আবুল মনসুর আহমদ তার ‘বাংলাদেশের কালচার’ নামক গ্রন্থের ‘আগে চাই সাহিত্যিক বিপ্লব’ নামক প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, ‘...বিপ্লব আনতে হলে সাহিত্যের ভেতর দিয়েই তা করতে হবে।’
চব্বিশের জুলাই বিপ্লব এ দেশকে অনেক রক্তের বিনিময়ে ফ্যাসিবাদ ও আধিপত্যবাদ থেকে মুক্ত করেছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে এমন একটি বিপ্লব নিঃসন্দেহে গভীর ও সুদূরপ্রসারী অভিঘাত সৃষ্টি করেছে। মানুষের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, বঞ্চনা, অপমান ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা জুলাইয়ের রাজপথে বিস্ফোরিত হয়েছে। অসংখ্য মানুষের আত্মত্যাগ, সাহস ও প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে একটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশা ছিল, এমন একটি ঐতিহাসিক ঘটনা আমাদের শিল্প-সাহিত্যে গভীর ও আশাপ্রদ প্রভাব ফেলবে। কিন্তু চূড়ান্ত বিচারে এখনো পর্যন্ত তার প্রত্যাশিত প্রতিফলন আমাদের শিল্প-সাহিত্যে তেমন দৃশ্যমান হয়নি। এর কারণ খোঁজার আগে আমাদের দেখতে হবে, চূড়ান্ত বিশ্লেষণে সাহিত্য ও শিল্পকলার উৎস কী।
এমন প্রশ্নের জবাবে বলা যায়, মানুষের সামাজিক জীবনই শিল্প-সাহিত্যের প্রধান ও অফুরন্ত উৎস। নির্দিষ্ট সমাজের জীবনধারা, মানুষের সুখ-দুঃখ, আশা-আকাঙ্ক্ষা, প্রেম-বিরহ, দ্বন্দ্ব-সংগ্রাম এবং স্বপ্ন-কল্পনা শিল্পী ও সাহিত্যিকের চেতনায় প্রতিফলিত হয়ে সৃষ্টিশীল রূপ লাভ করে। জনগণের জীবন হচ্ছে সাহিত্য ও শিল্পকলার কাঁচা উপাদানের অফুরন্ত ভান্ডার। তবে জীবন নিজে শিল্প নয়। শিল্পী ও সাহিত্যিক তার সৃষ্টিশীল শ্রম, অনুভব, কল্পনা ও নান্দনিক বোধের মধ্য দিয়ে জীবনের কাঁচা উপাদানকে শিল্পে রূপান্তর করেন। ফলে শিল্প বাস্তবতার নিছক অনুকরণ নয়; হয়ে উঠে বাস্তবতার সৃজনশীল পুনর্নির্মাণ।
বিপ্লবী শিল্প-সাহিত্যও এভাবেই জন্ম নেয়। বিপ্লবী শিল্পী ও সাহিত্যিক জনগণের জীবন, তাদের সংগ্রাম, আকাঙ্ক্ষা এবং পরিবর্তনের অভিজ্ঞতাকে নিজের চেতনায় ধারণ করেন এবং তা সৃষ্টিশীলতার মধ্য দিয়ে সাহিত্য ও শিল্পকলার রূপ দেন। তাই কোনো বিপ্লবের পরপরই অনেক কবিতা লেখা, গল্প লেখা, গান তৈরি করা বা ছবি আঁকা সম্ভব হলেও তার সবকিছু উৎকৃষ্ট শিল্প হয়ে ওঠে না। কারণ একটি ঐতিহাসিক ঘটনাকে শিল্পে রূপ দিতে শুধু আবেগ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন শিল্পীর গভীর জীবনবোধ, অভিজ্ঞতা, কল্পনা, মনন ও শৈল্পিক দক্ষতা।
চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে আমাদের সামনে যে বিপুল জীবন উন্মোচিত হয়েছে, তার মধ্যে শিল্পের অসংখ্য উপাদান রয়েছে। সেখানে রয়েছে তরুণের স্বপ্ন, মায়ের উদ্বেগ, সন্তানের জন্য অপেক্ষা, নিহতের পরিবারের শোক, আহত মানুষের যন্ত্রণা, অচেনা মানুষের পারস্পরিক সহমর্মিতা, ভয়কে জয় করার সাহস এবং একটি নতুন ভবিষ্যতের প্রত্যাশা। রাজপথের প্রতিটি মিছিল, প্রতিটি মুখ, প্রতিটি মৃত্যু এবং প্রতিটি প্রতিরোধের পেছনে রয়েছে একেকটি মানবিক গল্প। শিল্পী ও সাহিত্যিকের কাজ হলো সেই গল্পের অন্তর্গত সত্যকে আবিষ্কার করা।
লেখক ও শিল্পীরা প্রাত্যহিক ঘটনাগুলোকে ঘনীভূত রূপদান করেন। জীবনের বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলোর ভেতরকার দ্বন্দ্ব ও সংগ্রামকে বৈশিষ্ট্য দান করেন এবং এমন সাহিত্য ও শিল্প সৃষ্টি করেন, যা মানুষের চেতনাকে নাড়া দেয়। কিন্তু এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন—স্লোগান এবং সাহিত্য এক নয়, পোস্টার এবং শিল্প এক নয়। স্লোগান মানুষকে রাজপথে জাগিয়ে তুলতে পারে, পোস্টার আন্দোলনের প্রতীক হয়ে উঠতে পারে; কিন্তু সাহিত্য ও শিল্পকে তার চেয়ে গভীরে যেতে হয়। তাকে মানুষের অন্তর্জগতে প্রবেশ করতে হয়। একটি ঐতিহাসিক মুহূর্তকে স্থায়ী মানবিক অভিজ্ঞতায় রূপান্তর করাই শিল্পের বড় কাজ।
শিল্প-সাহিত্যের ক্ষেত্রে যত ধরনের মতান্ধতা আছে, তার মধ্যে সবচেয়ে নিষ্ফলা ও ক্ষতিকর হলো বিনা বিচারে অতীতের কিংবা বিদেশিদের রচনা ও শিল্পকর্মকে নকল বা অনুকরণ করা। প্রতিটি বড় ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা তার নিজস্ব শিল্পভাষা দাবি করে। চব্বিশের জুলাই বিপ্লবও তার ব্যতিক্রম নয়। আমাদের শিল্পী ও সাহিত্যিকদের অন্যের তৈরি শিল্পভাষা ধার করে জুলাইকে প্রকাশ করার চেয়ে জুলাইয়ের নিজস্ব জীবন, নিজস্ব অভিজ্ঞতা, নিজস্ব প্রতীক এবং নিজস্ব ভাষা আবিষ্কার করতে হবে। আমাদের সমাজের মাটি, মানুষের মুখ, তাদের স্বপ্ন ও ক্ষত থেকেই সেই শিল্পভাষার জন্ম হতে পারে।
শিল্প-সাহিত্যকে জনপ্রিয় করা এবং সেগুলোর মান উন্নয়ন করা—এই দুটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। জনগণের বৃহত্তর অংশ সহজে গ্রহণ করতে পারে এমন সাহিত্য ও শিল্পকলার প্রয়োজন অবশ্যই রয়েছে। শিল্পকে জনগণের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে কোনো সুস্থ সাহিত্যধারা গড়ে উঠতে পারে না। কিন্তু জনপ্রিয়তাকেই শিল্পমানের একমাত্র মাপকাঠি মনে করাও ঠিক নয়। জনগণের তাৎক্ষণিক রুচি সবসময় উৎকৃষ্ট শিল্পের নিশ্চয়তা দেয় না। অনেক সময় শিল্পীকে প্রচলিত রুচির সীমা অতিক্রম করে নতুন রুচি ও নতুন বোধেরও সৃষ্টি করতে হয়। ফলে জনপ্রিয়করণ ও মানোন্নয়ন—দুটির মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক থাকা প্রয়োজন।
জনগণের জীবনে সাহিত্য ও শিল্পের যে কাঁচা উপাদান পাওয়া যায়, বিপ্লবী লেখক এবং শিল্পীদের সৃষ্টিশীল শ্রমের মধ্য দিয়ে তা ব্যাপক জনগণের জন্য কল্যাণকর শিল্প ও সাহিত্যের রূপ লাভ করে। এ ধরনের শিল্প-সাহিত্যের মধ্যেও থাকে বিভিন্ন স্তর। প্রাথমিক স্তরের জনপ্রিয় শিল্পকে ভিত্তি করে উন্নততর শিল্পের বিকাশ ঘটতে পারে। আবার উন্নততর শিল্পও ধীরে ধীরে জনগণের রুচি ও চেতনাকে উন্নত করতে পারে। অতএব জনগণকে অনুসরণ করা এবং জনগণকে এগিয়ে নেওয়া—দুই কাজের মধ্যেই শিল্পের দায়িত্ব নিহিত।
এ ক্ষেত্রে সাহিত্যিকদের কেউ যদি নিজেকে জনসাধারণের শিক্ষক মনে করেন এবং অভিজাত ব্যক্তির মতো সাধারণ মানুষের ওপর কর্তৃত্ব করতে চান, তাহলে তার সাহিত্যিক প্রতিভা থাকলেও তার সঙ্গে জনগণের গভীর সম্পর্ক তৈরি হবে না। আবার নিজের বা একটি সংকীর্ণ গোষ্ঠীর পছন্দকে জনগণের ওপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়াও সমীচীন নয়। শিল্পীর উচিত জনগণের জীবনকে গভীরভাবে জানা, তাদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করা এবং সেই জীবনকে নিজের সৃষ্টিশীলতার মধ্য দিয়ে নতুন অর্থ দেওয়া।
শিল্প-সাহিত্যের মূল্য বিচারের ক্ষেত্রেও ভারসাম্য প্রয়োজন। একটি শিল্পকর্মের সামাজিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য যেমন বিবেচ্য, তেমনি তার শিল্পগত উৎকর্ষও বিবেচনা করতে হবে। কোনো সাহিত্যকর্মের উদ্দেশ্য মহৎ হলেই সেটি উৎকৃষ্ট সাহিত্য হয়ে যায় না; আবার শৈল্পিক সৌন্দর্য থাকলেই তার সামাজিক তাৎপর্য অপ্রাসঙ্গিক হয় না। বিষয়বস্তুর সঙ্গে রূপের, রাজনৈতিক মর্মের সঙ্গে শৈল্পিক সৌন্দর্যের এবং সামাজিক দায়ের সঙ্গে শিল্পীর স্বাধীনতার সমন্বয় প্রয়োজন।
চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের শিল্প-সাহিত্য নির্মাণের ক্ষেত্রেও এই ভারসাম্য বিশেষভাবে প্রয়োজন। বিপ্লবের পক্ষে লেখা মানেই বিপ্লবের প্রচারপত্র লেখা নয়। বরং প্রকৃত বিপ্লবী সাহিত্য মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, আত্মমর্যাদা, সাহস, বেদনা, স্বপ্ন ও প্রশ্নকে এমনভাবে ধারণ করবে, যাতে তা একটি নির্দিষ্ট সময়কে অতিক্রম করে মানুষের সর্বজনীন অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে উঠতে পারে। পোস্টার বা স্লোগানসর্বস্ব সাহিত্য তাই দীর্ঘস্থায়ী শিল্পের বিকল্প হতে পারে না।
শিল্পীর স্বাধীনতার প্রশ্নটিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। যে বিপ্লব মানুষের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও কথা বলার অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা থেকে জন্ম নিয়েছে, সেই বিপ্লবের শিল্প-সাহিত্যও শিল্পীর স্বাধীনতাকে স্বীকার করবে—এটাই প্রত্যাশিত। শিল্পীকে কোনো নতুন কর্তৃত্বের মুখপাত্রে পরিণত করা হলে বিপ্লবের অন্তর্নিহিত মুক্তির চেতনাই সংকুচিত হবে। শিল্পী সত্যকে অনুসন্ধান করবেন; সেই সত্য কখনো আনন্দের, কখনো বেদনার, কখনো গৌরবের, আবার কখনো আত্মসমালোচনারও হতে পারে।
সাহিত্য ও শিল্পকলার জগতে তাই স্বাধীন সৃষ্টিশীলতার পাশাপাশি গঠনমূলক সমালোচনারও প্রয়োজন। নিজের সৃষ্টিকে সুন্দর মনে করেন না—এমন লেখক বা শিল্পী দুর্লভ। কিন্তু শিল্পের প্রকৃত মূল্যায়ন নিজের হাতে নয়, সময়, পাঠক এবং সমালোচনার মধ্য দিয়েই হয়। স্বাধীন প্রতিযোগিতা, মতের বৈচিত্র্য এবং গঠনমূলক সমালোচনার মধ্য দিয়েই নিম্নমানের শিল্প উন্নত হওয়ার এবং উৎকৃষ্ট শিল্প প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ পায়। সংকীর্ণতা, দলান্ধতা কিংবা ব্যক্তিপূজা শিল্পের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে।
সবশেষে বলা যায়, চব্বিশের জুলাই বিপ্লব আমাদের শিল্প-সাহিত্যের সামনে এক বিরাট সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। কিন্তু সেই সম্ভাবনা বাস্তবায়নের জন্য শুধু জুলাইকে স্মরণ করলেই হবে না; জুলাইয়ের জীবনকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে। রাজপথের ঘটনা, রক্ত, অশ্রু, সাহস, স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষাকে শিল্পীর অন্তর্জগতে প্রবেশ করতে দিতে হবে। তারপর সৃষ্টিশীল শ্রমের মধ্য দিয়ে তাকে কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, গান, চিত্রকলা ও চলচ্চিত্রের স্বতন্ত্র নান্দনিক রূপ দিতে হবে।
জুলাইয়ের সত্যিকারের শিল্প তখনই জন্ম নেবে, যখন জুলাই শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনার নাম থাকবে না, মানুষের অন্তর্জীবনের এক গভীর অভিজ্ঞতার নাম হয়ে উঠবে। আমাদের সামনে তাই শুধু জুলাইকে স্মরণ করার দায়িত্ব নয়; জুলাইয়ের জন্য একটি নিজস্ব শিল্পভাষা আবিষ্কারের দায়িত্বও রয়েছে। ঘটনাকে শিল্পে, স্মৃতিকে নন্দনে এবং রক্তাক্ত ইতিহাসকে মানবিক অভিজ্ঞতায় রূপান্তর করাই হতে পারে চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের প্রতি আমাদের শিল্প-সাহিত্যের সবচেয়ে বড় দায়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

