আমাদের রাষ্ট্রবিধান বা সংবিধান রাষ্ট্র ও নাগরিকের সুসম্পর্কের মূলনীতি হওয়ার পরিবর্তে বিষাক্ততার খতিয়ানে পরিণত হলো কীভাবে, তার উত্তর খুঁজতে হলে উজানে তাকাতে হবে। মুসলিমবিদ্বেষী মোদি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শংকরের বাবা বিখ্যাত নিরাপত্তাবিশেষজ্ঞ কৃষ্ণস্বামী সুব্রামানিয়াম ১৯৭১ সালে ইন্ডিয়াকে আক্রমণাত্মক হতে তাগাদা দিয়েছিলেন। অভিযানের ন্যায্যতার জন্য আন্তর্জাতিক মহলের স্বীকৃতি আদায়ের লক্ষ্যে সক্রিয় ছিলেন ইন্দিরা গান্ধীর আস্থাবান ব্যারিস্টার সুব্রত রায় চৌধুরী, যিনি সম্পাদনা করেন ৭১-এর স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। মুসাবিদাকারীর তালিকায় ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম, এমনকি বিএসএফের আইনবিষয়ক শীর্ষ কর্মকর্তা কর্নেল এনএস বেswইন্সও আছেন। ঘোষণাপত্রে আনুষ্ঠানিকভাবে বলা হয়, স্বাধীন বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধের ভিত্তি সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার। কিন্তু পাকিস্তানের সংবিধান সভায় গৃহীত অবজেকটিভ রেজল্যুশনের প্রস্তাব সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া হয়, কারণ সেই প্রস্তাবে প্রথমে মহান আল্লাহর সর্বময় সার্বভৌমত্বকে স্বীকার করা হয়েছিল। সভার সদস্যদের ভেতর অধিকাংশ সদস্যই ছিলেন বর্তমান বাংলাদেশের। ফলে মুসলিম ভূমিতে মুসলিম আত্মসত্তা বাস্তব রাজনৈতিক রূপ লাভ করে। পাকিস্তানের সংবিধান ছিল মর্যাদাগত দিকে ইসলামি, কাঠামোগতভাবে আধুনিক রিপাবলিকান, কার্যকারিতায় ইসলামি অগ্রগণ্যতাসম্পন্ন গণতান্ত্রিক।
বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের সেতু হিসেবে ৭১-এর স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রকে উপযোগী করাই ছিল নিরাপত্তা স্বার্থে ইন্দিরা গান্ধীর আস্থাভাজন ব্যারিস্টার সুব্রত চৌধুরীর মূল মিশন। ১৯৭২ সালের সংবিধান সম্পূর্ণ অর্থে ৭১-এর ঘোষণারই প্রতিফলন। সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার হলো সেই ত্রিভুজের তিন বাহুর সমাহার, যাকে সেক্যুলারিজম বলে। এর অন্যতম অর্থ সব ধর্ম সমান। ধর্মকে রাজনীতিতে না টানলেই এমন আন্তঃধর্মীয় সাম্যাবস্থা বিরাজ করবে। তাই সাম্যাবস্থার খাতিরে ধর্ম বরং ব্যক্তিগত পরিসরেই শ্রেয়। ‘সাম্য’ ধারণার উৎস ফরাসি বিপ্লব। ফরাসি বিপ্লবের অন্যতম স্থপতি বিপ্লবী কামি ডেমুলাঁ এক ভাষণে লিবার্টি-ইক্যুয়ালিটি- ফ্রেটার্নিটি ধারণাত্রয় উল্লেখ করেছিলেন। পরে ডেমুলাঁর বন্ধু বিখ্যাত বিপ্লবী ম্যাক্সিমিলিয়া রবিস্পিয়া শব্দগুলোকে জনপ্রিয় করে তোলেন। আবার আমরা ১৯৫০ সালে ভিমরাও রামজি আম্বেদকারের খসড়া করা ইন্ডিয়ার সংবিধানে সরাসরি ‘সাম্য’ ধারণা পাই, যিনি ফরাসি বিপ্লবের সুরে বলেছিলেন, ‘I like the religion that teaches liberty, equality, and fraternity।’
কাজেই ৭১-এ মহান আল্লাহর সার্বভৌমত্বের ঘোষণা বাদ দিয়ে নিছকই সাম্য, মানবিক মর্যাদার ধারণার ভিত্তিতে স্বাধীনতার ঘোষণার উদ্দেশ্য ছিল, সেক্যুলার রিপাবলিকানিজমকে ইসলামের আয়ত্তে রাখার জনগণের ম্যান্ডেডপ্রাপ্ত বন্দোবস্ত খারিজ করে, সমগ্র ও পূর্ণমাত্রায় ফরাসি বা ইন্ডিয়ার কায়দায় সেক্যুলারিজমের প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইসলামি রাজনৈতিকতাকে উচ্ছেদ করা। অতএব এর অবশ্যম্ভাবী ফলাফল ও বিকশিত রূপ হলো ৭২-এর সংবিধান। কারণ এই ক্ষমতার প্রয়োগেই নিষিদ্ধ করা হলো ধর্মভিত্তিক রাজনীতি। ইতিহাসের এই স্পষ্ট সত্য উপেক্ষা বা গোপন রাখার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। যারা ধর্মভিত্তিক রাজনীতিকে আইনগতভাবেই নিষিদ্ধ রাখতে চান, তারা যেকোনো মূল্যে ৭২-এর সংবিধান বহাল রাখতে চান। উনারাই ‘ব্যাড সেক্যুলার’। অন্যরা চান সরাসরি ‘সেক্যুলার’ শব্দ ব্যবহার ছাড়াই এর উপাদান ‘সাম্য’, ‘মানবিক মর্যাদা’, ‘সামাজিক ন্যায়বিচার’কে সংবিধানের মূলনীতিতে পরিণত করার মাধ্যমে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি আধিপত্য তৈরি ও নিয়ন্ত্রণ করতে। উনাদের ভাষায়, ৭১-এর ঘোষণায় সেক্যুলারিজম ছিল না, কিন্তু ৭২-এর সংবিধানে আছে। কাজেই ৭১-এর ঘোষণা অনুযায়ী নয়া সংবিধান প্রণয়ন করতে হবে। এভাবে তারা ভাষাগত শঠতার মাধ্যমে ইসলাম ও রাজনীতির কৃত্রিম ফারাক বহাল রাখতে চান।
৪৭-এ উপনিবেশ বিদায় হলেও ঔপনিবেশিকতা রয়ে যায় রাষ্ট্রব্যবস্থার অভ্যন্তরে। পাকিস্তান আধুনিক ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থার ভেতর দিয়ে উপনিবেশী ক্ষমতার বি-উপনিবেশীকরণে সচেষ্ট হয়। কিন্তু ইন্ডিয়া মোটামুটি সার্বিকভাবেই ইউরোপীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে। আবার লাহোর প্রস্তাবভিত্তিক মুসলিম ভূমি ও ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা সত্তাগতভাবেই ইন্ডিয়ার ব্রাহ্মণ্যবাদী রাষ্ট্রচিন্তার বিরোধী। আধিপত্য খর্ব হওয়ার আশঙ্কায় ইন্ডিয়া স্বাভাবিকভাবেই চাইবে না নতুন বাংলাদেশ ১৯৪৭-এর ইসলামি রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তিতে হোক। এরই প্রমাণ ৭১-এর ঘোষণাপত্র, যা পর্যায়ক্রমে রূপ নেয় ৭২-এর সংবিধানে। এটাই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মাহেন্দ্রক্ষণে তৈরি হওয়া মৌলিক সংকট, যার ফলাফল ইসলাম বনাম সেক্যুলারিজম দ্বন্দ্ব। কিন্তু এই দ্বন্দ্বের মীমাংসা কীভাবে?
ইতিহাসে এই দ্বন্দ্বের স্বতঃস্ফূর্ত জাতীয় মীমাংসা ও ফয়সালার নজির আছে। ৪৭-এর অর্জনকে প্রগতির পরিপন্থী ভেবে নয়া আধুনিক সেক্যুলার মধ্যবিত্ত ইন্ডিয়ার তত্ত্বাবধানে ৭১-এর ঘোষণাপত্রকে গ্রহণ করেছিল। অথচ আবুল মনসুর আহমেদ মতো অনেকেই মনে করতেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা খুবই ন্যায্য কিন্তু এতে লাহোর প্রস্তাবভিত্তিক ৪৭-এর চেতনার কোনোই হেরফের ঘটেনি। ৭১ কোনো অর্থেই ৪৭-এর এন্টি থিসিস নয়। এক পাকিস্তানের জায়গায়, এখন দুই পাকিস্তান তৈরি হয়েছে। অবশ্যই বলতে হবে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কথা। যিনি সংবিধানের মূলনীতিতে না রেখেছেন সেক্যুলারিজম, না রেখেছেন সাম্য-মানবিক মর্যাদা। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদভিত্তিক সংবিধানের মূলনীতির অংশে ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও ঈমান’ স্থাপন করায় এবং সেক্যুলারিজম অথবা সেক্যুলারিজম সমার্থক যেকোনো ধারণা মূলনীতি থেকে বাদ দেওয়া হয়, তবে সরকার পরিচালনা এবং নাগরিক অধিকারের ক্ষেত্রে আবার সেই ধারণাগুলো যথাযথভাবে সন্নিবেশিতও হয়। এ কারণেই ইসলামি আত্মচৈতন্যভিত্তিক রাজনীতি আবারও বিকশিত হতে পেরেছিল, যা অনিবার্যভাবেই ইন্ডিয়াকে বিব্রত ও বিচলিত করেছিল। যার ফলেই হয়তো প্রাণ দিতে হয়েছিল শহীদ জিয়াকে।
এরপর আমরা দেখি পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানকে আবারও ৭১-৭২-এর ইসলামি রাজনীতিবিরোধী প্রকল্পে যুক্ত করা হয়। এর স্পষ্ট প্রভাবেই বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ইন্ডিয়ার নিয়ন্ত্রণ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়। আমরা ইন্ডিয়ার প্রভাবের নানা দিক উল্লেখ করলেও সাংবিধানিক ক্ষমতার কেন্দ্রে কীভাবে ইন্ডিয়ার আধিপত্যের ক্ষেত্র প্রস্তুত আছে, তা লক্ষ করি না। এখানেই রাষ্ট্রের অর্গানিক ক্রাইসিস বা মর্মব্যাধি নিহিত। আজকে পুনর্লিখন নাকি পরিবর্তন এমন হঠকারী বিতর্ক তৈরি হয় এই সংকটকে আড়ালে রেখেই। বিদ্যমান সংবিধানে ইন্ডিয়ার সংবিধানের বেসিক প্রিন্সিপালের নকল করে এমন ধারা সন্নিবেশিত হয়েছে, যাতে মূলনীতি পরিবর্তন করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেই বিশাল পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে, তাকে বিপ্লবে পরিণত করতে হলে অবশ্যই আমাদের জনগণের নয়া সংবিধান বা রাষ্ট্রবিধান রচনা করতে হবে। কাজেই জনগণের সংবিধান সোনার পাথরবাটি নয়, জনগণেরই স্বতঃস্ফূর্ততার বাস্তব প্রকাশ। আল্লাহপাক আমাদের সেই তৌফিক দান করুন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

