আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

গাজার রমজান : ধ্বংসস্তূপ আর অটল ইমানের গল্প

ইসরা আবু কামার

গাজার রমজান : ধ্বংসস্তূপ আর অটল ইমানের গল্প

বিপর্যস্ত গাজায় রমজান এসেছে। বিশ্ব যেখানে উৎসাহের মধ্য দিয়ে রোজা আর নামাজের এই মাস উদযাপন করছে, সেখানে গাজার মানুষ এই মাস কাটাচ্ছে দুঃখ আর দুর্দশার ভেতর দিয়ে। যুদ্ধের প্রতিধ্বনি এখনো প্রবলভাবে বাজছে।

এই অস্ত্রবিরতি যে টিকবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এরপর কী হতে যাচ্ছে, সেটা নিয়ে চরম উদ্বেগে আছে গাজার মানুষ। তারা ভয় পাচ্ছে, যুদ্ধ হয়তো আবার ফিরে আসবে। কিন্তু এর মধ্যেও আধ্যাত্মিকতার মাস রমজান পালনের চেষ্টা করছে গাজার মানুষ।

বিজ্ঞাপন

মসজিদগুলো গুঁড়িয়ে দিয়েছে ইসরাইলিরা। কিন্তু তাঁবুতে বা ভাঙা বাড়িতে তারাবিহ পড়ছে তারা। দোয়া করছে স্রষ্টার কাছে। কারণ, তারা জানে, যত দুর্ভোগ তারা সহ্য করছে, এর পুরস্কার তাদের স্রষ্টার কাছে আছে।

আল-জাজিরায় ইসরা আবু কামার গাজার রমজানের চিত্র তুলে ধরেছেন।

এক বছর ধরে গাজার মানুষ যা কিছু দেখেছে এবং যে অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে গেছে, সেই স্মৃতি এবং সেই ট্রমা এখনো তাদের অস্তিত্বের ওপর প্রবলভাবে ভর করে আছে।

যুদ্ধের মধ্যে রমজান পালনের অভিজ্ঞতা গত বছরই প্রথম ছিল না গাজার মানুষের কাছে। ২০১৪ সালেও এ রকম অভিজ্ঞতা হয়েছে গাজাবাসীর। রমজানের রাতগুলো তখন বিমান হামলা আর ধ্বংসযজ্ঞে ভরা ছিল। তখনো বোমা হামলার শব্দ শুনে রাতের আঁধারে তাদের ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসতে হতো। বোমা হামলার জায়গাগুলো থেকে পালাতে হতো।

কিন্তু গত বছরের রমজান ছিল আলাদা। আগের চেয়ে সেটা ছিল অকল্পনীয় পর্যায়ের ভয়াবহ। সবখানে শুধু ক্ষুধা। গাজাভিত্তিক সাংবাদিক ইসরা আবু কামার জানান, পুরো দিন রোজা রাখার পর শুধু এক ক্যান হুমুস বা বিন দিয়ে ছয়জনের পরিবারের সবাই ইফতার করতেন। কোনো বিদ্যুৎ ছিল না। অন্ধকারে বসে বসে বিস্বাদ ক্যানের খাবার চিবোতেন তারা। ইসরা জানান, টেবিলের এপাশে-ওপাশে বসা একে-অন্যের চেহারাও দেখতে পেতেন না তারা।

Gaza Iftar

পরিবারের একটা বড় অংশ থেকে আলাদা হয়ে অনেক দূরে থাকতে হতো গাজাবাসীর। যারা একসময় মিলেমিশে রমজান পালন করতেন, তারা সবাই আলাদা হয়ে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে গিয়েছিলেন। কেউ হয়তো ঘরবাড়িছাড়া হয়ে তাঁবুতে থাকতেন। অনেকে আটকা পড়েছিলেন গাজার উত্তরাঞ্চলে। মিলেমিশে থাকার মাসটা হয়ে গিয়েছিল বিচ্ছিন্নতা আর একাকিত্বের মাস।

রমজানের যে আনন্দ, সেটা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। গাজার মানুষ সব সময় ইফতারের আগে মাগরিবের এবং সাহরির পরে ফজরের আজান শোনার জন্য উন্মুখ থাকতেন। কিন্তু সেই আজানের আওয়াজ তারা একেবারেই শোনেননি। প্রতিটি মসজিদ ধ্বংস করা হয়েছে। কিছু মানুষ এর মধ্যেও আজান দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আজানের শব্দ শুনে আবার বিমান হামলা শুরু হতে পারে, তাদের টার্গেট করা হতে পারে, এই আশঙ্কায় তারা আজান দিতে পারেননি।

