তৃতীয় ইউনিট : শুরাহবিল ইবনে হাসানার নেতৃত্বে
ধর্মদ্রোহ প্রতিরোধের লক্ষ্যে শুরাহবিল ইবনে হাসানা (রা.)-এর নেতৃত্বে তৃতীয় বাহিনী প্রস্তুত করা হয়। তার অধীন সৈন্যসংখ্যা ছিল তিন হাজার। খলিফা আবু বকর (রা.) তাকে বিশেষ নির্দেশনা দিয়ে একটি চিঠি পাঠান। চিঠিতে তিনি লিখেছেন, ‘হানিফা গোত্রের কাছে গিয়ে আপনি অপেক্ষা করবেন। আমি সাহায্যকারী বাহিনী বা পরবর্তী নির্দেশ না পাঠানো পর্যন্ত মুসাইলামা কাজ্জাবের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হবেন না।’
খলিফার নির্দেশ পেয়ে শুরাহবিল হানিফা গোত্রের কাছাকাছি এলাকায় সৈন্যসমাবেশ করলেন এবং সাহায্যের অপেক্ষায় রইলেন। সেখানে অবস্থান করতে করতে তার মনে হলো, ইকরিমা ইবনে আবু জাহলের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে হানিফা গোত্রের সৈন্যরা হয়তো ক্লান্ত ও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগালে সহজেই তাদের পরাজিত করা সম্ভব হবে এবং অন্য কোনো সাহায্যকারী বাহিনীর প্রয়োজন হবে না। যদিও তার অপেক্ষা করার বিষয়ে খলিফার নির্দেশ ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন, তবু শুরাহবিল সাহায্য পৌঁছার আগেই আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নিলেন।
শুরাহবিল তিন হাজার সৈন্যের ক্ষুদ্র বাহিনী নিয়ে মুসাইলামার বিশাল বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। অথচ মুসাইলামার সৈন্যসংখ্যা তখন এক লাখে পৌঁছেছে। ফল যা হওয়ার তাই হলো। স্বতন্ত্রভাবে লড়াই করতে গিয়ে ইকরিমার বাহিনীর যে করুণ দশা হয়েছিল, শুরাহবিলের বাহিনীরও একই পরিস্থিতি হলো। মুসাইলামার বিশাল বাহিনী শুরাহবিলের ক্ষুদ্র বাহিনীকে গ্রাস করে নিল। শুরাহবিলের সৈন্যরাও ময়দানে টিকতে না পেরে ছত্রভঙ্গ হয়ে এদিক সেদিক পালিয়ে গেল।
খলিফার নির্দেশ অমান্য করে একাই লড়াই করতে যাওয়া ইকরিমার মতো একই পরিণতি হলো শুরাহবিলের। আমিরের নির্দেশ অমান্য করার ফলে পুরো মুসলিম বাহিনীকে দ্বিতীয়বারের মতো চরম ক্ষতির সম্মুখীন হতে হলো। শুরাহবিল ইবনে হাসানা ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ ও শক্তিশালী সেনাপতি, তবু পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠল। শুরাহবিলের আদেশ অমান্য করা এবং পরাজয়ের সংবাদে আবু বকর (রা.) খুব ব্যথিত হলেন। তিনি শুরাহবিলের কাছে কঠোর নির্দেশ পাঠালেন, ‘আপনি নিজের অবস্থানে অটল থাকুন। মদিনায় ফিরে আসবেন না।’
চতুর্থ ইউনিট : খালিদ বিন ওয়ালিদের নেতৃত্বে
মুসাইলামার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইকরিমা ও শুরাহবিলের বাহিনী যখন নাস্তানাবুদ হচ্ছিল, তখন খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.) উত্তরে বনু আসাদ ও বনু তামিম গোত্রের বিরুদ্ধে বিশাল এবং গৌরবময় বিজয় অর্জন করেছিলেন। তার ওপর অর্পিত প্রাথমিক দায়িত্ব সফলভাবে সম্পন্ন করে তিনি মদিনায় ফিরে আসেন।
মালিক ইবনে নুয়াইরাকে হত্যার ঘটনা নিয়ে তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য খলিফা আবু বকর (রা.) খালিদ ইবনে ওয়ালিদকে মদিনায় তলব করেছিলেন। খালিদ (রা.) নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করার পর খলিফা তাকে অভিযোগ থেকে দায়মুক্ত ঘোষণা করেন। এরপর তিনি খালিদকে একটি নতুন বাহিনীর সেনাপতি হিসেবে নিযুক্ত করেন।
আবু বকর (রা.) নির্দেশ দিলেন, এই বাহিনীটি খালিদ ইবনে ওয়ালিদের নেতৃত্বে ইয়ামামায় গিয়ে শুরাহবিল ইবনে হাসানার বাহিনীর সঙ্গে মিলিত হবে এবং তারা একত্রে হানিফা গোত্রে মুসাইলামা কাজ্জাবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে। এভাবে খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.) বনু হানিফাকে দমনের উদ্দেশ্যে প্রেরিত বাহিনীর প্রধান সেনাপতি হিসেবে নিযুক্ত হলেন।
ইয়ামামার উদ্দেশে খালিদের যাত্রা
খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.) নিজস্ব বাহিনী এবং মদিনা থেকে আসা আরো কিছু সৈন্য নিয়ে শুরাহবিলের বাহিনীর সঙ্গে মিলিত হলেন। এরপর তারা সম্মিলিতভাবে হানিফা গোত্রের দিকে অগ্রসর হন। খালিদ (রা.) মদিনা ত্যাগ করার পর খলিফা আবু বকর (রা.) তার সাহায্যে সালিত বিন কায়েসের নেতৃত্বে আরো একটি শক্তিশালী সাহায্যকারী দল পাঠালেন। সব ইউনিট মিলিয়ে মুসলিম বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা সর্বোচ্চ ১২ হাজার (অন্য তথ্য মতে প্রায় ১০ হাজার) পৌঁছেছিল। খালিদ (রা.) যখন মদিনা থেকে হানিফা গোত্রের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন উত্তর দিক থেকে নবুয়তের আরেক মিথ্যা দাবিদার সাজাহ বিনতুল হারিস এক বিশাল বাহিনী নিয়ে হানিফা গোত্রের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। সাজাহর বাহিনী সবাই ছিল মুরতাদ এবং সংখ্যায় তারা প্রায় এক লাখের কাছাকাছি। আরবের ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে এই দুই ভণ্ড নবী—মুসাইলামা ও সাজাহ—একেবারে মুখোমুখি হয়ে পড়লেন। মুসাইলামা ভয় পাচ্ছিল; একদিকে খালিদ এবং অন্যদিকে সাজাহ—এই দুই শক্তির চাপে সে পিষ্ট হবে এবং শক্তি হারিয়ে পশ্চাৎপদ হবে।
তখন মুসাইলামা কূটনীতির আশ্রয় নিল। সে ৪০ অনুসারী নিয়ে সাজাহের তাঁবুতে গিয়ে বৈঠকে বসল। সেখানে তারা একে অন্যকে নিজেদের কথিত ‘ওহি’ শুনিয়ে মুগ্ধ করার অভিনয় করল। মুসাইলামা কিছু অশ্লীল ও হাস্যকর ছন্দ শুনিয়ে সাজাহকে আশ্বস্ত করল। সাজাহ মুসাইলামাকে শর্ত দিল, যদি ইয়ামামার অর্ধেক ফসল তাকে দেওয়া হয়, তাহলে সে লড়াই করা থেকে বিরত থাকবে। মুসাইলামা তার শর্ত মেনে নিল।
একপর্যায়ে তারা একে অন্যকে নবী হিসেবে স্বীকার করল এবং মুসাইলামা সাজাহকে বিয়ের প্রস্তাব দিল। সাজাহ সম্মত হলো। কিন্তু মোহরানা ছাড়া বিয়ে হওয়ায় সাজাহর গোত্রের লোকরা আপত্তি তুলল। তখন সাজাহর গোত্র বনি তাগলাবের মধ্যে মুসাইলামা ঘোষণা করল—‘তোমাদের নবী (মুসাইলামা) তোমাদের জন্য এশা এবং ফজরের নামাজ মাফ করে দিয়েছেন।’ এটিই ছিল মুসাইলামা ও সাজাহর বিবাহের ‘মোহরানা’।
তবে খালিদ ইবনে ওয়ালিদের আগমনের খবর এবং তার বীরত্বের কথা শুনে সাজাহ ভীত হয়ে পড়ল। সে মুসাইলামার কাছ থেকে ইয়ামামার অর্ধেক ফসলের প্রতিশ্রুতি নিয়ে নিজের গোত্রের কাছি ফিরে গেল। খলিফা উমরের শাসনামলে সাজাহ ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন বলে জানা যায়।
খালিদ (রা.)-এর রণকৌশল
খালিদ (রা.) ছিলেন দক্ষ ও প্রাজ্ঞ সমরনায়ক। তিনি গোয়েন্দা বাহিনীকে চারদিকে ছড়িয়ে দিলেন। পথিমধ্যে ৬০ জন বনু হানিফার যোদ্ধা মুসলিমদের ওপর হামলার উদ্দেশ্যে ওত পেতেছিল। খালিদের সৈন্যরা তাদের বন্দি করে নিয়ে এলো। তাদের জিজ্ঞেস করা হলো, ‘তোমরা কি মুসাইলামাকে নবী মানো’ তারা দম্ভভরে বলল, ‘হ্যাঁ, আমাদের নবী আর তোমাদের নবী আলাদা আলাদা।’
খালিদ (রা.) তাদের তাওবা করার সুযোগ দিলেন, কিন্তু তারা কুফরিতে অটল থাকল। খলিফার নির্দেশমতো একে একে সবাইকে হত্যা করা হলো। বাকি রইল মাত্র একজন। তাকে জীবিত রাখা হলো। সে ছিল হানিফা গোত্রের অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তি মুজায়াহ বিন মুরারা। খালিদ (রা.) তাকে শিকলবন্দি করে নিজের তাঁবুতে রাখার নির্দেশ দিলেন এবং তার স্ত্রী উম্মে তমিমকে তার খাবার ও পাহারার ব্যবস্থা করতে বললেন।
মুসলিম বাহিনীর বিন্যাস
খালিদ (রা.) অত্যন্ত নিপুণভাবে সৈন্যবাহিনী বিন্যাস করলেন।
অগ্রবর্তী ইউনিট : শুরাহবিল ইবনে হাসানা
ডান বাহু : জায়েদ ইবনে খাত্তাব
বাম বাহু : আবু হুজাইফা
আনসারদের পতাকাবাহী : সাবিত ইবনে কায়েস
মুহাজিরদের পতাকাবাহী : সালিম মাওলা আবু হুজাইফা
কেন্দ্রে : খালিদ ইবনে ওয়ালিদ নিজে
খালিদ ইবনে ওয়ালিদ মুহাজির এবং আনসারদের আলাদা আলাদা পতাকার নিচে সমবেত করলেন। শুরাহবিল যদিও একবার পরাজিত হয়েছিল, তবু খালিদ (রা.) তাকে অগ্রগামী ইউনিটের সেনাপতি বানালেন। কারণ, শুরাহবিলের সামরিক দক্ষতা ও বিচক্ষণতার প্রতি তার প্রবল আস্থা ছিল। সালিতের নেতৃত্বে আগত সাহায্যকারী বাহিনীকে তিনি সবার পেছনে রাখলেন। তারা সরাসরি কোনো যুদ্ধে লড়বে না। বরং রিজার্ভ বাহিনী হিসেবে যেখানে প্রয়োজন, সেখানে সাহায্য করবে। বাহিনী পরিচালনার সুবিধা ও স্বাভাবিক রীতি অনুযায়ী সেনাপতি বাহিনীর কেন্দ্রে অবস্থান নিলেন।
মুসাইলামার রণসজ্জা
মুসাইলামা কাজ্জাবের অধীনে ছিল অসংখ্য মজবুত দুর্গ। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় দুর্গটিকে বলা হতো ‘আল-হাদিকা’ (উদ্যান)। এই দুর্গের প্রাচীর ছিল অনেক উঁচু। তবে মুসাইলামার বিশাল বাহিনীর জন্য শুধু এই দুর্গটি যথেষ্ট ছিল না। তাই সে বাহিনী নিয়ে দুর্গের বাইরে বেরিয়ে এলো এবং ইয়ামামার অদূরে ‘আকরাবা’য় শিবির স্থাপন করল।
মুসাইলামার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা
মুসাইলামা বাহিনীকে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে সাজাল।
বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন মুহাম ইবনে তোফায়েল, নবুয়তের মিথ্যা দাবির শুরু থেকেই সে মুসাইলামার মন্ত্রী হিসেবে কাজ করছিলেন।
বাম বাহু : এই ইউনিটের নেতৃত্বে ছিলেন নাহারুর রিজাল।
কেন্দ্রে ও পশ্চাতে : মুসাইলামা নিজে অবস্থান নিলেন বাহিনীর একেবারে পেছনে। দুর্গের প্রধান ফটকের সামনে নিজের তাঁবু স্থাপন করলেন এবং যুদ্ধে কোনো বিপর্যয় দেখা দিলে পিঠ বাঁচিয়ে পারানের পত খোলা রাখলেন।
অন্যান্য দুর্গ : অন্য ছোট দুর্গগুলো নারী ও শিশুদের নিরাপত্তার জন্য রাখা হয়েছিল।
ইতিহাসের সন্ধিক্ষণ
খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.) বাহিনী নিয়ে শত্রু শিবিরের কাছাকাছি পৌঁছালেন। সেখানে শুরু হলো ইতিহাসের বিখ্যাত ‘ইয়ামামার যুদ্ধ’।
এই যুদ্ধ ছিল পৃথিবীর হাতে গোনা কয়েক যুদ্ধের একটি, যা মানব ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিয়েছিল।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

