ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা হতবাক করেছে বিশ্বকে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার এ ধরনের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী আচরণের নগ্ন রূপ আবারও বিশ্বের সামনে তুলে ধরলেন। এর আগেও যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশে এ ধরনের নগ্ন হস্তক্ষেপ করে নিজেদের কথিত আইনের শাসনভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
সামরিক অভিযানে আটকের পর প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে হাতকড়া পরিহিত অবস্থায় নিউইয়র্কে হাঁটিয়ে নিয়ে যেতে দেখা যায়। একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের প্রেসিডেন্টকে কিডন্যাপ করে এভাবে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়াটা বিশ্বের সব স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের শাসকদের জন্যই মর্যাদাহানিকর ও অবমাননাকর। আমেরিকা যে সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী রাষ্ট্র, তা ভেনেজুয়েলার ঘটনায় আবারও প্রমাণিত হলো। ট্রাম্প এখন ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট এবং কলম্বিয়া, কিউবা, মেক্সিকো ও ইরানের শাসকদেরও হুমকি দিয়ে বলছেন, তার কথা না শুনলে মাদুরোর চেয়েও করুণ পরিণতি হবে তাদের। ট্রাম্পের এই হুমকি থেকে এটা স্পষ্ট, তিনি যতদিন ক্ষমতায় আছেন ততদিন বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতাকারী ছোট ও মাঝারি দেশগুলোর শাসকদের কোনো নিরাপত্তা নেই।
ক্যারিবিয়ান সাগর এবং পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে মাদক পরিবহন করার সন্দেহে বেশ কিছু ছোট ও মাঝারি আকারের নৌযানে মার্কিন বাহিনী বারবার মারাত্মক হামলা করে বেশ কিছু লোককে হত্যা করেছে। এসব অভিযানের পরই মাদুরোকে গ্রেপ্তার করার মূল অভিযানে নেমেছে মার্কিন বাহিনী। ওয়াশিংটনের দাবি, মাদুরো মাদক চোরাচালানকারীদের মদত দিচ্ছেন। মাদুরোকে তার বাসভবন থেকে ধরে আনার ঘটনা এর আগে পানামার ম্যানুয়েল নোরিয়েগাকে শক্তি প্রয়োগ করে তুলে আনা এবং ইরাকে আগ্রাসন চালিয়ে গণহত্যা চালানো ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পর সাদ্দাম হোসেনকে বন্দি করার কথাই মনে করিয়ে দেয়।
যুক্তরাষ্ট্র ১৯৮৯ সালে পানামা আক্রমণ করে এবং সামরিক নেতা ও কার্যত শাসক ম্যানুয়েল নোরিয়েগাকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়ার পর তার বিচার করে ২০১০ সাল পর্যন্ত তাকে কারাগারে রাখা হয়। তারপর তাকে আরেকটি অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি করার জন্য ফ্রান্সের কাছে প্রত্যর্পণ করা হয়। এর এক বছর পর ফ্রান্স তাকে পানামায় ফেরত পাঠায়। ২০১৭ সালে পানামার কারাগারে নোরিয়েগা মারা যান।
গণবিধ্বংসী অস্ত্র থাকার মিথ্যা অভিযোগ তুলে ২০০৩ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বাহিনী ইরাক আক্রমণ ও দখল করে। এর ৯ মাস পর ওই বছরের ১৩ ডিসেম্বর সাদ্দাম হোসেন মার্কিন বাহিনীর হাতে বন্দি হন। পরে ইরাকের আদালতে তার বিচার করে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে তাকে হত্যা করা হয়।
২০২২ সালের জানুয়ারি মাসে হন্ডুরাসের প্রেসিডেন্ট হার্নান্দেজ পদত্যাগ করেন। এরপর ফেব্রুয়ারিতে মাদক পাচারের অভিযোগে একইভাবে তার বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পরে তাকে বিচারে ৪৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। এসব ঘটনা সম্পর্কে বিশ্লেষকরা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের তুলে নেওয়ার এসব ঘটনা একটি ‘ভণ্ডামিপূর্ণ পদ্ধতি’।
ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতা নেওয়ার পর থেকেই মাদুরোকে তার প্রধান নিশানা বানান। তিনি মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক পাচার এবং যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ অভিবাসী পাঠানোর মতো অস্থিতিশীল কর্মকাণ্ডের অভিযোগ তোলেন। গত জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্র মাদুরোকে বিশ্বের অন্যতম বড় মাদক পাচারকারী হিসেবে অভিযুক্ত করে তার মাথার দাম পাঁচ কোটি ডলার ঘোষণা করে।
হুগো চাভেজ ১৯৯৯ সালে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হতে থাকে। সমাজতান্ত্রিক ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চাভেজ আফগানিস্তান ও ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের বিরোধিতা এবং কিউবা ও ইরানের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে যুক্তরাষ্ট্রকে ক্ষুব্ধ করেছিলেন। ২০০২ সালে তার বিরুদ্ধে এক অভ্যুত্থান চেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্রের মদত ছিল বলে তিনি অভিযোগ করেন।
মাদুরো ২০১৩ সাল থেকে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট। চাভেজের আমলে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। মাদুরোর শাসনকালকে স্বৈরতান্ত্রিক হিসেবে দেখা হয়। সাম্প্রতিক মাসগুলোয় ট্রাম্প বারবার মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার ডাক দিয়েছেন। যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাম্পের দেওয়া অনেক অভিযোগেরই যথেষ্ট প্রমাণ নেই। তবু আমেরিকার দুঃসাহসিক অভিযান সবাইকে অবাক করে দিয়েছে। ভেনেজুয়েলা কর্তৃপক্ষ এই অতর্কিত হামলার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না।
ভেনেজুয়েলার সামনের দিনগুলো অনিশ্চিত। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্কিন ‘আগ্রাসন’ প্রতিরোধের শপথ নিয়েছেন এবং একে ‘স্বাধীনতার লড়াই’ বলে অভিহিত করেছেন। মাদুরোর গোয়েন্দা সংস্থা ও দেশের সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্ব এবং প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের লোকগুলোকে আমেরিকা ম্যানেজ করেই এই অভিযান চালিয়েছে। দেশটির বিপুল তেলসম্পদ কুক্ষিগত করার জন্যই যে এই আগ্রাসন চালানো হয়েছে, তা ট্রাম্পের বক্তব্যে এরই মধ্যে স্পষ্ট হয়েছে।
গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের ফেরিওয়ালা আমেরিকা এবং তার পশ্চিমা মিত্ররা জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক রীতিনীতির তোয়াক্কা না করে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিল করে আসছে অনেক আগে থেকেই। এর সর্বশেষ নজির হলো ভেনেজুয়েলা। এরপর কোন রাষ্ট্রকে তারা টার্গেট করবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে মেক্সিকো, কলম্বিয়া, কিউবা ও ইরানের মধ্যে যেকোনো একটি হতে পারে।
এটা বলার অপেক্ষা রাখে না, আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদ তথা আধিপত্যবাদ গোটা বিশ্বকে কোণঠাসা করে রেখেছে। তারা সবচেয়ে বড় লুটেরা ও দস্যু। তারা শুধু জানে কীভাবে অন্যের সম্পদ খোড়া অজুহাতে লুণ্ঠন করা যায়। তবে ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের এই দস্যুপনার বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে।
দুই বছর ধরে ক্ষুদ্র ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রের মদতে ফিলিস্তিনে গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তাকে রুখে দেওয়ার মতো কেউ বিশ্বে নেই। আরব বিশ্বেরও কয়েকটি রাষ্ট্র এই গণহত্যায় সমর্থন দিয়েছে, কারণ তারা চায় হামাসকে ধ্বংস করতে।
বিশ্ব আজ যুক্তরাষ্ট্রের নতুন রূপের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের মুখে পড়েছে। ট্রাম্প বিশ্বে যুদ্ধ বন্ধ ও শান্তি স্থাপনের কথা বলে এখন বিশ্বকে নতুন করে অনিশ্চয়তা ও অস্থিতিশীলতার মুখে ফেলছেন। আমরা ভেনেজুয়েলায় আমেরিকার আগ্রাসনের তীব্র নিন্দা জানাই এবং মাদুরো ও তার স্ত্রীর অবিলম্বে মুক্তি চাই। মার্কিনসহ সব সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে জোরালো আওয়াজ তুলতে হবে বিশ্বের সব অঞ্চল থেকে। গড়ে তুলতে হবে প্রতিরোধ।
লেখক : শিক্ষাবিদ, গবেষক ও লেখক
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

