ফ্যাসিস্ট হাসিনার কুশাসনে সিলেটে একটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক ছড়া প্রচলিত ছিল। তা হচ্ছে-‘হাসিনারে হাসিনা/ তোর কথায় নাচি না/ তোর বাপের কথায় নাচিয়া/ দেশ দিস্লাম বেচিয়া’। কিন্তু তারপরও তো এ কথা সত্য, হাসিনার আওয়ামী ফ্যাসিবাদী কুশাসন আমলে এত রক্তের দামে কেনা বাংলাদেশের স্বাধীনতা একেবারেই বিনামূল্যে বিক্রি হয়েছিল ১৬ বছর ধরে।
শুধু ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে ঘৃণ্যতম নির্বাচনি নাটক দিয়ে পার করে নিয়েছিল তার ব্রাহ্মণ্যবাদী প্রভু হিন্দু আধিপত্যবাদী ভারত। খুনি হাসিনা ক্ষমতায় ছিলেন ভারতের জোরে আর ফ্যাসিবাদী বলপ্রয়োগে। ওদিকে মেরুদণ্ডহীন বিরোধী দলও জন-আকাঙ্ক্ষা যেমন বুঝতে পারেনি, তেমনি তাদের সাহসে কুলোয়নি রিস্ক নেওয়ার। সেটাই ছিল হাসিনার প্যান্ডোরার বক্সের রহস্য। এটা ভেঙে ধ্বংস করে দিয়েছে ছাত্র-জনতার অকুতোভয় লড়াই, জীবনদান ও বিশ্ব কাঁপানো গণঅভ্যুত্থান-২০২৪।
এটাই ছিল মনসুন রেভ্যুলিউশন বা বর্ষা বিপ্লবের মূল শক্তি। কত আঙ্কল টম, কত কুন্তা কিন্তে, কত স্পার্টাকাসকে জীবন দিতে হয়েছে, দৃষ্টিহারা হতে হয়েছে, পঙ্গু হতে হয়েছে এই বিপ্লবের মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে উৎখাত করতে গিয়ে। কত অশ্রু ঝরেছে রাতের গভীরে একমাত্র মালিকের প্রতি সুজুদে। কোনো কিছুই এমনিতে পাওয়া যায় না। সবকিছুর জন্য মূল্য চুকাতে হয়। আর সব সাফল্যের পেছনে কাজ করে আমাদের একমাত্র লা-শরিক মালিক আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের চূড়ান্ত সার্বভৌম ইচ্ছা; তারই রাহ্মাহ ও ফাদল।
১/১১-এর সরকারের অধীনে ২০০৮-এর নির্বাচনে বিজয়ী করে হাসিনাকে ক্ষমতায় আনার মাধ্যমে হিন্দু আধিপত্যবাদী ভারতের ষড়যন্ত্র শুরু হয়। এরপর ফ্যাসিস্ট হাসিনার টানা ১৬ বছরের শাসনামলে তিনটি ভুয়া নির্বাচন করে অবৈধ দখলদারির রাজত্বে হাত কাটা, গলাকাটা, চোখ উপড়ে ফেলা, যৌনাঙ্গ কাটা, থানায় ধরে নিয়ে পায়ে গুলি করে পা কেটে ফেলা, কিংবা মারতে মারতে হত্যা করা, টুকরো টুকরো করা লাশের সংখ্যা ও সারি বহু হাজার গুণ বেড়ে গেছে। লিনচিং স্বঘোষিত জননেত্রী ও দেশরত্ন কিন্তু বাস্তবে খুনি হাসিনার সময় আরো ভয়ংকর রূপে সংঘটিত হয়েছে।
হাসিনারই অর্থমন্ত্রী কিবরিয়া হত্যাকাণ্ড, নারায়ণগঞ্জের সেভেন মার্ডার অসংখ্যের মধ্যে মাত্র দুটি উদাহরণ। আওয়ামী লীগের কসাইরা ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের সময় জাল পরা বাসন্তীর ছবি তোলা সাংবাদিক আফতাবকে তার অ্যাপার্টমেন্টে কুপিয়ে হত্যা করেছে। আবার মেজর বজলুল হুদাকে জেলে গিয়ে খুনি হাসিনা নিজ হাতে জবাই করা ছাড়াও তার ভাগনিকে গাড়িচাপা দিয়ে হত্যা করেছে।
এই আলোচনায় হাসিনার ফ্যাসিস্ট আমলের খুনখারাবি ও অপরাধের ফিরিস্তির দিকে না গিয়ে কিছু দৃশ্যপট ও ভয়াবহ নিষ্ঠুরতা তুলে ধরা যাক। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা নিজেই কীভাবে বিরোধী তো বটেই, এমনকি স্বীয় দল, ছাত্র সংগঠনের লোককেও স্বীয় স্বার্থে কিংবা প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর জন্য খুন করতেন, তা মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান রেন্টুর ‘আমার ফাঁসি চাই’ বইতে অনেক স্থানে বর্ণিত আছে। কয়েকটি গুম, খুন ও হত্যাকাণ্ডের ক্ষুদ্রচিত্র এখানে তুলে ধরছি, যা আমি প্রত্যক্ষভাবে জানি। বিএনপি নেতা ও ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলম, যাকে আমি চিনতাম, যার সঙ্গে দেখা হয়েছে বহুবার, তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি আর ফিরে আসেননি।
সিলেটের ইলিয়াস আলী বিএনপির প্রতিশ্রুতিশীল নেতা ছিলেন। ভারতের বরাক নদীতে টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ করে বাংলাদেশের ওপর পানি সন্ত্রাস চালানোর বিরুদ্ধে অত্যন্ত সোচ্চার কণ্ঠ ও লংমার্চ অনুষ্ঠানকারী নেতা ইলিয়াস আলী ও তার স্ত্রী আমার পরিচিত। ইলিয়াসের সঙ্গে আমার শেষ দেখা হয় আদালতের বারান্দায়। আমাকে দেখে জিজ্ঞাসা করে, স্যার আপনি এখানে কেন? আমি উত্তর দিই, আমার বিরুদ্ধে মামলার কারণে। তখন সে বলে, তারও উপস্থিতি মামলার বিষয় নিয়ে।
এরপর সামান্য কথাবার্তার পর আমি চলে যাই। কিছুদিনের মধ্যেই শুনি ইলিয়াস আলীকে খুনি হাসিনার দাসানুদাস গোয়েন্দা পুলিশ রাতে বাসায় ফেরার পথে ধরে নিয়ে গেছে ড্রাইভারসহ। ওই যে গেল আর এলো না। এখন দেখা যাচ্ছে, ডিজিএফআইয়ের আয়নাঘরে আটকে রেখে ইলিয়াসকে টুকরো টুকরো করে বস্তাবন্দি করে ভারী পাথর দিয়ে বেঁধে সমুদ্রে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে। অথচ মানুষরূপী দানবী খুনি হাসিনা ইলিয়াসের স্ত্রী ও সন্তানদের সাক্ষাৎ দিয়ে কি ভয়ংকর ভণ্ডামি ও নাটক করেছেন। হাসিনা এখন আছেন তার ব্রাহ্মণ্যবাদী প্রভুর পদতলে।
ফ্যাসিবাদের নিষ্ঠুরতার শিকার আরেকজনের কথা ভুলতেই পারি না। আমাদের প্রিয় সুমন। তার তরুণ বয়স থেকেই তাকে আমি চিনি। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারের অফিসে চাকরিতে ঢুকেছিল। হাসিমুখে কথা বলত। ১৯৯৬-২০০১ পর্যায়ে আন্দোলনে, বিপদের দিনে বহুবার তাকে দেখেছি, পাশে পেয়েছি। সুমন শেষ হয়ে গেল। ফ্যাসিস্ট হাসিনার আওয়ামী লীগ, ওয়ার্ড কমিশনার ও তার গুন্ডাবাহিনীর অত্যন্ত নির্মম হামলায় তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হলো, তার স্ত্রীকে বিধবা করল আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা। অটিস্টিক বাচ্চাসহ তার স্ত্রী এখন অসহায় জীবনে পড়েছে।
বিশ্বজিতের কথা কি আপনাদের মনে পড়ে? শিবির সন্দেহে তাকে গুন্ডা ছাত্রলীগের খুনিরা চাপাতি দিয়ে কোপ দিচ্ছিল এবং সে প্রাণ বাঁচাতে দোকানে দৌড়ে যেতে চেয়েছিল। তার মুখ থেকে আর্তনাদ বেরিয়েছিলÑ‘আমি শিবির করি না, আমি হিন্দু, আমি প্যান্ট খুলে দেখাই’। তবুও খুনিরা বিশ্বজিৎকে বাঁচতে দেয়নি।
সম্পূর্ণ নির্দোষ বিশ্বজিৎ চাপাতি লীগের চাপাতির কোপ খেতে খেতে অসহায়ভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। আরেক দৃষ্টান্ত হচ্ছে ভারতীয় পানি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়া বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদ। তাকেও শিবির ট্যাগ দিয়ে ছাত্রলীগের খুনিরা এক হিন্দুর নেতৃত্বে কয়েক ঘণ্টা ধরে পিটিয়ে শেষ করে দেয়। আওয়ামী ‡`vmi কট্টর সাম্প্রদায়িক ঘুসখোর ডাকাত, ইয়াবা চোরাচালানিদের সঙ্গে যোগসাজশকারী ওসি প্রদীপ একইভাবে পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জ থেকে গুলি করে মেরেছিল মেজর (অব.) সিনহাকে কক্সবাজারে।
আমার মতে, যত কারণে খুনি হাসিনার পতন হয়েছে, তার মধ্যে লিনচিংই সবচেয়ে বড় কারণ। সে নিজে হুকুম দিয়ে পরিকল্পনা করে মিছিলে হত্যা করিয়েছে। এপিসি থেকে ফেলে হত্যা করিয়েছে। স্নাইপার দিয়ে গুলি করে হত্যা করেছে। হেলিকপ্টার থেকে গুলি করিয়ে হত্যা করেছে।
এর আগে লগি-বইঠা হত্যাকাণ্ড, হেফাজত হত্যাকাণ্ড, বিডিআর হত্যাকাণ্ড, শেখ সেলিমের সাক্ষ্যমতে খুনি হাসিনার নির্দেশে নানক ও আজমের উদ্যোগে সাকুরার সামনে বাসে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে যাত্রী হত্যাকাণ্ডসহ অসংখ্য গুম-খুনের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন হাসিনা। ফ্যাসিস্ট হাসিনা নিজে জেলে ঢুকে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মেজর বজলুল হুদার বুকে পা দিয়ে চেপে ধরে নিজেই গলা কেটে তাকে হত্যা করাসহ অসংখ্য হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন শেখ হাসিনা।
এরপর-২০২৪-এর অভূতপূর্ব ছাত্র-গণঅভ্যুত্থান দেখে জানের ডরে পালানোর আগে কয়েক দিনের মধ্যেই দেড় হাজারের বেশি হত্যাকাণ্ড আর ৫০ হাজারের অধিক আহত করা, দৃষ্টিহীন ও পঙ্গু করাসহ সবই খুনি হাসিনার ফ্যাসিবাদী জবরদস্তি শাসনের ঘৃণ্যতম লিনচিং কালচারের বর্বর দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
কিন্তু ৭ জানুয়ারি ২০২৫ পরাজিত হয়ে পালিয়ে যাওয়া আওয়ামী ফ্যাসিবাদীরা যেভাবে গাজীপুরে নতুন করে লিনচিং কালচারের ভয়াবহতম নমুনা দেখিয়েছে, তা সহ্যের সীমার বাইরে চলে গেছে। অতএব, এদের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার আবার জেগে ওঠা দরকার। এই লিনচিং কালচার তথা ঘৃণ্য হনন কুসংস্কৃতি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতেই হবে।
হাসিনা পালানোর পরও গত প্রায় পাঁচ মাসে বেশ কয়েকটা হত্যাকাণ্ড ঘটেছে লিনচিং কালচারের বীভৎস দুঃসহ স্মৃতিকে উসকে দিয়ে। এসব ছাড়তে হবে সবাইকে, সবপক্ষকে। হাসিনা যা করেছেন ফ্যাসিবাদী হয়ে, তা যদি অন্যরাও করা শুরু করেন, তাহলে ফ্যাসিবাদ তো গেল না, রয়েই গেল। তাই মিথ্যাচার দ্বারা লেলিয়ে দেওয়া বিচারহীন বীভৎস হত্যা চিরতরে বন্ধ করতে হবে। আমরা কি বিশ্ববাসীকে বুঝতে দেব যে হাসিনা একাই ফ্যাসিবাদী ছিলেন না, আমরাও ফ্যাসিবাদী? হাসিনা ও দোসররা গেছেন, কিন্তু শ্বাপদসংকুল করে গেছেন সভ্য মানুষের জীবনকে। তবে আবার সভ্য হতে পয়সা লাগে না।
আওয়ামী লীগের এই ফ্যাসিবাদী আচরণ থেকে মুক্তির স্বপ্নেই দীর্ঘদিন পরিশ্রম করে পুরো রাষ্ট্রকাঠামো, শাসন ব্যবস্থাপনা সংস্কার করে নতুন এক রাষ্ট্র অস্তিত্ব, শাসনকাঠামো ও নতুন বন্দোবস্ত নির্মাণ করার আন্তরিক গরজেই ‘টুইন অ্যাপ্রোচ’, ‘টু প্রঙ্গড স্ট্র্যাটেজি’ এবং ‘টেন পয়েন্ট ফর্মুলা’র ভিত্তিতে দশটি অধ্যায়ে ইংরেজি ভাষায় একটি গবেষণা গ্রন্থ প্রস্তুত করে দিয়েছিলাম দেশনেত্রী খালেদা জিয়াকে ২০১৩ সালের মার্চ মাসে।
এর শিরোনাম ছিল : ‘ফরওয়ার্ডিংয়ে মেমো অন পলিসি পজিশন অব করাপশন ফর বিএনপি পার্লামেন্টারি পার্টি ককাস’। তাদের অনুরোধেই ওই গবেষণাপত্রের বাংলা অনুবাদ করে একই সঙ্গে তা প্রদান করি। সেটা কম্পিউটার কম্পোজ করতে সময় দেওয়া ছাড়াও এক সপ্তাহ ধরে আমার প্রাক্তন ছাত্র ড. হারিস আদ্ দ্বীন দৈনিক ১৫/১৬ ঘণ্টা সময় দিয়েছে। নিজের চাকরিস্থল থেকে ছুটি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুলার রোডে আমার ১৯/জি বাসায় এসে সে এই কঠোর পরিশ্রম করেছে।
এই কাজটি করতে গিয়ে আমরা বিশ্বাসে উদ্বুদ্ধ হতে চেয়েছিলাম, ফ্যাসিবাদের ঘন কালো আঁধার পেরিয়ে জুঁই সাদা রেশমি জোছনা ছুঁয়ে একদিন আশ্চর্য এক সুবহে সাদিক হয়ে আমরা সমষ্টি জনতা ‘রমুজে বেখুদি’ তথা অ্যাকশন অরিয়েন্টেড কালেকটিভ এনটিটি হিসেবে সম্পূর্ণ নতুন দিগন্তে সোনা ঝরা দিনে পৌঁছে যাব ইনশাআল্লাহ।
ফ্যাসিবাদের পতনে আল্লাহ তোমার রহমত পেয়েছে এই দেশবাসী। এখন সব ধরনের বৈষম্যহীন এক প্রকৃত স্বাধীন স্বনির্ভর জীবনের দিকে যাত্রার পর্যায়। ইয়া আল্লাহ! তুমিই তো বলেছো, ‘যে তোমার অভিমুখী হয়, তুমি তাকে সাহায্য করো’…। ইয়া আল্লাহ, তোমার একান্ত রাহ্মাহ দিয়ে আমাদের কামিয়াব করে দাও; আমাদের মাঝে দাও তোমার তরফ থেকে পাঠানো সাকিনাহ। আমিন ইয়া রাব্বুল আলামিন।
লেখক : প্রফেসর (অব.), রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

