আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য রূপরেখা যেভাবে ইসরাইলকে মাটিতে নামাতে পারে

মার্কো কার্নেলস

ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য রূপরেখা যেভাবে ইসরাইলকে মাটিতে নামাতে পারে

সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক সফরের দুটি উদ্দেশ্য ছিল। প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল তার বৈশ্বিক ব্র্যান্ড ‘আমেরিকা ফার্স্ট’কে কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও এর জনগণের জন্য একটি ভিশন হিসেবে নয়, বরং একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আকাঙ্ক্ষা হিসেবে বিশ্বের যত বেশি দেশের কাছে সম্ভব এই ব্র্যান্ডকে গছিয়ে দেওয়া। ট্রাম্প তার ব্যতিক্রমধর্মী এই বিশ্বাসকেই প্রতিষ্ঠিত করতে চান যে, হোয়াইট হাউসে রিপাবলিকান বা ডেমোক্র্যাট যারাই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যেটা ভালো, তা সমগ্র বিশ্বের জন্যও ভালো।

ট্রাম্প অনেক ভেবেচিন্তেই তার সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সফরে বিশ্বের শীর্ষ বিত্তশালী দেশগুলোর তিনটি—সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে বেছে নিয়েছেন, যে দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে বিনিয়োগ করবে। কোনো সন্দেহ নেই, গত শতাব্দীর শেষ প্রান্তিকে একটি ব্র্যান্ড হিসেবে ‘আমেরিকা’র ইমেজ ও সুনাম ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে তাদের বিরামহীন যুদ্ধ এই অঞ্চলে চরম বিশৃঙ্খলা ও অবৈধ অভিবাসীর স্রোত তৈরি করে, একইসঙ্গে নিষেধাজ্ঞা আরোপের নীতি অনেক দেশকে এবং আমেরিকার শত্রু-মিত্র সবাইকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। এ ছাড়া ওয়াল স্ট্রিটের অনিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক স্কিমগুলো বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করে, যার ফল হয় অনেক ভয়াবহ।

বিজ্ঞাপন

একই সময়ে ‘জেগে ওঠা’ এবং ‘বাতিল করার সংস্কৃতি’ অভাবনীয় পর্যায়ের অভ্যন্তরীণ মেরূকরণের পথ তৈরি করে, যা বিপুলসংখ্যক আমেরিকার নাগরিককে পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেয়। যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরেই বিত্তশালী এলিটদের সুবিধা দেওয়ার অর্থনৈতিক নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। এর ফলে দেশটিতে বৈষম্য ও বঞ্চনার মাত্রা বেড়েই চলেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণের পরিমাণ বর্তমানে আকাশচুম্বী হয়ে ৩৬ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।

চীনের উত্থান এবং ব্রিকস গঠন করার মধ্য দিয়ে বিশ্বে একটি বহু মেরুর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠছে। নতুন এই ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যে গড়ে ওঠা দীর্ঘদিনের ‘আইনভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা’র বিকল্প হিসেবে নিজের অবস্থানকে মজবুত করছে ধীরে ধীরে। বর্তমান এই পরিস্থিতির প্রেক্ষাপট সামনে রেখেই ডোনাল্ড ট্রাম্প উপসাগরীয় অঞ্চলের তিনটি দেশ সফরে যান। তার এই সফরের লক্ষ্যই ছিল আমেরিকাকে নতুনভাবে ব্র্যান্ডিং করে বিভিন্ন দেশের কাছে আবারও গ্রহণযোগ্য ও আকর্ষণীয় করে তোলা।

শুরুতে তার এই উদ্যোগ হোঁচট খেয়েছিল বিভিন্ন দেশের ওপর নির্বিচারে শুল্ক আরোপ করার কারণে। এতে সব দেশই তার ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছিল। ট্রাম্পের শুল্কনীতির বিরূপ প্রভাবে মার্কিন ট্রেজারি বন্ডও হুমকির মুখে পড়েছিল, এর ইন্টারেস্ট রেট বিপজ্জনকভাবে পাঁচ শতাংশের সিলিংয়ের কাছাকাছি নেমে এসেছিল।

উপসাগরীয় অঞ্চলে ট্রাম্পের সফরের দ্বিতীয় উদ্দেশ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যে ‘প্যাক্স আমেরিকানা’ বা ‘আমেরিকান শান্তি’র উদ্যোগ আবার চালু করা। কারণ দীর্ঘদিন ধরেই ‘প্যাক্স আমেরিকানা’ তার কৌশলগত গুরুত্ব বহন করছিল। মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বের জ্বালানির একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস ও বাণিজ্যিক রুট। এই অঞ্চলে যেকোনো ধরনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের বিরুদ্ধে চলে যেতে পারে, সুবিধা তৈরি করে দিতে পারে প্রতিক্রিয়াহীন শত্রুদের।

মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক মাত্রার উত্তেজনা ‘অভিবাসন অস্ত্র’কে উসকে দিতে পারে, যা ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক ভঙ্গুর মার্কিন মিত্র বিশেষ করে মিসর ও জর্ডানের জন্য নানামুখী বিপদ বয়ে আনবে। এ ছাড়া বিভিন্ন গ্রুপকে ‘সন্ত্রাসবাদী’ সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হলে তা রাশিয়ার সংখ্যালঘু মুসলিম জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকার লোকদের উত্তেজিত করে তুলতে পারে।

এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি উৎপাদনকারী গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোকে টার্গেট করে কোনো জ্বালানি নীতি গ্রহণ করা হলে জ্বালানি তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর সংস্থা ওপেকের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। একইসঙ্গে এ ধরনের নীতি জ্বালানি তেলের অন্যতম বড় আমদানিকারক দেশ চীনের ওপরও চাপ তৈরি করতে পারে। কেননা চীন উপসাগরীয় অঞ্চলের তেলের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল।

মধ্যপ্রাচ্যে আবার ‘প্যাক্স আমেরিকানা’ বা ‘আমেরিকান শান্তি’র প্রত্যাবর্তন ইউরোপ ও দূরপ্রাচ্যের মধ্যে বাণিজ্যিক রুট চালুর সম্ভাবনাকেও কমিয়ে আনতে সহায়তা করবে। কারণ এ ধরনের একটি বাণিজ্যিক রুট তৈরির প্রধান হাতিয়ার হিসেবে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ বা বিআরআই প্রকল্প এরই মধ্যে সামনে চলে এসেছে বলে মনে করে যুক্তরাষ্ট্র।

সামগ্রিক এই পরিস্থিতি সামনে রেখে উপসাগরীয় অঞ্চল সফরকালে সৌদি আরবসহ এই অঞ্চলের দেশগুলোর প্রতি ট্রাম্পের স্পষ্ট বার্তা ছিল—“তোমরা ‘ওপেক+’-কে ব্যবহার করে জ্বালানি তেলের মূল্য নিয়ন্ত্রণের খেলা খেলতে পার এবং চীনের নেতৃত্বে উদীয়মান বিকল্প বিশ্বব্যবস্থার দিকেও ঝুঁকতে পার, অথবা আমার সঙ্গে ১০ গুণ বেশি লাভের অর্থনৈতিক অংশীদারত্বেও থাকতে পার—কোন দিকে যাবে, সেটা বেছে নেওয়ার দায়িত্ব তোমাদের।”

সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের দিকেই ঝুঁকেছে। তারা পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে আমেরিকার অর্থনীতিতে তিন ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ করার চুক্তি করেছে ট্রাম্পের সঙ্গে। এর মধ্যে আরব আমিরাতের সঙ্গেই চুক্তি হয়েছে ১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের। ট্রাম্পের জন্য যা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল তা হচ্ছে, তিন দেশের এই বিশাল অর্থনৈতিক চুক্তির পর তা বিশ্ব অর্থনীতি ও পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

ট্রাম্পের উপসাগরীয় অঞ্চল সফরের অন্যতম আকর্ষণীয় দিক ছিল ইসরাইলকে পুরোপুরিই এড়িয়ে যাওয়া। সফরে আসার আগেই ট্রাম্প এমন কিছু সিদ্ধান্ত নেন, যা ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তার সরকারের জন্য সুস্পষ্টভাবেই অস্বস্তিকর। ট্রাম্প ইসরাইলকে বাদ দিয়ে সরাসরি হামাসের সঙ্গে আলোচনা করেছেন, ইয়েমেনের হুতিদের সঙ্গে চুক্তি করেছেন, যাতে ইসরাইলের নিরাপত্তার বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। তিনি পরমাণু চুক্তি নিয়ে ইরানের সঙ্গে আবারও আলোচনা শুরু করেছেন এবং ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার শর্ত বাদ দিয়েই সৌদি আরবের সঙ্গে বিশাল অর্থনৈতিক চুক্তি করেছেন।

ধীরে ধীরে ট্রাম্প হয়তো এটা বুঝতে পেরেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যে মহাকৌশল নিয়ে তিনি অগ্রসর হচ্ছেন, তাতে ইসরাইল সম্পদের চেয়ে বোঝায় পরিণত হওয়ার আশঙ্কাই বেশি। ট্রাম্পের এই মধ্যপ্রাচ্য নীতি কেবল নেতানিয়াহু ও তার গণহত্যাকারী সহযোগীদের কোণঠাসা করার জন্য নাকি মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের সামগ্রিক বিধ্বংসী ভূমিকার জন্য, তা কেবল সময়ই বলে দেবে। ধারণা করা হচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের এতদিনের অনুসৃত নীতি থেকে সরে এসে নতুন পথে চলতে চাইছেন ট্রাম্প। সিরিয়ার নতুন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক করার মাধ্যমে ট্রাম্প তার এই নতুন নীতির জানান দিয়েছেন এরই মধ্যে। তিনি সিরিয়ার ওপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞাও প্রত্যাহার করেছেন। সবকিছুই হচ্ছে ইসরাইলকে পরিহার করে। ইউরোপীয় নেতারা যখন ইসরাইল নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছেন, তখন ট্রাম্প ইসরাইলের ব্যাপারে তার নীতি চূড়ান্ত করে ফেলেছেন। পাশাপাশি তিনি তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যিপ এরদোয়ানের সঙ্গেও সুসম্পর্ক রক্ষা করে চলছেন। ট্রাম্পের এই নীতি ইসরাইল ও নেতানিয়াহুকে নিশ্চিতভাবেই মাটিতে নামিয়ে আনবে।

লেখক : সাবেক ইতালীয় কূটনীতিক

মিডল ইস্ট আই থেকে অনুবাদ : মোতালেব জামালী

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন