নারীর ক্ষমতায়নে বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ নিশ্চিতকরণসহ ১৬ দফা সুপারিশ

নারীর ক্ষমতায়নে বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ নিশ্চিতকরণসহ ১৬ দফা সুপারিশ

বাজেটে নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বর্তমান বাজারের প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন ভাতার পরিমাণ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন বিশিষ্টজনেরা। তারা নারীকে বৈষম্য ও নির্যাতন থেকে সুরক্ষা দেওয়ার লক্ষ্যে রাষ্ট্র কর্তৃক গৃহীত আইন, নীতি ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত বরাদ্দ নিশ্চিত করার জন্য ১৬ দফা সুপারিশও করেছেন।

বিজ্ঞাপন

বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মিলনায়তনে বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ (বিএনপিএস) আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এ আহ্বান জানান।

বক্তারা বলেন, বাজেটে বরাদ্দ বাড়লেও যে প্রক্রিয়ায় বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন হচ্ছে, তা নারী-পুরুষ সমতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যথেষ্ট সহায়ক হচ্ছে কি না, এ প্রশ্ন থেকেই যায়। সরকার জেন্ডারবান্ধব বাজেট করলেও বাস্তব অগ্রগতি নিয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো পর্যালোচনা বা সমীক্ষা পাওয়া যায় না। পর্যবেক্ষণের অভাবে বাজেটে বরাদ্দের কতটুকু নারীর জীবনের কোন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি বয়ে আনলো, সে বিষয়ে কোনো তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যায় না।

বক্তারা আরো বলেন, মূল প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, জেন্ডার বাজেট নারীর অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের সঙ্গে যুক্ত। বাজেটে সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ না থাকলে কোনো নীতিমালাই নারীর ক্ষমতায়ন প্রক্রিয়ায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না।

বৈঠকে সভা প্রধান ছিলেন আয়োজক সংগঠনের সহ সভাপতি ডা. মাখদুমা নার্গিস রত্না। এ সময় বিএনপিএস এর উপ-পরিচালক শাহনাজ সুমীর সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম, এ্যাকশন এইড বাংলাদেশ লিড-উইমেন রাইটস অ্যান্ড জেন্ডার ইকুইটি মরিয়মনেসা, জেন্ডার বাজেট ও প্ল্যানিং বিশেষজ্ঞ নিলুফার করীম, প্রাগ্রসর এর নির্বাহী পরিচালক ফৌজিয়া খন্দকার ইভা, আমরাই পারি পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোট (উই ক্যান) এর প্রধান নির্বাহী জিনাত আরা হক প্রমুখ। এর আগে, মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনোমিক মডেলিং (সানেম) এর উপ পরিচালক ইশরাত শারমীন। সুপারিশ তুলে ধরেন বিএনপিএস উপ পরিচালক নাসরীন বেগম।

১৬ দফা সুপারিশ হলো

বরাদ্দকৃত বাজেটের মাধ্যমে নারীর জীবনের কোন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে, সে বিষয়ক তথ্য-উপাত্ত আগামী অর্থবছরের জাতীয় বাজেট উপস্থাপনের সময় উত্থাপন করতে হবে; মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর বরাদ্দকৃত জেন্ডার বাজেটের কার্যক্রমগুলো কীভাবে সরাসরি নারীর ক্ষমতায়ন ও জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালার কর্মপরিকল্পনার সাথে সম্পর্কিত, তার অগ্রগতি সংক্রান্ত রিপোর্ট প্রতি বছর তৈরি ও জনসমক্ষে পেশ করতে হবে; নারীর ক্ষমতায়নের জন্য নেওয়া কৌশলগুলো কতটুকু জেন্ডার চাহিদা পূরণ করছে এবং এর অগ্রগতি কতটুকু, সে বিষয়ে সংখ্যাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের পাশাপাশি গুণগত বিশ্লেষণের পরিমাপক নির্ধারণ করতে হবে; প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের জেন্ডার বাজেট বিষয়ে ধারণাগত স্পষ্টতা এবং পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন বিষয়ে দক্ষতা বৃদ্ধির ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে; বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের জেন্ডার বাজেট ফোকাল পয়েন্টদের তথ্য মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে থাকতে হবে; লিড মন্ত্রণালয় হিসেবে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জেন্ডার বাজেট বিষয়ে ধারণাগত এবং মনিটরিং দক্ষতা বাড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে; সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের জেন্ডার ও জেন্ডার বাজেট বিষয়ক প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হবে এবং জেন্ডার সংবেদনশীল পরিবেশ নিশ্চিত করে তাদের সেবাদানের দক্ষতাকে বার্ষিক কর্মমূল্যায়নের সাথে যুক্ত করতে হবে; নারীর জন্য জামানতমুক্ত ঋণ সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি উত্তরাধিকার আইনে পরিবর্তন আনতে হবে।

এছাড়া, সহিংসতার শিকার নারীদের জন্য সেবা বাড়ানো, বিশেষ করে আইনি সহায়তা প্রদান, শেল্টার হোম তৈরি করা এবং সেখানে রেখে তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণসহ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে; জেন্ডার বাজেট বিষয়ক গবেষণার উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষ করে বিআইডিএসসহ গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে জেন্ডার বাজেট বিশ্লেষণের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য উৎসাহিত করা যেতে পারে; নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রান্তিকতা, নারীর চাহিদা, বর্তমান বাজার বিবেচনায় উপবৃত্তি, বয়স্ক ভাতা, বিধাব ভাতার পরিমাণ বাড়াতে হবে; কৃষক নারীদের ‘কৃষক’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানসহ তাদের সহজ শর্তে ঋণ প্রদানে ব্যবস্থা থাকতে হবে; সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের জেন্ডার সংবেদনশীলতা বাড়াতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ও লোকবল বাড়াতে হবে; সোশ্যাল মিডিয়াসহ বিভিন্ন মাধ্যমে নারীবিদ্বেষী ঘৃণ্য বক্তব্য প্রচার বন্ধে বাজেটে বরাদ্দ রাখতে হবে; প্রান্তিক নারীদের উপার্জনমূলক কাজে যুক্ত করার জন্য কর্মসূচি গ্রহণ করতে বাজেটে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ রাখতে হবে এবং নারীর বৈষম্য ও নির্যাতন থেকে সুরক্ষা দেওয়ার লক্ষ্যে রাষ্ট্র কর্তৃক গৃহীত আইন, নীতি ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন