আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ব্যতিক্রমী ড. ইউনূস

মো. মাহবুবুর রহমান বুলবুল

ব্যতিক্রমী ড. ইউনূস

বাংলাদেশের বিশ্ববরেণ্য কৃতী সন্তান ও অর্থনীতিবিদ শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করে বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে সম্মানজনক আসনে প্রতিষ্ঠিত করেন। ড. মুহাম্মদ ইউনূস বিকল্পধারার ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ‘ক্ষুদ্রঋণ’ কর্মসূচির উদ্ভাবন করে এবং ব্যাংকের মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন করে দারিদ্র্যবিমোচন ও নারীর ক্ষমতায়নে শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বেই এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন। এ জন্যই তিনি বিশ্বের অন্য নোবেল লরিয়েটদের থেকে আলাদা ও অনন্য।

দারিদ্র্যবিমোচন, নারীর ক্ষমতায়ন ও বেকারত্ব দূরীকরণে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে তিনি শুধু ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচির তত্ত্ব নিয়ে বসে থাকেননি। তিনি তার চিন্তাধারাকে সম্প্রসারণের মাধ্যমে ২০০৭ সালে ‘সামাজিক ব্যবসা’ এবং ‘থ্রি জিরো’ নামে নতুন তত্ত্ব বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছেন। তার এই তত্ত্বগুলো এখন বিশ্বের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করে নিয়মিত পড়ানো হচ্ছে। পাশাপাশি জাতিসংঘের বিভিন্ন কর্মসূচিতেও তা অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে।

বিজ্ঞাপন

সামাজিক ব্যবসার সাতটি মূলনীতি আছে : ১. দারিদ্র্যবিমোচনসহ এক বা একাধিক বিষয় যেমনÑশিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি ও পরিবেশগত খাতের সমস্যার সমাধানে ব্যক্তিগত মুনাফাহীন কল্যাণকর ব্যবসা এটি। ২. সবার অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জন করাই এ ব্যবসার লক্ষ্য। ৩. সামাজিক ব্যবসায় বিনিয়োগকারীরা শুধু তাদের বিনিয়োগকৃত অর্থই ফেরত পাবেন, কোনো লভ্যাংশ পাবেন না, কোনো লভ্যাংশ ফেরত নিতে পারবেন না। ৪. বিনিয়োগকারী তার বিনিয়োগকৃত অর্থ ফেরত নেওয়ার পর বিনিয়োগকৃত মুনাফা কোম্পানির সম্প্রসারণ কাজে ব্যবহৃত হবে। ৫. সামাজিক ব্যবসা হবে পরিবেশবান্ধব। ৬. এখানে যারা কাজ করবেন তারা কাজের ভালো পরিবেশ ও চলমান বাজার অনুযায়ী বেতন-ভাতা পাবেন। ৭. সামাজিক ব্যবসা হবে আনন্দের সঙ্গে ব্যবসা। অন্যদিকে ‘থ্রি জিরো’ বা ‘তিন শূন্য’ তত্ত্বটি বর্তমান বিশ্বের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনটি শূন্য হলো শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব ও শূন্য কার্বন নির্গমন।

ড. মুহাম্মদ ইউনূস নোবেল লরিয়েটের বাইরেও একজন ক্রীড়া অনুরাগী, সংস্কৃতিপ্রেমিক, আধুনিক বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তির অনুসারী এবং সর্বোপরি তিনি বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের মানুষের কাছে জীবনসায়াহ্নেও এক টগবগে তারুণ্যের প্রতীক। তিনি বড় মাপের একজন ক্রীড়াপ্রেমিক। ২০১৮ সালে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে দেখা করার জন্য আর্জেন্টিনা ও স্পেনের ক্লাব বার্সেলোনার তারকা ফুটবলার লিওনেল মেসিকে লাইনে দাঁড়াতে হয়েছিল। সেদিন ড. মুহাম্মদ ইউনূসের হাতে ছিল বার্সার জার্সি আর মেসির হাতে ছিল তার লেখা ‘এ ওয়ার্ল্ড অব থ্রি জিরোস’ বইটি। বইটির স্প্যানিশ ভাষায় অনূদিত সংস্করণ উদ্বোধনের জন্য সেদিন তিনি বার্সেলোনায় গিয়েছিলেন। বার্সা তাদের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে তার আগমন উপলক্ষে একটা ভিডিও পোস্ট করেছিল। তিনি সেদিন বলেছিলেন, বাংলাদেশের লাখো কোটি তরুণ বার্সাকে পছন্দ করে। আমি তাদের মুখপাত্র হয়ে এখানে এসেছি।

তিনি সামাজিক ব্যবসায় খেলাধুলার প্রভাবকে কাজে লাগানোর জন্য নিরলসভাবে কাজ করে অনেক দূর এগিয়ে গেছেন। এ জন্য তিনি গড়ে তুলেছেন ‘ইউনূস স্পোর্টস হাব’, যার মাধ্যমে খেলাধুলাকে সামাজিকীকরণের জন্য কাজ করা হচ্ছে। বিশ্ব অলিম্পিক আসরে প্রজ্বালিত মশাল বহন করা সবচেয়ে সম্মানজনক একটি কাজ। ২০২০ সালে জাপান অলিম্পিক এবং ২০২৪ প্যারিস বিশ্ব অলিম্পিক আসরের মশাল বাহক ছিলেন। ২০২৬ সালের ইতালি অলিম্পিকে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে পাওয়ার জন্য দেশটি তদবির শুরু করেছে।

বাংলাদেশে ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার বিপ্লব-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান হিসেবে জাতিসংঘে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন। সেখানে তার সঙ্গে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সাক্ষাৎ ও বৈঠক, বিভিন্ন দেশে তার রাষ্ট্রীয় সফর, বাংলাদেশে জাতিসংঘ মহাসচিবের আগমনসহ নানা ঘটনাবলি বিশ্লেষণ করলে প্রতীয়মান হয়, তিনি বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী ও জনপ্রিয় ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম।

তিনি তরুণ ও যুবসমাজের মধ্যে বক্তৃতায় প্রায়ই বলেন, তোমরা চাকরিপ্রার্থী হবে কেন, তোমরা হবে চাকরিদাতা। জীবনে কর্মক্ষেত্রে কাজের কোনো বয়স নেই। অবসর বলতে মানুষের জীবনে কোনো শব্দ থাকতে পারে না। অবসরকে চিরতরে অবসরে পাঠিয়ে দিতে হবে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রতিটি মানুষই কর্মক্ষম। যেমন : তিনি ৮৬ বছর বয়সে একজন টগবগে তরুণের মতো নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তার এসব বক্তব্য ও উপদেশগুলো আজ তরুণসমাজকে সামনের দিকে পথচলায় ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত করছে এবং প্রতিটি বক্তব্যই আজ একেকটি তত্ত্ব কিংবা থিওরি হিসেবে কাজ করছে।

অথচ তার মতো একজন বিশ্ববরেণ্য নোবেল লরিয়েটকে বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার কতভাবেই না অসম্মান ও হেয় করার সব ধরনের চেষ্টা করেছে। তার বিরুদ্ধে অসংখ্য মিথ্যা মামলা করা হয়েছে। অথচ ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, আজ ড. মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান। পক্ষান্তরে পতিত ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি আমেরিকায় অধ্যয়নরত ছিলেন। সে সময় তিনি প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্ব জনমত গঠনে ‘বাংলাদেশ ইনফরমেশন সেন্টার’ পরিচালনা করেন। সেখানে তার নিজ বাড়ি থেকে প্রকাশ করতেন ‘বাংলাদেশ নিউজ লেটার’। এভাবেই তিনি মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

দেশের মানুষের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরগুলোয় প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পন্ন করে একটি নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে আবার নিজের কাজে ফিরে যাবেন বলে আগেই জানিয়েছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। জাতির একটি সংকটকালে তিনি দেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য রাজি হওয়ায় দেশের মানুষ তার কাছে চিরঋণী হয়ে থাকবে।

লেখক : সাবেক কনসালট্যান্ট, সিএআরডি ব্যাংক, ফিলিপাইন

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন