আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ফিলিস্তিন অভিযানে উসামার সেনাবাহিনী (শেষ পর্ব)

মাহমুদ আহমাদ

ফিলিস্তিন অভিযানে উসামার সেনাবাহিনী (শেষ পর্ব)

সাহাবিদের আপত্তি কিংবা আনসারদের দাবিÑকোনোটিই খলিফা আবু বকরকে সিদ্ধান্তচ্যুত করতে পারেনি। জীবনের অন্তিম প্রহরে উসামা ইবনে জায়েদের নেতৃত্বে ফিলিস্তিন ও বালকার অভিমুখে যে সৈন্যবাহিনী প্রেরণের সিদ্ধান্ত আল্লাহর রাসুল (সা.) গ্রহণ করেছিলেন, খলিফা আবু বকর (রা.) তা বাস্তবায়নে অটল ও অবিচল রইলেন। তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল—রাসুলের (সা.) নির্দেশ কার্যকর করাই তার ওপর অর্পিত আমানতের দাবি।

তৎকালীন বিশ্বপরাশক্তি রোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে অভিযানের জন্য উসামার বাহিনী প্রস্তুত হলো। খলিফা আবু বকর (রা.) নিজে তাদের শিবিরে উপস্থিত হলেন, সৈনিকদের সাহস জোগালেন, ঈমানের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করলেন। সে সময় উসামা (রা.) ঘোড়ার পিঠে আরোহী ছিলেন, আর আবু বকর (রা.) তাঁর পাশে পাশে হাঁটছিলেন।

বিজ্ঞাপন

এরপর খলিফা আবু বকর (রা.) সেনাসদস্যদের উদ্দেশে ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করলেন। তিনি বললেন—

‘মুসলিম সেনাবাহিনীর সদস্যরা! আপনারা যুদ্ধক্ষেত্রে দশটি বিষয় থেকে অবশ্যই বিরত থাকবেন। আপনারা বিশ্বাসঘাতকতা করবেন না, প্রতারণা করবেন না, লুণ্ঠন করবেন না, অঙ্গহানি করবেন না। কোনো শিশু, নারী বা বৃদ্ধকে হত্যা করবেন না। ফলদার বৃক্ষ কেটে ফেলবেন না। খাদ্যের প্রয়োজন ছাড়া কোনো গরু, ছাগল বা উট জবাই করবেন না। আপনাদের যাত্রাপথে যদি নিজেদের উপাসনায় নিমগ্ন কোনো সাধু-সন্ন্যাসী বা আশ্রমবাসী ব্যক্তিদের দেখতে পান, তাদের কোনো ক্ষতি করবেন না; তাদের নিজ নিজ কাজে নিবিষ্ট থাকতে দেবেন। পথিমধ্যে এমন একদল মানুষের সাক্ষাৎ পাবেন, তারা আপনাদের জন্য বিভিন্ন ধরনের খাদ্য নিয়ে উপস্থিত হবে। যদি আপনারা তাদের দেওয়া খাদ্য গ্রহণ করতে চান, তবে ‘বিসমিল্লাহ’ বলে আল্লাহর নাম নিয়ে গ্রহণ করবেন। আর এমন একদল লোকের মুখোমুখি আপনারা হবেন, যারা মাথার দুপাশের চুল বড় করে রাখে এবং মাঝখানের অংশ মুড়িয়ে ফেলে। আপনারা আল্লাহর নাম নিয়ে অগ্রসর হবেন এবং সর্বশক্তি দিয়ে তাদের মোকাবিলা করবেন। (তারিখে তাবারি, খণ্ড : ৪, পৃষ্ঠা : ৪৬)

উসামার অভিযান ও যুদ্ধের ফলাফল

মদিনার উপকণ্ঠ জুরফ থেকে সেনাবাহিনী নিয়ে উসামা ইবনে জায়েদ ওয়াদিউল কুরায় চলে আসেন। সামনের পথ ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করার জন্য সেখান থেকে তিনি দুজন গুপ্তচর পাঠান। গুপ্তচরের পজিটিভ রিপোর্ট পেয়ে উসামা (রা.) আবনায় পৌঁছান। সেখানে তিনি গুপ্তচরদের থেকে ফাইনাল রিপোর্ট পান। তারা জানান, সার্বিক পরিস্থিতি মুসলিম বাহিনীর অনুকূলেই রয়েছে।

এ সময় সৈন্যবাহিনীকে উদ্দীপ্ত করতে সেনাপতি উসামা (রা.) তাদের সঙ্গে কথা বলেন। শত্রুবাহিনীর মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুত হতে বলেন। তিনি বলেন, ‘ইসলামের নিবেদিতপ্রাণ মুজাহিদরা, আপনারা আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হন। শত্রুর পেশিশক্তি দেখে আপনারা ভয় পাবেন না, পিছু হটে যাওয়ার কথা চিন্তাও করবেন না। সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকবেন। কথার আওয়াজ নিচু রাখবেন। আল্লাহকে অন্তরে স্মরণ রাখবেন। আপনাদের অস্তিত্ব বিলীন করে দেওয়ার জন্য যুদ্ধরত শত্রুদের পরিপূর্ণভাবে প্রতিহত করার আগে তরবারি কোষবদ্ধ করবে না।’ (তারিখে দিমাশক, ইবনে আসাকির, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ৫৯)

এরপর মুসলিম বাহিনী আক্রমণ শুরু করে। তবে শত্রুরা মুসলিম বাহিনীর মোকাবিলায় কুলিয়ে উঠতে পারে না। তারা সহজেই পরাজিত হয় আর মুসলিমদের বিজয় ঘোষিত হয়। এই যুদ্ধে বিপুল পরিমাণ গনিমত ও যুদ্ধলব্ধ সম্পত্তি মুসলিমদের হাতে আসে। আর এ যুদ্ধে একজন মুসলিমও শাহাদতবরণ করেননি।

আবনায় একদিন অবস্থান করে উসামা (রা.) সৈনিকদের মধ্যে যুদ্ধলব্ধ সম্পত্তি বণ্টন করে দেন এবং মদিনা থেকে রওনা হওয়ার ৪০ থেকে ৭০ দিন পরে তারা ওয়ালিউল কুরার দিক দিয়ে নিরাপদে মাদিনায় ফিরে আসেন। (তারিখে দিমাশক, ইবনে আসাকির, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ৫৯)

সার্বিক ঘটনা থেকে শিক্ষা ও ইসলামের সর্বজনীনতা

উসামার বাহিনী পাঠানোর মাধ্যমে খলিফা আবু বকর (রা.) মুসলিমদের কাছে স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দিয়েছিলেন, কারো মৃত্যুতে ইসলামের অগ্রযাত্রা থেমে থাকবে না এবং ইসলামের অগ্রযাত্রা কোনো ব্যক্তিবিশেষের ওপর নির্ভরশীল নয়। যদি এক নেতা মারা গেলে অন্য কেউ এসে তার স্থান পূর্ণ করবেন। তিনি সবাইকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, নবীজি (সা.) মাত্র ইন্তেকাল করেছেন। মুসলিম জনতা শোকে বিপর্যস্ত হয়ে আছে। তবে এর মানে এটা নয় যে, ইসলাম কার্যক্রম শেষ হয়ে গিয়েছে। বরং নবীজির মৃত্যুতে মুসলিমদের দায়িত্ব আরো বেড়ে গেছে। যেহেতু নবীজি আর পৃথিবীতে নেই, তাই ইসলামের প্রচার ও প্রসারের সব দায়িত্ব এখন তাদের ওপর বর্তায়। এই বাস্তবতা অনুধাবন করে খলিফা আবু বকর (রা.) রাসুলের মৃত্যুশোকে একটি মুহূর্তও আত্মবিস্মৃত হননি। মাত্র তিন দিনের মাথায় তিনি নিজেকে ও খেলাফত রাষ্ট্রের রাজধানী মাদিনাকে নিরাপত্তাঝুঁকির মধ্যে ফেলে রোমানদের বিরুদ্ধে উসামার বাহিনীকে পাঠানোর মতো একটি দুঃসাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

তরুণদের নেতৃত্বের প্রতি আস্থা

ইসলামের সেবা ও খেলাফত রাষ্ট্রের নিরাপত্তা জন্য উসামা বাহিনী যে ভূমিকা পালন করেছেন, তা মুসলিম জাতির তরুণ প্রজন্মের কাছে এক অবিস্মরণীয় উদাহরণ হয়ে রয়েছে। তরুণদের নেতৃত্বদানে উদ্বুদ্ধ করে মূলধারায় জাতি রাষ্ট্রের জন্য সার্বিকভাবে কল্যাণকর। আল্লাহর রাসুল (সা.) ১৮/২০ বছরের যুবককে দুর্বল কোনো গোত্রে অভিযান পরিচালনার জন্য আক্রমণের জন্য নিযুক্ত করেননি; বরং সেই যুগের সুপার পাওয়ার ও সবচেয়ে ক্ষমতাধর পরাশক্তিকে আক্রমণ করার জন্য নিযুক্ত করেছিলেন। আর তরুণ সেনাপতি যুদ্ধক্ষেত্রে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করে বিজয় ও গনিমত নিয়ে দেশে ফিরে এসেছিলেন। নবীজির মক্কা ও মদিনার জীবন অধ্যয়ন করলে এমন অনেক দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়, যেখানে তরুণরা নেতার দায়িত্ব পালন করেছেন, নিজ নিজ ক্ষেত্রে অবদান রেখেছেন এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য মুসলিম জাতির ভিত্তি স্থাপন করে গিয়েছেন।

কাজের মাধ্যমে কথার বাস্তবায়ন

তৎকালীন পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর পরাশক্তির মোকাবিলা করার লক্ষ্যে পাঠানো বাহিনীর সেনাপতি ছিলেন মাত্র ১৮ বা ২০ বছর বয়সের তরুণ যুবক উসামা ইবনে জায়েদ। যুদ্ধবিদ্যায় অনভিজ্ঞ এবং অল্পবয়স্ক হওয়ার কারণে অনেক সাহাবিই এ ক্ষেত্রে অস্বস্তিবোধ করছিলেন। তাদের অনুভূতিটা হয়তো সমর্থনযোগ্য নয়, কিন্তু নিশ্চয় তা বোধগম্য। তবে খলিফা আবু বকর (রা.) তাদের কাছে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছিলেন, ‘আল্লাহর রাসুলের নির্দেশের মান্যতা সবকিছুর ঊর্ধ্বে।’ খলিফা শুধু কথা নয়; কাজে বাস্তবায়ন করেছিলেন। ২০ বছরের একটি যুবকের নেতৃত্ব মেনে নিতে তিনি সবাইকে বাধ্য করেছিলেন। তিনি দুভাবে এটি করেছিলেনÑ

এক. মদিনা থেকে রওনা হওয়ার সময় খলিফা আবু বকর (রা.) সেনাপতি উসামাকে যথাযথ মর্যাদা দিয়েছিলেন। উসামা ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে ছিলেন। তিনি হেঁটে তার পাশে পাশে হাঁটছিলেন। তিনি অন্যদের চোখের সামনেই এই কাজ করেছিলেন। তিনি যেন ঘোষণা করছিলেন, উসামা যুবক হলেও সে নবীজির মনোনীত সেনাপতি। তাই বাহিনীর প্রত্যেক সদস্য থেকে যথার্থ সম্মান ও আনুগত্য তার প্রাপ্য।

দুই. নবীজির ইন্তেকাল, ধর্মদ্রোহের উদ্ভব ও পার্শ্ববর্তী গোত্রগুলো বিদ্রোহের মতো কঠিন পরিস্থিতিতে শাসনকেন্দ্রিক বিভিন্ন পরামর্শের জন্য খলিফার প্রয়োজন ছিল তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত উপদেষ্টা উমর ইবনুল খাত্তাবের। কিন্তু তিনি ছিলেন উসামার বাহিনীর একজন সাধারণ সদস্য। খেলাফত রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী হিসেবে আবু বকর (রা.) চাইলে উমর (রা.)-কে রেখে যাওয়ার বিষয়ে উসামাকে আদেশ করতে পারতেন। কিন্তু তার কাছে তিনি বিনীতভাবে অনুরোধ করেছিলেন। উসামার বাহিনীর অন্য সদস্যরা যখন দেখলেন, খলিফা নিজে উসামার কাছে অনুমতি প্রার্থনা করছেন, তখন সবার সামনে স্পষ্ট হয়ে গেল, উসামাই হলেন তাদের নেতা। তাকে যথাযথভাবে মান্য করে চলতে হবে এবং তিনি পরিপূর্ণ সম্মান পাওয়ার হকদার।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন