মদিনার আকাশে তখন গোধূলির ম্লান আলো। মসজিদের আঙিনায় সাহাবিদের গুঞ্জন আজ অন্যদিনের চেয়ে একটু ভিন্ন। মাত্র কয়েক মাস আগে আরব উপদ্বীপের ধূলিধূসরিত প্রান্তরগুলোয় যে বিদ্রোহের আগুন দাউদাউ করে জ্বলছিল, তা এখন স্তিমিত। রিদ্দা বা ধর্মত্যাগীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর মদিনার নবীন রাষ্ট্রটি এক নতুন ভোরের মুখোমুখি। খলিফা আবু বকর মদিনার উপকণ্ঠে এক উঁচু টিলার উপর দাঁড়িয়ে উত্তর দিগন্তের দিকে তাকিয়ে আছেন। যে দিগন্তের ওপারে নীল কুয়াশায় ঢাকা সিরীয় মরুভূমি, আর তারও পরে দাঁড়িয়ে আছে হাজার বছরের প্রাচীন ও সমৃদ্ধ বৃহত্তর শাম অঞ্চল।
খলিফার দুই কাঁধে তখন বিরাট দায়িত্ব—একদিকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর রেখে যাওয়া আমানতের সুরক্ষা, অন্যদিকে আরবের এই নতুন উদ্যমকে একটি মহৎ লক্ষ্যের দিকে পরিচালিত করা। রিদ্দা যুদ্ধের মাধ্যমে আরবের গোত্রগুলো আবার এক পতাকার নিচে এসেছে, তাদের সামরিক শক্তি এখন শানিত, তারা আত্মবিশ্বাসে পরিপূর্ণ। মদিনার শান্ত বাতাসে তখন বড় সংঘাতের ঘ্রাণ বিরাজ করছে, যেখানে আরবের এই নবজাত শক্তির প্রতিপক্ষ ছিল তৎকালীন বিশ্বের দুই পরাশক্তি—বাইজেন্টাইন ও পারস্য সাম্রাজ্য।
শামের ভৌগোলিক সীমানা
শাম ছিল রোম সাম্রাজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশ। সেখানে খ্রিষ্টানদের অনেক পবিত্র স্থান ও স্থাপনা অবস্থিত ছিল। পারসিকদের মতো রোমানরাও আরবদের আদিশত্রু ছিল; তবে পারসিকদের বৈরিতা রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কারণে আর রোমানদের শত্রুতা মূলত ধর্মীয়ভিত্তিক।
বৃহত্তর শাম বলতে আধুনিক ভূরাজনীতির সীমানায় শুধু সিরিয়াকে বোঝায় না; বরং বর্তমান সিরিয়া, ফিলিস্তিন, জর্ডান এবং লেবাননকে নিজের বুকে ধারণ করা এটি বিস্তৃত অঞ্চল বোঝায়। সপ্তম শতাব্দীর বিশ্ব ইতিহাসে শামের অবস্থান ছিল অনেকটা হীরাখচিত মুকুটের মতো, যার দিকে প্রতিটি সাম্রাজ্য তৃষ্ণার্ত চোখে তাকিয়ে থাকত।
শামের ভৌগোলিক অবস্থান একে বিশ্বের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছিল। পশ্চিমে নীল জলরাশির ভূমধ্যসাগর আর পূর্বে অন্তহীন সিরীয় মরুভূমি—এ দুইয়ের মধ্যে এক উর্বর করিডোর হিসেবে শাম দাঁড়িয়ে ছিল। এর উর্বর ভূমি এবং নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু একে মরুভূমির শুষ্ক রুক্ষতা থেকে পৃথক করেছিল। এটি ছিল তিনটি মহাদেশ—এশিয়া, আফ্রিকা এবং ইউরোপের এক মহান মিলনস্থল। প্রাচীন রেশম পথ (Silk Road) এবং লোহিত সাগর থেকে আসা ধূপ পথ (Incense Route) এই শামের বুক চিরে চলে গিয়েছিল সুদূর রোম ও পারস্যের দিকে।
শাম মোট চারটি জান্দ বা প্রশাসনিক প্রদেশে গঠিত ছিল। সিরিয়ার একাংশ নিয়ে জান্দ দিমাশক, মধ্য সিরিয়ায় জান্দ হিমস, উত্তর জর্ডান ও উত্তর ফিলিস্তিন নিয়ে জান্দ আল উরদুন এবং দক্ষিণ ফিলিস্তিন ও উপকূলীয় অঞ্চল নিয়ে জান্দ ফিলিস্তিন।
মরুচারী আরবদের কাছে শামের উর্বরতা ছিল অলৌকিক স্বপ্নের মতো। যে আরবরা তপ্ত বালু আর খেজুরের বাগানের বাইরে খুব কমই সবুজ দেখেছে, তাদের কাছে শামের আঙুর বাগান, জলপাইয়ের বন এবং গমের ক্ষেতগুলো ছিল পরম আরাধ্য। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের জন্য শাম ছিল তাদের ‘রুটির ঝুড়ি’ (Breadbasket)। জর্ডান নদীর অববাহিকা এবং ওরোন্টেস নদীর প্রবাহ এই অঞ্চলকে শস্যশ্যামল করে তুলেছিল, যা সাম্রাজ্যের বিশাল সেনাবাহিনীর রসদ জোগাত।
শামের ধর্মীয় গুরুত্ব
মুসলিমদের বিশ্বাস ও ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে শামের মর্যাদা ছিল অতুলনীয়। কোরআন ও হাদিসে বারবার এই অঞ্চলকে ‘বরকতময় ভূমি’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। এটি ছিল অসংখ্য নবী ও রাসুলের জন্মস্থল, বিচরণভূমি, দাওয়াতের ক্ষেত্র। ইব্রাহিম, মুসা, ঈসা (আ.) থেকে শুরু করে অনেক নবী এই মাটিতেই দাওয়াত প্রচার করেছেন। বাইতুল মুকাদ্দাসের মসজিদুল আকসা, যা মুসলিমদের প্রথম কিবলা এবং রাসুল (সা.)-এর পবিত্র মিরাজ ভ্রমণের প্রারম্ভিক স্থান, এই শামেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল।
এছাড়া শামের শহরগুলোর ঐতিহাসিক আভিজাত্য ছিল প্রাচীন। দামেস্ক ছিল বিশ্বের প্রাচীনতম জনপদগুলোর একটি। জেরুসালেম ছিল আধ্যাত্মিকতার কেন্দ্র। অন্যদিকে গাজা ছিল আরবের কুরাইশদের বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্রস্থল, যেখানে রাসুল (সা.)-এর প্রপিতামহ হাশেম ইবনে আবদ মানাফের সমাধি অবস্থিত ছিল। এই গভীর ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক সম্পর্কের কারণেই আরবের মুসলিমদের হৃদয়ে শামের জন্য এক বিশেষ টান বিদ্যমান ছিল।
পতনোন্মুখ বাইজেন্টাইন : এক ক্লান্ত দানবের রাজনৈতিক চিত্রপট
সপ্তম শতাব্দীর শুরুতে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য (পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য) বাহ্যিকভাবে এক বিশাল মহিরুহ মনে হলেও এর শেকড় তখন অনেকখানি আলগা হয়ে পড়েছিল। সম্রাট হেরাক্লিয়াস যখন সিংহাসনে বসেন, তখন সাম্রাজ্যটি পারস্যের সাসানীদের হাতে প্রায় ধ্বংসের মুখে।
৬০২ থেকে ৬২৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ২৬ বছর ধরে বাইজেন্টাইন ও সাসানীয় সাম্রাজ্যের মধ্যে যে মরণপণ লড়াই চলেছিল, তাকে আধুনিক ঐতিহাসিকরা ‘প্রাচীনকালের বিশ্বযুদ্ধ’ বলে অভিহিত করেন। সম্রাট হেরাক্লিয়াস অত্যন্ত চাতুর্য ও বীরত্বের সঙ্গে পারস্যের রাজধানী তিসফুন (Ctesiphon) পর্যন্ত পৌঁছে তাদের পরাজিত করেছিলেন এবং হারানো শাম ও ফিলিস্তিন পুনরুদ্ধার করেছিলেন। কিন্তু এই বিজয় ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল। যুদ্ধের ফলে সাম্রাজ্যের অর্থনীতি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিল, জনসংখ্যা হ্রাস পেয়েছিল এবং অনেক অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।
দীর্ঘ যুদ্ধের ক্লান্তিতে বাইজেন্টাইন সেনাবাহিনী তখন নিস্তেজ। সৈন্যদের নিয়মিত বেতন দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত অর্থ কোষাগারে ছিল না। সাম্রাজ্যের সীমানা রক্ষার জন্য তারা এতদিন আরব সীমান্তে যে ঘাসানিদ (Ghassanids) মিত্রদের ওপর নির্ভর করত, অর্থের অভাবে তাদের সেই আর্থিক অনুদান বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে সীমান্ত পাহারায় নিয়োজিত আরব গোত্রগুলো বাইজেন্টাইনদের প্রতি তাদের আনুগত্য শিথিল করে দেয়। ফলে মুসলিম বাহিনীর অগ্রযাত্রার জন্য এক সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হয়।
বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের পতনের এক বড় কারণ ছিল তাদের অভ্যন্তরীণ ধর্মীয় সংঘাত। কনস্টান্টিনোপলের রাষ্ট্রীয় গির্জা এবং শামের স্থানীয় মনোফিজাইট (Monophysite) খ্রিষ্টানদের মধ্যে বিশ্বাসগত বিরোধ ছিল তীব্র। সম্রাট হেরাক্লিয়াস এক জবরদস্তিমূলক ধর্মীয় ঐক্যের চেষ্টা চালান। ফলে স্থানীয় সিরীয় ও মিসরীয় খ্রিষ্টানদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। তারা মনে করতে শুরু করেছিল, দূরবর্তী রোমানদের চেয়ে আরব মুসলিমদের অধীনে থাকা হয়তো ধর্মীয়ভাবে বেশি নিরাপদ হবে। ফ্রেড ডোনারের মতো আধুনিক ঐতিহাসিকরা মনে করেন, এই ধর্মীয় ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতাই মুসলিমদের দ্রুত বিজয়ের পথ প্রশস্ত করেছিল।
কেন উত্তর দিগন্তের শামই ছিল প্রথম লক্ষ্য
ইসলামের আবির্ভাবের আগে ইয়েমেনের খ্রিষ্টান শাসক ‘আবরিহা’ রোমান বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের প্ররোচনায় কাবাঘরের প্রতিপক্ষ হিসেবে একটি গির্জাঘর নির্মাণ করে আরবদের সেখানে গিয়ে হজ করার আহ্বান জানায়। আরবরা তার সেই প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছিল। রিদ্দার যুদ্ধের পর যখন আরবরা ইসলামের ছায়াতলে একতাবদ্ধ হয়ে একটি সুগঠিত শক্তিতে পরিণত হয়, তখন বিষয়টি বাইজেন্টাইন রোমানদের তীব্র মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কেননা, ইসলামের সৌন্দর্যের সামনে খ্রিষ্টধর্মের কৃত্রিম ঔজ্জ্বল্য ভীষণ ফ্যাকাশে দেখাচ্ছিল।
তারা শঙ্কিত হয়ে পড়ল, এভাবে যদি ইসলামের বার্তা চতুর্দিকে ছড়াতে থাকে, তাহলে শিগগিরই সে প্রাচ্য-প্রতীচ্যকে গুণমুগ্ধ বানিয়ে খ্রিষ্টধর্মকে একটি বিস্মৃত অতীতে পরিণত করে ফেলতে পারে। এ কারণেই শামের খ্রিষ্টশক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগেই মুসলিমদের বিরুদ্ধে আদাজল খেয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে শুরু করে। এ প্রশাসনই রাসুল (সা.)-এর বার্তাবাহক হারিস ইবনু আমর (রা.)-কে হত্যা করেছিল। যার রক্তের প্রতিশোধ নিতে রাসুলুল্লাহ (সা.) সৈন্যদল পাঠান। মুতার রণাঙ্গনে মুসলিম বাহিনী মাথায় কাফন বেঁধে রোমানদের পঙ্গপালের মতো ধেয়ে আসা সৈনিকদের সঙ্গে বুক চিতিয়ে লড়াই করে। রোমানরা ইসলামের উদীয়মান শক্তিকে নিজেদের জন্য চরম বিপদ বিশ্বাস করে আরবদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকে। সেই ভাবনা থেকেই তারা ইরাক সীমান্তে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত আরব খ্রিষ্টান গোত্রগুলোকে শতভাগ পৃষ্ঠপোষকতা চালিয়ে যায়। এমনকি ফিরাজ যুদ্ধে রোমানরা প্রকাশ্যে অংশগ্রহণ করার মাধ্যমে মুসলিমদের বিরুদ্ধে উন্মুক্ত যুদ্ধের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়।
রিদ্দা যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটার পর মদিনার নেতৃত্ব এক নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। হাজার হাজার আরবযোদ্ধা এখন মদিনায় সমবেত, যারা যুদ্ধের ময়দানে বিজয় অর্জনে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। এই বিশাল জনশক্তিকে যদি কোনো উচ্চতর লক্ষ্যের দিকে পরিচালিত না করা হয়, তবে গোত্রীয় দ্বন্দ্ব আবার ফিরে আসতে পারে—এমন একটি সম্ভাবনা আবু বকর (রা.) অনুভব করেছিলেন।
শাম ছিল আরবের উত্তর তোরণ। বাইজেন্টাইনরা প্রায়ই আরবের উত্তর সীমান্ত দিয়ে মদিনার ওপর হামলার পরিকল্পনা করত। বিশেষ করে, মুতা ও তাবুক অভিযানের স্মৃতি তখনো টাটকা ছিল। আবু বকর (রা.) জানতেন, মদিনাকে স্থায়ীভাবে সুরক্ষিত করতে হলে উত্তরের এই হুমকিকে সমূলে উৎপাটন করতে হবে। শামের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হওয়া মানেই ছিল আরবের উত্তর সীমান্তকে এক শক্তিশালী প্রতিরক্ষা প্রাচীর দিয়ে ঘিরে ফেলা।
আবু বকর (রা.)-এর জন্য শাম অভিযান ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেষ ইচ্ছারও প্রতিফলন। মুতা যুদ্ধের অসম্পূর্ণ মিশন সম্পন্ন করার জন্য ইন্তেকালের মাত্র কয়েক দিন আগে রাসুল (সা.) উসামা বিন জায়দ (রা.)-এর নেতৃত্বে এক বিশাল বাহিনী শামের দিকে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। নবী (সা.)-এর ওফাতের পর যখন মদিনা চারদিক থেকে বিদ্রোহীদের দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে ছিল, তখনো আবু বকর (রা.) উসামার বাহিনীকে রওনা করার আদেশ দিয়েছিলেন। অনেকে বাধা দিলেও তিনি বলেছিলেন, ‘আল্লাহর কসম, যদি মদিনার চারপাশে হিংস্র নেকড়েরা ঘোরাফেরা করে এবং তারা আমাকে ছিঁড়ে ফেলে, তবু আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদিষ্ট এই বাহিনীকে থামাব না।’ উসামার বাহিনীর সফল প্রত্যাবর্তন শামের দিকে বড় অভিযানের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল।
আরেকটা কারণ ছিল, আরবদের দীর্ঘকালের বাণিজ্যপথগুলো শামের ওপর দিয়ে চলে গিয়েছিল। কুরাইশদের শীত ও গ্রীষ্মকালীন সফরের এক বড় অংশ ছিল শামের বাজারগুলোতে। এই বাণিজ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা আরবের সমৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য ছিল। এছাড়া ইসলামের বিশ্বজনীন বাণীর প্রথম বড় পরীক্ষা ছিল শামের মতো একটি সভ্য ও বহুমাত্রিক অঞ্চলে প্রবেশ করা। আরবের ক্ষুদ্র গণ্ডি পেরিয়ে ইসলামকে এক বিশ্বজনীন জীবনব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার রাজনৈতিক স্বপ্নই আবু বকর (রা.)-কে শামের দিকে পরিচালিত করেছিল।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

