আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ঔপনিবেশিক আমলে বাঙালি মুসলমানের জাগরণ

রহমান মোস্তাফিজ পাভেল

ঔপনিবেশিক আমলে বাঙালি মুসলমানের জাগরণ

বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে, ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দে। বাংলা সাহিত্যের উন্নতি ও প্রসারের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হলেও এর প্রতিষ্ঠাকালীন নাম ছিল বেঙ্গল একাডেমি অব লিটারেচার। অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন এল লিউটার্ড ও ক্ষেত্রপাল চক্রবর্তী। প্রথম দিকে সভার বিবরণ ও মুখপত্র শুধু ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত হতো। এ নিয়ে সদস্যরা আপত্তি জানান এবং বাংলায় প্রকাশ করার দাবি করেন। তখন উমেশচন্দ্র বটব্যালের প্রস্তাবে একাডেমির নাম পরিবর্তন করে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ করা হয়।

বিজ্ঞাপন

প্রথম সভাপতি ছিলেন বিনয়কৃষ্ণ দেব। এছাড়া রমেশচন্দ্র দত্ত, চন্দ্রনাথ বসু, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, জগদীশচন্দ্র বসু, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন।

পরিষদের সদস্যদের মধ্যে মুসলমান থাকলেও তারা ছিলেন উপেক্ষিত। এ প্রসঙ্গে ভাষাতত্ত্ববিদ ও সব্যসাচি লেখক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছিলেন, ‘আমরা কয়েকজন বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সভ্য ছিলাম। সেখানে হিন্দু-মুসলমানের কোনো ভেদ না থাকলেও আমরা বড়লোকের গরিব আত্মীয়ের মতো মনমরা হয়ে তার সে সভায় যোগদান করতাম।’

এ প্রেক্ষাপটে মুসলমান লেখক-সাহিত্যিকদের উদ্যোগে ১৯১১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ছিলেন সমিতির প্রথম সম্পাদক। মুসলমানদের আলাদা সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আরও চৌকস মন্তব্য করেছিলেন প্রফেসর ড. আনিসুজ্জামান—‘উনিশ শতকের শেষের দিকে তাদের রচনায় হিন্দু জাতীয়তাবাদের যে ভাব দেখা দিয়েছিল, মুসলমানরা তা অনুমোদন করতে পারেনি।… তাদের আপত্তির কারণ ছিল—এক. মুসলমানদের নিত্যব্যবহার্য আরবি, ফার্সি ও হিন্দুস্তানি শব্দ আধুনিক সাহিত্যের ভাষায় স্থান পায়নি। দুই. এই সাহিত্যে মুসলিম জীবনের কোনো পরিচয় নেই। তিন. তার চেয়ে শোচনীয় ব্যাপার এই যে, ইতিহাস-আশ্রিত যেসব কাব্যনাটক ও উপন্যাসে মুসলমান চরিত্র স্থান পেয়েছিল, সেসব রচনায় মুসলমানদের শ্রদ্ধেয় বহু ঐতিহাসিক চরিত্র কলঙ্কিত হয়েছে।’

বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বাঙালি মুসলমান সমাজের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অগ্রগতি ও পৃষ্ঠপোষকতা। সে লক্ষ্যে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয় ছিল—মুসলিম সমাজে বাংলা সাহিত্যের চর্চা, আরবি-ফার্সি-উর্দু প্রভৃতি ভাষা থেকে অনুবাদ, প্রাচীন মুসলমান বাংলা সাহিত্যের সংগ্রহ, বঙ্গীয় মুসলমান সমাজে সাময়িকপত্রের প্রচার ইত্যাদি।

এ পরিপ্রেক্ষিতে ‘আল এসলাম’ পত্রিকা প্রতিষ্ঠিত হয়। এর সম্পাদক ছিলেন মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী। পরে পূর্ণাঙ্গ সাহিত্য সাময়িকী হিসেবে ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’ ও ‘সওগাত’ প্রতিষ্ঠিত হয়। এর মধ্য দিয়ে বাংলার মুসলমান সাহিত্যিকরা নতুন উদ্যম ফিরে পান। বাঙালি মুসলমান সাহিত্যিকদের মধ্যে এ সময় যারা জাগ্রত ভূমিকা রাখেন, তাদের মধ্যে ইসমাইল হোসেন সিরাজী, কাজী ইমদাদুল হক, গোলাম মোস্তফা, শাহাদাত হোসেন, আবুল মনসুর আহমদ, আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ, কায়কোবাদ, মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, মওলানা আকরম খাঁ, মাওলানা আব্দুল্লাহেল বাকী প্রমুখ অন্যতম।

বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির প্রথম ও দ্বিতীয় সাহিত্য সম্মেলনের মধ্য দিয়ে মুসলমানদের সাহিত্যধারা ক্রমবিকাশ লাভ করতে থাকে। সভাপতিত্ব করেন যথাক্রমে তসলিমুদ্দিন আহমদ ও ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। প্রথম দুটি সম্মেলন কলকাতায় অনুষ্ঠিত হলেও তৃতীয় সাহিত্য সম্মেলন হয়েছিল চট্টগ্রামে। সভাপতি ছিলেন মাওলানা আকরম খাঁ। মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর সভাপতিত্বে আয়োজিত হয় আরেকটি সম্মেলন। এরপর দীর্ঘকাল কোনো সম্মেলন হয়নি।

পরবর্তী সময়ে যুক্ত হন কাজী নজরুল ইসলাম, আবুল কালাম শামসুদ্দিন, ওয়াজেদ মিয়া, আইনুল হক খা ও আব্দুল কাদিরের মতো সাহিত্যপ্রতিভা। আবার জেগে ওঠে সাহিত্যমহল। সূচনা ঘটে নতুন যুগের।

আইনুল হক খা নতুনভাবে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সম্মেলনের প্রস্তাব করেন। তার প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হলে সম্মেলনকে চারটি শাখায় বিভক্ত করা হয়—১. সাহিত্য ২. ইতিহাস ৩. দর্শন ও ৪. বিজ্ঞান।

১৯৩২ সালের ২৫ ডিসেম্বর কলকাতার এলবার্ট হলে ঐতিহাসিক ৫ম সাহিত্য সম্মেলনের প্রথম অধিবেশন হয়। সম্মেলনের মূল সভাপতি কবি কায়কোবাদ। অভ্যর্থনা কমিটির সভাপতি সৈয়দ এমদাদ আলী। সাহিত্য শাখার সভাপতি কাজী আব্দুল ওদুদ। ইতিহাস শাখার সভাপতি অধ্যাপক জহুরুল ইসলাম। দর্শন শাখার সভাপতি অধ্যাপক কাজেমুদ্দিন। বিজ্ঞান শাখার সভাপতি অধ্যাপক কুদরাত-এ-খুদা। এ সম্মেলন কলকাতার বিশিষ্ট মহলে বিপুল প্রভাব বিস্তার করে।

কোরআন তেলাওয়াত দিয়ে অধিবেশনের আরম্ভ হয়। কাজী নজরুল ইসলামের সূচনা সংগীত ও কবি শাহাদাত হোসেনের ‘আহ্বান’ কবিতা পরিবেশিত হয়। কবি কায়কোবাদের গলায় ফুলের মালা দিয়ে আসন গ্রহণ করার অনুরোধ করা হলে তিনি মালা খুলে কাজী নজরুল ইসলামের গলায় পরিয়ে দেন। এতে হল-ভরা দর্শক করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে।

দ্বিতীয় দিন সকালে ইতিহাস ও দর্শন শাখার অধিবেশন শুরু হয়। সভাপতিদ্বয়ের ভাষণের পর ইতিহাস ও দর্শন সম্পর্কে বক্তব্য-প্রবন্ধ উপস্থাপিত হয়। বিকালে শুরু হয় সাহিত্য শাখার অধিবেশন। সাহিত্য শাখার অধিবেশনের পর বিজ্ঞান শাখার অধিবেশন বসে। কুদরাত-এ-খুদা তাতে দীর্ঘ বক্তৃতা করেন।

পরদিন বিকালে শুরু হয় কবি কায়কোবাদের সভাপতিত্বে সম্মেলনের মূল অধিবেশন। কয়েকজন সাহিত্যিক এ সম্মেলনের সাফল্য নিয়ে বক্তৃতা করেন। এ ধরনের সম্মেলন প্রতি বছর হওয়া উচিত বলে তারা অভিমত প্রকাশ করেন।

বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের প্রতিনিধি নলিনীরঞ্জন পণ্ডিত মুসলিম সাহিত্যিকদের অগ্রগতি লক্ষ করে আনন্দ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে সম্মেলনের সভাপতিসহ উদ্যোক্তাদের সংবর্ধনা দেয়ার প্রস্তাব করেন। সম্মেলনের তরফ থেকে প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরদিন বিকালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সংবর্ধনা সভায় মুসলিম সাহিত্য সমিতির সদস্যরা অংশগ্রহণ করেন। তাদের অভ্যর্থনা জানান সাহিত্য পরিষদের নেতারা। সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় ওঠার পথে ঝোলানো ছিল বাংলার বহু সাহিত্যিকদের তৈলচিত্র। কিন্তু মুসলমান সাহিত্যিকদের মধ্যে ছিল শুধু মীর মোশাররফ হোসেনের তৈলচিত্রটি। অথচ তখন বহু মুসলমান সাহিত্যিকের নাম কলকাতার সাহিত্য আসরে মর্যাদার সঙ্গে উচ্চারিত হতো।

ঐতিহাসিক এ সম্মেলন তৎকালীন মুসলিম সমাজে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। মুসলমান কবি-সাহিত্যিকরা নতুন উদ্যমে সাহিত্য সাধনায় সচেষ্ট হন, যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে মোহম্মদী, আজাদ, সওগাত, জেহাদ ও রওনক পত্রিকায় বিপুলসংখ্যক সাহিত্যিকদের অজস্র রচনা প্রকাশের মাধ্যমে।

মুসলিম সাহিত্য সমিতি মুসলিম জাতীয়তাবোধের বিকাশ সাধনে বিশেষ চেষ্টা করে। প্রায় ৩২ বছর এ প্রচেষ্টা অব্যাহত ছিল। সমিতির উদ্যোগে বার্ষিক সম্মেলনের পাশাপাশি নিয়মিত মাসিক সভার আয়োজন ছিল। ৩২ বছরে সাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল মোট সাতটি।

শেষ বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৪৩ সালে। লাহোর প্রস্তাবের প্রেক্ষাপটে কলকাতায় পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি (১৯৪২) এবং ঢাকায় পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ (১৯৪২) গঠিত হয়। মুসলিম সমিতির সঙ্গে যুক্ত এবং সমিতির পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যকদের অনেকেই সংগঠন দুটির গোড়ায় ভূমিকা রাখেন। তখন থেকে মুসলিম সমিতির কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়ে।

নতুন সংগঠন দুটি প্রতিষ্ঠার পেছনে যে জাতীয়তাবোধ ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে, তার প্রতিষ্ঠা, পরিপালন ও প্রসারে মুসলিম সমিতির অবদান অনস্বীকার্য।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন