অপ্রতিমদের প্রতি নির্মমতা থামবে কীভাবে

অপ্রতিমদের প্রতি নির্মমতা থামবে কীভাবে

সমসাময়িক বিষয় নিয়ে লিখতে গিয়ে প্রায়ই বিপাকে পড়ে যাই। সপ্তাহ না পেরোতেই বহু ঘটনা-অঘটন সামনে আসে। রাজনীতিতে ঘটে নানা ঘনঘটা। কোনটা রেখে কোনটি নিয়ে লিখব, স্থির করাই কঠিন হয়ে পড়ে। পতিত আওয়ামী লীগ তাদের চেনা চরিত্র—ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিতে চাইছে। নিষিদ্ধঘোষিত যুবলীগ কথিত লকডাউন ডেকেছে কর্মদিবসের প্রথম দিন রোববার। তা বাস্তবায়ন করতে আগের দুই রাতে রাজধানীর কয়েকটি স্থানে ককটেল বা পটকা ফাটিয়ে আতঙ্ক ছড়ানোর অপচেষ্টা চালিয়েছে। বেশ কয়েকটি বাসে আগুন দিয়েছে। কয়েকটি স্থানে বিক্ষিপ্ত ঝটিকা মিছিলও করেছে। পুলিশের মধ্যে আওয়ামী লীগের প্রতি অনুগতদের নিয়েও গত সপ্তাহজুড়ে আলোচনার ঝড় বইছে। গুলশানের একটি মিছিলকে কেন্দ্র করে দুই পুলিশ কর্মকর্তা অপসারিত হওয়া এবং ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসির ভাইরাল কথোপকথনও সময়ের আলোচিত ইস্যু।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে জামায়াতের নেতৃত্বে ১১-দলীয় বিরোধী জোট তাদের দ্বিতীয় লংমার্চ সম্পন্ন করেছে উত্তর জনপদে। সেখান থেকে ৮ দফা না মানলে সরকার পতনের এক দফায় যাওয়ার হুঁশিয়ারি-হুংকার দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আজ নিউ ইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়ছেন। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বৃহস্পতিবার ভাষণ দেবেন। বাবা ও মায়ের পর সরকারপ্রধান হিসেবে জাতিসংঘ অধিবেশনে ভাষণ দেওয়ার মধ্য দিয়ে এক বিরল ইতিহাস সৃষ্টির সন্ধিক্ষণে রয়েছেন তিনি। এসব নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা যেত। কিন্তু তেরো বছরের কিশোর অপ্রতিম সব এলোমেলো করে দিল।

শনিবার দুপুর থেকে ফেসবুকে স্থির হতে পারছিলাম না। ফুটফুটে মায়াবি চেহারার, ফুলের

মতো পবিত্র মুখটি যতবার মোবাইল স্ক্রিনে ভেসে এসেছে, ততবারই যেন বুকের মধ্যে চিনচিন করে ব্যথা অনুভব করছিলাম। কয়েকবার দ্রুত সরিয়ে দিয়েছি। আবার এসেছে। একপর্যায়ে পুরো ফেসবুক ওয়াল সয়লাব হয়ে গেছে ধূসর রঙের পাঞ্জাবি ও পায়জামা পরা অপ্রতিমের ভিডিও আর স্থিরচিত্রে। কোন পাষণ্ড নরঘাতক এমন একটি কোমলমতি শিশুকে হত্যা করা তো দূরে থাক, আঁচড় দিতে পারে—তা বিশ্বাস করাও কঠিন। বুকটা বারবার ভেঙে যেন খানখান হয়ে যাচ্ছিল।

অপ্রতিমের মায়ের বুকফাটা আর্তনাদ নিতে পারছিলাম না। তিনি বলছিলেন—‘আমার ছোট্ট ছেলেটাকে অনেক কষ্ট দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। মৃত্যুর সময় ছেলেটা কীভাবে ছটফট করেছিল, কে জানে। তোরা আইফোন নিয়ে যেতি, কিন্তু আমার ছেলেকে খুন করলি কেন? আমার তো সব শেষ হয়ে গেল। এখন আমি কী নিয়ে বাঁচব? যারা আমার ছেলেকে খুন করেছে, তাদের বিচার চাই।’

আবার পরক্ষণেই বলছিলেন—‘খুনিদের ফাঁসি হলেইবা কী, আমি কি আমার অপ্রতিমকে ফিরে পাব?’

বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন হতভাগিনী মা নাহিদা বেগম।

অপ্রতিমের মর্মান্তিক হত্যার আদ্যোপান্ত এখন সবার জানা। বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলবে বলে মায়ের আইফোন নিয়ে বাসা থেকে বের হয়েছিল ১৩ বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম। গত শুক্রবার বেলা আড়াইটার দিকে বাসা থেকে বের হওয়ার পর শনিবার বেলা ১টায় তার নিথর দেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিখোঁজ হওয়ার প্রায় ২২ ঘণ্টা পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের জঙ্গলে অপ্রতিমের লাশ পাওয়া যায়। তার মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন রয়েছে বলে পুলিশ ও স্থানীয়রা জানিয়েছে। এ ঘটনার ১২ ঘণ্টার মধ্যে ৪ কিশোরকে আটক করেছে পুলিশ। যে আইফোনের জন্য অপ্রতিমকে জীবন দিতে হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, সেটিও উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। এতে অনেকটাই নিশ্চিত হওয়া যায়, অপ্রতিমের খুনিরা চিহ্নিত হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, গ্রেপ্তারকৃত কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা হত্যার কথা স্বীকার করেছে। তদন্ত ও বিচার দ্রুত করার চেষ্টা করবে সরকার।

কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকার বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী অপ্রতিম কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানার ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের কোটবাড়ি এলাকায় মা-বাবার সঙ্গে থাকত। মা নাহিদা বেগম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার মোবাইল অ্যাকসেসরিজের ব্যবসা করেন। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান ছিল অপ্রতিম। একরাশ শূন্যতা নাহিদা-ফিরোজ দম্পতিকে এখন গ্রাস করবে। তাদের পৃথিবীটা এখন গুহার ঘুটঘুটে অন্ধকারে ঘুরপাক খাবে।

সাম্প্রতিক সময়ে শিশু নিখোঁজ, হত্যা, নারী ও শিশু ধর্ষণের মতো ভয়াবহ ঘটনাগুলো বারবার আলোচনায় আসছে। অপ্রতিমের আগেও চলতি বছর নিখোঁজ হয়েছে বহু শিশু। তাদের কাউকে পাওয়া গেছে মাটিচাপা অবস্থায়, কাউকে নদীতে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাবে, বছরের প্রথম আট মাসে (জানুয়ারি-আগস্ট) ৩৬ নিখোঁজ শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজের পর লাশ উদ্ধার ছাড়াও চলতি বছর শিশুদের ধর্ষণের পর হত্যা, শারীরিক নির্যাতনে মৃত্যু এবং স্বজনদের হাতে নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। হত্যার কোনো কোনো ঘটনায় অভিযোগ উঠেছে পরিচিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে।

যেমন জামালপুরের মাদারগঞ্জে সাত বছরের একটি শিশু ১০ সেপ্টেম্বর বিদ্যালয়ে গিয়ে আর বাড়ি ফেরেনি। ১২ সেপ্টেম্বর তার সহপাঠীর বাড়ির মেঝেতে মাটিচাপা অবস্থায় লাশ পাওয়া যায়। পুলিশ সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছে, সহপাঠীর বাবা শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করেন। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

আসকের হিসাবে দেখা যাচ্ছে, গত আট মাসে শিশু নিখোঁজের পর হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন ও অন্যান্য ঘটনায় মোট নিহত শিশুর সংখ্যা ১৫৫। এর মধ্যে শারীরিক নির্যাতনে নিহত ৬৮, পারিবারিক পরিসরে নির্যাতনে নিহত ৪৯, ধর্ষণের পর হত্যা (দুই ছেলেশিশুসহ) ২৬, ধর্ষণচেষ্টার পর হত্যা ৪, গুলিতে নিহত ৩, গৃহকর্মীকে শারীরিক নির্যাতনে মৃত্যু ২, উত্ত্যক্তকারীর হাতে হত্যা ২ এবং অপহরণের পর হত্যা করা হয় ১ জনকে। এর বাইরে আত্মহত্যা, রহস্যজনক মৃত্যু ও মরদেহ উদ্ধারের ৯৯টি ঘটনা আছে।

সাম্প্রতিক সময়ে শিশুহত্যার একের পর এক ঘটনা সামনে আসছে। যেমন : পাবনা সদরে ১০ বছরের একটি শিশু ৯ সেপ্টেম্বর নিখোঁজ হয়। সাত দিন পর, ১৬ সেপ্টেম্বর, একটি ডোবা থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। পুলিশের ভাষ্য, শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ১৫ হাজারের বেশি শিশু নিখোঁজ হওয়ার সংবাদ প্রকাশ করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৩ সেপ্টেম্বর পুলিশ সদর দপ্তর সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানায়, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজ হলেও ৮৭ শতাংশের বেশি শিশু উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া শিশুর সংখ্যা ১৩ হাজার ৬৭৯। সেই হিসাবে নিখোঁজ রয়েছে ২ হাজার ৩৮ জন, যা মোট নিখোঁজ শিশুর প্রায় ১৩ শতাংশ।

শিশুর ওপর সহিংসতার পেছনে অপরাধীদের বিকৃত মানসিকতার পাশাপাশি প্রতিশোধ বা পারিবারিক বিরোধও কাজ করতে দেখা যাচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বড়দের মধ্যে বিরোধ বা হিংসার শিকারও হচ্ছে শিশু। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে বিরোধে জড়িয়ে অনেক শিশু-কিশোর অকালে ঝরে যাচ্ছে।

এসব ঘটনার দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার হলে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়বে এবং এ ধরনের অপরাধ কমিয়ে আনার ক্ষেত্রেও তা ভূমিকা রাখতে পারে।

সন্তান হারানোর পর পরিবারগুলো রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যথাসময়ে যথাযথ সহায়তা না পাওয়ার অভিযোগ বরাবরই সামনে আসে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সন্তান নিখোঁজের অভিযোগ নিয়ে থানায় গেলে বলা হয়—‘অপেক্ষা করেন, ফিরে আসবে’, ‘ফিরে আসে কি না দেখেন’ ইত্যাদি। পুলিশের পোশাকে থাকা অনেক পাষাণহৃদয় রাষ্ট্রের চাকর সন্তানহারা বাবা-মায়ের সঙ্গে শুধু যে সংবেদনশীল আচরণ করতে ব্যর্থ হন, তা নয়; অসদাচরণও করেন। থানা-পুলিশের কাছে গুরুত্ব না পেলে পরিবারগুলোর মধ্যে যে অসহায়ত্ব তৈরি হয়, তা বর্ণনাতীত।

অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর তার পরিবার কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে। মা নাহিদা বেগম ছেলেকে খুঁজে পেতে সবার সহযোগিতা চেয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন। পাশাপাশি ফেসবুকে অপ্রতিমের ছবি দিয়ে তার সন্ধান চায় ‘মুন অ্যালার্ট’ (মিসিং আর্জেন্ট নোটিফিকেশন)।

নিখোঁজ ও অপহৃত শিশুদের দ্রুত উদ্ধারে গত ১৩ জানুয়ারি ‘ফ্রি হেল্পলাইন’ (১৩২১৯) চালু করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। উদ্ধারকাজে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রম জোরদার এবং দ্রুত সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে প্রথমবারের মতো চালু হয় জরুরি সতর্কতা-ব্যবস্থা ‘মুন অ্যালার্ট’।

অপ্রতিমের মা নাহিদা বেগমের স্ট্যাটাস ও মুন অ্যালার্টের ফটোকার্ডের পর ফেসবুকে তার নিখোঁজের খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

অপ্রতিম বাসায় না ফেরায় তার সঙ্গে থাকা মুঠোফোনের অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা করা হয়। শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত কোটবাড়ি এলাকার গন্ধমতীতে তার অবস্থান শনাক্ত করা যায়। এরপর থেকে তার সঙ্গে থাকা ফোনটি বন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত পুলিশ বা প্রশাসন কিন্তু অপ্রতিমের সন্ধান দিতে পারেনি। একদল শ্রমিক বাঁশ কাটতে যাওয়ার সুবাদে তার সন্ধান মেলে। তা না হলে হয়তো অপ্রতিমের নিথর দেহে পচন ধরত।

শনিবার বেলা ১১টার দিকে বাঁশ কাটতে গিয়ে লালমাই পাহাড়ের জঙ্গলে অপ্রতিমের লাশ প্রথম দেখতে পান স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ আবদুল কাদের জিলানী ও তার সঙ্গে থাকা কয়েকজন। পেশায় শ্রমিক জিলানী লাশ দেখে ভয় পেয়ে বাঁশ না কেটেই ফিরে গিয়ে অপ্রতিমের সন্ধান দেয়।

বাংলাদেশে শিশুদের ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে চলতি বছরের ২২ মে বিবৃতি দেয় ইউনিসেফ। সংস্থাটির তৎকালীন বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স এসব ঘটনায় দায়মুক্তির অবসানের আহ্বান জানান। ঘর, প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের প্রতিটি পরিসরে শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিতের আহ্বানও উঠে আসে সংস্থাটির বক্তব্যে। অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা, শিশুবান্ধব পুলিশ ও বিচারপ্রক্রিয়া, স্থানীয় সুরক্ষা সেবা এবং মানসিক-সামাজিক সহায়তার ঘাটতি দূর করার প্রতি গুরুত্বারোপ করে ইউনিসেফ। পাশাপাশি স্কুল, মাদরাসা ও কর্মক্ষেত্রেও জবাবদিহি বাড়ানোর কথা তুলে ধরা হয় সংস্থাটির পক্ষ থেকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফাতেমা রেজিনা ইকবাল শিশুহত্যা ও শিশুর প্রতি নির্মমতার মতো অপরাধগুলো নিয়ে খোঁজখবর রাখেন। তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, শিশুদের বিরুদ্ধে এ ধরনের নৃশংসতা একটি সমাজের জন্য খুবই উদ্বেগজনক। এখন প্রশ্ন উঠছে, শিশুদের নিরাপদ জায়গা আসলে কোথায়। খেলার মাঠ, বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে যাওয়া কিংবা পরিবারের সঙ্গে থাকাÑকোনো জায়গাতেই যেন তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

শিশু নিখোঁজ ও নির্যাতিত হওয়ার ঘটনাগুলোর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের বক্তব্য হচ্ছে—‘সরকার তো পরিবারে পরিবারে পাহারা বসাতে পারবে না। অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। ডিভাইস প্রজন্মের ব্যাপারে বাড়তি সতর্কতা থাকতে হবে। সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, বন্ধু হিসেবে কাদের কাছে টানছে, খেলাধুলার সঙ্গী কারা—এসব বিষয়ে পারিবারিক সচেতনতা বেশি জরুরি।’

সরকারের পক্ষ থেকে আরো বলা হয়—‘ঘটনা ঘটার পর অপরাধীদের শনাক্ত করা, আইনের আওতায় আনা এবং বিচারের মুখোমুখি করার বিষয়ে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে কি না, সেটা মূল্যায়ন হতে পারে। সরকার প্রতিটি ঘটনাকে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে যথাযথ দায়িত্ব পালন করছে।’

রাষ্ট্রের এসব বক্তব্য উপেক্ষা বা উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। সাম্প্রতিক সময়ে চাঞ্চল্যকর শিশু ধর্ষণ-হত্যা ও নারী ধর্ষণ-হত্যার ঘটনাগুলোতে দ্রুত তদন্তকাজ সম্পন্ন করে বিচারের মুখোমুখি করার ঘটনা চোখে পড়েছে। গত কয়েক মাসে এ ধরনের অনেকগুলো মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে, অপরাধীদের সাজাও হয়েছে। কিন্তু তার পরও থামছে না কেন? অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত ও বিচার করার পাশাপাশি শিশু নিখোঁজের সঙ্গে সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা জোরদার করার কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া রাষ্ট্রের কর্তব্য।

একই সঙ্গে ভুক্তভোগী পরিবারের প্রতি রাষ্ট্রকে আরো সংবেদনশীল হতে হবে। শিশু নিখোঁজের অভিযোগের পর দায়সারা গোছের আচরণ না করে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে শিশুকে অক্ষত ও জীবিত ফেরানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। সামাজিক সচেতনতা বাড়াতেও রাষ্ট্রের অনেক দায়িত্ব রয়েছে। সমাজে মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করার সময় এসেছে। শিশু-কিশোরদের জন্যও বন্ধু নির্বাচন, মেলামেশা এবং দামি ডিভাইস হাতে একা ঘোরাফেরার বিষয়ে সতর্ক হতে আলাদা মোটিভেশনাল প্রোগ্রাম নেওয়া যেতে পারে। মসজিদের ইমামদের শুক্রবারের আলোচনায় বিষয়টি তুলে ধরার নির্দেশনা দেওয়া যায়। সর্বাত্মক উদ্যোগের মাধ্যমে শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত না করলে এ রাষ্ট্র ও সমাজকে অবশ্যই কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।

লেখক: যুগ্ম সম্পাদক, আমার দেশ ও রাজনীতি বিশ্লেষক

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন