রাষ্ট্র শুধু আইন-শৃঙ্খলার রক্ষক নয়; এটি একই সঙ্গে একটি নৈতিক প্রকল্প, যা বলে দেয়—কে ‘ভালো’, কে ‘খারাপ’, কে ‘নাগরিক’, আর কে ‘অপর’। যখন রাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট ভাবাদর্শের নামে সমাজকে একরৈখিক করতে চায়, তখন তা হয়ে ওঠে একটি ফ্যাসিবাদী প্রকল্প। বাংলাদেশের বিগত সময়, বিশেষ করে আওয়ামী লীগ-শাসিত সময়কে আমরা এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখতে পাই, কীভাবে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ ও ‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ’ এই বাইনারি কাঠামোর মাধ্যমে একটি সুপরিকল্পিত দানবায়ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদী কাঠামো নির্মিত হয়েছে, যা সমাজের ভেতরকার মানবিক সম্পর্কের স্বাভাবিকতাকেও বিপর্যস্ত করেছে।
ফ্যাসিবাদ : শুধু রাজনৈতিক শাসন নয়, একটি সাংস্কৃতিক প্রকল্প
সমাজবিজ্ঞানী আর্নেস্টো লাখলাউ ও শ্যান্টাল মুফ ‘হেজেমনিক প্রজেক্ট’ ধারণার মাধ্যমে দেখিয়েছেন, কীভাবে একটি রাজনৈতিক শক্তি কেবল রাষ্ট্রযন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক পরিসর দখল করে ফেলে। বাংলাদেশে ‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ’ নামক বয়ানটি হয়ে উঠেছিল একটি সর্বগ্রাসী হেজেমনিক কাঠামো, যার মধ্যে সব ভিন্নমতকে ‘বিপক্ষ’ হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটি ছিল গ্রামশিয়ান অর্থে সাংস্কৃতিক হেজেমনির এক নিখুঁত উদাহরণ, যেখানে রাষ্ট্র শুধু অস্ত্রের মাধ্যমে নয়, বরং ভাষার মাধ্যমে বিরুদ্ধ মতকে নির্মূল করার ব্যবস্থা নেয়।
এই ভাষার রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু ছিল ‘আমরা’ ও ‘তারা’ এই কল্পিত দ্বন্দ্ব। এই ‘আমরা’ মানেই মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র দাবিদার, ক্ষমতার অধিকারী এবং রাজনৈতিক-নৈতিক বৈধতার প্রতীক; অন্যদিকে ‘তারা’ মানে স্বাধীনতাবিরোধী, ধর্মান্ধ, মৌলবাদী ও শত্রু। এই ডিকটোমির মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র একটি ‘জাতি’ গড়ে তুলতে চায়; কিন্তু সেটি বহুত্ববাদী নয়, বরং একক—এক রক্ত, ভাষা ও রাজনৈতিক আনুগত্যে গাঁথা কল্পিত জাতি।
দানবায়ন ও ট্যাগিং : সমাজতাত্ত্বিক সহিংসতার নতুন ভাষা
জার্মান সমাজতাত্ত্বিক হান্না অ্যারেন্ট ফ্যাসিবাদের গঠন ও গণহত্যার পূর্বশর্ত হিসেবে যে ‘ব্যানালিটি অব ইভিল’ ধারণার কথা বলেন, তা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশে যখন ‘শিবির সন্দেহে পিটিয়ে মারা’ সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে, তখন তা কেবল রাষ্ট্রীয় সহিংসতার ফল নয়, বরং সমাজের মধ্যেই একধরনের নৈতিক হীনতা বা সহিংসতার স্বাভাবিকীকরণ কাজ করে।
এই সহিংসতা গড়ে ওঠে দানবায়নের (demonization) মাধ্যমে। যারা ইসলামপন্থি, তাদের হিজাব, টুপি, দাঁড়ি, মাদরাসা শিক্ষা—এসবকেই প্রতীকীভাবে ‘অপর’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এভাবেই একটি গোষ্ঠীকে মানুষের চেয়ে কম কিছুর রূপে কল্পনা করা হয়। ফলে তাদের ওপর সহিংসতা প্রয়োগ করা কেবল বৈধ নয়, বরং ‘দেশপ্রেম’-এর অংশ হয়ে দাঁড়ায়।
এই দানবায়নের পাশাপাশি চলে ‘ট্যাগিং’। সমাজতত্ত্বে পরিচিতি রাজনীতির (politics of identification) একটি বিপরীতধর্মী কৌশল এই ট্যাগিং। এখানে কোনো ব্যক্তির আসল অবস্থান বা চিন্তা নয়, বরং তার ওপর আরোপিত পরিচয়ই হয়ে ওঠে তার সামাজিক ভাগ্যনির্ধারক। এই ট্যাগ—‘জামায়াত-শিবির’, ‘রাজাকার’, ‘শাহবাগি’ ও ‘হাইব্রিড’ শুধু একেকটি শব্দ নয়, বরং একেকটি সামাজিক মৃত্যুদণ্ড। এগুলো দিয়ে মূলত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নির্মূলের কাজটা সমাজের হাতে তুলে দেওয়া হয়। ফলে রাষ্ট্র নিজে সরাসরি নৃশংস না হয়ে সমাজকেই একেকটা নিধনযন্ত্রে পরিণত করে।
আত্মসেন্সরশিপ ও আন্তঃসম্পর্কের ভাঙন
ফরাসি সমাজতাত্ত্বিক পিয়েরে বোর্দিয়োর ‘symbolic violence’ ধারণা আমাদের বোঝাতে সাহায্য করে, কীভাবে সহিংসতা সবসময় অস্ত্র বা জেলখানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়—কখনো কখনো তা হয় ভাষাগত, সাংস্কৃতিক ও আত্মিক। বাংলাদেশে বামপন্থি বা প্রগতিশীল শিক্ষক-চিন্তাবিদদের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে, তারা ছাত্রদের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে নিজের সঙ্গে কাজ করতে নিষেধ করেছেন। কারণ একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অবস্থানের ছায়া থাকলেই চাকরি, স্কলারশিপ, ভিসা এমনকি সামাজিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এই ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করে এক ধরনের ‘আত্মসেন্সরশিপ’—কেউ কথা বলেন না, কেউ লেখেন না, কেউ কাউকে আমন্ত্রণ জানাতে সাহস পান না। ব্যক্তিগত সম্পর্কও হয়ে ওঠে রাজনৈতিকভাবে বিপজ্জনক। আর এভাবেই সমাজে গড়ে ওঠে সম্পর্কের শূন্যতা—যেখানে পারস্পরিক আস্থা, সহযোগিতা ও সহাবস্থান প্রতিস্থাপিত হয় সন্দেহ, চুপচাপ সরে যাওয়া এবং নিরাপত্তাবোধ হারানোর মধ্য দিয়ে।
নাগরিকত্বের সংকট ও ‘অপরায়নের’ কৌশল
সাংবাদিক ও তাত্ত্বিক আচার্য পার্থ চ্যাটার্জি তার ‘The Politics of the Governed’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, কীভাবে আধুনিক রাষ্ট্র সাধারণ নাগরিকদের পূর্ণাঙ্গ ‘নাগরিক’ না ভেবে ‘জনতা’ হিসেবে শাসন করে, যারা কেবল উপযুক্ত আচরণ করলেই রাষ্ট্রীয় সেবার দাবিদার হয়। বাংলাদেশেও ফ্যাসিবাদী শাসনে ‘সাচ্চা বাঙালি’ বা ‘সাচ্চা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান’ হওয়ার একমাত্র শর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছিল নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বয়ানে বিশ্বাস। এর বাইরে যারা, তারা ‘আধা-নাগরিক’ বা রাষ্ট্রবিহীন—যারা অধিকার চাইলেই সন্দেহের চোখে পড়েন।
এভাবেই নাগরিকত্ব হয়ে ওঠে একচেটিয়া, বিভাজনমূলক ও শর্তাধীন। এই নাগরিকত্বের কল্পনায় হিন্দু, নাস্তিক, ইসলামপন্থি, বা প্রবাসী কণ্ঠ—সবাই হয়ে পড়ে ‘অন্য’। অথচ সত্যিকারের গণতন্ত্র বা মুক্তির রাজনীতি তখনই সম্ভব, যখন নাগরিকত্ব হয় সর্বজনীন, বহুত্ববাদী ও শর্তহীন।
পোস্ট-রেভলুশনারি বাংলাদেশে নাগরিক বন্ধনের নতুন কল্পনা
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান আমাদের একটি সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছিল। সেখানকার রাস্তায় কোনো দলীয় পতাকা ছিল না, ছিল না পূর্বনির্ধারিত নেতা; ছিল কেবল একটাই পরিচয়—‘নাগরিক’। এই নাগরিকত্ব ছিল চেতনায়, অধিকারচেতনায়, বাঁচার ইচ্ছায়, স্বাধীন মত প্রকাশের স্পৃহায়।
কিন্তু বিপ্লব কোনোদিনই শুধু সরকারের পতনে শেষ হয় না। প্রকৃত বিপ্লব তখনই ঘটে, যখন মানুষের মাঝে সম্পর্কের বিনির্মাণ ঘটে। যখন ভিন্ন মত, ভিন্ন ধর্ম, ভিন্ন পোশাক, ভিন্ন রাজনীতিকে শত্রু নয়, বরং বৈচিত্র্য হিসেবে গ্রহণ করা যায়। যখন আমরা মানুষকে ‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ’, ‘ডান-বাম’, ‘আস্তিক-নাস্তিক’ হিসেবে নয়, বরং সমানাধিকারভিত্তিক নাগরিক হিসেবে দেখতে শিখি—তবেই ফ্যাসিবাদী সংস্কৃতির অবসান ঘটবে।
সম্পর্কের রাজনীতি ও মুক্তির পথ
ফরাসি তাত্ত্বিক মিশেল ফুকো বলেছিলেন, ‘Power is everywhere, because it comes from everywhere.’ রাষ্ট্রের ক্ষমতা শুধু সেনাবাহিনী বা পুলিশ নয়, বরং সম্পর্ক, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও প্রতিদিনের জীবনের মধ্য দিয়েই কাজ করে। ফ্যাসিবাদ ঠিক এখানেই—এটি শুধু রাজনৈতিক নয়, এটি সামাজিক, মানসিক ও নৈতিক প্রকল্প।
বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ রাজনৈতিক বিরোধীদের নিশ্চিহ্ন করেছে, কিন্তু তার চেয়েও ভয়ানকভাবে নিশ্চিহ্ন করেছে মানুষের মধ্যকার বিশ্বাস, সহানুভূতি ও সহযোগিতার সম্পর্ককে। সেই সম্পর্কের পুনর্গঠনই এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ। আর এই কাজ শুরু হবে, যদি আমরা ট্যাগিংয়ের রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করি, পারস্পরিক শ্রদ্ধার জায়গা তৈরি করি এবং নাগরিক বন্ধনের এক নতুন কল্পনা নির্মাণ করি।
নতুন বাংলাদেশ তখনই অর্থবহ হবে, যখন রাষ্ট্র ও সমাজ একযোগে নাগরিকত্বকে নির্দিষ্ট পরিচয়ের চেয়ে বড় হিসেবে কল্পনা করতে পারবে। অন্যথায় পুরোনো ফ্যাসিবাদ নতুন রূপে ফিরে আসবে—আর আমরা আবার হারিয়ে ফেলব সম্পর্কের সবচেয়ে মানবিক দিকগুলো।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

