আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ক্যাম্পাস থেকে ক্ষমতার করিডর

শাহীদ কামরুল

ক্যাম্পাস থেকে ক্ষমতার করিডর

বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির বর্তমান চিত্রকে অনেকটা গ্রিক পুরাণের ইকারাসের গল্পের সঙ্গে তুলনা করা যায়। ইকারাস ছিল ডেডালাসের ছেলে, যে পালক ও মোম দিয়ে তৈরি ডানায় ভর করে আকাশে উড়েছিল। কিন্তু তার বাবা তাকে সতর্ক করেছিলেন—অতি উঁচুতে যেও না, সূর্যের উত্তাপে মোম গলে যাবে; আর অতি নিচে যেও না, সাগরের লোনা জল ডানা ভিজিয়ে ফেলবে।’ কিন্তু ইকারাস সেই সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে অহংকারে উঁচুতে উঠতে থাকে। শেষ পর্যন্ত সূর্যের তাপে তার ডানা গলে যায় এবং সে সাগরে পতিত হয়। এই কাহিনি অহংকার, অন্ধ অনুগতি ও আত্মসমালোচনার অভাবের করুণ পরিণতির প্রতীক। বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতি আজ এক জটিল মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে ছাত্রদল, বাম সংগঠন ও ইসলামী ছাত্রশিবির প্রত্যেকেই ভিন্ন ভিন্নভাবে নিজেদের অবস্থান নির্ধারণ করেছে। সাম্প্রতিক পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনের ফলে স্পষ্টভাবে বোঝা গেছে যে ছাত্রদল তাদের সাংগঠনিক শক্তি ও ভোটের কৌশলে পিছিয়ে পড়েছে আর শিবির বরং নতুন প্রজন্মের চোখে বিশ্বাসযোগ্যতার প্রতীক হয়ে উঠতে পেরেছে। ছাত্রদল বহু বছর ধরে বিএনপির ছায়াতলে কাজ করে আসছে এবং সে কারণে তাদের সাংগঠনিক পরিচয় অনেকাংশে বিএনপির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বাস্তবে এই নির্ভরশীলতা তাদের নতুন প্রজন্মের কাছে নেতিবাচক প্রতিচ্ছবি তৈরি করেছে, কারণ তারা স্বাধীন সংগঠন হিসেবে কোনো শক্তিশালী ভিশন দাঁড় করাতে পারেনি। তাদের বড় ভুল হলো এটা গুমান করা যে জামায়াতবিরোধীরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছাত্রদলের পক্ষে ভোট দেবে। এই অনুমান শুধু রাজনৈতিক আলস্য নয়, বরং একধরনের মানসিক স্থবিরতা। অন্যদিকে শিবির ক্যাম্পাসভিত্তিক দৈনন্দিন সমস্যার সমাধানে সক্রিয় থেকেছে, লাইব্রেরি, টিউশন সাপোর্ট, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মতো বিষয় নিয়ে সরাসরি শিক্ষার্থীদের আস্থা অর্জন করেছে। এর ফলে ভোটাররা তাদের কাছে শুধু একটি রাজনৈতিক সংগঠন নয়, বরং শিক্ষার্থী-স্বার্থের বাস্তব রক্ষক হিসেবে দেখেছে।

বিজ্ঞাপন

ছাত্রদলের ব্যর্থতা আরেকটি জায়গায় স্পষ্ট—তাদের ন্যারেটিভের দুর্বলতায়। তারা শিবিরকে পাকিস্তানপন্থি হিসেবে চিহ্নিত করে আক্রমণ করেছে; কিন্তু বাংলাদেশের অনেক শিক্ষার্থী রাজনীতিতে ভারতবিরোধী মনোভাবকে পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ধরে নেয়। ফলে শিবিরের বিরুদ্ধে এই আক্রমণ উলটোভাবে তাদের পক্ষে কাজ করেছে, কারণ ভোটাররা শিবিরকে অ্যান্টি-ইন্ডিয়ান শক্তি হিসেবে দেখে আরো গ্রহণযোগ্য ভেবেছে। ছাত্রদল এই মনস্তত্ত্ব বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে এবং নিজেদের বিকল্প কোনো পরিকল্পনা দাঁড় করাতে পারেনি। তারা প্রতিপক্ষের সমালোচনায় সময় ব্যয় করেছে; কিন্তু নিজেদের ভবিষ্যৎ ভিশন স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করেনি। এর ফলে তাদের রাজনীতি ভোটারদের চোখে প্রতিক্রিয়াশীল ও নিষ্ক্রিয় হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে। এর বিপরীতে শিবিরের প্রার্থীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ছিল শিক্ষাগতভাবে যোগ্য, আচরণে নম্র ও নৈতিকভাবে বিশ্বাসযোগ্য, যা ভোটারদের জন্য আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।

বাম ছাত্রসংগঠনগুলোর অবস্থাও ভিন্নরকম সংকটে ভুগছে। তারা আদর্শিকভাবে শক্তিশালী হলেও সাংগঠনিক বিভাজন ও প্রাত্যহিক ইস্যুতে অক্ষমতা তাদের ভোটে প্রভাব ফেলতে দেয়নি। নানা ভাগে বিভক্ত হয়ে তারা নিজেদের শক্তিকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে বিভক্ত করেছে এবং প্রগতিশীল স্লোগান বাস্তবে ভোটে রূপান্তর করতে পারেনি। ভোটাররা যখন জাতীয় রাজনীতির অ্যান্টি-ইন্ডিয়ান বনাম প্রো-ইন্ডিয়ান মেরূকরণ নিয়ে ভাবছে, তখন বাম সংগঠনের সামাজিক ন্যায়বিচার বা প্রগতিশীল এজেন্ডা অনেকটা অপ্রাসঙ্গিক মনে হয়েছে। এতে প্রমাণিত হয় যে, শুধু সাংস্কৃতিক বা আদর্শিক মূলধন থাকলেই হবে না, রাজনৈতিক মূলধন তৈরি না করতে পারলে সংগঠন ভোটের প্রতিযোগিতায় সফল হতে পারে না।

সামগ্রিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ছাত্রদল শুধু বিএনপির সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে গেলে তারা ক্রমেই আরো দুর্বল হয়ে পড়বে। তাদের প্রয়োজন অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা, নতুন প্রজন্মকে নেতৃত্বে তুলে আনা এবং শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন সমস্যার বাস্তব সমাধান দিতে সক্ষম হওয়া। একই সঙ্গে তাদের সাংগঠনিক অপরাধ ও চাঁদাবাজির মতো অভিযোগ থেকে মুক্ত হয়ে একটি নৈতিক ও শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক চিত্র দাঁড় করাতে হবে।

অন্যদিকে শিবির তাদের শৃঙ্খলা, সততা ও সাংগঠনিক কার্যক্রম দিয়ে ভোটারদের আস্থা অর্জন করেছে, যা তাদের দীর্ঘ মেয়াদে জাতীয় রাজনীতিতেও শক্ত অবস্থান তৈরির সুযোগ করে দিচ্ছে। তাই ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে যদি ছাত্রদল নিজেদের পুনর্গঠন না করে, তবে তারা বিএনপির জন্য সম্পদ নয়; বরং বোঝা হয়ে দাঁড়াবে আর শিবিরের মতো সংগঠনগুলোই শিক্ষার্থীদের আস্থা নিয়ে রাজনৈতিক মূলধন গড়ে তুলবে।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতির আলোকে ছাত্রদলের অবস্থানকে সমালোচনামূলকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাদের কার্যক্রম শুধু একটি ছাত্র সংগঠনের সীমা অতিক্রম করে বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সম্ভাবনাকেও সরাসরি প্রভাবিত করছে। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো তরুণ ভোটারদের আস্থা অর্জন করা। অথচ ছাত্রদল যে রাজনৈতিক অনুশীলন চালিয়ে যাচ্ছে, তা তরুণদের কাছে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। বলতে গেলে, ছাত্রদল তার সাংগঠনিক শক্তিকে ইতিবাচক রাজনৈতিক মূলধনে রূপান্তরিত করতে পারছে না। বরং তারা বিএনপির ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং নির্বাচনি রাজনীতিতে সম্ভাব্য সাফল্যের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বাংলাদেশি প্রেক্ষাপটে আরো গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, আওয়ামী লীগের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ দীর্ঘদিন ধরে সহিংসতা, দখলদারিত্ব ও দুর্নীতির অভিযোগে সমালোচিত। বিরোধী শক্তি হিসেবে ছাত্রদলেরও উচিত ছিল বিকল্প ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির মডেল উপস্থাপন করা। কিন্তু বিশ্লেষণ বলছে, ছাত্রদল সেই সুযোগটি পুরোপুরি হারিয়েছে। তারা গুজারা ১৮ মাসে কী কী করেছে, দেশবাসীর তা ঢের মালুম আছে বলে মনে করি। তারা ক্যাম্পাসে শিবিরবিরোধী স্লোগান দিয়ে কিংবা ছাত্রলীগের সহিংস রাজনীতির প্রতিরূপ হয়ে দাঁড়িয়ে নিজেদের আলাদা করার সুযোগ নষ্ট করেছে। এর ফলে তরুণ ভোটাররা ভাবছেন-‘ছাত্রদল আর ছাত্রলীগের মধ্যে পার্থক্য কোথায়?’ এই প্রশ্নটাই বিএনপির নির্বাচনি সম্ভাবনার জন্য বিপজ্জনক।

আরেকটি সমালোচনার জায়গা হলো ছাত্রদলের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির স্থবিরতা। একদিকে শিবির ধীরে ধীরে নিজেদের সাংগঠনিক সক্ষমতা, শৃঙ্খলা ও ক্যাডারশক্তিকে কাজে লাগিয়ে ক্যাম্পাসে জায়গা করে নিচ্ছে। অন্যদিকে ছাত্রদল এখনো অতীতের সহিংসতার ধারা আঁকড়ে ধরে আছে। বলা যায়, ছাত্রদল যদি আগামী নির্বাচনে বিএনপির জন্য কোনো ইতিবাচক অবদান রাখতে চায়, তবে তাদের অবিলম্বে কৌশল বদলাতে হবে। প্রথমত, শিক্ষার্থীদের বাস্তব ইস্যু-বেকারত্ব, বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত দুরবস্থা, সেশনজট, গবেষণার সংকট, ডিজিটাল দক্ষতা-এসব প্রশ্নে নেতৃত্ব দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, সংগঠনের ভেতরে গণতন্ত্র ও স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে হবে, যাতে তরুণরা সত্যিকারভাবে ছাত্রদলকে ‘আশার প্রতীক’ হিসেবে ভাবতে পারে। বাংলাদেশের নির্বাচনি বাস্তবতায় ছাত্রদলের সংকট আরো বড় হয়ে ওঠে, যখন দেখা যায়, তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রলীগের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা কমলেও বিকল্প হিসেবে ছাত্রদলকে বিশ্বাস করতে মানুষ দ্বিধাগ্রস্ত। এর ফলে শিবির ধীরে ধীরে শিক্ষাঙ্গনে নিজেদের জায়গা পাকা করছে, কারণ তাদের শৃঙ্খলা, সাংগঠনিক কাঠামো ও ‘অনেস্ট পলিটিকস’ (honest politics) প্রচারের ধারা তরুণদের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করছে। বলতে গেলে, যদি বিএনপি আগামী নির্বাচনে টিকে থাকতে চায়, তবে তাদের সবচেয়ে বড় কাজ হবে ছাত্রদলকে পুনর্গঠন করা। না হলে ছাত্রদল বিএনপির জন্য সম্পদ নয়, বরং দায় হয়ে থাকবে।

বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতি নিয়ে যখন আমরা ক্রিটিক্যালি চিন্তায় প্রবেশ করি, তখন ছাত্রদলকে নিছক একটি সাংগঠনিক বাহু হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়; বরং এটিকে বিএনপির রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, কৌশল, এমনকি সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন হিসেবেও বোঝা জরুরি। এ জায়গায় অ্যান্টোনিও গ্রামশির hegemony তত্ত্ব প্রাসঙ্গিক। ছাত্রদল ক্যাম্পাসে যে ক্ষমতার প্রদর্শন করে, তা মূলত শাসকশ্রেণির ‘consent’ উৎপাদনের একটি ব্যর্থ প্রয়াস-কারণ দমন ও পেশিশক্তি দিয়ে সাময়িক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হলেও তা কখনো ‘cultural hegemony’ প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। অন্যদিকে দার্শনিক হান্না আরেন্ট রাজনৈতিক হিংসা বিষয়ে বলেছেন, সহিংসতা ক্ষমতার বিকল্প নয়, বরং ক্ষমতার দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ। ছাত্রদলের বর্তমান আচরণ-উচ্ছৃঙ্খলতা বা শিবিরের বিরুদ্ধে হিংসাত্মক স্লোগান-এই দুর্বলতার প্রতিফলন। ফলে তারা বিএনপির জন্য সম্পদ নয়, বরং বোঝা হয়ে উঠছে।

এখানে মিশেল ফুকোর ক্ষমতা-জ্ঞান তত্ত্বও আলোচনায় আনা যায়। ফুকো দেখিয়েছেন, ক্ষমতা শুধু দমন নয়, বরং জ্ঞানের কাঠামো তৈরি করেও সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করে। ছাত্রদল যদি সত্যিই প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব করতে চাইত, তবে তাদের দায়িত্ব হতো জ্ঞানতাত্ত্বিক পরিসরে-শিক্ষার্থীদের মৌলিক দাবি, ন্যায্য শিক্ষা বাজেট, গবেষণা, সাংস্কৃতিক কর্মসূচি-এসবকে রাজনৈতিক এজেন্ডায় রূপান্তর করা। কিন্তু তাদের অনুশীলিত রাজনীতি শুধু ‘disciplinary power’-এর এক নিম্নমানের অনুকরণে সীমিত, যেখানে ভয়, দখল ও আনুগত্যের সংস্কৃতি তৈরি হয়। ফরাসি দার্শনিক জ্যাঁ-পল সার্ত্রের অস্তিত্ববাদী দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে ছাত্রদলের সংকট আরো প্রকট। সার্ত্রে বলেছেন, মানুষকে ‘authentic choice’ করতে হয় নিজের স্বাধীনতার দায় নিয়ে। অথচ ছাত্রদলের তরুণ কর্মীরা নিজেরা স্বাধীনভাবে চিন্তা করার পরিবর্তে পুরোনো রাজনৈতিক ধারা-মারধুর, স্লোগান, চাঁদাবাজি-এই পূর্বনির্ধারিত পথকেই ‘অস্তিত্ব’ ভেবে বেছে নিচ্ছে। এর ফলে তাদের রাজনীতি শুধু ‘bad faith’-এ আটকে যাচ্ছে, যেখানে স্বাধীনতার সুযোগ থাকলেও তারা দায়িত্বহীনতার শরণাপন্ন হচ্ছে।

জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের দার্শনিক অ্যাডর্নো ও হর্কহাইমার দেখিয়েছেন, ক্ষমতার কাঠামো তখনই পুনরুৎপাদিত হয়, যখন মানুষ সমালোচনার বদলে অন্ধ অনুগতিতে প্রবৃত্ত হয়। ছাত্রদলের ক্ষেত্রে এই অন্ধ অনুগতিই তাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা : তারা বিএনপির ছায়ায় থেকে নতুন প্রজন্মের প্রশ্ন-ডিজিটাল কানেকটিভিটি, গ্লোবালাইজেশনের চ্যালেঞ্জ, জলবায়ু সংকট, শিক্ষা-সংস্কার-এসব আলোচনার পরিবর্তে শুধু অতীতের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা পুনরাবৃত্তি করছে।

বাংলাদেশি প্রেক্ষাপটে বলা যায়, ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, তা যদি ছাত্রদল আবার ক্যাম্পাসে পুরোনো দখলদারিত্ব ফিরিয়ে আনে, তবে তা শুধু ছাত্ররাজনীতির ব্যর্থতা নয়; বরং জাতির ভবিষ্যৎকেই অন্ধকারে ঠেলে দেবে। এর প্রতিষেধক হতে পারে দার্শনিক জুর্গেন হাবারমাসের communicative action তত্ত্ব, যেখানে যুক্তি, সংলাপ ও পারস্পরিক স্বীকৃতির মাধ্যমে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি হয়। ছাত্রদলের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে এই রূপান্তরের ওপর : তারা কি সহিংসতাভিত্তিক পুরোনো রাজনীতি ধরে রাখবে, নাকি নতুন গণতান্ত্রিক সংলাপমুখী, জ্ঞানভিত্তিক রাজনীতির দিকে যাবে। আজ ছাত্রদলও অনেকটা সেই ইকারাসের মতো আচরণ করছে। তারা বিএনপির ছায়ায় ভর করে রাজনীতির আকাশে উড়তে চেয়েছিল, কিন্তু নিজেদের আলাদা পরিচয় ও কৌশল তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাদের অহংকার ছিল-‘যারা জামায়াতবিরোধী, তারাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে আমাদের ভোট দেবে।’ বাস্তবে এই ভুল ধারণা তাদের ডানা গলিয়ে দিয়েছে। শিবির যখন সতর্কভাবে শিক্ষার্থীদের সমস্যার সমাধানে নিজেদের ‘ডানা’ শক্ত করছিল, তখন ছাত্রদল অন্ধভাবে অতীতের সহিংসতা, প্রতিপক্ষবিরোধী স্লোগানের মোমে নিজেদের রাজনীতি বাঁধছিল। এতে ফল হয়েছে ইকারাসের মতো-তাদের সংগঠন আস্থা হারিয়েছে এবং তরুণদের চোখে ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছে।

এই গল্প আমাদের শেখায়, যে সংগঠন আত্মসমালোচনা করে না, যারা শুধু পুরোনো তরিকা অনুসরণ করে আর যারা অহংকারে নিজেদের অন্ধ করে রাখে-তাদের পতন অবশ্যম্ভাবী। ইকারাস যেমন সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে ধ্বংস হয়েছিল, তেমনি ছাত্রদলও যদি সতর্ক না হয়, তবে তারাও রাজনৈতিক ইতিহাসের সাগরে ডুবে যাবে।

আজ বাস্তবতা কঠিন কিন্তু পরিষ্কার। ছাত্রদল যদি নিজেদের বদলাতে না পারে, তবে তারা বিএনপির জন্য সম্পদ নয়, বোঝা হয়ে থাকবে। আর শিবির যদি তাদের বর্তমান শৃঙ্খলা, আচরণ ও শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক রাজনীতি ধরে রাখতে পারে, তবে তারা শুধু ক্যাম্পাসেই নয়, ভবিষ্যতের জাতীয় রাজনীতিতেও একটি কার্যকর শক্তি হয়ে উঠবে।

শেষ পর্যন্ত রাজনীতি কোনো স্মৃতিচারণ নয়, এটি বর্তমানের সঙ্গে সৎ থাকার লড়াই। যে সংগঠন সময়কে বোঝে, মানুষকে শোনে এবং নিজের অহংকারকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে-ইতিহাস তার পক্ষেই দাঁড়ায়। আর যে সংগঠন তা পারে না, তার জন্য ইতিহাস কখনো দয়ালু হয় না।

লেখক : সাবেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, লেখক ও গবেষক, ফ্রাই ইউনিভার্সিটি বার্লিন, জার্মানি

যোগাযোগ : sahidkamrul25@gmail.com

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন