিবেচনায় নিলে এ সময়কাল নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। মসজিদটির প্রকৃত বয়স নির্ধারণ করতে হলে স্থাপত্যরীতি, নির্মাণ উপকরণ, গাঁথুনির ধরন এবং সম্ভাব্য সমসাময়িক নিদর্শনের সঙ্গে তুলনামূলক বিশ্লেষণ প্রয়োজন। পাশাপাশি পুরোনো দলিল-দস্তাবেজ, স্থানীয় ইতিহাস ও প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্যও অনুসন্ধান করতে হবে।

শুধু বয়সের দাবিই নয়; বরং এর মধ্যে লুকিয়ে থাকা সম্ভাব্য ইতিহাস মসজিদটিকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। মসজিদটি যদি মোগল আমলের হয়, তাহলে এটি দক্ষিণ বাংলায় মোগল আমলের স্থাপত্য বিস্তারের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হতে পারে। আর যদি ছবি খাঁর সঙ্গে এর সম্পর্কের কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে ভোলার হারিয়ে যাওয়া পুরোনো জনপদ ও প্রশাসনিক ইতিহাস সম্পর্কেও নতুন তথ্য সামনে আসতে পারে।

বন-জঙ্গলের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসা এই ছোট্ট স্থাপনাটি যেন হারিয়ে যাওয়া একটি জনপদের ইতিহাসের দরজা। সেই দরজা দিয়ে অতীতে পৌঁছাতে হলে এখন প্রয়োজন প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান, স্থাপত্যের নিবিড় পাঠ এবং পুরোনো ইতিহাসের নতুন খোঁজ। অনুসন্ধানেই হয়তো জানা যাবে, ভোলার এই নির্জন বাগানে আসলে কত শত বছরের ইতিহাস নীরবে অপেক্ষা করে আছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন