মসনদে আলা ঈসা খাঁ: স্বাধীন বাংলা সালতানাতের শেষ উত্তরসূরি

মসনদে আলা ঈসা খাঁ: স্বাধীন বাংলা সালতানাতের শেষ উত্তরসূরি

বৃহৎ বাংলার পূর্বাঞ্চলে সম্রাট আকবরের সাম্রাজ্যবাদী সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে মসনদে আলা ঈসা খাঁ ছিলেন সবচেয়ে শক্তিশালী ও অগ্রসর নেতা। স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রামে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি অবিচল ছিলেন। সমকালেই সাধারণ মানুষের কাছে তিনি বীরপুরুষ ও স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। বিশেষ করে বাংলার খেটে খাওয়া মানুষের হৃদয়ে তার স্থান ছিল সবার ওপরে। আর তার প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা ছিল গভীর ও আন্তরিক। এমন এক বীরের জীবন ও কীর্তি যে লোকস্মৃতি, কিংবদন্তি ও লোকসাহিত্যে অমর হয়ে থাকবে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। গ্রামীণ কবি ও গীতিকাররা তার বীরত্ব, সংগ্রাম ও প্রেমকে কেন্দ্র করে অসংখ্য পালাগান ও লোকগাথা রচনা করেছেন। সেসব গাথা বাংলার কৃষক-জনতা দিনের পরিশ্রম শেষে সুর করে গেয়ে সারা দিনের কষ্ট ভুলে যেত। আজও তার স্মৃতিবিজড়িত বহু লোকগাথা ও রোমান্টিক কাহিনি বাংলার লোকঐতিহ্যের অংশ হিসেবে অমর হয়ে আছে।

ঈসা খাঁকে নিয়ে বাংলার সমসাময়িক ইতিহাসের সূত্র নেই বললেই চলে। ফলে ঈসা খাঁর আজীবনের স্বাধীনতার সংগ্রামের ইতিহাস জানতে আমাদের ভরসা করতে হয় আকবরের দরবারি ইতিহাসবিদ আবুল ফজলের ওপর, যিনি অবশ্যই পূর্বাঞ্চলের ‘বিদ্রোহী’দের প্রতি মোটেই সহানুভূতিশীল ছিলেন না।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে বাঙালি কবিরা ঈসা খাঁর কীর্তি নিয়ে অনেক গান বেঁধেছিলেন এবং জনসাধারণকে আনন্দ দিয়েছিলেন; কিন্তু সত্যসন্ধানীদের জন্য সমসাময়িক কোনো ঐতিহাসিক দলিল তারা রেখে যেতে পারেননি। আমাদের কাছে ঈসা খাঁর পরিবারের নির্ভরযোগ্য যেসব তথ্য আছে, সেগুলো মূলত আকবরনামা থেকে সংগৃহীত।

রায়বাহাদুর ড. দীনেশচন্দ্র সেন মৈমনসিংহ গীতিকার দ্বিতীয় খণ্ডে ‘দেওয়ান ইশা খাঁ মসনদালী’ নামে একটি পূর্ণাঙ্গ গাথা প্রকাশ করেছেন। তবে এই লোকগাথা খুব প্রাচীন নয়; এটায় যে ঈসা খাঁকে চিত্রিত করা হয়েছে, তিনি ইতিহাসের ঈসা খাঁ নন, তিনি কিংবদন্তির ঈসা খাঁ।

ফলে ঈসা খাঁর জীবনের বড় একটা অংশ আমাদের চোখের আড়ালে থেকে গেছে। তার সময়ে সমাজ জীবন কেমন ছিল, সে সম্পর্কে আমরা তেমন কোনো ধারণা পাই না। বিভিন্ন সূত্র, তথ্য ও বিবরণ সংযুক্ত করে আমরা যে ঈসা খাঁর চিত্র আঁকতে পারি, তিনি ১৬ শতকে বাংলার রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র।

ঈসা খাঁর জন্মে কবে হয়েছিল, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট ও বিস্তারিত কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। শুধু এতটুকু জানা যায়, তার বাবা সুলায়মান গজদানী বাংলার কোনো এক সুলতানের মেয়েকে বিয়ে করেছিলেন। ইতিহাসের কালক্রম ও আনুষঙ্গিক তথ্য-উপাত্ত থেকে ধারণা করা যায়, সেই সুলতান ছিলেন হোসেন শাহি বংশের শেষ শাসক গিয়াসুদ্দিন মাহমুদ শাহ। আর তিনি ১৫৩৩ থেকে ১৫৩৮ সন পর্যন্ত শাসনকার্য পরিচালনা করেছিলেন। সার্বিক বিচারে তাই আমরা বলতে পারি, বাংলায় আফগান বিজয়ের আগে হোসেন শাহি বংশের শাসনের শেষ পর্বে ১৫৩৩ থেকে ১৫৩৮ সনের মধ্যে কোনো এক সময় তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ঈসা খাঁর জন্মের পরের সময়টা তার জন্য মোটেই মসৃণ ছিল না। তার জন্মের কিছুদিনের মধ্যে সুলতান গিয়াসুদ্দিন মাহমুদ শাহকে পরাজিত করে সুর আফগানরা বাংলা দখল করে নেয়। তার পিতা সুলায়মান ছিলেন পরাজিত সুলতানের জামাতা। তিনি ছিলেন গৌরবময় বাংলা সালতানাতের যোগ্য ও বৈধ উত্তরসূরি। ফলে তিনি সুর সুলতানদের বিরুদ্ধে বারবার বিদ্রোহ করেন। এমনই এক বিদ্রোহের সময় তিনি নিহত হন। পিতা হারানোর পর ঈসা ও তার অপর এক ভাইকে দাস হিসেবে বণিকদের কাছে বিক্রি করে মধ্য এশিয়ার কোনো দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

এরপর দীর্ঘ সময় ঈসা খাঁকে ইতিহাসের দৃশ্যপটে অনুপস্থিত দেখা যায়। বাংলায় কররানী শাসনের সময় ঈসা খাঁর চাচা তাকে ও তার ভাইকে তুরান থেকে উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে আনে। ঈসা খাঁর পিতার জমিদারি ছিল সরাইল পরগনায়। চাচা কুতুবুদ্দিন তাকে সেখানে প্রতিষ্ঠিত করেন। এর পরের ইতিহাস শুধু ঈসা খাঁর মসনদে আলা হয়ে ওঠার এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার।

ঈসা খাঁর শাসন ও সংগ্রাম

দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয় দেশে ফিরে এসে ঈসা খাঁর রাজনৈতিক উত্থান শুরু হয় ত্রিপুরার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত সরাইল পরগনার একজন ক্ষুদ্র জমিদার হিসেবে। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যে প্রজ্ঞা, সামরিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতার মাধ্যমে তিনি নিজের কর্তৃত্বের পরিধি বহুগুণে বাড়িয়ে তোলেন। প্রথমে কত্রাবো এবং পরে সোনারগাঁও ও জঙ্গলবাড়ীকে শাসনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তিনি ভাটি অঞ্চলে শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামরিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে তার কর্তৃত্ব পশ্চিম সিলেট, ত্রিপুরা, ঢাকা, ময়মনসিংহ এবং যমুনার পূর্ব তীর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। সমকালীন বিবরণে তার শাসিত ভাটি অঞ্চলের পশ্চিম সীমা ইছামতি নদী, পূর্ব ও উত্তর সীমা ত্রিপুরা, বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও সিলেটের বানিয়াচং এবং দক্ষিণ সীমা গঙ্গা বা পদ্মা নদী পর্যন্ত বিস্তৃত বলে উল্লেখ পাওয়া যায়।

১৫৭৬ খ্রিষ্টাব্দে দাউদ খাঁ কররানীর পতনের পর বাংলার রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। মোগলরা বাংলার ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করলেও স্থানীয় আফগান সর্দার ও ভুঁইয়ারা তাদের ভূখণ্ড ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা রক্ষায় প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এই প্রতিরোধে ঈসা খাঁ ধীরে ধীরে প্রধান নেতৃত্বে উঠে আসেন। পরবর্তীকালে ‘বারো ভূঁইয়া’ নামে পরিচিত পরিবারগুলোর মধ্যে তার নেতৃত্বই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আকবর ও জাহাঙ্গীরের আমলের সমকালীন সূত্রে ভুঁইয়াদের বিভিন্ন তালিকা পাওয়া যায়; এতে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে নেতৃত্ব ও সদস্যদের মধ্যেও পরিবর্তন ঘটার প্রমাণ মেলে। মোগলদের সঙ্গে ঈসা খাঁর সংঘর্ষ ছিল দীর্ঘ ও বহুস্তবিশিষ্ট। ১৫৭৮ খ্রিষ্টাব্দে কাস্তুলের যুদ্ধে খাঁ জাহানের বাহিনী ভাটিতে প্রবেশ করে প্রতিরোধের মুখে পড়ে। এরপর ১৫৮৪ ও ১৫৮৫ খ্রিষ্টাব্দে শাহবাজ খাঁর পরপর দুই অভিযানে মোগল বাহিনী ঈসা খাঁর প্রতিরোধ ভাঙতে ব্যর্থ হয়।

নদী, জলাভূমি ও স্থানীয় ভূপ্রকৃতিকে কাজে লাগিয়ে ঈসা খাঁ স্থল ও নৌবাহিনীর সমন্বয়ে মোগলদের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ধারাবাহিক ব্যর্থতার পর আকবর সামরিক সংঘাতের পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত নমনীয় রাজনৈতিক কৌশল গ্রহণ করেন এবং ঈসা খাঁর সঙ্গে সমঝোতার পথ বেছে নেন।

তবে এই বিরতি স্থায়ী হয়নি। ১৫৯৫-৯৭ খ্রিষ্টাব্দে মানসিংহের নেতৃত্বে নতুন অভিযান শুরু হলে আবার সংঘর্ষ তীব্র হয়ে ওঠে। ১৫৯৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর মেঘনা ও সংলগ্ন নৌ যুদ্ধে ঈসা খাঁ ও মাসুম খাঁ কাবুলির যৌথ বাহিনী মোগল নৌবহরকে পরাজিত করে। যুদ্ধে মানসিংহের পুত্র দুর্জন সিংহসহ বহু মোগল সৈন্য নিহত হয়। এর মধ্য দিয়ে ভাটি অঞ্চলে ঈসা খাঁর সামরিক অবস্থান আরো দৃঢ় হয়।

ঈসা খাঁর প্রতিরোধ তাই কেবল একজন স্থানীয় জমিদারের নিজস্ব ভূখণ্ড রক্ষার লড়াই ছিল না; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল আফগান ও স্থানীয় শক্তিগুলোর বৃহত্তর মোগলবিরোধী প্রতিরোধ। খাজা ওসমান আফগান ও তার ভাইদের পাশাপাশি মাসুম খাঁ কাবুলি ও তার পুত্র মির্জা মুমিনও এই সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ফলে ঈসা খাঁর নেতৃত্বে ভাটি হয়ে ওঠে মোগল সাম্রাজ্য বিস্তারের বিরুদ্ধে বাংলার অন্যতম শক্তিশালী প্রতিরোধকেন্দ্র।

শেষ জীবনে ঈসা খাঁ ও ইন্তেকাল

জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত ঈসা খাঁর সংগ্রাম অব্যাহত ছিল। ১৫৯৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর মেঘনা ও সংলগ্ন নৌপথের যুদ্ধে মানসিংহের পুত্র দুর্জন সিংহের নেতৃত্বাধীন মোগল বাহিনীকে ঈসা খাঁ ও মাসুম খাঁ কাবুলি পরাজিত করেন। যুদ্ধে দুর্জন সিংহ নিহত হন। এর মাধ্যমে জীবনের শেষ পর্যায়েও ভাটিতে ঈসা খাঁর সামরিক কর্তৃত্ব অটুট থাকার প্রমাণ মেলে।

১৫৯৯ সালের ১০ মে কত্রাবে অসুস্থ হয়ে তার অন্যতম প্রধান সহযোগী মাসুম খাঁ কাবুলি মৃত্যুবরণ করেন। কয়েক মাস পর ১৫৯৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঈসা খাঁও ইন্তেকাল করেন। তার মৃত্যু ভাটিতে মোগলবিরোধী প্রতিরোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শেষ হয়।

ঈসা খাঁর মাজারের সন্ধানে

ঈসা খাঁর মাজার নিয়েও নিশ্চিত তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার বক্তারপুর গ্রামের একটি কবর ঈসা খাঁর মাজার হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। স্থানীয় স্মৃতি ও পরবর্তী ঐতিহাসিক আলোচনায় এই দাবির সমর্থন পাওয়া গেলেও এর পরিচয় নিয়ে মতভেদ রয়েছে। ‘Identity of a Muslim Family in Colonial Bengal : Between Memories and History’ বইয়ের লেখক মোহাম্মদ রশিদুজ্জামানও বক্তারপুরকে ঈসা খাঁর মাজার হিসেবে দাবি করার পাশাপাশি এ দাবির বিরোধী মতের কথা উল্লেখ করেছেন। ফলে বক্তারপুরের কবরকে ঈসা খাঁর কবর হিসেবে উল্লেখ করা গেলেও চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠার জন্য আরো নির্ভরযোগ্য প্রত্নতাত্ত্বিক ও লিখিত প্রমাণ প্রয়োজন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন