গাজায় গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের তদন্তে ইসরাইলের নেতাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির কয়েক মাস পর আদালতের প্রধান কৌঁসুলি করিম খানের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। ঘটনাটি নিছক কাকতালীয়, নাকি একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক প্রতিশোধ—এই প্রশ্ন এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রে। একজন প্রভাবশালী কৌঁসুলি যখন ন্যায়ের তীর একটি প্রভাবশালী রাষ্ট্রের দিকে তাক করেন, তখন তার বিরুদ্ধে হঠাৎ এমন কেলেঙ্কারির অভিযোগ উঠলে তা নিয়ে সন্দেহ জাগাটাই স্বাভাবিক।
একজন প্রাক্তন সহকারী আইনজীবী, মালয়েশিয়ান বংশোদ্ভূত এক নারী, অভিযোগ করেছেন, করিম খান তার ওপর বারবার যৌন নিপীড়ন চালিয়েছেন। এই ঘটনাগুলো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সফর (নিউ ইয়র্ক, কঙ্গো ও ইউরোপ) এবং হেগে তার বাসভবনে ঘটেছে বলে জানানো হয়েছে। করিম খান অবশ্য এসব অভিযোগ ‘পুরোপুরি মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন এবং বলেছেন, এটি একটি ষড়যন্ত্রমূলক প্রচেষ্টা, যার লক্ষ্য তাকে এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে দুর্বল করা।
করিম খান বর্তমানে প্রশাসনিক ছুটিতে রয়েছেন এবং তার দায়িত্ব সাময়িকভাবে দুই উপ-প্রধান কৌঁসুলি পালন করছেন। আদালতের সদস্যরাষ্ট্রগুলোর অনুরোধে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে একটি স্বাধীন তদন্ত শুরু হয়েছে, যা পরিচালনা করছে জাতিসংঘের অফিস অব ইন্টারন্যাশনাল ওভারসাইট সার্ভিস। তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে তার পদচ্যুতি বা বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
২০২৪ সালে করিম খান গাজায় মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্তের অংশ হিসেবে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও অন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। এরপর ২০২৫ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতায় এসে তার বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এতে তার মার্কিন ভিসা বাতিল হয়, আর্থিক লেনদেন স্থগিত হয় এবং আইসিসির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
ট্রাম্প প্রশাসনের মতে, আইসিসির এই পদক্ষেপ ইসরাইলের বিরুদ্ধে একতরফা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তবে অনেক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং বিচার-বিশ্লেষক এই নিষেধাজ্ঞাকে বিচারবিরোধী ও ন্যায়বিচারের পথে এক বিপজ্জনক হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছে। এবার চিন্তা করুন—আমেরিকা আসলে কত বড় বিশ্ব মাস্তান এবং ‘ডাবল স্ট্যান্ডার্ড’-এর প্রকৃত বাহক!
এরই পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার একটি গভীর সংকট স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যখন কোনো কৌঁসুলি বড় কোনো শক্তিধর রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তদন্ত করেন, তখন তার বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত ও পেশাগত হামলার ঝুঁকি যে কতটা প্রবল, করিম খানের ঘটনাই তার উদাহরণ।
অভিযোগ সত্যি হলে অবশ্যই তাকে বিচারের আওতায় আনতে হবে। কিন্তু যদি এটি প্রমাণিত হয় যে এটি একটি রাজনৈতিক চক্রান্ত, তবে তা হবে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের বিশ্বাসযোগ্যতা ও স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত। অপরাধী যখন অভিযোগকারী হয়ে ওঠে, তখন ন্যায়বিচার বলে কিছু থাকে না যেমনটি আমরা বাংলাদেশে ভারতীয় তাঁবেদার ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার আমলে দেখেছি।
করিম খানের ঘটনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার শুধু আইনি কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়—এটি একটি রাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্রও। যেখানে সত্য, বিচার এবং প্রতিশোধ একে অন্যকে ছায়ার মতো অনুসরণ করে। জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদন এবং আইসিসির সদস্যরাষ্ট্রগুলোর অবস্থান আগামী দিনে নির্ধারণ করবে—এই মামলা একটি ব্যক্তির বিচার, নাকি আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


জুলাই সনদ কেন জরুরি