গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকার পতনের পর নতুন গঠিত সরকার সাংবিধানিক কাঠামোর বাইরে থাকে, যতক্ষণ না তা বৈধতা পায়। বৈধতার পথ হতে পারে : (ক) সংবিধান সংশোধন, (খ) নতুন নির্বাচন, (গ) আনুষ্ঠানিক ঘোষণাপত্র। বর্তমানে ঘোষণাপত্র হলো সব অপশনের মধ্যে সবচেয়ে সহজ, যা ন্যায়বিচার, আইনের শাসন ও মৌলিক অধিকার রক্ষার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।
আইনগতভাবে ঘোষণাপত্র (Proclamation) একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি, যা সরকার বা ক্ষমতাধর ব্যক্তি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত প্রকাশ, নাগরিকদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা বা জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য জারি করে। উদাহরণস্বরূপ, মদিনা সনদ, নবী মুহাম্মদ (সা.) কর্তৃক ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে জারি করা একটি আনুষ্ঠানিক ঘোষণাপত্র, যা মদিনার বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সহাবস্থান, আইনের শাসন এবং পারস্পরিক দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠা করেছিল। একইভাবে, ১৮৬৩ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন দাসপ্রথা বিলোপ ঘোষণা করে এমান্সিপেশন প্রোক্লেমেশন জারি করেছিলেন।
সাধারণত ঘোষণাপত্রে ভূমিকা (Preamble), কর্তৃপক্ষের বিবৃতি, নির্দেশ বা ঘোষণা এবং কর্তৃপক্ষের স্বাক্ষর অন্তর্ভুক্ত থাকে। গণঅভ্যুত্থান বা বিপ্লবের ক্ষেত্রে এটি আইনি এবং ঐতিহাসিক দলিল, যা বিপ্লবের বৈধ, নৈতিক ও আইনি ভিত্তি নিশ্চিত করে এবং অনুচ্ছেদ ৭(১), জনগণের সর্বোচ্চ ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত দলিল। ৫ আগস্ট বিপ্লবের ঘোষণাপত্র হবে আওয়ামী লীগ সরকার উৎখাতের ন্যায্যতার এবং ২০০৯ সাল থেকে সরকারের নৈতিক ভিত্তির দুর্বলতা, জুলুম, নির্যাতন, গুম, খুন, দুর্নীতি, গণহত্যা এবং শাসন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের চূড়ান্ত দলিল।
আইনি স্বীকৃতির ক্ষেত্রে, গণঅভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্র অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে বৈধতা প্রতিষ্ঠিত করে, যা ভবিষ্যৎ সংসদে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে আরও বেশি মজবুত আইনি স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে পারে। ক্ষমতাচ্যুত সরকারের ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রতিশোধমূলক অতীত ইতিহাস বিবেচনায় ঘোষণাপত্রটি গণঅভ্যুত্থান বা বিপ্লবে নেতৃত্বদানকারী এবং অংশগ্রহণকারী লাখ লাখ ব্যক্তি ও শত শত গোষ্ঠীকে সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দেবে এবং ভবিষ্যতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। সংশোধনের মাধ্যমে এই নিশ্চয়তাটি সংবিধানের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে, যাতে ভবিষ্যতে ঘোষণাপত্রটি সহজেই বাতিল করা না যায়। এই সুরক্ষার সুযোগ, গণঅভ্যুত্থান বা বিপ্লবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করবে, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ছাড়া।
বিপ্লবের ঘোষণাপত্র আরও এক কারণে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১০৬ সংবিধানের কাঠামোর বাইরে অতীতে ঘটে যাওয়া কোনো কাজ বা পদক্ষেপ, যেমন গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ‘নির্বাচিত’ সরকার উৎখাত, তার আইনগত সুরক্ষা প্রদান করে না। তা ছাড়া অনুচ্ছেদ ১০৬ বিতর্কিত আইনি বিষয়, যেমন সংবিধান সংশোধন, নির্বাচন প্রক্রিয়া বা জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে, নির্বাহী বিভাগকে দিকনির্দেশনা প্রদান করে। তাই, অনুচ্ছেদ ১০৬ অন্তর্বর্তী সরকারকে দুর্বল আইনি ভিত্তি দিলেও গণঅভ্যুত্থানের নেতা এবং অংশগ্রহণকারীদের জন্য সার্বিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে না। এ জন্য ঘোষণাপত্র অত্যাবশ্যক।
সুতরাং, যেসব মানুষ বা রাজনৈতিক দল এই সাহসী তরুণ প্রজন্মকে কৃতিত্ব দিতে বা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে চায়, তারা অবশ্যই ঘোষণার পক্ষে। যারা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব, সাম্য, মানবিক মর্যাদা বা ন্যায়বিচারের জন্য রাজনীতি করে, তারা অবশ্যই ঘোষণাপত্রের পক্ষে। বাকি সবাই বিরোধিতা করবে।
লেখক : গবেষক এবং সুশাসন, ক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতি বিশ্লেষক
এমবি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

