সংসদ কি সরকারের রাবার স্ট্যাম্প

সংসদ কি সরকারের রাবার স্ট্যাম্প

বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রে জাতীয় সংসদের দুটি মৌলিক দায়িত্ব—একদিকে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে আইনপ্রণয়ন, অন্যদিকে সরকারের কর্মকাণ্ডের ওপর কার্যকর নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। কিন্তু সাম্প্রতিক সংসদীয় কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—এ দুই ক্ষেত্রেই কি জাতীয় সংসদ ধীরে ধীরে তার কার্যকারিতা হারাচ্ছে? প্রশ্নটি শুধু রাজনৈতিক নয়; এটি সাংবিধানিক। সংবিধানের ৬৫(১) অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের আইনপ্রণয়ন-ক্ষমতা সংসদের উপর ন্যস্ত হইবে।’ অর্থাৎ আইনপ্রণয়ন সরকারের কোনো মন্ত্রণালয়, আমলাতন্ত্র বা নির্বাহী বিভাগের মূল দায়িত্ব নয়; চূড়ান্ত আইনপ্রণয়ন ক্ষমতার সাংবিধানিক কেন্দ্র হলো জাতীয় সংসদ। একইভাবে, সংবিধানের ৫৫(৩) অনুচ্ছেদ ঘোষণা করছে, ‘মন্ত্রিসভা যৌথভাবে সংসদের নিকট দায়ী থাকিবেন।’ অর্থাৎ সংসদ শুধু আইন পাস করার প্রতিষ্ঠান নয়; সরকারের নির্বাহী কর্মকাণ্ডের ওপর জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানও বটে। কিন্তু আইনপ্রণয়নের সাম্প্রতিক চর্চা দেখে মনে হচ্ছে, সংসদের এই সাংবিধানিক ভূমিকার সঙ্গে বাস্তব কার্যপ্রণালির একটি বিপজ্জনক দূরত্ব তৈরি হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

আইনপ্রণয়নের জন্য কি সংসদকে যথেষ্ট সময় দেওয়া হচ্ছে?

সংসদের কার্যপ্রণালি-বিধি পড়লে একটি বিষয় খুব স্পষ্ট হয়—আইনপ্রণয়ন প্রক্রিয়ায় সংসদ সদস‍্যদের কার্যকর অংশগ্রহণের জন‍্য বিভিন্ন স্তরে সময় নিয়ে যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগ রাখা হয়েছে। সরকারি বিল উত্থাপনের আগে নোটিস, বিলের কপি ও উদ্দেশ্য-কারণসংবলিত বিবৃতি দেওয়ার বিধান রয়েছে। বিধি ৭৫ অনুযায়ী সরকারি বিল উত্থাপনের জন্য সাধারণভাবে সাত দিনের লিখিত নোটিসের বিধান রয়েছে, যদিও স্পিকার যথেষ্ট কারণ থাকলে এ সময় শিথিল করতে পারেন। এরপর আসে আরো গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। বিধি ৭৭ অনুযায়ী বিল উত্থাপনের পর সেটি অবিলম্বে বিবেচনা করা, নির্দিষ্ট ভবিষ্যৎ তারিখে বিবেচনা করা, কোনো স্থায়ী বা বাছাই কমিটিতে পাঠানো অথবা জনমত যাচাইয়ের জন্য প্রচারের প্রস্তাব করা যেতে পারে। কিন্তু সদস্যদের ব্যবহারের জন্য বিলের কপি না পৌঁছানো পর্যন্ত এ ধরনের প্রস্তাব করা যাবে না এবং প্রস্তাবের অন্তত তিন দিন আগে বিলের কপি সদস্যদের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ রাখা হয়েছে।

এখানেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো—কার্যপ্রণালি-বিধির কাঠামো আইনকে ‘যত দ্রুত সম্ভব পাস’ করার জন্য তৈরি হয়নি; বরং সংসদ সদস্যদের বিল পরীক্ষা, বিতর্ক, সংশোধন এবং প্রয়োজন হলে কমিটিতে পাঠানোর সুযোগ দেওয়ার জন্য তৈরি হয়েছে। বিধি ৭৮-এ বিলের নীতি ও সাধারণ বিধান নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ রয়েছে। এরপর বিল সংশ্লিষ্ট স্থায়ী বা বাছাই কমিটিতে পাঠানো যেতে পারে। আর কমিটির রিপোর্ট সংসদে উপস্থাপনের পরও বিষয়টি সেখানেই শেষ হয়ে যায় না। বিধি ৮০ অনুযায়ী সংসদ প্রয়োজনবোধে বিলটিকে একই কমিটিতে বা অন্য স্থায়ী কমিটিতে আবার পাঠাতে পারে; এমনকি জনমত যাচাই বা অধিকতর জনমত যাচাইয়ের জন্য প্রচারের ব্যবস্থাও করা যেতে পারে। অর্থাৎ বিধির কাঠামোতেই দেখা যাচ্ছে, আইনপ্রণয়ন একটি ডিলিব্যারেটিভ প্রসেসÑঅর্থাৎ আলোচনা, পরীক্ষা, সংশোধন ও পর্যালোচনার প্রক্রিয়া।

সংবিধানও সংসদীয় কমিটিকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দিয়েছে

এটি শুধু কার্যপ্রণালি-বিধির বিষয় নয়। সংবিধানের ৭৬(২)(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদের স্থায়ী কমিটি ‘ড্র্যাফট বিলস অ্যান্ড আদার লেজিসলেটিভ প্রপোজালস’ (Draft Bills and other legislative proposals) পরীক্ষা করতে পারে। একই অনুচ্ছেদের অধীনে কমিটি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম বা প্রশাসন তদন্ত করতে পারে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য ও প্রশ্নের উত্তর চাইতে পারে। সংবিধানের ৭৬(৩) অনুচ্ছেদে আইন দ্বারা কমিটিকে সাক্ষী হাজির করা এবং দলিলপত্র দাখিলে বাধ্য করার ক্ষমতাও দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। কার্যপ্রণালি-বিধিতেও এই ক্ষমতার বাস্তব রূপ রয়েছে। বিধি ২০২-২০৫-এর কাঠামো অনুযায়ী সংসদীয় কমিটি দলিল ও রেকর্ড তলব করতে পারে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে হাজির করতে পারে এবং শপথের মাধ্যমে সাক্ষ্য গ্রহণ করতে পারে। তাহলে প্রশ্ন হলো—একটি গুরুত্বপূর্ণ আইন যদি সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো হয়, কিন্তু কমিটিকে মাত্র দুই কার্যদিবসের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলা হয়, তাহলে সংবিধান ও কার্যপ্রণালি-বিধিতে যে সাবস্ট্যানটিভ স্ক্রুটিনি (Substantive Scrutiny) বা গভীর যাচাই-বাছাইয়ের ধারণা রয়েছে, সেটি বাস্তবে কতটা সম্ভব?

১১ দিনের অধিবেশন, ছয়টি বিল এবং সংসদীয় বিতর্কের সংকোচন

বর্তমান সংসদের তৃতীয় অধিবেশন ছিল মাত্র ১১ দিনের। এ সময়ের মধ্যে ছয়টি বিল পাস করা হয়েছে। বিলগুলোর ওপর আলোচনা করতে আগ্রহী সংসদ সদস্যদের ক্ষেত্রে অনেক সময় এক মিনিটের মতো সময় নির্ধারণ করা হয়েছে; অনুরোধের পর কোথাও কোথাও দুই থেকে তিন মিনিট পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে। আইনপ্রণয়ন কি সত্যিই এত অল্প সময়ে সম্পন্ন করার বিষয়? একজন সংসদ সদস্য যখন একটি বিল নিয়ে বক্তব্য দেন, তখন তিনি শুধু নিজের রাজনৈতিক মতামত প্রকাশ করেন না। তিনি বিলটির সাংবিধানিক বৈধতা, বিদ্যমান আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্য, নাগরিক অধিকার, প্রশাসনিক প্রভাব, আর্থিক প্রভাব এবং বাস্তব প্রয়োগযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন। দুই মিনিটে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিলের এসব দিক বিশ্লেষণ করা কার্যত অসম্ভব। অন্যদিকে, কার্যপ্রণালি-বিধির ৯১ অনুযায়ী বিল গ্রহণের পক্ষে বা বিপক্ষে বিতর্কের সুযোগ রয়েছে এবং সদস্য তার যুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় বক্তব্য দিতে পারেন। একই বিধিতে বলা হয়েছে, বক্তব্য সাধারণ প্রকৃতির হবে এবং বিলের খুঁটিনাটি আলোচনার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অর্থাৎ বিধির উদ্দেশ্য হলো যুক্তিনির্ভর সংসদীয় বিতর্ক—শুধু দ্রুত ভোটে যাওয়ার প্রক্রিয়া নয়।

কমিটিকে যদি সময়ই না দেওয়া হয়, তাহলে কমিটি করবে কী?

আরো উদ্বেগের জায়গা হলো সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। বিধি ৭৭ বিলকে স্থায়ী কমিটিতে পাঠানোর সুযোগ দিয়েছে। সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদ কমিটিকে ড্রাফট বিল (Draft Bill) পরীক্ষা করার ক্ষমতা দিয়েছে। কার্যপ্রণালি-বিধি কমিটিকে নথি তলব, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ডাকাসহ সাক্ষ্যগ্রহণের ক্ষমতা দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে যদি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিল কমিটিতে পাঠিয়ে বলা হয়—দুই কার্যদিবসের মধ্যে রিপোর্ট দিতে হবে—তাহলে কমিটি কীভাবে তার সাংবিধানিক ও বিধিগত দায়িত্ব পালন করবে? একটি জনগুরুত্বপূর্ণ বিল নিয়ে কমিটির উচিত হতে পারে—

প্রথমত, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে বিল তৈরির পটভূমি ও জাস্টিফিকেশন (Justification) নেওয়া।

দ্বিতীয়ত, বিদ্যমান আইনের সঙ্গে প্রস্তাবিত আইনের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা।

তৃতীয়ত, সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, পেশাজীবী, নাগরিক সমাজ, মানবাধিকার সংগঠন এবং অন্যান্য অংশীজনের মতামত নেওয়া।

চতুর্থত, প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের সাক্ষ্য গ্রহণ করা।

পঞ্চমত, প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও তথ্য তলব করা।

ষষ্ঠত, বিলের প্রতিটি ধারা সংবিধান, প্রচলিত আইন এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা পরীক্ষা করা।

দুই কার্যদিবসে এই কাজগুলো বাস্তবে করা সম্ভব নয়।

মানবাধিকার কমিশন বিলের অভিজ্ঞতা কী বলছে?

মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত বিলটি এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। আইন মন্ত্রণালয় অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করেছে এবং অনলাইনে মতামত আহ্বান করেছে—এটি ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু সংসদীয় পর্যায়ে মূল প্রশ্ন হলো, সেই মতামতগুলোর কতটুকু বিলের চূড়ান্ত খসড়ায় প্রতিফলিত হয়েছে? কোন কোন মানবাধিকার সংগঠন কী সুপারিশ করেছে? কোন সুপারিশ গ্রহণ করা হয়েছে এবং কোনটি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে? প্রত্যাখ্যান করা হলে কেন? প্রস্তাবিত বিধানগুলো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ? এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথি ও মতামত সংসদীয় কমিটির সামনে পর্যাপ্তভাবে উপস্থাপিত না হলে সংসদ কীভাবে ইনফর্মড লেজিসলেটিভ জাজমেন্ট (Informed legislative judgment) বা তথ্যভিত্তিক আইনগত সিদ্ধান্ত নেবে? এই বিলটি আমাদের আন্তর্জাতিক যে কমিটমেন্টগুলো ছিল, সেটি কতটুকু পূরণ করতে পেরেছে? এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব‍্যক্তি ও অংশীজনের সঙ্গে স্থায়ী কমিটির মতবিনিময়ের সুযোগ দেওয়া উচিত ছিল, যেটি হয়নি। জনমত গ্রহণ করা এবং সেই জনমতের সংসদীয় মূল্যায়ন করা—দুটি ভিন্ন বিষয়। প্রথমটি করলেই দ্বিতীয়টি নিশ্চিত হয় না।

আমলাতন্ত্র খসড়া করে, নির্বাহী বিভাগ পরীক্ষা করে—সংসদের ভূমিকা কোথায়?

আইনপ্রণয়নের বর্তমান কাঠামো নিয়ে আরো মৌলিক একটি প্রশ্ন রয়েছে। সাধারণত কোনো আইনপ্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। খসড়া প্রণয়নে আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর বড় ভূমিকা থাকে। এরপর মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয় এবং মন্ত্রিসভা পর্যায়ে খসড়াটি নানা ধাপে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সংসদে পাঠানো হয়। অর্থাৎ সংসদে একটি বিল আসার আগেই নির্বাহী বিভাগের হাতে সেটি নিয়ে দীর্ঘ সময় কাজ করার সুযোগ থাকে। কিন্তু বিল সংসদে আসার পর সংসদ সদস্যদের হাতে যদি পর্যাপ্ত সময় না থাকে, যদি বিলের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সময়মতো না পৌঁছায়, যদি আগের আইনের কপি বা কম্পারেটিভ স্টেটমেন্ট (Comparative Statement) না দেওয়া হয়, যদি কমিটিকে দু-চার কার্যদিবসের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলা হয় এবং সদস্যদের আলোচনার সময় দু-তিন মিনিটে সীমিত রাখা হয়—তাহলে সাংবিধানিকভাবে আইনপ্রণয়নের ক্ষমতা সংসদের হাতে থাকলেও বাস্তবে আইনটির সাবস্ট্যানটিভ স্ক্রুটিনি (Substantive Scrutiny) কোথায় হচ্ছে? এখানে একটি মৌলিক ইনস্টিটিউশনাল ইমব্যালেন্স (Institutional Imbalance) তৈরি হয়। আইনের খসড়া তৈরি করছে আমলাতন্ত্র; পরীক্ষা করছে নির্বাহী বিভাগ; কিন্তু চূড়ান্ত আইনপ্রণয়নকারী সংসদ পর্যাপ্ত সময় ও তথ্য ছাড়া শুধু অনুমোদনের জায়গায় পরিণত হলে সংসদের সাংবিধানিক ভূমিকা দুর্বল হয়ে পড়ে।

দ্রুত আইন মানেই ভালো আইন নয়

রাষ্ট্র পরিচালনায় জরুরি আইন কখনো কখনো দ্রুত পাস করার প্রয়োজন হতে পারে। কার্যপ্রণালি-বিধিও সেই বাস্তবতা অস্বীকার করে না। সরকারি বিল উত্থাপনের সাত দিনের নোটিসের ক্ষেত্রেও স্পিকার যথেষ্ট কারণ থাকলে সময় শিথিল করতে পারেন। অন্তর্বর্তী সরকারের কারা ১৩৩টি অধ‍্যাদেশ পাসের ক্ষেত্রে ৩০ দিনের বাধ‍্যবাধকতা ছিল। সে ক্ষেত্রে বিল পাসে তাড়াহুড়ো করা যুক্তিযুক্ত হতেই পারে। কিন্তু এক্সেপশন শুড নট বিকাম দ্য নর্ম (Exception should not become the norm). জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত আইন করা এক বিষয়। আর সাধারণ ও জনগুরুত্বপূর্ণ আইনকে নিয়মিতভাবে এমন গতিতে পাস করা, যাতে সংসদ সদস্যরা যথাযথভাবে পড়ার, বোঝার, প্রশ্ন করার ও সংশোধনের সুযোগ না পান—তা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। ভালো আইনপ্রণয়নের মাপকাঠি কতটি আইন কত দিনে পাস হলো, তা নয়। বরং মাপকাঠি হওয়া উচিত—আইনটি কতটা যাচাই-বাছাই হয়েছে, কতটা অংশীজনের মতামত প্রতিফলিত হয়েছে, কতটা সাংবিধানিক ও মানবাধিকারসম্মত হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আইনটির আনইনটেনডেড কনসিকুয়েনসেস (Unintended Consequences) কতটা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

সংসদ কি তাহলে রাবার স্ট্যাম্পে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে?

একটি সংসদকে কার্যকর সংসদ বলা যায় তখনই, যখন সরকার জানে তার প্রস্তাবিত প্রতিটি আইন সংসদে কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হবে; সংসদীয় কমিটি প্রয়োজনে নথি চাইবে; বিশেষজ্ঞদের ডাকবে; সংশোধনী আনবে এবং বিরোধী দলের বক্তব্যকে শুধু রাজনৈতিক বিরোধিতা হিসেবে নয়, লেজিসলেটিভ স্ক্রুটিনি (Legislative Scrutiny)-এর অংশ হিসেবে বিবেচনা করবে। কিন্তু যদি সংসদের কাজ মূলত সরকারের উপস্থাপিত বিল দ্রুত অনুমোদন করা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সংসদীয় গণতন্ত্রের একটি মৌলিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। এটি সরকারবিরোধী বা সরকারপন্থি হওয়ার প্রশ্ন নয়। এটি ইনস্টিটিউশনাল ইন্টেগ্রিটি (Institutional Integrity)-এর প্রশ্ন। কারণ আগামীকাল সরকার পরিবর্তন হতে পারে। আজকের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল আগামীকাল বিরোধী দলে যেতে পারে। কিন্তু সংসদীয় প্রতিষ্ঠানটি থেকে যায়। আজ যদি আমরা সংসদের লেজিসলেটিভ স্ক্রুটিনি (Legislative Scrutiny) দুর্বল করি, আগামীকাল একই দুর্বল প্রতিষ্ঠান যেকোনো সরকারের হাতে আরো দুর্বল হয়ে পড়বে।

কী করা প্রয়োজন?

প্রথমত, জনগুরুত্বপূর্ণ ও জটিল বিলের ক্ষেত্রে স্থায়ী কমিটিকে বাস্তবসম্মত সময় দিতে হবে। দুই কার্যদিবসের মতো অতি সংক্ষিপ্ত সময়সীমা দিয়ে কমিটির সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন আশা করা যায় না।

দ্বিতীয়ত, কমিটিকে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সুযোগ দিতে হবে—বিশেষ করে মানবাধিকার, বিচার, মৌলিক অধিকার, অর্থনীতি ও ব্যক্তিগত আইনসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিলের ক্ষেত্রে।

তৃতীয়ত, কমিটিকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থার কাছ থেকে প্রয়োজনীয় নথি, কম্পারেটিভ স্টেটমেন্ট, ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট (Comparative Statement, Impact Assessment এবং মতামত চাওয়ার বাস্তব সুযোগ দিতে হবে। কার্যপ্রণালি-বিধির ২০২ ও ২০৩-এ কমিটির নথি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে তলবের যে ক্ষমতা রাখা হয়েছে, সেটিকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে হবে।

চতুর্থত, সংসদ সদস্যদের হাতে বিলের কপি ও সংশ্লিষ্ট নথি পর্যাপ্ত সময় আগে পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে। বিধি ৭৭ নিজেই সদস্যদের কাছে বিলের কপি পৌঁছানোর আগে সংশ্লিষ্ট প্রস্তাব না তোলার এবং ন্যূনতম তিন দিনের ব্যবধানের সুরক্ষা দিয়েছে।

পঞ্চমত, বিলের ওপর আলোচনা শুধু আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখা যাবে না। প্রয়োজনীয় সময় দিতে হবে। দুই মিনিটে একজন সংসদ সদস্যের বক্তব্য সীমাবদ্ধ করলে সংসদীয় বিতর্কের গুণগত মান স্বাভাবিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

ষষ্ঠত, কমিটির রিপোর্টে ভিন্নমত থাকলে সেই ডিসেন্টিং ওপিনিওন (Dissenting opinion) যথাযথভাবে প্রকাশ ও আলোচনার সুযোগ রাখতে হবে। কার্যপ্রণালি-বিধির কাঠামোতেই কমিটির সদস্যের মতপার্থক্যপূর্ণ মন্তব্য লিপিবদ্ধ করার সুযোগ রয়েছে।

সবশেষে, সংসদকে শুধু ল-পাসিং ইনস্টিটিউশন (Law-passing institution) হিসেবে দেখলে চলবে না; সংসদকে হতে হবে ল-ম্যাকিং ইনস্টিটিউশন (Law-making institution)। দুটির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য আছে। আইন পাস করা যায় কয়েক মিনিটে। কিন্তু একটি ভালো আইন তৈরির জন্য প্রয়োজন সময়, তথ্য, বিতর্ক, বিশেষজ্ঞ মতামত, অংশীজনের অংশগ্রহণ এবং সংসদীয় স্ক্রুটিনি (Scrutiny)। বাংলাদেশের সংবিধান আইনপ্রণয়নের ক্ষমতা সংসদের ওপর ন্যস্ত করেছে। সংবিধান সংসদীয় কমিটিকে ড্রাফট বিলস (Draft Bills) পরীক্ষা করার দায়িত্ব ও ক্ষমতাও দিয়েছে। সুতরাং প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত দাঁড়ায়— আমরা কি সংসদকে তার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করার সুযোগ দিচ্ছি? যদি একটি বিলের খসড়া তৈরি হয় সংসদের বাইরে, দীর্ঘ সময় ধরে পরীক্ষা হয় নির্বাহী বিভাগের মধ্যে, আর সংসদে এসে সেটি সদস্যদের পর্যাপ্ত সময়, তথ্য ও আলোচনার সুযোগ ছাড়াই দ্রুত পাস হয়ে যায়—তাহলে আইনপ্রণয়নের ক্ষেত্রে সংসদের সাংবিধানিক ক্ষমতা কাগজে অক্ষুণ্ণ থাকলেও তার বাস্তব কার্যকারিতা প্রশ্নের মুখে পড়ে। সংসদকে রাবার স্ট্যাম্পে পরিণত করা কোনো দলের জন্য দীর্ঘ মেয়াদে কল্যাণকর নয়। কারণ শক্তিশালী সংসদ শুধু বিরোধী দলের প্রয়োজন নয়; শক্তিশালী সংসদই একটি জবাবদিহিমূলক সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা। বাংলাদেশে কার্যকর সংসদীয় গণতন্ত্র চাইলে তাই আইন পাসের গতি নয়, আইনপ্রণয়নের মান ও সংসদীয় যাচাই-বাছাইয়ের গভীরতাই আমাদের প্রধান বিবেচনা হওয়া উচিত।

লেখক: জাতীয় সংসদ সদস্য

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...