এ বছর অমর একুশে বইমেলা দেরিতে শুরু হওয়ায় এবং পবিত্র রমজান মাস থাকায় পাঠকদের উপস্থিতি তুলনামূলক কম দেখা যাচ্ছে। এদিকে মেলায় বই কিনতে আসা পাঠকদের অভিযোগ, এবার বইমেলায় প্রকাশিত অধিকাংশ বইয়ের দাম অনেক বেশি। অথচ বইয়ের প্রচ্ছদ ও পৃষ্ঠাসজ্জা সুন্দর হলেও লেখা ও আধেয়ের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন তারা।
গতকাল বৃহস্পতিবার সরেজমিন বইমেলায় ঘুরে দেখা যায়, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে দল বেঁধে মেলায় আসেন শিক্ষার্থীরা। ছোট ছোট দল বেঁধে ঘুরতে দেখা যায় তাদের। অনেকে স্টল থেকে স্টলে ঘুরে দেখেন নতুন বই। কেউ বই কেনে আবার কেউ শুধু ছবি তোলেন। তবে ঘোরার আনন্দের মাঝেও অনেকের কণ্ঠে হতাশার সুর শোনা যায়।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বললে তারা অভিযোগ করেন, বইমেলায় অনেক বই থাকলেও মানসম্মত বইয়ের সংখ্যা তুলনামূলক কম। তাদের মতে, বইয়ের কোয়ালিটির তুলনায় দাম বেশি। কেউ কেউ বলেন, বইয়ের কভারটাই (প্রচ্ছদ) সুন্দর; কনটেন্ট নয়। অনেক বইয়ের ক্ষেত্রে কাগজ, সম্পাদনা কিংবা বিষয়বস্তুর মান নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন তারা।
রাজধানীর গুলশান থেকে প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটির ১০ থেকে ১২ জন শিক্ষার্থী গতকাল দল বেঁধে মেলায় আসেন। তাদের মধ্যে সানজিনা আক্তার নাজিফা জানান, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রতিবাদী কবিতার বইয়ের পাশাপাশি পছন্দ করেন থ্রিলার বই। আমি নানা ধরনের বই হাতে নিয়ে দেখলাম। বইয়ের দাম আসলে শিক্ষার্থী-বান্ধব নয়। আমরা ব্যক্তিগত খরচ থেকে বাঁচিয়ে যে বই কিনব, সেটা চড়া দামের কারণে আমরা পছন্দ হলেও সংগ্রহ করব কি না ভাবতে হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, কোয়ালিটির কথা যদি বলি, তাহলে বলবÑকনটেন্টের দিকে মনোযোগ না দিয়ে প্রকাশকরা মনোযোগ দিচ্ছেন কভারের দিকে, যা আসলেই অত্যন্ত বাজে বিষয়। কনটেন্ট কোয়ালিটি বাড়ানো উচিত। তাহলে আমাদের মতো পাঠকদের জন্য বই কেনা সহজ হবে।
এশিয়া প্যাসিফিক ও ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে একসঙ্গে আসেন সামিহা শারমিন প্রজ্ঞা, আকিবুল হৃদয় ও সুমাইয়া খন্দকার। হৃদয়ের অভিযোগ, মেলায় খুব একটা মানসম্মত বই আসছে না। নতুন লেখকদের মধ্যেও কোয়ালিটির ঘাটতি দেখছেন তিনি। তিনি বলেন, মেলায় এখন এমনিতেই পড়াশোনা করার পাঠক নেই; আছেন দর্শনার্থী।
সঙ্গে থাকা সুমাইয়া ও প্রজ্ঞা বলেন, তথ্যভিত্তিক কোনো বই নেই। আগের লেখাই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে লিখে লেখক হয়ে যেতে চায়। এছাড়া যা আছে বেশিরভাগ অনুবাদ বই। আর রোমান্টিক বইগুলোও ওরকম নেই। তাদের নিজস্ব কিছু স্মৃতি দিয়ে তারা বই লেখেন। আর একেকটা বই অনেক দাম। আমাদের জন্য বই কেনাও কঠিন। দেখা যায় অনেক বই খুঁজে তিন-চারটি পছন্দ করলাম কিন্তু দাম অনেক হাই।
রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট) থেকে আসেন ইফাজ আরমান তাহসীন। তার সঙ্গে ছিলেন তিন বন্ধু আরাফ খন্দকার রাহিন, রাকীবুল হাসান দীপ্ত ও আকিবুল হুদা। মেলার বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে প্রতিবেদকের সঙ্গে দেখা হয় তাদের। বই সম্পর্কে জানতে চাইলে তাহসীন বলেন, প্রতিবার মেলায় অনেক নতুন বই আসে। বইয়ের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু কোয়ালিটিফুল বইয়ের সংখ্যা কম। যেগুলো আসছে সেসব অনেক হাই প্রাইস, শিক্ষার্থীদের জন্য কেনা কঠিন।
তার সঙ্গে তাহসীন বলেন, কোয়ালিটিফুল বই না আসা, বইয়ের প্রচার না হওয়া, ফেব্রুয়ারির শুরুতে মেলা না হওয়া এবং রমজানে মেলা হওয়া সবকিছু মিলিয়ে এবারের বইমেলা জমেনি।
সাভার ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজ থেকে আসেন মুনতাসির ফুয়াদ, ইশা মনি, নুসরাত পারভেজ ঐশী ও ইফতি। ঐশী জানান, পাওয়ার অব থিংকিং একটা বই পছন্দ হয়েছে। কিন্তু বইয়ের দাম দেখার পর আর কিনিনি। টাকা ফুরিয়ে গেছে। আর দেখেও বেশি দাম মনে হলো।
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি) থেকে আসেন ১১ জন শিক্ষার্থীর একটি দল। রোহান জানান, আরিফ আজাদের বই পছন্দ করেন তিনি। তারও অভিযোগ, বইয়ের দাম বেশি। তিনি বলেন, কোনো বই কিনিনি কিন্তু হাতে নিয়ে কয়েকটি বই দেখলাম। স্টুডেন্ট হিসেবে বইগুলোর দাম একটু বেশি।
এছাড়া সোনারগাঁ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তানভীর রহমান, লাবিবা তাসনিমসহ আট শিক্ষার্থী একসঙ্গে দল বেঁধে আসেন। তেজগাঁও কলেজ থেকে আসেন ইয়াসিন আরাফাত রনি, ঐশী আক্তার, মিম আক্তার, তন্নী খাতুন, মো. জামান, মুমিনুল ইসলাম রাফসান ও মো. রাফসান। তারা কিনেছেন বিভিন্ন বই। এর মধ্যে রয়েছে ‘একা’, ‘লাভায় লালশাক পুবের আকাশ’সহ নানা প্রতিবাদী কবিতার বই।
বাংলাদেশ মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মুবতাসিম সাকিব, হাসিবুল সাকি, তানভীর হাসান তন্ময়, মাশরাফি নুরসহ একসঙ্গে আসেন ১৮ জন শিক্ষার্থী । আরো আসেন ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্সেস (ইউআইটিএস)-এর ১০ জন শিক্ষার্থী। তারাও বইয়ের দাম ও কনটেন্ট কোয়ালিটি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


হরমুজ প্রণালির কাছে আটকা প্রায় ১ হাজার জাহাজ