প্রশ্নপত্র ফাঁসের পুরোনো ব্যাধি

প্রশ্নপত্র ফাঁসের পুরোনো ব্যাধি

একটি সরকারি চাকরির জন্য বছরের পর বছর প্রস্তুতি নেন অসংখ্য তরুণ। তাদের প্রত্যাশা খুবই সাধারণ—প্রতিযোগিতা হবে সবার জন্য সমান, মূল্যায়ন হবে মেধার ভিত্তিতে। কিন্তু পরীক্ষার আগেই প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ, পরীক্ষা স্থগিত হওয়া এবং চাকরিপ্রার্থীদের রাস্তায় নেমে প্রতিবাদের চিত্র নতুন নয়। রাষ্ট্র কি তবে তরুণদের জন্য ন্যায্য প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারছে না? মেধার মর্যাদা, রাষ্ট্রের জবাবদিহি ও তরুণদের ভবিষ্যৎ রক্ষায় আজ তাই কার্যকর সংস্কার অপরিহার্য।

১০ অক্টোবর ২০২৬ যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পরীক্ষাকে ঘিরে আবার ফিরে এলো মাফিয়া শাসক শেখ হাসিনার আমলের প্রশ্নপত্র ফাঁসের সেই পুরোনো ব্যাধি। ১১তম গ্রেডের ২৪২টি পদের বিপরীতে তিন লাখের বেশি প্রার্থীর অংশ নেওয়ার কথা ছিল। ঢাকার ১০০টি কেন্দ্রে বেলা ১১টায় পরীক্ষা হওয়ার কথা থাকলেও আগের রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ায় তা স্থগিত করা হয়। দূরদূরান্ত থেকে ঢাকায় আসা প্রার্থীদের যাতায়াত, আবাসন ও প্রস্তুতির জন্য ব্যয় করা অর্থ অপচয় হয়েছে, যা তাদের অনিশ্চয়তা ও ক্ষোভ বাড়িয়েছে। তাদের এই মানসিক যন্ত্রণা, অর্থের অপচয় আর ভোগান্তির দায় কি সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর এড়াতে পারে? সরকার কি তাদের কোনো ক্ষতিপূরণ দেবে? এ দাবি কি অন্যায়? কারণ, প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত অনেককে হয়তো শনাক্ত করা যাবে, শাস্তিও দেওয়া যাবে; কিন্তু তাতে কি বেকার তরুণদের ক্ষতি ও যন্ত্রণা পুষিয়ে যাবে? আজ সময় এসেছে এ বিষয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপনের। কারণ, অতীতে রাষ্ট্রীয় নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের মাধ্যমে কত মেধাবীকে বঞ্চিত করা হয়েছে, তার হিসাব নেই। প্রশ্নপত্র ফাঁসে জড়িত অনেককে অতীতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে; কিন্তু প্রশ্নপত্র ফাঁস ও দুর্নীতির কারণে যেসব মেধাবী বঞ্চিত হয়েছেন, তাদের বঞ্চনার অবসান হয়নি।

বিজ্ঞাপন

২০১৮ সালের এসএসসি পরীক্ষায় ১৭টির মধ্যে ১২টি বিষয়ের বহুনির্বাচনি প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রমাণ পেয়েছিল সরকারি তদন্ত। ওই অভিজ্ঞতা থেকে প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা ও পরীক্ষা বাতিলের মানদণ্ড আরো শক্তিশালী করার প্রয়োজন ছিল।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। রেলওয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী নিয়োগ পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে ৮ জুলাই সিআইডি পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যানের গাড়িচালক সৈয়দ আবেদ আলী জীবন, তার ছেলেসহ ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করে। ২০২৬ সালের ১৮ মে সিআইডি আবেদ আলীসহ ৫৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে। এছাড়া এপ্রিলে আদালত তাদের ব্যাংক ও শেয়ার হিসাব অবরুদ্ধ করেন। পিএসসির নিজস্ব তদন্ত কমিটি কোনো প্রমাণ পায়নি বলে জানালেও সিআইডির ফৌজদারি তদন্ত পৃথকভাবে এগিয়েছে। অভ্যন্তরীণ তদন্ত ও আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এক বিষয় নয়। তবে এর মধ্য দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা সংস্কারের প্রশ্নটি সামনে আসে।

নতুন সরকার দায়িত্ব নিলেই দীর্ঘদিনের অনিয়ম দূর হয় না, তা ঠিক; তবে এজন্য প্রয়োজন পরিকল্পিত পরিবর্তন ও নজরদারি। ২০২৬ সালের যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পরীক্ষায় নতুন করে অনিয়মের অভিযোগ প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ১০ অক্টোবরের ঘটনায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে কারা জড়িত, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খুঁজে বের করতে হবে এবং জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।

প্রশ্নপত্র ফাঁসের অপরাধ মোকাবিলায় ২০২৬ সালে ‘পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) (সংশোধন) আইন’ পাস হয়েছে। আইনটি ২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত হয় এবং অবিলম্বে কার্যকর হয়। এতে প্রশ্নপত্র বেআইনিভাবে প্রকাশ বা বিতরণ, ডিজিটাল কারসাজি এবং নিষিদ্ধ ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহারসহ বিভিন্ন অপরাধের জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে। অপরাধের ধরন অনুযায়ী কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান ভিন্ন। উত্তরপত্রের নম্বর ইচ্ছাকৃতভাবে বেশি বা কম দেওয়ার ক্ষেত্রে শাস্তির বিধান সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট ধারা যাচাই করে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন। নিরপরাধ ব্যক্তির অধিকার রক্ষা এবং অপরাধীকে ছাড় না দেওয়ার মানসিকতাই প্রকৃত কঠোরতা।

মেধার মর্যাদা রক্ষা রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব। সততার সঙ্গে প্রস্তুতি নেওয়া প্রার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হলে মেধাভিত্তিক ব্যবস্থার ওপর আস্থা কমে যায়। রাষ্ট্রকে শুধু অপরাধী শনাক্ত করলেই চলবে না, অপরাধের সুযোগও বন্ধ করতে হবে। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রমাণিত অপরাধের বিচার এবং নিয়োগব্যবস্থার স্থায়ী সংস্কার নিশ্চিত করা না গেলে শুধু আশ্বাসে সংকট কাটবে না। তরুণদের মেধা ও পরিশ্রমের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের প্রকৃত জবাবদিহি।

লেখক : শিক্ষক

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন