ইতিহাসের নিরিখে ঢাকা হাজার বছরের পুরোনো শহর। এই শহরের অলিগলি, পথ-প্রান্তরে ছড়িয়ে আছে ইতিহাসের ঘ্রাণ। ইতিহাস-ঐতিহ্য, সভ্যতা সংস্কৃতিতে এই শহর ছিল সমৃদ্ধ বাংলার স্বাধীন সুলতানদের রাজধানী সোনারগাঁয়ের সহোদরার মতো পাশাপাশি ছিল এর অবস্থান। তারও অনেক আগে, ঈসা (আ.)-এর জন্মেরও আগে এই শহরের বাতাসে ছড়িয়েছিল মানুষের প্রশ্বাসের আওয়াজ।
এই শহরে লেখা হয়েছে ইহিতাসের অনেক আখ্যান। হাজার বছরের জীবনপরিক্রমায় এই শহর দেখেছে অনেক উত্থানপতন। সহ্য করেছে অনেক ঘাত-প্রতিঘাত। বিলীন হয়ে যেতে যেতে আবার মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। হাজারো মনীষীর জন্ম দিয়েছে এই শহর। যাদের অর্জন ও অবদান অমরত্ব দান করেছে এই শহরকে। হাকিম হাবিবুর রহমান ছিলেন শহর ঢাকার কীর্তিমান একজন মহান মানুষ।
ঢাকার ইতিহাস নিয়ে যারা ভাবেন, যারা এই শহরের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি অনুভব করতে চান, যারা সভ্যতার পরশে এই শহরকে সাজিয়ে তুলতে আগ্রহী, তাদের কাছে ‘হাকিম হাবিবুর রহমান’ খুব পরিচিত একটি নাম। মুসলিমদের হাতে বিকাশ লাভ করা এই শহরের সভ্যতা ও সংস্কৃতির ইতিহাস রচনায় তার অবদানের স্বীকৃতি দেওয়া অপরিহার্য।
বংশগতভাবে তিনি ছিলেন তৎকালীন সীমান্ত প্রদেশের ইয়াগিস্তানের ইউসুফজাই পরিবারের সদস্য। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে তার বাবা মাওলানা মুহাম্মদ শাহ আখুন্দজাদাহ জীবিকার উদ্দেশ্যে ঢাকায় হিজরত করেন। আর ১৮৮১ সালে ঢাকার ছোট কাটরায় হাকিম হাবিবুর রহমান জন্মগ্রহণ করেন।
শিক্ষাজীবন ও আলোর সন্ধান
হাকিম হাবিবুর রহমানের শিক্ষা জীবন ছিল বৈচিত্র্যময়। ধর্মীয় শিক্ষায় তিনি যেমন পারদর্শী ছিলেন, তেমনি ইউনানি চিকিৎসা শাস্ত্রে নিপুণ দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। ১৩ বছর বয়সে তিনি ধর্মীয় শিক্ষার জন্য কানপুর যাত্রা করেন। সেখানে শিক্ষা সমাপ্ত করার পর তিনি ইউনানি চিকিৎসাবিদ্যা অর্জনে আগ্রহী হন। সে জন্য প্রথমে লখনৌ ও পরে দিল্লি গমন করেন। ১৮৯৯ সালে আগ্রায় যান। সেখানে তিব্বে ইসলামির পাঠ গ্রহণ সমাপ্ত করেন।
১১ বছর কানপুর, লখনৌ, দিল্লি ও আগ্রায় ধর্মীয় শিক্ষা এবং চিকিৎসাবিদ্যায় বিশেষ জ্ঞান অর্জন করে ১৯০৪ সালে ঢাকায় ফিরে আসেন। মানুষকে চিকিৎসাসেবা দিতে শুরু করেন। অল্প সময়ে তিনি হাকিমি চিকিৎসায় খ্যাতি অর্জন করেন। নবাব সলিমুল্লাহর সঙ্গে তার সখ্য ছিল। তিনি নবাব পরিবারের পারিবারিক চিকিৎসক ছিলেন। সে সময় তিনি ঢাকার বড় বড় জমিদার পরিবারেরও চিকিৎসক ছিলেন। স্যার সলিমুল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কের কারণে তিনি নবাব সাহেবের রাজনীতি ও শিক্ষা আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ হন এবং এই সুবাদে চিকিৎসার পাশাপাশি সাংবাদিকতা, রাজনীতি, শিক্ষা আন্দোলন ও ইতিহাস চর্চায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
ইতিহাস চর্চা ও সাংস্কৃতিক বয়ান নির্মাণ
হাকিম হাবিবুর রহমান স্বভাবগতভাবে একজন ঐতিহাসিকের গুণাবলি ধারণ করতেন। ছোটবেলা থেকেই ঐতিহাসিক তথ্য সংগ্রহের প্রতি তার প্রবল ঝোঁক ছিল। আসুগেদানের ভূমিকায় তিনি বলেন, ‘শৈশবেই আমি উর্দু লিখন ও পঠন আয়ত্ত করেছিলাম। সেই সময়ে ঢাকার মসজিদ ও কবরসমূহের ইতিহাস লেখার ইচ্ছা আমার মনে ছিল। দশ বছর বয়সেই আমি কয়েকটি মসজিদের ইতিহাস আমার খাতায় লিপিবদ্ধ করে ফেলেছিলাম।’
তার রচিত প্রায় সব গ্রন্থ ইতিহাসবিষয়ক। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধ, হায়াতে সুকরাত, আসুদেগানে ঢাকা, ঢাকা পচাস বরস পহলে, মাসাজিদে ঢাকা, কুছ পুরানী বাতে, ঢাকে কী তারিখি ইমারত, সালাসা গাসসালাÑএগুলো সবই ইতিহাসবিষয়ক রচনা। ১৯১০ সালের নভেম্বরে তিনি এলাহাবাদের আদীব পত্রিকায় ‘শামসুল বায়ান’ শীর্ষক যে প্রবন্ধটি লেখেন বা ১৯৩৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে সৈয়দ সুলায়মান নাদবীর অনুরোধে ‘মাআরিফ’ পত্রিকায় ‘বাংগাল মে ইলমে হাদিস’ শীর্ষক যে লেখাটি প্রকাশ করেন, ঐতিহাসিক দৃষ্টিতে সেগুলোর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। আলমাশরিক পত্রিকার প্রথম খণ্ডের দ্বিতীয় সংখ্যায় ‘ঢাকে কী তারিখি আজমত’ অর্থাৎ ঢাকার ঐতিহাসিক গুরুত্ব শীর্ষক তার যে লেখাটি রয়েছে বা ওই পত্রিকার প্রথম খণ্ডের সপ্তম সংখ্যায় ‘হাজি শাহবাজ’ শীর্ষক যে প্রবন্ধটি তিনি প্রকাশ করেছেন, তা সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষ গুরুত্বের অধিকারী।
হাকিম সাহেবের আগে ঢাকাকে কেন্দ্র করে যে কটি ইতিহাস-গ্রন্থ রচিত হয়েছে, তার মধ্যে জেমস টেইলরের Topography and Statistics of Dacca (১৮৪০), সৈয়দ আওলাদ হাসানের Notes on the Antiquities of Dacca (১৯০৪) এবং মুনশী রহমান আলী তায়েশের তাওয়ারিখে ঢাকা (১৯১০), এই তিনটি গ্রন্থ উল্লেখযোগ্য। হাকিম হাবিুবর রহমানের ‘আসুদেগানে ঢাকা’ আগে উল্লিখিত গ্রন্থগুলো থেকে ভিন্ন। তিনি এ গ্রন্থে ‘ইসলামি শহর’ ঢাকার মাজার, দরগাহ ও বিভিন্ন কবরের ইতিবৃত্ত তুলে ধরেই ক্ষান্ত হননি, বরং ঢাকার ইসলাম প্রচারক পীর-দরবেশ, গাউসকুতুব, আলিম-ফাজিল, কবি-সাহিত্যিক, আমির-কবির, শাসক-প্রশাসকদের জীবনও তুলে ধরেছেন।
হাকিম সাহেবের লেখা ‘ঢাকা পচাস বরস পহলে’ গ্রন্থটি ঐতিহাসিক দৃষ্টিতে বিশেষ গুরুত্বের অধিকারী। সত্যি বলতে, উনিশ শতকের শেষভাগ এবং বিশ শতকের প্রথমার্ধে ঢাকার সাংস্কৃতিক ইতিহাসবিষয়ক এটাই একমাত্র গ্রন্থ। সংস্কৃতি বলতে আজকাল সাধারণভাবে যা বোঝানো হয়, তার কোনো অংশই এ গ্রন্থে বাদ পড়েছে বলে মনে হয় না। এতে ঢাকার কৃষ্টিপরায়ণ সভ্য সমাজের গান-বাজনা, রঙ্গ-রসিকতা, রঙ্গমঞ্চের অভিনয়, কবিতার আসর, মেলা-প্রদর্শনী, উৎসব পালন, ধর্মীয় জীবন, খেলাধুলা, বেশভুষা, সাজসজ্জা, আতিথেয়তা, পানাহার, খাদ্যায়োজন, খাদ্য প্রস্তুতির বৈশিষ্ট্য, মিষ্টান্নের বৈচিত্র্যÑমোটকথা ঢাকার নাগরিক জীবনের যাবতীয় রীতিনীতি হৃদয়গ্রাহী ও প্রাঞ্জল ভাষায় বিবৃত হয়েছে। ঢাকার প্রায় পৌনে এক শতাব্দীর (১৮৭৫-১৯৪৭) এমন একটি সাংস্কৃতিক ইতিহাসগ্রন্থ হাকিম হাবিবুর রহমানের আগে তো নয়ই বটে, এমনকি আজও প্রণীত হয়েছে বলে মনে হয় না। এই গ্রন্থে শুধু সাংস্কৃতিক ইতিহাসই নয়, কতকটা সামাজিক ইতিহাস অর্থাৎ ঢাকাবাসীর অতীত পেশা, ব্যবসায়-বাণিজ্য, শিল্পকলা ইত্যাদিও স্থান পেয়েছে।
প্রত্নতত্ত্ব সংগ্রহ ও ইতিহাস মনস্কতা
পুরোনো মুদ্রা ও শিলালিপি সংগ্রহের প্রতি হাকিম হাবিবুর রহমানের ছিল গভীর অনুরাগ। এটি শুধু শখের বিষয় ছিল না; বরং তার অন্তর্নিহিত ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক মনোভাবেরই উজ্জ্বল প্রকাশ। অতীতের নিদর্শন সংরক্ষণে তিনি যে আন্তরিকতা ও দায়িত্ববোধ দেখিয়েছেন, তা তার কর্মজীবনের একটি বিশেষ দিক উন্মোচন করে।
অত্যন্ত যত্ন ও নিষ্ঠার সঙ্গে তিনি দুশোরও অধিক দুষ্প্রাপ্য মুদ্রা সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করেছিলেন। পরবর্তীকালে, ১৯৩৩ সালে তিনি তার সেই মূল্যবান সংগ্রহ ঢাকার জাদুঘরে দান করেন। তার এই দানের গুরুত্ব অনুধাবন করে জাদুঘর কর্তৃপক্ষ মুদ্রাগুলো তারিখের ক্রমানুসারে সুশৃঙ্খলভাবে বিন্যস্ত করে ১৯৩৬ সালে একটি ক্যাটালগ প্রকাশ করে।
ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
মরহুম হাকিম হাবিবুর রহমানের অসিয়ত অনুসারে তার সুবিশাল ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করা হয়। তার এই অমূল্য সংগ্রহ বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘হাবিবুর রহমান কালেকশন’ (H. R. C.) নামে সুপরিচিত।
এই গ্রন্থাগারে তার সংরক্ষিত উর্দু ও ফারসি ভাষার ৩৩টি দুর্লভ পাণ্ডুলিপি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। মুদ্রিত গ্রন্থের ভান্ডারও সমান সমৃদ্ধ—এক হাজারেরও অধিক উর্দু বই, চার শতাধিক ফারসি গ্রন্থ এবং প্রায় পাঁচশ আরবি কিতাব এতে সন্নিবেশিত। দুই হাজারেরও বেশি ছোট-বড় গ্রন্থ তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করে গেছেন।
এই সংগ্রহের অনেক বই আজ দুষ্প্রাপ্য; ফলে বাংলাদেশের আরবি, ফারসি ও উর্দু সাহিত্য নিয়ে গবেষণার জন্য তার গ্রন্থাগার এক অপরিহার্য সম্পদে পরিণত হয়েছে। জ্ঞানচর্চা ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে তার এই অনন্য অবদানই তাকে ইতিহাসের পাতায় চিরস্মরণীয় করে রাখবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

