বিলুপ্ত ডিগ্রির শর্ত দিয়ে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি

সিডিএর আট ইমারত পরিদর্শকের অব্যাহতি নিয়ে তোলপাড়

সিডিএর আট ইমারত পরিদর্শকের অব্যাহতি নিয়ে তোলপাড়

চাকরিতে যোগ দিয়ে পাঁচ মাস দায়িত্ব পালনের পর ‘অযোগ্য’—এমন এক সিদ্ধান্তে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) আট ইমারত পরিদর্শকের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তায়। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইমারত পরিদর্শক পদে যোগ দিয়েছিলেন ১৮ জন। চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করা এসব প্রার্থীর নিয়োগের পর নানা যাচাই-বাছাই শেষে দেওয়া হয় পদায়নও।

কিন্তু পাঁচ মাস না পেরোতেই গত ৬ জুলাই নোটিস দিয়ে আটজনকে অযোগ্য ঘোষণা করে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয় সিডিএ। অভিযোগ উঠেছে, নিয়োগ বিধি সংশোধন না করেই বিলুপ্ত ডিগ্রি ও উদ্ভট শর্তে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করায় তৈরি হয়েছে এই জটিলতা। এমতাবস্থায় সিডিএ নিয়োগ বিধি সংশোধন না করে উল্টো অব্যাহতি দিয়ে তাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এমন ঘটনায় ক্ষুব্ধ চাকরিচ্যুতদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরাও।

বিজ্ঞাপন

চাকরি থেকে অব্যাহতি পাওয়া আটজন হলেন, অনয় সিংহ সুজাত, দ্বিন ইসলাম লিমন, আব্দুর রহমান রিয়াদ, তাহমিদুল ইসলাম ইবনুল, মাহিদুল হাসান, ইকরামুল হক, ইজতিয়াদ ইসলাম খান ও শরিফুল ইসলাম। এর আগে শাকিরা আক্তার বিথি নামে কুড়িগ্রামের একজন বেতন না পেয়ে চাকরি ছাড়তে বাধ্য হন।

ভুক্তভোগীরা জানান, গত বছরের অক্টোবরে সিডিএ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে দিলে সেখানে অস্থায়ীভাবে ১৮ জন ইমারত পরিদর্শক নিয়োগ নেওয়া হবে বলে তারা জানতে পারেন। নিয়োগের শর্ত ছিল, উচ্চ মাধ্যমিক বা সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এবং স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান থেকে সার্ভে ফাইনাল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। সংশ্লিষ্ট কাজে অভিজ্ঞকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। সে সময় সিডিএ চেয়ারম্যান ছিলেন প্রকৌশলী নুরুল করিম।

সংস্থাটির চেয়ারম্যান, সচিব ও বোর্ড সদস্যরা চলতি বছরের জানুয়ারিতে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা নিয়ে ৩৬৪ জন প্রার্থীর মধ্যে থেকে ১৮ জনকে চূড়ান্তভাবে নিয়োগ দেন। ফেব্রুয়ারি তারা ১৬তম গ্রেডে যোগ দিলে বিভিন্ন বিভাগে তাদের দায়িত্বও ভাগ করে দেওয়া হয়। তবে এর মধ্যে ৯ জনের বেতন আটকে যায়। কর্তৃপক্ষের কাছে এর কারণ জানতে চাইলে তারা বেতন পরিশোধের চেষ্টা চলছে বলে জানান। এর মধ্যেই জুলাইয়ের শুরুতে হঠাৎ করে তাদের চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এইচএসসি পাস করে ডিপ্লোমা পড়ার নজির কম। দেশে সাধারণত এসএসসি পাস করেই শিক্ষার্থীরা ডিপ্লোমা ডিগ্রিতে ভর্তি হন। এরপর তারা বিএসসিতে পড়ার সুযোগ পান। তাছাড়া ডিপ্লোমা ডিগ্রি চার বছর মেয়াদের। আর এইচএসসি দুই বছরের। চাকরির বাস্তবতায় কারিগরি শিক্ষায় ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারী ইঞ্জিনিয়ার ১০ গ্রেডে যোগদান করতে পারেন এবং এটি জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ অনুসারে উচ্চমাধ্যমিক সমমান। তাছাড়া দেশের বিভিন্ন নিয়োগে ডিপ্লোমাকে এইচএসসির সমমান হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। অথচ সিডিএর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে এইচএসসি পাস ও সার্ভে ফাইনাল পরীক্ষায়ও পাস চাওয়া হয়েছে, যা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।

ভুক্তভোগীদের অনেকে সিটি করপোরেশন, ওয়াসাসহ অন্যান্য চাকরি ছেড়ে সিডিএতে যোগ দিয়েছিলেন। এখন হঠাৎ অব্যাহতিতে তারা বেকার হয়ে পড়েছেন। এতে কেউ দুশ্চিন্তায় পড়েছেন, আবার কেউ চাকরি ফেরতের দাবি নিয়ে নানাদিক ঘুরছেন।

এদিকে এমন ঘটনায় হতবাক হয়ে সম্প্রতি বাংলাদেশ সার্ভে ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ মোবারক হোসেন সিডিএ চেয়ারম্যান বরাবরে চিঠি দেন। এর আগে ২০২৩ সালেও একই বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটি সিডিএকে চিঠি দিয়েছিল। এতে উল্লেখ করা হয়, ২০০৪ সালের পর থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড সার্ভে ইনস্টিটিউট, রাজশাহী ও বাংলাদেশ সার্ভে ইনস্টিটিউট কুমিল্লা সার্ভে ফাইনাল নামে কোনো ডিগ্রি দেয় না। ওই সময় থেকে প্রতিষ্ঠান দুটি চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং (সার্ভেয়িং টেকনোলজি) সনদ দিয়ে আসছে। এক্ষেত্রে সরকারি বিভিন্ন দপ্তর, অধিদপ্তর ও পরিদপ্তরে সরাসরি নিয়োগের বিষয়টি অন্তর্ভুক্তির অনুরোধ করা হলো।

চলতি বছরের ২৩ এপ্রিল সিডিএর সচিব মাহবুবুল করিম গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবরে বিষয়টি জানিয়ে সিডিএর চাকরি বিধি-১৯৯০ সংশোধনের আবেদন করেন। আবেদনে সিডিএ সচিব উল্লেখ করেন, ভূমি মন্ত্রণালয়ের নিয়োগেও ডিগ্রির নামের বিষয়টি সংশোধন করা হয়েছে এবং এই কোর্সে ভর্তির যোগ্যতা এসএসসি। কাজেই ইমারত পরিদর্শক পদে প্রার্থিত ডিগ্রিটি এসএসসি পাসসহ সার্ভে টেকনোলজিতে ডিপ্লোমা হওয়া প্রয়োজন।

ভুক্তভোগী তাহমিদুল ইসলাম ইবনুল বলেন, আমরা অনেকে বিভিন্ন পদে চাকরি করতাম। আমাদের সনদগুলো সাবেক সিডিএ চেয়ারম্যান, সচিবসহ সংশ্লিষ্টরা কয়েকবার যাচাই-বাছাই করেছেন। আমরা বোর্ড থেকে ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি এইচএসসি সমমান সে বিষয়ে প্রত্যয়নও দিয়েছি। তারপরও আমাদের অব্যাহতি দেওয়া অযৌক্তিক। তিনি আরো বলেন, মোংলা কাস্টম হাউজের সাম্প্রতিক এক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে এইচএসসি/আলিমের পাশাপাশি ডিপ্লোমা অপশন রাখা হয়েছিল। একজন ছাত্র ডিপ্লোমা পড়ে সরাসরি তিন বছরের ডিগ্রি বা বিএসসিতে ভর্তি হতে পারেন। এতে বুঝা যায় ডিপ্লোমা ডিগ্রি এইচএসসি সমমানের। শুধু তাই নয় প্রকৌশলনির্ভর প্রতিষ্ঠানে এর গুরুত্ব আলাদা। একই কথা বলেন অন্যরাও।

বাংলাদেশ সার্ভে ইনস্টিটিউট, কুমিল্লার অধ্যক্ষ মোবারক হোসেন বলেন, আমরা ইতিমধ্যে সিডিএকে চিঠি দিয়েছি। এই নামে কোনো সনদ দেওয়া হয় না। সেটি যেমন ভুল, তেমনি এইচএসসি পাসের সঙ্গে এই ডিগ্রি চাওয়াও অযৌক্তিক। এসএসসি পাসের পরই ডিপ্লোমা করা হয়। এসব জটিলতায় আমাদের শিক্ষার্থীরা বিপদে পড়ছে। তিনি আরো বলেন, সিডিএ তাদের চাকরিবিধিমালা সংশোধন করেনি। দ্রুত সেটি সংশোধন করা দরকার বলে আমি মনে করি।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে তাদেরকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তাদের আটজনের নিয়োগ অবৈধ ছিল। অর্থাৎ যোগ্যতা না থাকার পরও তারা নিয়োগ পেয়েছে। এ ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। কারা এর সঙ্গে জড়িত আমরা খতিয়ে দেখছি। তাদেরকে শাস্তির আওতায় আনা হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...