এক.
মওলানা ভাসানীর মৃত্যুর পর ‘খামোশ’ বলে গর্জনটি শোনা যায় নাই! তেমনিভাবে এখন থেকে ‘দেশ বাঁচাও মানুষ বাঁচাও’ ডাকটি আর তেমন করে শোনা যাবে না। বলাই বাহুল্য, এই দুঃসংবাদটি শোনার জন্য জাতির এক ধরনের আতঙ্কমিশ্রিত প্রস্তুতি ছিল।
আজকের এই লেখাটি প্রায় শেষ করে গত পরশু যথারীতি আলফাজ ভাইয়ের কাছে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। সেই মুহূর্তেই জানতে পারলাম, দেশনেত্রী এই দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছেন! তখন আলফাজ আনাম ভাই জানালেন, পরদিন বুধবার বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে কিছু লেখা দিতে হবে। আমাকে অনুরোধ করলেন, ‘আপনার লেখাটি পরের দিন ছাপা হবে, পারলে ম্যাডাম সম্পর্কে কিছু কথা যোগ করে দিন!’
ড্রাফটটির দিকে নতুন করে চোখ বুলিয়ে দেখলাম, আশ্চর্যভাবে পুরো লেখাটিই ইতোমধ্যে যেন ম্যাডামের কথাই বলছে। এতে সামান্য ঘষামাজা করলেই লেখাটি ম্যাডামকে আরো স্পষ্ট এবং আরো যথাযথভাবে তুলে ধরবে। ভেবে অবাক হলাম, এই মহীয়সী নারী কেমন করে যেন আমাদের মন ও মননের অনেকটাই দখল করে আছেন!
জাতির সব অনুভব, আনন্দ বা বেদনার সঙ্গে এভাবেই মিশে গেছেন বেগম খালেদা জিয়া—দিনাজপুরের ইসকান্দার সাহেবের আদরের সেই ‘পুতুল’! ৮০ বছরের এই জীবনটায় কমপক্ষে ৫০ বছর কাটিয়েছেন জীবনসংগ্রামের ভেতর দিয়েই। বিয়ের পরপরই ১৯৬৫ সালে একমাত্র সন্তানকে কোলে নিয়ে যুদ্ধরত ক্যাপ্টেন স্বামীর জন্য উৎকণ্ঠা; জীবনে একটু স্থিতি আসতেই আবারও ১৯৭১-এর যুদ্ধে স্বামীর আরো বলিষ্ঠ ভূমিকা এবং তার ফলে ছোট দুই সন্তানকে নিয়ে কঠিন জীবনসংগ্রাম; আবার ১৯৭৫ সালে স্বামীর সঙ্গে টালমাটাল জীবন। ১৯৮১ সালে মাত্র ৩৫ বছর বয়সে তিনি অকাল বৈধব্য বরণ করেন এবং তারপর থেকেই স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রাণপণ যুদ্ধ চালিয়ে যান! ১৯৯১ সাল থেকে একটু স্থিতির পর ২০০৬ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আরো ভয়ংকর সংগ্রাম শুরু হয়। এক-এগারো সবকিছু তছনছ করে দেয়। তার বড় ছেলেকে পঙ্গু বানিয়ে লন্ডনে নির্বাসনে পাঠানো হলো এবং ছোট সন্তানকেও মানসিক নিপীড়ন করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হলো। নিজের সন্তান-সন্ততিদের সংস্পর্শে থাকার ভাগ্য হলো না জীবনের শেষ ১৮টি বছর! জানি না জীবনে এরকম কঠিন সংগ্রামের ভেতর দিয়ে তার লেবেলের আরো কাউকে কাটাতে হয়েছে কি না। এত কিছুর পরেও তিনি আধিপত্যবাদের লেসপেন্সারদের কাছে আপস করেননি!
বেগম খালেদা জিয়ার এই দেহাবসান কোনো সাধারণ মৃত্যু নয়—এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। যে কারণে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে, শহীদ আবরারকে, শহীদ হাদিকে হত্যা করা হয়েছে—সেই একই কারণে বেগম খালেদা জিয়াকে এই মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। তবে সরাসরি নয়, ধীরে ধীরে, তিলে তিলে। কারণ তিনি আপস করেননি; কোনো অবস্থাতেই দেশ ছাড়েননি, দেশের মানুষকে ছেড়ে যাননি। এই অনমনীয় অবস্থানই তার জন্য মৃত্যুর পথ তৈরি করে দিয়েছিল। তিনি জানতেন ঝুঁকি কী, তবু পিছু হটেননি। এজন্যই ইতিহাসের বিচারে তিনিও একজন শহীদ।
পরম করুণাময়ের কাছে প্রার্থনা—হে আল্লাহ, আপনি তাকে শহীদের মর্যাদায় কবুল করুন। কারণ আধিপত্যবাদের সামনে তিনি ছিলেন সবচেয়ে বড় হুমকি। জীবনের শেষ কয়টি বছর জেলে এবং গৃহবন্দিত্বে কাটালেও তিনিই ছিলেন প্রতিরোধের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রেরণা। দেশের মাটিতে তার নিঃশব্দ অবস্থানই লাখো মানুষের মনে সাহস জুগিয়েছে, লড়াইয়ের ভাষা শিখিয়েছে। হাজার হাজার হাদি তাকে দেখেই প্রেরণা পেয়েছে!
‘দেশ বাঁচাও, মানুষ বাঁচাও’—এই ডাকটি কেবল একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এটি ছিল জাতির জন্য একটি চিরন্তন সতর্ক সংকেত। আর ঠিক এ কারণেই সেই কণ্ঠকে স্তব্ধ করা প্রয়োজন মনে করা হয়েছিল। তার কণ্ঠ থামাতে না পেরে তাকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে—এমন বিশ্বাস অমূলক নয়।
তিনি সতর্ক করেছিলেন—‘আমরা সচেতন না হলে মসজিদে উলুধ্বনি শোনা যাবে, ফেনী পর্যন্ত ভারত হয়ে যাবে। এই কথাগুলো অনেকের কাছে অতিরঞ্জন মনে হলেও সময় বারবার প্রমাণ করেছে, আমরা এখনো সতর্ক না হলে এগুলো আসবে ‘সিকোয়েন্সিয়াল কনসিকোয়েন্স’ হিসেবে! একইভাবে মাওলানা সাঈদীসহ আরো অনেক মহৎপ্রাণ সেই ‘অমানিশার অন্ধকার’ সম্পর্কে জাতিকে সাবধান করে গেছেন।
এই সতর্ক উচ্চারণগুলোই আজ আমাদের অতন্দ্র প্রহরী হয়ে থাকবে। মানুষ চলে যায়, কিন্তু তাদের বলা কথাগুলো থেকে যায়—দিকনির্দেশনা হয়ে, সতর্কতা হয়ে, প্রতিরোধের অনুপ্রেরণা হয়ে।
বেগম খালেদা জিয়া আজ আর শুধু একজন ব্যক্তি নন; তিনি একটি অবস্থান, একটি চেতনা, একটি অমোঘ স্মরণিকা, যা আমাদের মনে করিয়ে দেবে—আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই কখনো সহজ নয়, কিন্তু অপরিহার্য।
দুই.
শিল্পে মোড়ানো ইন্ডিয়ান খোয়াব
অটল বিহারি বাজপেয়ীর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে গত ২৬ ডিসেম্বর নরেন্দ্র মোদি রাষ্ট্র প্রেরণা স্থলে একটি স্মৃতিস্মারক উদ্বোধন করেন। স্মারকটির এক দেয়ালে ভারতের মানচিত্র স্থাপন করা হয়েছে এবং এর সামনে ঘেঁষে ভারতীয় পতাকা হাতে একটি নারীমূর্তি দাঁড়িয়ে আছে। লক্ষণীয় বিষয় হলো—পতাকাটি এমনভাবে স্থাপন করা হয়েছে যে, মানচিত্রের ওপর আমাদের সোনার বাংলাদেশটি সম্পূর্ণভাবে আড়াল (অন্য কথায় ভ্যানিশ) হয়ে যায়। শৈল্পিক ভাষায় যাকে বলা যায় কেয়ারফুলি কেয়ারলেসনেস!
এক ছোট ভাই ছবিটি পাঠিয়ে জানতে চেয়েছেন, ‘এটি কি নেহায়েত ফটোগ্রাফিক ভুল, শিল্পীর বেখেয়ালি আলপনা, নাকি অন্যকিছু?’
অনেকেই এটিকে নিছক কাকতালীয় বলে এড়িয়ে যেতে পারেন। কিন্তু এই কাকতালটি একটি আধিপত্যবাদী মানসিকতা ও রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে মিলে যায়।
এই ছবিটি আসলে ‘ইন্ডিয়ান খোয়াব’-এর একটি প্রতীকী রূপ। একটি এমন ভারতীয় স্বপ্ন, যেখানে প্রতিবেশীরা সমান সার্বভৌম রাষ্ট্র নয়, বরং তারই প্রভাববলয়ের অংশ, যেখানে বন্ধুত্বের ভাষার আড়ালে থাকে নিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষা, সহযোগিতার আড়ালে থাকে আধিপত্যের হিসাব। বাংলাদেশের ওপর পতাকার ছায়া—এটি কোনো গ্রাফিক দুর্ঘটনা নয়, এটি দিল্লির ক্ষমতাকেন্দ্রে লালিত একটি দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিচ্ছবি।
স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশকে ভারত দেখেছে তার ‘নিরাপত্তা বলয়’ বা Buffer Zone হিসেবে। কখনো পানিবণ্টন, কখনো সীমান্ত হত্যা, কখনো বাণিজ্য ঘাটতি, আবার কখনো অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ হস্তক্ষেপ—সবকিছু মিলিয়ে একটি ধারাবাহিক প্যাটার্ন স্পষ্ট। আমার দেশ-এ প্রকাশিত “এনএসআইয়ে ‘র’ নেটওয়ার্ক” সংবাদটি পড়ে আমাকে ফোন করেছেন আমার স্কুলের এক বড় ভাই, যিনি বুয়েট থেকে পাস করে কুয়েতে চাকরি করছেন! প্রিয় বড় ভাইটির কণ্ঠে আর্তনাদ—‘এই দেশটিকে তাহলে আমরা কি আর রক্ষা করতে পারব না?’ বড় ভাইটি বুয়েটে থাকাকালে কোনো একটি প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন । দেশটিকে নিয়ে এরকম উদ্বিগ্ন আত্মা বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে আছে!
এখানেই আসে আমাদের নিরাপত্তা ভাবনার প্রশ্ন। নিরাপত্তা মানে শুধু সেনাবাহিনী বা অস্ত্র নয়; নিরাপত্তা মানে রাজনৈতিক স্বাধীনতা, নীতিনির্ধারণের সক্ষমতা, অর্থনৈতিক বিকল্প, তথ্য ও গণমাধ্যমের স্বাধিকার এবং সর্বোপরি জনগণের মানসিক স্বাধীনতা। যখন একটি রাষ্ট্র আরেকটি রাষ্ট্রের স্বপ্নের ভেতরে ঢুকে পড়ে, তখন সবচেয়ে আগে আক্রান্ত হয় এই মানসিক স্বাধীনতাই। আমাদের ক্ষেত্রেও ঘটেছে তাই। সেজন্য ব্যক্তির পরিবর্তন হলেও কণ্ঠের আওয়াজ একই থেকে যাচ্ছে!
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো—আমরা নিজেদের ভবিষ্যৎ অন্যের চোখ দিয়ে দেখতে শুরু করি। যদি ভাবি, ‘ভারত না চাইলে আমরা পারব না’, ‘ভারত অসন্তুষ্ট হলে আমাদের অস্তিত্ব সংকটে পড়বে’—এই মনস্তত্ত্বই হলো আধিপত্যবাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য। সামরিক দখলের আগেই মানসিক দখল সম্পন্ন হয়ে গেছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—গণমাধ্যম ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসর। যখন দেশের ভেতরেই এমন একটি শ্রেণি তৈরি হয়, যারা বিদেশি প্রভুর দৃষ্টিভঙ্গিকেই ‘বাস্তবতা’ বলে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তখন নিরাপত্তা সংকট আরো গভীর হয়। কারণ তখন প্রশ্ন তোলাটাই অপরাধ হয়ে দাঁড়ায়, আর আত্মসম্মানকে বলা হয় উগ্রতা।
ইতিহাস আমাদের একটি সুযোগ দিয়েছে। তরুণ প্রজন্ম, গণজাগরণ, নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা—সব মিলিয়ে বাংলাদেশ আজ আর আগের মতো একমুখী নির্ভরতার জায়গায় নেই। কিন্তু এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি—‘শহীদ শরীফ ওসমান হাদি আমাদের এই বোধটিই জাগাতে চেয়েছিলেন! তার সেই কথাকে দুর্বল ও গুরুত্বহীন করে রাখার জন্যে তাকে গুপ্ত শিবির আখ্যায়িত করা হয়েছে। এখন সেই তারাই হাদির প্রশংসায় পঞ্চমুখ! মৃত হাদিদের বীর হিসেবে সেলুট করলেও জীবিত হাদিদের গুপ্ত শিবির বা জঙ্গি বলে মনে হয়।
তবে দেশের জনগণ স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়েছেন, তারা এই হাদিদের হৃদয়ের কোন জায়গায় স্থান দিয়েছেন। সেই একই জায়গায় আছেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়া এবং সদ্য শহীদ বেগম খালেদা জিয়া। জনগণের মেসেজ অত্যন্ত স্পষ্ট—‘আমরা কারো স্বপ্নের অংশ নই।’ এই মেসেজটি তারেক রহমানও সঠিকভাবে ধরতে পেরেছেন বলে আপাতত প্রতীয়মান হচ্ছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ১৭ বছর পর দেশে ফিরে নিজের ছোট ভাই কোকোর কবর জিয়ারতের আগেই শহীদ হাদির কবর জিয়ারত করেছেন। এটি নিছক কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং আধিপত্যবাদ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক ও নৈতিক কমিটমেন্ট হিসেবেই দেখা উচিত।
এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তিনি একটি বার্তা দিয়েছেন—ব্যক্তিগত শোকের আগেও জাতির আত্মত্যাগকে সম্মান জানানো জরুরি। শহীদ হাদির কবর জিয়ারত সেই চেতনারই প্রকাশ, যেখানে আত্মমর্যাদা, প্রতিরোধ ও স্বাধীন সিদ্ধান্তের আকাঙ্ক্ষা একসূত্রে গাঁথা।
কাজেই সবার প্রতি অনুরোধ—আমরা যে মতেরই অনুসারী হই, যে পথেই হাঁটি না কেন—আধিপত্যবাদকে প্রতিরোধ করতে গিয়ে যারা শাহাদাতের পেয়ালা পান করেছেন (জিয়া, আবরার, হাদি, খালেদা), তাদের এসব আত্মত্যাগ যে বোধ ও চেতনা জাগরিত করে গেছে, তা যেন কোনো অবস্থাতেই হারিয়ে না যায়। এই চেতনাই আমাদের শক্তি, এই বোধই আমাদের ভবিষ্যতের দিশা।
তিন.
আমাদের স্বপ্ন আমরা নিজেরাই দেখব
বাংলাদেশ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ইতিহাসের ভার, আবেগের রাজনীতি এবং ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা—এই তিনের টানাপোড়েনে আমাদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নীতির সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এখানে আবেগ দিয়ে নয়, রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ও কৌশলগত বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়াই হবে দায়িত্বশীল নেতৃত্বের পরিচয়।
১৯৭১ আমাদের ইতিহাসের একটি গৌরবময় কিন্তু একই সঙ্গে বেদনাবিধুর অধ্যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই ইতিহাস কি আমাদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা পরিকল্পনাকে চিরতরে স্থবির করে রাখবে, নাকি আমরা ইতিহাসকে স্মরণ করেই সামনে এগিয়ে যাব?
১৯৭১ সালের যুদ্ধকে দক্ষিণ এশিয়ায় নৈতিক যুদ্ধ (moral war) হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, বিশেষ করে ভারতের বয়ানে। ফলে কিছু তথ্য চেপে রাখা হয়েছে, কিছু তথ্য অতিরঞ্জিতভাবে সামনে আনা হয়েছে, কিছু প্রশ্নকে ট্যাবু বানানো হয়েছে, যেমন যুদ্ধের আর্থিক নিষ্পত্তি। ইতিহাস এখানে শুধু ঘটনা নয়, ক্ষমতার হাতিয়ার।
ইতিহাসের নামে রাজনীতি, নিরাপত্তার নামে নীরবতা
আমরা যখনই নিজেদের স্বপ্ন নিজেরা দেখতে চাই, নিজের সিদ্ধান্ত নিজেরা নিতে চাই, তখনই সেই ট্যাবুটি আমাদের সামনে টেনে আনা হয়! বলা হয়, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে হলে ১৯৭১-এর দেনাপাওনা আগে চুকাতে হবে!
একটি বিস্ময়কর বাস্তবতা হলো—১৯৭১ সালের যুদ্ধ বাবদ পাকিস্তান ভারতকে সম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণ দিয়েছে। ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব নথি অনুযায়ী, যুদ্ধের সামরিক ব্যয়, শরণার্থী রক্ষণাবেক্ষণ, যুদ্ধবন্দি, অবকাঠামো ক্ষতি—সব মিলিয়ে শত শত কোটি রুপির হিসাব নিষ্পত্তি হয়েছে। অথচ এই তথ্য বাংলাদেশে প্রায় অচর্চিত।
নিচের এই তালিকাটি ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ইতিহাস বিভাগ (History Division, MoD, India) থেকে সংকলিত। এর সূত্র বা Source: Official 1971 War history, History Division, Ministry of Defence, Government of India, copyright BHARAT RAKSHAK, 1992
অর্থাৎ, এটি পাকিস্তানপন্থি কোনো উৎস নয়। এটি ভারতের নিজের রাষ্ট্রীয় হিসাব।
১৯৭১ সালের যুদ্ধ বাবদ পাকিস্তান ভারতকে যে ক্ষতিপূরণ দেয়, তা নিম্নরূপ—
১. যুদ্ধের সময় ব্যবহৃত ও খোয়া যাওয়া অস্ত্র, যন্ত্রপাতি, যানবাহন প্রভৃতির দাম বাবদ ৫০,০০,০০,০০০ রুপি!
২. যুদ্ধের সময় রেলপথে সৈন্য, মালামাল এবং অস্ত্রপাতির আনা-নেওয়া বাবদ ৭,০৫,৩৬,৭২৬ রুপি!
৩. ইন্ডিয়ান এয়ারফোর্সের ১৪ দিনের যুদ্ধবাবদ খরচ ৫৫,৭১,০০,০০০ রুপি!
৪. ১৯৭১-এর যুদ্ধে ইন্ডিয়ান নেভির খরচ ৩৪,৯৮,৮২,৪৪০.৫৬ রুপি!
