আজ শব্দেরা ভারী।
বাংলাদেশ নীরব।
রাষ্ট্র শোকস্তব্ধ।
বেগম খালেদা জিয়া—বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনমনীয়, দৃঢ় ও আপসহীন নাম—আজ আমাদের মাঝে নেই। লক্ষ মানুষের অশ্রু, ইতিহাসের দীর্ঘশ্বাস আর রাষ্ট্রীয় সম্মানে তিনি আজ চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন—স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পাশে। পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ জানাজায় মানুষের ঢল, প্রার্থনার নীরবতা আর চোখের জলে জাতি তাকে বিদায় জানিয়েছে।
এই শোক শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিদায়ের শোক নয়।
এ শোক একটি সময়ের, একটি রাজনৈতিক সংগ্রামের, একটি রাষ্ট্রীয় অভিযাত্রার।
এ শোক—বাংলাদেশের ইতিহাসের এক গভীর অধ্যায়ের অবসান।
এই শোকের মুহূর্তে আমি ফিরে গেছি স্মৃতির কাছে। বাংলাদেশ টেলিভিশনের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনের বাইরেও আমি দীর্ঘদিনের প্রত্যক্ষদর্শী—যে অমূল্য স্মৃতিগুলো রাষ্ট্র, সংস্কৃতি ও গণমাধ্যমের ইতিহাসের নীরব নির্মাতা। আমার স্মৃতিগুলো তাই শুধু ব্যক্তিগত নয়; সেগুলো একটি রাষ্ট্রের পথচলার দলিল।
প্রথম দেখা : শোকের আবহে নেতৃত্বের নীরব উদ্ভব
আশির দশক।
বাংলাদেশ টেলিভিশনের অডিটোরিয়াম।
শিশু ও কিশোরদের প্রতিভা অন্বেষণমূলক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠান—‘নতুন কুঁড়ি’।
পুরস্কার প্রদান করবেন রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তার, তথ্যমন্ত্রী শামসুল হুদা চৌধুরী।
বিশেষ অতিথি—বেগম খালেদা জিয়া।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শহীদ হওয়ার পর—
এই প্রথম তিনি টেলিভিশন ভবনে আসছেন।
সেদিনের আবহ আজও স্পষ্ট মনে আছে। আনন্দ ও উত্তেজনার সঙ্গে সবার মনে জমে ছিল গভীর শোক। আমাদের কয়েকজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয় তাকে স্বাগত জানানোর। গভীর আগ্রহ আর ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আমরা গাড়ি বারান্দায় অপেক্ষা করছিলাম।
একটি সাদা গাড়ি ধীর গতিতে প্রবেশ করতেই আমরা এগিয়ে যাই।
তিনি ধীরে ধীরে গাড়ি থেকে নামলেন।
অফ-হোয়াইট রঙের, কালো পাড়ের দেশীয় জামদানি শাড়ি।
স্বামীহারা এক নারীর দুঃখ-কষ্ট-বেদনায় মুখ মলিন—তবু চোখ ফেরানো যায় না।
প্রথম দর্শনেই আমরা মুগ্ধ ও হতভম্ব।
তথ্যমন্ত্রীসহ আমরা তাকে অডিটোরিয়ামে নির্ধারিত আসনে বসালাম। ‘নতুন কুঁড়ি’র বিজয়ী শিশুরা তাকে অভ্যর্থনা জানাল। মঞ্চে মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও মন্ত্রী মহোদয়; পাশে টেবিলে সজ্জিত সোনার কাপ। দর্শক সারির প্রথম সারিতে বসে আছেন বেগম খালেদা জিয়া—নীরব, সংযত, গভীর শোকে আচ্ছন্ন।
মন্ত্রী মহোদয় বক্তব্য দিতে এসে বললেন—
‘আমাদের মাঝে সোনার শিশুরা আছে, পাশে সোনার কাপ আছে—
শুধু সোনার মানুষটি নেই।’
পুরো অডিটোরিয়াম ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল।
আমি লক্ষ করলাম—খালেদা জিয়া কান্না থামাতে পারছেন না। রুমালে চোখের পানি আড়াল করার আপ্রাণ চেষ্টা।
সেদিনই বুঝেছিলাম—এই শোক একদিন শক্তিতে রূপ নেবে।
পরের ইতিহাস আমরা সবাই জানি।
১৯৯৩ : আনন্দের আলোয় রাষ্ট্রনায়ক
সময় বদলায়।
১৯৯৩ সাল।
সেই চিরচেনা বিটিভির অডিটোরিয়াম—কিন্তু আবহ সম্পূর্ণ ভিন্ন। ‘নতুন কুঁড়ি’র বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার তুলে দেবেন বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী—বেগম খালেদা জিয়া।
সবার মাঝে আনন্দ উপচে পড়ছে।
কি সাজসাজ রব!
বাংলাদেশ টেলিভিশন সেজেছে নতুন রূপে।
শিল্পী, কর্মকর্তা, কর্মচারী—সবার চোখে উচ্ছ্বাস।
মুহূর্তটি ছিল মাহেন্দ্রক্ষণ।
হাসিমুখে শিশুদের হাতে পুরস্কার তুলে দিলেন বিজয়িনী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। সেদিন অডিটোরিয়াম ভরে উঠেছিল আশায়, স্বপ্নে ও বিশ্বাসে।
কিন্তু বিষয়টি শুধু ‘নতুন কুঁড়ি’তেই সীমাবদ্ধ ছিল না। শিশুদের শিক্ষা ও মেধার বিকাশে তার অনুপ্রেরণায় বিটিভিতে প্রচার শুরু হয় জাতীয় স্কুলবিতর্ক। ফাইনাল পর্বে উপস্থিত থেকে তিনি নিজেই শিশুদের উৎসাহ দেন।
সেদিন এক কিশোরীকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল—সে ভবিষ্যতে কী হতে চায়। যুক্তি-তর্কের পর সে বলেছিল—
‘আমি এ দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে চাই।’
তার বাচনভঙ্গি ও যুক্তির দৃঢ়তায়
বেগম খালেদা জিয়া অভিভূত হয়েছিলেন।
সারা অডিটোরিয়াম মুহূর্তে করতালিতে মুখরিত হয়ে উঠেছিল।
গণমাধ্যমে এক যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত
এরপর আর থেমে থাকা নয়।

বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বেই বাংলাদেশ টেলিভিশনে শুরু হয় বিদেশি গণমাধ্যম সম্প্রচার—যা তখন কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। বিবিসি, সিএনএনের সংবাদ প্রতিদিন সকালে বিটিভির মাধ্যমে দর্শক দেখতে শুরু করেন।
এটি শুধু প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ছিল না;
এটি ছিল রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে আন্তর্জাতিক তথ্যপ্রবাহের সঙ্গে যুক্ত করার সাহসী সিদ্ধান্ত।
তিনি আকাশ সংস্কৃতি উন্মুক্ত করেছিলেন।
বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের অনুমতি দিয়ে বাংলাদেশের গণমাধ্যমকে বহুমাত্রিক ও গতিশীল করে তুলেছিলেন।
বিটিভি ওয়ার্ল্ড : বাংলাদেশকে বিশ্বমুখী করা ২০০৪ সাল।
বাংলাদেশ টেলিভিশন টেরিস্ট্রিয়াল বিধায় দেশের বাইরে দেখা যেত না। এই সীমাবদ্ধতা ভেঙে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের দ্বিতীয় চ্যানেল বিটিভি ওয়ার্ল্ড-এর শুভ উদ্বোধন করেন বেগম খালেদা জিয়া।
এর মাধ্যমে বিশ্বের নানা প্রান্তের দর্শক বাংলাদেশ টেলিভিশনের অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ পান।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি ছিল স্মরণকালের।
সব বিশিষ্ট শিল্পীর অংশগ্রহণে এক ঐতিহাসিক আয়োজন।
এক মঞ্চে—
শাহনাজ রহমতউল্লাহ,
সাবিনা ইয়াসমিন,
রুনা লায়লা।
এই প্রথম তিন কিংবদন্তি একসঙ্গে সংগীত পরিবেশন করেন।
অনুষ্ঠান শেষে বিদায়কালে সাবিনা ইয়াসমিনকে হাসিমুখে জিজ্ঞেস করেন—
‘আপনি কলকাতা থেকে কবে এলেন?’
সুমন কবিরের সঙ্গে বিয়ের বিষয়টি তিনি জানতেন।
সাবিনা ইয়াসমিন হেসে উত্তর দিয়েছিলেন—
‘এই অনুষ্ঠানে আপনি আসবেন—এ জন্যই গতকাল ফিরেছি।’
দুজনের সেই অন্তরঙ্গ মুহূর্ত আজও স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করে।
তিনি উদ্বোধন করেন বিটিভি আর্কাইভ—বাংলাদেশ টেলিভিশনের সোনালি দিনের অনুষ্ঠানমালা সংরক্ষণের জন্য।
এক রাষ্ট্রনায়কের বিদায়
শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রতি গভীর অনুরাগী ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। বাংলাদেশ টেলিভিশনের উন্নয়নের লক্ষ্যে তিনি যে বহুমুখী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন—তার সুফল আজও দৃশ্যমান।
প্রখর বুদ্ধিমত্তা ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন এই রাষ্ট্রনায়কের অবদান আগামী দিনগুলোতেও বিটিভির দর্শক-শ্রোতা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করবে।
আজ তিনি নেই।
কিন্তু—
আসলেন, দেখলেন, জয় করলেন।
লক্ষ কোটি জনতার চোখের জলে
অনন্ত পথে পাড়ি দিলেন।
বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে ঘরে
আজ শ্রদ্ধাভরে উচ্চারিত হচ্ছে একটি নাম—
বেগম খালেদা জিয়া।
এক আপসহীন দেশনেত্রী।
এক সাহসী রাষ্ট্রনায়ক।
এক ইতিহাস।
লেখক : সাবেক উপমহাপরিচালক, বাংলাদেশ টেলিভিশন
(তাৎক্ষণিক স্মৃতিচারণে)
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