নিকটবর্তী মসজিদের লাউডস্পিকারের পরিচিত শব্দ শুনে যারা ইফতার করে অভ্যস্ত, তাদের রোজা ভাঙতে হয়েছে মিসাইল আল বোমার আতঙ্কজনক শব্দের মধ্যে। যুদ্ধের আগে গাজার মানুষ ইফতারের পর পরিবারের সবাই মিলে মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়তেন।

পরিচিতজনদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করতেন। এরপর তারা গাজার রাস্তা দিয়ে হাঁটতেন, রমজানের প্রাণবন্তু পরিবেশ উপভোগ করতেন। পরে ঘরে ফিরে হয়তো সদ্য রান্না করা কাতায়েফ খেতে বসতেন তারা। কিন্তু গত বছর রমজানে কোথাও গিয়ে তারাবিহ পড়তে পারেননি তারা। চারদিকে তখন নির্বিচারে গণহত্যা চালাচ্ছিল ইসরাইল।

গাজার সবচেয়ে সুন্দর ঐতিহাসিক মসজিদগুলোর একটি ছিল ওমারি মসজিদ। গাজার বহু মানুষ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এখানে রমজানের শেষ দশ দিন ইতেকাফ করতেন। অসামান্য সুমধুর কণ্ঠের কোরআন তিলাওয়াত শুনতেন। এই মসজিদটিও আর নেই। বোমা মেরে এমনভাবে ধ্বংস করা হয়েছে, সেটা চেনার আর উপায় নেই। যে জায়গাটি একসময় নামাজের আর শান্তির জায়গা ছিল, সেটাকে এখন ধুলোবালি আর ধ্বংসস্তূপ বানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এ বছর রমজান শুরু হয়েছে অস্ত্রবিরতির মধ্যে। ইফতারের সময় অন্তত বিমান হামলার শব্দে মাটি কেঁপে উঠছে না। ফজরের নীরবতার সময় বিস্ফোরণের শব্দও আপাতত পাওয়া যাচ্ছে না। ঘরবাড়ি সাজাতে এই মুহূর্তে কোনো ভয় নেই। ঘরে রমজানের রঙচঙে বাতি জ্বালালেই এখনই হয়তো তাদের হামলার টার্গেট করা হবে না।

বিপর্যের যন্ত্রণার মধ্যেই গাজার সড়কগুলোয় জীবন ফিরে আসার চেষ্টা করছে, যেটা একটা দীর্ঘ সময় ধরে থমকে ছিল। যেসব দোকান আর বাজার ধ্বংস হওয়া থেকে কোনো রকমে বেঁচে গেছে, সেগুলো আবার খুলছে। সড়কের ফেরিওয়ালাও ফিরে এসেছেন।

এমনকি নুসেইরাতের বড় সুপারমার্কেট, হাইপার মলের দরজাগুলো আবার খুলেছে। রমজানের আগে বা এখনো অনেকেই এসব মার্কেটে যাচ্ছেন। গণহত্যার বছর পার করে বিপুল উত্তেজনা বুকে তারা আলো ঝলমলে মার্কেটে ঢুকছেন। একটা মুহূর্তের জন্য হয়তো কারো কারো মনে হচ্ছে পেছনের সময়ে তারা ফিরে গেছেন। মার্কেটের শেলফগুলো আবার পণ্যে ভরে উঠছে।

বিভিন্ন ধরনের চকোলেট, বিস্কুট আর চিপস শোভা পাচ্ছে সেখানে। রমজান উপলক্ষে সাজানো হয়েছে মার্কেট। বিভিন্ন আকার আর ডিজাইনের লণ্ঠন ঝুলছে। শোভা পাচ্ছে খেজুরের বাক্স, বিভিন্ন রঙের শুকনো ফল আর কামার আল-দিন।

কিন্তু এই সাজগোজও ঠিক পুরো সত্য নয়। যেসব জিনিস দিয়ে তাক ভর্তি করা হয়েছে, এগুলো এসেছে বাণিজ্যিক ট্রাকে। মানবিক সহায়তার অংশ হিসেবে যেসব ট্রাক গাজায় ঢুকতে দেওয়া হয়, তার একটা বড় অংশজুড়ে থাকে এসব ট্রাক। কিন্তু গাজার অধিকাংশ মানুষের জন্য এসব পণ্য ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। কারণ বেশিরভাগ মানুষ তাদের ঘরবাড়ি ও জীবিকা হারিয়েছে।

এবারের রমজানে তাহলে কী দিয়ে ইফতার করবে গাজার মানুষ? গত বছরের মতো এক ক্যান বিনের চেয়ে একটু হয়তো ভালো হবে। ভাত, মোলোখিয়া বা যেটুকু সবজি জোগাড় করা সম্ভব, সেটা দিয়ে হয়তো সাধারণ একটা খাবার হবে ইফতারের মেন্যুতে।

সাংবাদিক ইসরা জানান, প্রথম ইফতারিতে তাদের পরিবারে মুসাখান রান্না হয়েছিল। এই ফিলিস্তিনি খাবারটি তৈরি হয় মুরগি, সাজ রুটি আর বেশি করে পেঁয়াজ দিয়ে। এই খাবারের কারণে নিজেদের সৌভাগ্যবানদের একজন মনে করেন তারা। গাজার অধিকাংশ মানুষ ফ্রেশ মুরগি কেনার সামর্থ্য রাখেন না এখন। বাজারে এখন যেটুকু-বা মুরগি পাওয়া যাচ্ছে, সেটার দাম যুদ্ধের আগের তুলনায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। কিন্তু ঐতিহ্যবাহী ইফতারই একমাত্র বিষয় নয়, যেটা গাজার রমজান থেকে হারিয়ে গেছে।

যুদ্ধে ৪৮ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। সরকারি নথি থেকে বহু পরিবারের নাম পুরোপুরি মুছে গেছে, যারা আর এ বছর রমজান উদযাপন করবে না। বহু পরিবারের ইফতারের টেবিলে এবার অনেক আসন শূন্য পড়ে থাকবে। যে বাবার কণ্ঠ শুনে ছেলেমেয়েরা ইফতারের টেবিলে জড়ো হতো, সেই কণ্ঠ হয়তো আর নেই। যে সন্তান ইফতার করার জন্য অধৈর্য হয়ে উঠত, সেই ছেলেও আর নেই। অথবা সেই মা-ও আর নেই, যার দক্ষ হাতে রান্না হতো সুস্বাদু সব খাবার।

সাংবাদিক ইসরা জানান, তিনিও প্রিয় স্বজনের অনেককে হারিয়েছেন। তার যে খালু প্রতিবছর তাদের ইফতারির দাওয়াত দিতেন, তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। তার বন্ধু শায়মা, লিনা ও রোয়ার সঙ্গে মসজিদে তারাবিহ নামাজের পর আড্ডা দিতেন তিনি। এদের সবাই শহীদ হয়েছেন।

উৎসবের আমেজ আর নেই। কিন্তু রমজানের নির্যাস এখনো রয়েছে। গাজার মানুষ জানে, এই মাস হলো দৈনন্দিন জীবনের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দূরে সরিয়ে রেখে মুসলিমদের বিশ্বাসকে তাজা করার মাস। এটা ক্ষমার সময়। এটা স্রষ্টার নৈকট্য অর্জন ও আধ্যাত্মিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার মাস।

গাজার ফিলিস্তিনিদের মসজিদগুলো হয়তো গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তাদের ঈমান হারিয়ে যায়নি। ভাঙা ঘরবাড়ি আর তাঁবুর মধ্যেই তারা তারাবিহ পড়ছেন। দোয়ায় মনের সব আকাঙ্ক্ষা তারা স্রষ্টার কাছে জানাচ্ছেন। আর কোরআন তিলাওয়াতের মধ্যে প্রশান্তি খোঁজার চেষ্টা করছেন। তারা সবাই ভালো করেই জানেন, যত দুর্ভোগ তারা সহ্য করেছেন এবং করে চলেছেন, এগুলোর পুরস্কার তাদের স্রষ্টার কাছে অবশ্যই পাবেন।

লেখক: গাজার ইসলামিক ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী। আলজাজিরা থেকে ভাষান্তর: জুলফিকার হায়দার

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন