প্রথম গুলিতেই লুটিয়ে পড়ে ছেলেটা। দেখি আর নড়ছে না। কেউ এগিয়েও যাচ্ছে না। সে পড়ে রইল স্টেডিয়ামের উত্তর-পশ্চিম কোনায় নিরীহভাবে দাঁড়িয়ে থাকা মেহগনি গাছের গোড়ায়। ‘না জানি কার বুকের ধন গো!’ পাশ থেকে কান্নায় ভেঙে পড়ে আমার স্ত্রী। পরক্ষণেই আরেকটা পুলিশ এসে রাইফেল তাক করে গুনে গুনে সাতটি গুলি করে একেবারে বুক বরাবর।
মনে হলো ছেলেটি যেন মরে গিয়ে আরো জেদি হয়ে উঠেছে। কবিরা যাকে বলে, ‘মড়ার চোখে আগুন।’ ছেলেটার চোখ বোজা না খোলা চারতলা থেকে বোঝা যাচ্ছে না। হয়তো খোলা। হয়তো তার চোখে আগুনও থাকবে। নাহলে পুলিশ এত ভয় পেত না, মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য ছেলেটার পাঁজর বরাবর লাথি মেরে পরীক্ষা করত না।
গত ১৫ বছরের মধ্যে এই প্রথম দেখলাম, পুলিশ ভয় পায়। বোধহয় একটু সাহসও পেলাম। নাবিলাকে দরজা-জানালা বন্ধ করার কথা বলে নেমে এলাম। দেখি অনেক মানুষ। পুলিশ ভয় পেয়েছে, খবরটা কীভাবে যেন চাউর হয়ে যায়। শহরের সব শিক্ষার্থী বেরিয়ে পড়েছে। সবাই গিয়ে আক্রমণ করে জেলখানায়। জেলখানায় পুলিশ নেই। অ্যাক্সিডেন্ট করা বাসের ড্রাইভারের মতো কোনো দিক দিয়ে যেন পালিয়ে গেছে। মনে আরো সাহস পেলাম। পাশ থেকে কেউ একজন উচ্চারণ করল—‘এইবার আর পারবে না সরকার।’
প্রচণ্ড ভিড় ঠেলে ছেলেটির কাছে গেলাম। দেখি সত্যি সত্যিই তার চোখ খোলা। কঠিন একটা অভিব্যক্তি নিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে। আমি তার চোখে কিছু একটা খুঁজছি বুঝতে পেরে কেউ একজন বলল, ‘অনেক চেষ্টা করলাম, বোঝাতে পারলাম না।’
দেখা হলো চিত্রশিল্পী আল আমীন ভাইয়ের সঙ্গে। বলল, ওর নাম তাহমিদ। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। স্কুলে ক্লাস নাইনে পড়ত।
কোত্থেকে একজন সহপাঠী পতাকা নিয়ে এসেছে। আমরা বললাম, ওটা দিয়ে ঢেকে দাও। পতাকাটা খুব ছোট। মুখ ঢাকলে পা ডাকে না, পা ঢাকলে মুখ বেরিয়ে পড়ে। আমরা বললাম, মুখ ঢেকে দাও। কিন্তু সহপাঠী ছেলেটি মুখ ঢাকতে চায় না। সে পা ঢেকে একদৃষ্টিতে তাহমিদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার এমন আচরণে অন্যরা কী বুঝলো জানি না। দেখি সকলে একদম স্তব্ধ-স্থির।
এ সময় পেছন থেকে কে যেন টোকা দেয়। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি আমাদের অফিস সহকারী আবসার উদ্দিন। না, ভুল বললাম। এমপি মহোদয়ের গ্রামের ছেলে বলে অফিসে যেরকম পাওয়ার দেখায়, ডিডি সাহেবের ওপরে যেভাবে ছড়ি ঘোরায়, আর আমরা সবাই যেভাবে মিইয়ে থাকি, তাতে তাকে এমপি মহোদয়ই বলা উচিত। বলা উচিত জাতীয় সংসদ সদস্য আবসার উদ্দিন মহোদয়।
মতিন সাব, চলেন ওদিকে যাই।
কী যে হলো আমার! চালানের বাটির পেছনে মন্ত্র-বশীভূত তুলারাশির জাতকের মতো হাঁটতে লাগলাম। একটু আড়ালে গিয়ে পকেট থেকে মোবাইল বের করে। খুব আগ্রহ নিয়ে কয়েকটি ভিডিও ফুটেজ দেখায়। যেখানে একটি পুলিশ শটগান দিয়ে ভিডিও গেমসের শুটারের মতো টুস-টুস গুলি করে। আর নির্মাণাধীন এক বহুতল ভবন থেকে ছেলেরা উল্টিপাল্টি খেয়ে নিচে পড়ে যায়। আরেকটিতে দেখি কোত্থেকে একটা হেলমেটধারী লোক হাতে একটা চাইনিজ কুড়াল নিয়ে পলায়নরত শিক্ষার্থীদের পেছনে ধাওয়া করে এবং এর মধ্যে একটি ছেলে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। আরেকটায় দেখি লাঠি দিয়ে একদল তরুণ একটি মেয়েকে বেদম পেটাচ্ছে।
আমি ওসব সহ্য করতে পারি না। আবসার উদ্দিনের মুখের দিকে চেয়ে থাকি। সে খুব পুলকিত।
কী বুঝলেন? দেখবেন রাজাকারের বাচ্চাদের একটাকেও ছাড়বে না। চিরুনি অভিযান চালিয়ে একটা একটা করে সবকটারে এভাবেই খতম করবে।
চুপচাপ কেবল শুনে গেলাম। অবশ্য এর বেশি কিছু পারিও না। গত ১৫ বছর চুপ থাকতে থাকতে ভুলে গিয়েছি কীভাবে কথা বলতে হয়। ভেতরে থাকতে থাকতে ভুলে গিয়েছি বাইরের দাগ-নকশা-খতিয়ান। মনে পড়ে উত্তর কোরিয়ার কথা—কোনো বহুবচন নেই যেখানে।
যেখানে একবচনই বহুবচন। একবচনের কথাই সবার কথা। একবচনের খাওয়া মানেই ধরে নিতে হয়, ভরে গেছে সবার পেট। একক যেদিন হাসে, সবাইকে হাসতে হয়। যেদিন কাঁদে সবাই কাঁদছে কি না—চোখ ঘুরায় সিসি ক্যামেরা। ফলে ওখানকার লোকেরা নাকি বোবা হয়ে চলে। যদি কোনো কারণে কিছু বলার জন্যে মুখ খুলতে হয়, তখন নাকি এমনভাবে কথা বলে, যেন নিজের কান শুনতে না পায়।
কীভাবে নিজের কানকে ফাঁকি দিতে হয়, দীর্ঘ সাধনায় রপ্ত করে ফেলেছি আমিও। ফলে ‘ফুটফুটে সুন্দর’ শব্দ দুটি এমনভাবে উচ্চারণ করলাম, আবসার উদ্দিন তো দূরের কথা, আমি নিজে শুনেছি কি না সন্দেহ।
তবে ভাই, আর যা-ই বলেন, কেন জানি মনে হচ্ছে, এবার পরিস্থিতি অন্যরকম হয়ে গেছে।
আমার মেন্দামার্কা কথা শুনে আবসার উদ্দিন তার বেখাপ্পা দাঁতগুলো বের করে হাসে।
পরিস্থিতির কোনোকিছুই এখন পর্যন্ত দেখেনি কেউ। কাল দেখবে। কাল দেখবেন, পরিস্থিতি কাকে বলে, উহা কত প্রকার ও কী কী?
কাল কী হতে পারে! ভাবতে গিয়ে ভেতরে ভেতরে একটু হোঁচট খেলাম। একটু ভয়ও পেলাম বোধহয়। সত্যিই তো! কী এমন বদলে গেছে পরিস্থিতি? এর আগে তো আরো কঠিন পরিস্থিতিকে সরকার তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছে। দ্বাদশ নির্বাচনের পর বলতে গেলে সরকার অপরাজেয়ই। সবাই মনে মনে স্থির করে নিয়েছি, এক আল্লাহ ছাড়া উদ্ধারের আর কোনো সম্ভাবনা নেই। এই সিচুয়েশনে দলমতহীন এই শিক্ষার্থীরা কতক্ষণ এক থাকতে পারবে!
ভাবতে গিয়ে মনে মনে একটু হতাশই হলাম। ঠিক তখনই দেখি জেলখানা ভেঙে বেরিয়ে পড়েছে কয়েদিরা। জনগণের সঙ্গে মিশে গিয়ে স্লোগানে স্লোগানে উত্তেজিত করে তুলছে পরিস্থিতি। দেখতে দেখতে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কটা কানায় কানায় ভরে গেল। যেদিকে চোখ যায়, মানুষ আর মানুষ।
আবসার উদ্দিনের দিকে মুখ ঘোরালাম—দেখি সে নেই। আমাকে কিছু না বলেই চলে গেছে। এবার আর আমাকে দেখে কে? মিশে গেলাম মহাসমুদ্রে, যেখানে তরুণরা চিৎকার দিয়ে বলছে, ‘এক দফা এক দাবি...।’
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

