আগুন লাগছে তো শত শত মাইলজুড়ে, দাবানল শেষ হয় না। বৃষ্টি হচ্ছে তো লাগাতার, বর্ষণে জনপদ তলিয়ে যাচ্ছে। ঘন ঘন ভূমিকম্প এখন পৃথিবীজুড়েই। তাপমাত্রা বাড়ছে লাগামহীন। এবার নেপালে পাহাড়ি ঢলে নতুন ভয়ংকর রূপ দেখলাম।
হিমালয়ের হিমবাহ পিছলে গলে নূহের প্লাবনের মতো উপত্যকাগুলোকে সগর্জনে ভাসিয়ে নিয়ে গেল। ঢলের পানিতে বরফ, পাথর, কাদা নেপাল ও তিব্বতের ঘরবাড়ি, বাঁধ, বিদ্যুৎকেন্দ্র চুরমার করে দিয়েছে। প্রশ্ন হলোÑ২০২৬-এ প্রকৃতি কেন এমন মারমুখী? মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথের ‘বিসর্জন’ নাটকের ওই সংলাপ—‘এ জগৎ মহাহত্যাশালা। জানো না কি, প্রত্যেক পলকপাতে লক্ষ কোটি প্রাণী চির আঁখি মুদিতেছে। সে কাহার খেলা?’
দুদিন আগে জাতিসংঘের তরফে ঘোষিত হয়েছে, এল নিনো এবার চরম আঘাত হানবে। দুনিয়াজুড়েই চলবে ভয়াবহ ঝড়, বন্যা ও খরা। অর্থনীতিতে পড়বে তীব্র অভিঘাত। চলতে পারে ২০২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। স্প্যানিশ ভাষায় ‘এল নিনো’র অর্থ ছোট বালক। পেরুর জেলেরা ক্রিসমাসের কাছাকাছি সময়ে সামুদ্রিক পরিবর্তন দেখে এর নাম দিয়েছিল। এমন সময়ে প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব ও মধ্য অঞ্চলে সমুদ্রের পানি অস্বাভাবিক গরম হয়ে ওঠে। এ মুহূর্তে সমুদ্রের পানির উত্তাপ দুই ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। নভেম্বরে তা চার ডিগ্রিতে উঠতে পারে। এতে করে ভূসংলগ্ন বায়ু হালকা হয়ে ওপরে উঠে যায়। ফলে ভারী বৃষ্টি, সাইক্লোন দেখা যায়। আবার খরাও হয়। দক্ষিণ গোলার্ধে পুবালি বায়ু বদলে যায়। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে খরা, বন্যা, বৃষ্টি হয়। বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, অ্যান্টার্কটিকার হিমবাহগুলো দ্রুত গলতে থাকায় সেখানকার সমুদ্রে তিমি মাছেরা আনাগোনা শুরু করেছে।
আমরা প্রকৃতির এমন মারণঘাতী আচরণের কারণ খুঁজি জলবায়ুর ক্রমউত্তাপ, কার্বন নিঃসরণের ভয়াবহ বিস্তৃতি বা নদীশাসনের দুর্মর আকাঙ্ক্ষায়। কিন্তু শুধুই কি তাই? মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহতায়ালার সায় ছাড়া জগতের কোনো বৃক্ষের পাতা নড়ে না—এ সত্যে স্থিত হলে আমরা জেনে নেওয়ার চেষ্টা করি না কেন—এক ও অদ্বিতীয় সৃষ্টিকর্তা রেগে গেছেন কি না?
এই বিশ্বজুড়েই অস্বাভাবিক বৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশেও গত জুলাইয়ে চট্টগ্রামে একদিনে ৪১২ দশমিক ৩ মিলিমিটার (মিমি) বৃষ্টি হয়েছে, যা ৪২ বছরের মধ্যে একদিনের সর্বোচ্চ রেকর্ড। বন্যা ও জলাবদ্ধতায় চট্টগ্রাম জেলা স্থবির হয়ে পড়েছিল। ভারতে আসাম, মুম্বাই, ফিলিপাইন, পশ্চিম আফ্রিকা, চীন—সর্বত্র।
বিবিসি ওয়ার্ল্ড টিভিতে ‘ক্লাইমেট কোশ্চেন’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে এক বিশেষজ্ঞ বলছিলেন, মেঘগুলোতে এত পানি—মনে হয় পানির শহর। বৃষ্টি যেন থামতেই চায় না।
বিপরীতে, ক্রমবর্ধিষ্ণু তাপমাত্রার কথা ধরুন। ইউরোপ ও আমেরিকায় এবার গ্রীষ্মে ঘটছে তাপমাত্রার সর্বোচ্চ রেকর্ড। মানুষ হাঁসফাঁস করছে। বৃষ্টির দেখা নেই। তার ওপর বনের দাবানল। বিজ্ঞানীদের হিসাবে, এ বছর বিশ্বে দাবানলে ১১২ থেকে ১৫০ মিলিয়ন হেক্টর বনাঞ্চল পুড়ে গেছে। আফ্রিকা, ইউরোপ ও আমেরিকায় এবার ভয়াবহ দাবানল দেখেছি। কোনো কোনো পশ্চিমা বিশেষজ্ঞ একে বলছেন ‘Fire Weather’। দোজখের আগুনের সামান্য নমুনা কি আমরা দুনিয়াতেই দেখছি?
পবিত্র কোরআনের সুরা আল-ওয়াকিয়াহতে আভাস দেওয়া হয়েছে যে, দোজখে থাকবে উষ্ণ বায়ু ও উত্তপ্ত পানি আর কালো বর্ণের ধোঁয়া। এই পবিত্র গ্রন্থে আরো বলা হয়েছে, সবুজ বৃক্ষ থেকে আগুনের সূত্রপাত। গাছে গাছে ঘষা লেগে আগুন তৈরি হয়। আগে আরব দেশে মারুখ ও ইফার নামে দুই ধরনের গাছ ছিল। এ দুটির সবুজ শাখা পরস্পর সংযুক্ত করলে আগুন উৎপন্ন হতো। এ বছর স্পেন ও ফ্রান্সে এক দাবানলেই তিন লাখ মানুষকে বাস্তুচ্যুত হতে হয়েছে। ইউরোপের নদীগুলোয় পানি কমে যাওয়ায় অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
ভূমিকম্পের প্রসঙ্গ এলেও কপালে ভাঁজ পড়ে। ২০২৬-এ বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের জিওলজিক্যাল সার্ভের হিসাবমতে ৯ হাজার ৬৪৬টি ভূমিকম্প হয়েছে (৪ থেকে ৯ রিখটার স্কেলে), যাতে ৭ হাজার ১৩৭ জনের লাশ পাওয়া যায়। ভেনেজুয়েলা, কলম্বিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, জাপান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, মেক্সিকো ভূমিকম্পের শিকার হয়েছে। বাংলাদেশেও কয়েকবার ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, এসবের উৎপত্তিস্থল আসাম বা মিয়ানমার নয়, খোদ ঢাকার কাছে নরসিংদী এলাকায়।
সবচেয়ে আলোচিত হলো নেপাল-তিব্বতের সাম্প্রতিক ভয়াবহ দুর্যোগটি। বৃষ্টি নেই, বাদল নেই, উজ্জ্বল দিনেই অকস্মাৎ নেমে এলো ত্রিশূলী নদীতে ভয়াবহ পাহাড়ি ঢল। কৈলাস মানস সরোবর, তীর্থযাত্রার অন্যতম প্রবেশপথ ‘রাসুয়াগড়ি-তিমুর’—এই মুখে আঘাত হানে এই ঢল। চীনের তিব্বতগামী কৈলাস মানস সরোবরে যাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন শত শত তীর্থযাত্রী। তিব্বতি পঞ্জিকা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি ‘ইয়ার অব দ্য হর্স’ শুরু হওয়ায় এবার তীর্থযাত্রার চাহিদা ছিল ব্যাপক। শনিবার ৬০ বছর বয়সি এক চীনা মহিলাকে, সম্ভবত তীর্থযাত্রী, ১০ দিন পর উদ্ধার করা হয়েছে।
স্থানীয় ধর্মবিশ্বাস মতে, এ বছর একবার কৈলাস পর্বত প্রদক্ষিণ করলে ১২-১৩ বছরের সমান পুণ্য পাওয়া যায়। গত বছর বেইজিং-নয়াদিল্লি সমঝোতায় ভারতীয়রা কৈলাসে যেতে নেপালের এ রুটকেই বেছে নেয়। নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ৪২টি পাহাড়ি হ্রদ। হিমবাহগুলো অধিক উষ্ণতায় গলে বন্যা ক্রমাগত নামতে পারে।
প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ও বিজ্ঞানী আল-বেরুনি পর্যবেক্ষণ দিয়েছিলেন যে, বঙ্গ-পাক-ভারত উপমহাদেশ (হিমালয়সহ) সম্ভবত সমুদ্রের নিচ থেকে কোনো এক ভূমিকম্পে ভূপৃষ্ঠে উঠে এসেছে। উপমহাদেশের ঝরনাগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রে পাথর বয়ে নিয়ে চলে। সমুদ্রের গভীরে নিচের প্রবাহগুলো পাথর বয়ে নিয়ে চলে বলেই তিনি ওই অভিমত দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের জাফলংয়ে বরফবাহী পানির স্রোত দেখা যায়।
নেপালে প্রকৃতির এই ধ্বংসযজ্ঞ বাংলাদেশের মানুষকে যারপরনাই ব্যথিত করেছে। নেপাল বাংলাদেশের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ও বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশী। সম্পর্কটা জনগণকেন্দ্রিক। বাংলাদেশের মানুষ সবসময়ই নেপালে ওয়েলকাম। দেশটি আজ সর্বগ্রাসী এ সংকটে। কিন্তু দুঃখজনক যে, বাংলাদেশের মিডিয়া কতজন সাংবাদিক সেখানে পাঠিয়েছে? বাংলাদেশও কিন্তু পৃথিবীজুড়ে ঘটমান বিপদ থেকে মুক্ত নয়। অতিবৃষ্টি, বন্যা, খরা, ভূমিকম্প চলছে। আমরা মোকাবিলার নানা উপায় ধারণ করছি, আরো করব। কিন্তু এর মূল কারণ খুঁজতে হবে সৃষ্টিকর্তার কাছে।
ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, এই বিশ্বচরাচরে যা কিছু বিদ্যমান আছে বা হচ্ছে অথবা ভবিষ্যতে হবে, এগুলোকে সৃষ্টি করা, স্থায়ী রাখা বা পরিবর্তন করা এবং মানুষের বিভিন্ন উপকারে নিয়োজিত করা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহতায়ালার শক্তি ও রহস্যের লীলাখেলা। আল্লাহ এ জগৎকে পরীক্ষাগার করেছেন। তাই এখানে যা কিছু অস্তিত্ব ও বিকাশ লাভ করে, সব কারণাদির অন্তরালে বিকাশপ্রাপ্ত হয়।
বিজ্ঞান, যুক্তি ও বুদ্ধি ছাড়া আল্লাহ কিছু করেন না। আল্লাহর স্বীয় অপার শক্তি ও রহস্যের বলে কারণাদি এবং ঘটনাবলির সঙ্গে ঘটনা অস্তিত্ব লাভ করে। এই যে, হিমবাহ হঠাৎ পিছলে গেছে, বনে বনে আগুন লাগা বা ভূমিকম্প কোথায় কখন হবে, তার পূর্বাভাস প্রযুক্তি বোধ হয় এখনো মানুষ আয়ত্ত করতে পারেনি।
বাহ্যদর্শী মানুষ শুধু কারণাদির বেড়াজালে আটকে যায়। যবনিকার অন্তরাল থেকে যে আসল শক্তি কারণ ও ঘটনাবলিকে সক্রিয় করে, তাতে মানুষের দৃষ্টি যায় না। যারা ধর্মে বিশ্বাসী নয়, প্রকৃতির সৃষ্টিকর্তাকে স্বীকার করতে চায় না, তারাও বলে বিজ্ঞান যাকে হাইপোথিসিস বলে, তাই দিয়ে সাধনা। যুক্তিসংগতভাবে শুরু করে একটা বৃহৎ সমগ্র সত্যের সন্ধান। এ সাধনায় ব্রতী হতে হয় গভীরতর চৈতন্য দিয়ে। চৈতন্য মানেই সৃষ্টিকর্তার অপরিসীম কর্তৃত্বের রাজ্যে প্রবেশ।
আসুন, আমরা মনোযোগী হই পরম করুণাময়ের প্রতি, তার রহমত অর্জনে ব্রতী হই। বর্তমান বিশ্বের শক্তিধররা চরম বাড়াবাড়ি করছে, যা বরাবরই আল্লাহর অপছন্দ। সুরা আরাফের ৩৩ আয়াতে তিনি বলেছেন, ‘হে নবী বল, আমার প্রতিপালক কেবল হারাম করেছেন প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য অশ্লীলতা, পাপকাজ, অন্যায় বাড়াবাড়ি, আল্লাহর সঙ্গে শরিক করা, যার সম্পর্কে তিনি কোনো প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি এবং আল্লাহ সম্পর্কে এমন কিছু বলা, যা তোমরা জান না।’
লেখক: জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

