‘হ্যাঁ, কামাল। এতক্ষণ ওয়েট করার জন্য ধন্যবাদ। না, না দাঁড়াচ্ছ কেন?’ বলে রাশেদ সাহেব আয়েশ করে সোফায় হেলান দিলেন।
কামাল চায়ের কাপটা টেবিল রাখলো। ‘না, না, স্যার, কোনো সমস্যা নেই। চা-টা চমৎকার ছিল।’
‘এনি ওয়ে, বলো অফিসের খবরটবর? সব ঠিকঠাক চলছে তো?’ রিটায়ারমেন্টের পর তার চোখেমুখে আজ হঠাৎ সেই পুরোনো সচিবসুলভ আভিজাত্য।
কামাল একটু ইতস্তত মুখে বলল, ‘জ্বি স্যার, আপনার দোয়ায় ভালোই। আপনার হ্যান্ডলিং ক্যাপাসিটি ছিল অন্যরকম। এখন কী হতে যে কী হয়ে যায়—এই চিন্তায় থাকি সারাক্ষণ।’
‘ম্যানেজ করে চলতে হয় কামাল। জীবনে উত্থান-পতন থাকবেই। আর মনে রাখতে হবে, ফাইলের ক্ষমতা ফায়ারের চেয়ে কম নয়। হা হা হা।’
‘স্যার, আসলে একটা বিশেষ কারণে আসা।’ কামালের গলা কিছুটা নিচু হয়ে এলো। ‘পিলখানা ইস্যুটা নিয়ে আবার নতুন করে তোড়জোড় শুরু হয়েছে; একদম সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে।’
‘আমাদের ডিপার্টমেন্টের তো কিছু ইনভলভ্মেন্ট ছিল। ডিনাই করার উপায় নেই। তো আমাদের ডিপার্টমেন্টেই তাহলে কমিশনটা হচ্ছে?’
‘না স্যার। এটা কেন্দ্রীয়ভাবেই হচ্ছে। তবে আমাদের ডিপার্টমেন্টের বিষয়টা বিশেষভাবে কনসিডার করা হয়েছে।’
‘তুমি তাহলে বলছ, এর আগে এ বিষয় নিয়ে এই লেভেলের উচ্চবাচ্য হয়নি?’
‘সেটাই স্যার। ব্যাপারটাকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে বের করা হচ্ছে। ডিপার্টমেন্টের নানক স্যার আর মাহবুবা ম্যামও বেশ চিন্তিত। তারা চাইলেন আপনাকে আগেভাগেই একটু ইনফর্ম করতে। লাকিলি আমাকে কমিশনে রাখা হয়েছে। কমিশনের সব ইনফো যেন আপনার কানে পৌঁছায়, আমি সেই ব্যবস্থা করব। আপনি এত বছর সার্ভিস দিয়েছেন। বুঝতেই তো পারছেন ব্যাপার-স্যাপার ।’
রাশেদ সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর সামান্য কাঁপা গলায় বললেন, ‘ডোন্ট মাইন্ড, ক্যান আই হ্যাভ এ সিগারেট?’
‘অবভিয়াসলি।’ কামাল উঠে লাইটার এগিয়ে দিল। ধোঁয়ার কুণ্ডলীর আড়ালে রাশেদ সাহেবের মুখটা হঠাৎ কেমন বিকৃত দেখাল।
কামালকে বিদায় করে রাশেদ সাহেব লাফিয়ে লাফিয়ে ওপরে উঠলেন। সুলতানাকে বসে থাকতে দেখা যাচ্ছে বিশাল লিভিংরুমে। বাইরের দিকে তাকিয়ে আছেন মুখ গোমড়া করে। সামনে স্তূপ করা পুরোনো কিছু খবরের কাগজ। রুমের কর্নারে মার্বেল টপের ওপর রাখা ৬৫ ইঞ্চি রোলবল টিভিটাতে অ্যালগরিদমের খেলায় ভিডিও চলছে, কিন্তু ভলিউম একদম কমানো। ওটা ছেড়ে রাখা সুলতানার অভ্যাস।
সুলতানা একবার তাকালেন। তার চোখে একধরনের শীতল উদাসীনতা। ‘ওবায়েদরা চলে গেল।’
‘চলে গেল? আমাকে তো একবার বললও না? এখান থেকেই তো এয়ারপোর্টটা কাছে ছিল।’
‘আমাকেও তো বলেনি। ছেলের বউটাকে আমার শুরু থেকেই অপছন্দ ছিল।’
ওবায়েদ ছেলে থাকতে রশিদ সাহেবকে আগেভাগেই বাসায় ফিরতে হতো এবং রাজকুমারের মর্জিমাফিক ঘোড়া ঘোড়া না খেললে রেহাই মিলত না। খেলার চিত্রটা ছিল এরকম—
ঘোড়ার পিঠের চড়ে রাজকুমার হেঁকে উঠছেন, ‘বাবা, জোরে চলো। ওই ট্যাঙ্কটাকে ধ্বংস করতে হবে...’
‘ঘোড়া দিয়ে ট্যাঙ্ক কীভাবে ধ্বংস করবেন, শাহজাদা?’ ওবায়েদের সঙ্গে মিশে নিজের মেধা আর প্রতিভাকে যেন ওর মধ্যে আবিষ্কার করতে চাইতেন তরুণ রাশেদ সাহেব। তখন তিনি সবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ঢুকেছেন।
‘রান্নাঘরে ঢুকছ কেন? ট্যাঙ্ক ভাঙা চেয়ারের নিচে। জোরে, আরো জোরে...’
‘তিনটা রুম, তাও ছোট ছোট, জাহাঁপনা। তাড়াতাড়ি কীভাবে যাই?’
বেডরুমের আলনায় কাপড় গুছিয়ে লাস্যময়ী সুলতানা রাকী বলে উঠতেন, ‘অফিসের ড্রেস না খুলেই এসব কী শুরু করেছ? আমি আর কাপড় ধুতে পারব না।’
প্রতিদিন নিদেনপক্ষে আধা ঘণ্টা এই মহড়া চলত। একেক রুমে একেক মিশনে।
এরপর ওবায়েদ বড় হতে লাগল। রশিদ সাহেবের উন্নতি হতে হতে তিনি থমকে হঠাৎ খেয়াল করলেন, টিভি, ভিডিও গেমস আর মোবাইল ওবায়েদের বন্ধু হয়ে গেছে।
সুলতানা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ‘উত্তরায় ফারজানার কোনো এক আত্মীয়র বাসায় উঠল। ওখান থেকেই গেল।’
রশিদ সাহেব খুব বেশি কথা বলতে ভরসা পাচ্ছেন না। সাত দিন আগে সুলতানার সঙ্গে তার কিছু কথা কাটাকাটি হয়। সেদিন বাড়ি ফিরতেই মুখ ঝামটা দিয়ে সুলতানা বললেন, ‘সারা জীবন সচিব মহোদয়ের বাঁদিগিরি করে গেলাম। আর এখন শুনতে পাচ্ছি, এই ষাটোর্ধ্ব সাহেব ১৭ বছর ধরে চার-চারটা মেয়ের সঙ্গে ফুর্তি করে এসেছেন।’
ব্যাপারটা সত্য। গুলশানে তার কিনে দেওয়া একটা ফ্ল্যাটে আজও ২৭ বছরের ভরা যৌবনের এক যুবতী থাকে। সম্পর্ক বহু বছরের। এর আগে আরেকটা মেয়ের বন্দোবস্ত ছিল। তার বয়স আরো কম এবং সে আরো নিখুঁত শরীরের সুন্দরী। অনেক দুধ-কলা খসানোর পর সেই সাপিনী তৎকালীন সরকারি দলের হোমরাচোমড়া এক নেতার কাঁধে ঝুলে পগার পার হলো। এর আগে ছিল আরেকটা।
এসব কবে থেকে চলছে, তা ক্ষয়ে যাওয়া পুরোনো মস্তিষ্কের রাশেদ সাহেব ঠিকঠাক বলতে পারেন না। তবে খুব বেশি হলে ১১ বছরের মামলা।
সুলতানা তাহলে ১৭ বছর বলছে কেন?
‘চার-চারটা মেয়ে! ছিঃ! সতেরো বছর ধরে আমাকে ঠকিয়েছ। লজ্জা করে না তোমার?’
সত্যি বলতে রাশেদ সাহেবের লজ্জা করছিল না। তিনি চিন্তিত ছিলেন যে, চার নম্বর মেয়েটা কোত্থেকে এলো? দেশে-বিদেশে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন হোটেলে বিপুলসংখ্যক দেহপসারিণী তার রুমে ঢুকেছে। কিন্তু সেসব নেহাত সাময়িক ব্যাপার। যে দুটি মেয়ের সঙ্গে আধা-স্থায়ী সম্পর্ক ছিল তাদেরও তিনি প্রশাসনিক দক্ষতার সঙ্গে পোশাকি জীবন থেকে আড়াল করে রেখেছেন।
‘প্রতিদিন রাত ১১টায় বোতল নিয়ে বসবে, আর সারা রাত মাতলামি তো আছেই।’
‘কেন, তুমি খাও না?’ এবার একটু নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যান ঠান্ডা নরম রাশেদ সাহেব।
‘আমি তোমার মতো কেজি দরে উইড নেই না। আবার কথা বলছ কোন মুখে? একটুও লজ্জাশরম নেই তোমার?’
রাশেদ সাহেব স্ত্রীকে ভালোবাসা বস্তুটা না দিলেও বৈষয়িক বস্তু যথেষ্ট দিয়েছেন। এই ঢাকা শহরে তিন একরের সমপরিমাণ পাঁচটা প্লট, তিনটা অত্যন্ত বিলাসবহুল ফ্ল্যাট এবং এই ডুপ্লেক্সটা সুলতানার নামে আছে। বিদেশে দুটো বাড়ি সুলতানার দুই ভাইয়ের নামে। এছাড়া চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে লন্ডনের উপমাহীন বাড়িটাও সুলতানার নামেই হতো, যদি না তিনি একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলতেন।
‘তুমি কি ভুলে যাচ্ছ সুলতানা? তোমার জন্য কীইনা করেছি?’
‘আমার জন্য করেছ, না তোমার চাহিদা মেটানোর জন্য করেছ?’ সুলতানা এবার ফুপিয়ে কেঁদে ওঠেন।
রাশেদ সাহেব একবার বলতে গিয়েছিলেন, ‘তোমাকে নতুন একটা ডায়মন্ডের...’
সুলতানা বারবার বলছিলেন, ‘কিনতে চাও আমাকে? বলো আমি কি পেলাম? আমি আর আমার ভাইদের সারা জীবন ব্যবহার করেছো। কী পেলাম তোমাদের সহযোগিতা করে? কী পেলাম?’
সুলতানা তার ঘরে এসে ঘরোয়া হয়ে গেলেও এককালের আইনের তুখোড় ছাত্রী হিসেবে রশিদ সাহেবকে যথেষ্ট সহযোগিতা করেছেন বিভিন্ন কাজে। পেছন থেকে। পেছনের কাজগুলোতে।
মেধাবী হওয়ার কারণে ছোট থেকেই সকল পরিসরে নিজের অবস্থানটা পরিষ্কার করে নিয়েছেন রাশেদ সাহেব। ২০০৯ সালে পিলখানার ঘটনাটার পর পিলপিল করে ওপরে উঠেছেন তিনি। দুহাত ভরে বাগিয়ে নিয়েছেন প্রভূত সুবিধা। ওপরের আশকারাও অবশ্য কম ছিল না।
ছেলে চলে যাওয়ায় সুলতানার মনটা বোধহয় আজ একটু তরল। তাই অভিমান ভুলে বলে উঠলেন—‘আমরা কেন যেতে পারলাম না? কবে যাব?’
লাক্ বলে একটা ব্যাপার সত্যি সত্যিই আছে। রশিদ সাহেব জুয়াড়ির মতো নেশা এবং সতর্কতায় ভাগ্য নামক সাগরে স্কি করেছেন এদ্দিন এবং তরী পার করেছেন অজস্রবার। কিন্তু সম্প্রতি হিসাববহির্ভূত সম্পত্তির একটা মামলায় ধরা খেয়ে গেছেন। মাসে মাসে হাজিরা দিতে হচ্ছে। সুলতানা এখন আর এসবের তোয়াক্কা করতে চান না।
রাশেদ সাহেব জানালার দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘সবকিছু গুছিয়ে আনছি। ওদের আগে চলে যাওয়াটাই ভালো হয়েছে। সবকিছু ঠিকঠাক করে তারপরেই না যাওয়া যায়!’
তাদের তৈরি করা এই ব্যুরোক্রেসিতে টাকা নামক ভাত ছেটানোর দরুন কাকের অভাব তিনি অনুভব করছেন না। কিন্তু ধোঁয়াশা ক্রমেই বেরিক্যাড হয়ে উঠছে।
‘কামাল এসেছিল কেন?’
‘আর বোলো না। পিলখানা নিয়ে একটা ঝামেলা!’
* পুরো এক মাস তদন্তের খবর-টবর এবং ফাইল-টাইল নাড়াচাড়ার পর রাশেদ সাহেব আজ সন্দিহান। দেশ যে কোথায় এগোচ্ছে! সেই সুদিন আর ফিরবে না। ওপর থেকে আঙুলের ইশারায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এনএসআই’তে ঢোকার সময়টার কথা মনে পড়ছে আজ। হঠাৎ ফোনটা নড়ে উঠল ভাইব্রেশনে। কামালের ফোন।
‘হ্যাঁ, বলো কামাল।’
কামালের গলাটা বেশ উত্তেজিত শোনায়। ‘স্যার, খবর শুনেছেন? কমিশন পুনর্গঠিত হয়েছে। নতুন করে এনকোয়ারি শুরু হচ্ছে।’
একটা মুহূর্ত নিঃশ্বাস নিতে না পেরে ঝনঝন করে উঠল রাশেদ সাহেবের মাথা। অকারণে বললেন, ‘হঠাৎ?..কেন?’
‘জানি না, স্যার। আমাকে বাদ দেওয়া হয়েছে। নতুন যে শাকিল সাহেব এসেছেন, তিনি দায়িত্ব নিয়েই সব এলোমেলো করে দিলেন। মনে হচ্ছে, এবার আমাদের অনেকের নাম জড়িয়ে যাবে।’
ফোনটা নামিয়ে রেখে তিনি কাচের দেয়ালের সামনে দাঁড়ালেন। নীল প্রলেপের ফাঁক গলে ঝকমকিয়ে জেল্লা আসছে রোদের। অতিরিক্ত আলো তিনি পছন্দ করেন না। কাঙ্ক্ষিত ঘটনাটা ঘটানোর আগে পিলখানার মসজিদে প্রতি জুমার পর গোপন বৈঠক হতো। দুইটাতে তিনি ছিলেন আর বাকিগুলোর সব সিদ্ধান্তের খবর তাকে দেয়া হতো। নেহাত বিশ্বস্ত না হলে, এসব ম্যানেজ করতে পারতেন না তিনি। পিলখানার পর মিনিস্টার তাঁকে ফোন পর্যন্ত করেছিলেন। বলেছিলেন, ‘আপনাদের মতো অফিসারই তো দেশের প্রয়োজন।’ তলে তলে রাশেদ সাহেবের অবদান ছিল, পিলখানা-সংক্রান্ত সব তদন্তের ফাইলগুলোকে প্রয়োজনমাফিক ‘শোভনীয়’ এবং প্রয়োজনমাফিক ‘ভ্যানিশ’ করে দেওয়া। পরবর্তী সময়ে অবশ্য সবগুলোই বেপাত্তা করার নির্দেশ দেয়া হয়। একটি বাংলা এবং একটি ইংরেজি পত্রিকাও তাকে নিয়ে দুটি প্রতিবেদনে তথ্যের ভাঁজে ভাঁজে জ্ঞানগর্ভ কথা বলতে বলতে একরকম প্রশংসাপত্র লিখে ফেলেছিল। তিনি বেশ লজ্জাই পেয়েছিলেন। থার্ড ওয়ার্ল্ডে বুদ্ধি বা প্রতিভা জিনিসটা সত্যি বলতে কনডমের মতোই সস্তা। এছাড়া বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক হর্তাকর্তারাদের কাছ থেকে যেসব ওহি নাজিল হতো, সেগুলোকে সঙ্গোপনে মাটির জমিনে বাস্তবায়ন করার গুরুদায়িত্ব তিনিই নিয়েছিলেন। আজ টিকে থাকার প্রয়োজনে পিলখানা নিয়ে তাকে জেহাদে নামতে হয়েছে। এই ব্যাপারটার সঙ্গে তার নাম এরকম জড়ানো না থাকলে তিনি কামালদের আর সাহায্য করতেন না।
লিভিং রুমে আসতেই আচমকা রাশেদ সাহেবের কানে ভেসে এলো টিভির আওয়াজ। সুলতানা টিভির সামনে নখে নেলপলিশের কারুকার্যে ন্যস্ত। র্যানডম ভিডিও চলছে। স্ক্রিনে পিলখানার বীভৎস দৃশ্য। ধারাবর্ণনাকারী বলছেন—
‘...২৫শে ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টা। বিডিআর প্রধান বারবার সাহায্য চেয়ে ফোন করেছিলেন তৎকালীন ঊর্ধ্বতন মহলে। কিন্তু রহস্যজনকভাবে সেনাবাহিনীকে অ্যাকশন নিতে অনুমতি দেয়া হয়নি। ৫৭ মেধাবী সেনা অফিসারকে কোনো যুদ্ধ ছাড়াই নির্মমভাবে প্রাণ দিতে হয়েছিল। এর পেছনে কি কোনো প্রতিবেশী শক্তির প্রতিহিংসা ছিল? বেরুবাড়ি সীমান্তের সেই পরাজয়ের প্রতিশোধ কি এই পিলখানা?..’
‘বুলশিট! টিভিটা বন্ধ করো তো সুলতানা!’ রাশেদ সাহেব এতক্ষণ পর চিৎকার করে উঠলেন। তাঁর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। যেন পচা লাশের গন্ধ কুকুরের মতো শুঁকেছেন।
সুলতানা স্থির হয়ে বসে রইলেন। ‘অটো-প্লে চলছে, তাই সামনে চলে এসেছে। আর দেখছ না, আমার হাত বাঁধা? নিজে বন্ধ করলেই তো পারো, কী যে মনে করো আমাকে... ‘
ঠিক তখনই মোবাইলটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে অপরিচিত নম্বর। কাঁপতে কাঁপতে রিসিভার কানে তুললেন তিনি।
‘আসসালামু আলাইকুম। রাশেদ স্যার বলছেন?’ কণ্ঠস্বরটা খুব গভীর এবং ধারালো।
‘জ্বি, কে বলছেন?’
‘স্যার, আমি গুলজার বলছি। নতুন তদন্ত দলের পক্ষ থেকে।’
‘ও, জলিল সাহেবের সেক্রটারি গুলজার?’
‘জ্বি। কেমন আছেন স্যার?’
‘আরে তুমি তো বিখ্যাত মানুষ। আমি আর কেমন-ই বা থাকতে পারি। তা তুমি আছ কেমন?’
‘জি, আলহামদুলিল্লাহ।’ একটু নোকতা দিয়ে গুলজার বলে উঠল, ‘স্যার, আপনার কাল একবার আমাদের জিগাতলার অফিসে আসা দরকার।’
রাশেদ সাহেবের চোখ ছোট হয়ে গেল। পিলখানায় এদের অফিস দিয়েছে কবে? কারণটা যেন বুঝতে পারেননি এমন বিস্ময়ে বললেন, ‘অফকোর্স, কিন্তু কেন?’
‘তদন্তের প্রয়োজনে আপনার উপস্থিতি জরুরি।’
‘আমি অবশ্যই আসব, যেভাবে পারি সাহায্য করব। ‘
‘ভালো থাকবেন।’
লাইনটা কেটে যেতে রাশেদ সাহেব মূর্তির মত নিষ্ক্রিয় হয়ে রইলেন কিছুক্ষণ।
হঠাৎ তার বুকের ডান পাশে একটা তীব্র চিনচিনে ব্যথা শুরু হলো। ব্যথাটা দ্রুত সংক্রামিত হচ্ছে— ঘাড়ে, পিঠে, সারা শরীরে। তিনি সোফায় বসে পড়লেন। নিঃশ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করলেন, কিন্তু বাতাসের বদলে তার ফুসফুসে ঢুকে পড়ল যেন বারুদের ভারী গন্ধ।
কিছুক্ষণ পর ঠিকই সামলে উঠলেন রাশেদ সাহেব। কপালের ঘাম মুছলেন টিস্যু দিয়ে। কিছুক্ষণ হেলান দেওয়া থেকে সোজা হয়ে বসার কসরত করলেন এবং হার মানলেন। ডক্টর ইদানীং সতর্ক করছেন। তাঁর নাকি ধীরগতিতে মেন্টাল স্ট্যাবিলিটি কমে যাচ্ছে। বোধহয় সে কারণেই অকারণ-ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। বয়স হয়েছে তো!
তবে এই ছোট ধাক্কাটাকে ব্যাপার মনে করেন না রাশেদ সাহেব। ঝড়ঝাপটা আগেও এসেছে, তিনি ঠিকই সামলে নিয়েছেন। তাঁর মন বলতে চায়—যাই হয়ে যাক, দিনশেষে তার মতো ঝানু অফিসারকে কায়দা করা সোজা কথা নয়। কথাটার যৌক্তিকতা ও প্রাসঙ্গিকতা খুঁজে খুঁজে হয়রান হলেন তিনি। অবশেষে ক্লান্ত চোখে বিল্ডিংয়ের আড়ালে অস্তায়মান অসহায় সূর্যের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