৫. তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা শরণার্থীদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্যে ভারত সরকারের খরচ বাবদ সাকুল্যে ৩২৬,০০,০০,০০০ রুপি!
৬. যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্যে সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোয় শস্যের ক্ষতি বাবদ ৫২,৮৩,০০০ রুপি!
৭. ইন্ডিয়ার নাগরিকদের সাহায্য ও পুনর্বাসন বাবদ খরচ ১১৪১,০০,৭৫৫.৭৯ রুপি!
৮. রাজ্য সরকার কর্তৃক জনগণকে দেওয়া ক্ষতিপূরণ ২৫৮,৯২,৯২৫ রুপি!
৯. সেনাবাহিনীর মৃত এবং আহতদের ক্ষতিপূরণ বাবদ ১,৬১,৩৯,২৭৪ রুপি!
১০. অফিসার, জেসিও এবং ওআরদের ক্ষতিপূরণ বাবদ ১,৫৯,৭০,০০০ রুপি!
১১. বাংলাদেশ থেকে সৈন্য ফিরিয়ে আনা বাবদ ৮৮,৭৯,৪৫৮.১৫ রুপি!
১২. পিওএল বাবদ (POL) ৭.৫৩,০২,০০০ রুপি!
১৩. বেসামরিক গাড়ি ভাড়া, রিকুইজিশন বাবদ ৬,১০,২৯,৫২৫.৮৮ রুপি!
১৪. যুদ্ধবন্দিদের রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ ৩৮,০৯,৯৮,০০০ রুপি!
সর্বমোট ৫৪৩,৫১,১৪,২৯৪.৯০ রুপি পাকিস্তানের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে আদায় করে নিয়েছে ভারত!
ওপরের এই তালিকা থেকে দেখা যায়, সে সময় একজন ইন্ডিয়ান সৈন্য বাংলাদেশে এসে যে লোটা ব্যবহার করেছে, সেটা কেনার টাকাও তারা পাকিস্তানের কাছ থেকে আদায় করে নিয়েছে! আর সম্পূর্ণ উপরি হিসেবে পেয়েছে আমাদের ভয়ানক কৃতজ্ঞতাবোধ! আপনাদের নিশ্চয়ই স্মরণে আছে, পাকিস্তানের ৯৩ হাজার যুদ্ধবন্দি আমাদের হাত থেকে নিয়ে গিয়ে তাদের বিনিময়ে ভারত এই ক্ষতিপূরণ আদায় করেছে। ১৬ ডিসেম্বর শপথ অনুষ্ঠানে এ কারণেই জেনারেল ওসমানীকে উপস্থিত থাকতে দেওয়া হয়নি এবং সারেন্ডার চুক্তিতে শুধু ইন্ডিয়ার জেনারেল স্বাক্ষর দিয়েছেন। তার বদৌলতে মাত্র ১৩ দিন যুদ্ধ করে ক্ষতিপূরণের সম্পূর্ণ টাকা দাদা নিজের পকেটে ঢুকিয়ে ফেলেছে! এখন নিজেদের লেসপেন্সারদের মাধ্যমে আমাদের পরামর্শ দিচ্ছে, ক্ষতিপূরণের সেই টাকা আবারও দাবি করতে!
কাজেই ১৮ কোটি আত্মা এবং তাদের অনাগত সব প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে এখন নিজেদের স্বপ্ন নিজেদেরই দেখতে হবে। জিয়া, আবরার, হাদি ও খালেদাকে আমাদের অনুভবে জাগিয়ে রাখতে হবে! আমাদের নিরাপত্তার জন্য যে দেশের সঙ্গে সঙ্গে মৈত্রী করা দরকার অনুভূত হবে, সকল দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেলে সেই দেশের সঙ্গেই মৈত্রী চুক্তি করতে হবে!
মূলত এর নামই স্বাধীনতা।
লেখক: কলামিস্ট
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

