আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ভারতে গণতন্ত্রের ক্ষয় ও ফ্যাসিবাদের উত্থান

ব্রি জে (অব.) এইচ আর এম রোকন উদ্দিন

ভারতে গণতন্ত্রের ক্ষয় ও ফ্যাসিবাদের উত্থান

নয়াদিল্লির ক্ষমতার করিডোর থেকে শুরু করে ভারতের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল—সবখানেই ফ্যাসিবাদের উত্থানের লক্ষণ আজ স্পষ্ট। আর কোনো বিভ্রান্তি নেই। একসময় বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র হিসেবে পরিচিত ভারত আজ ক্রমেই একটি কর্তৃত্ববাদী জাতীয়তাবাদের দিকে ধাবিত হচ্ছে। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ক্ষয়ে যাচ্ছে, ভিন্নমতকে ‘দেশবিরোধী’ তকমা দেওয়া হচ্ছে, আর শক্তিশালী নেতার রাজনীতিকে গৌরবের আসনে বসানো হচ্ছে। এই প্রবণতা ভারতের রাজনৈতিক ভূদৃশ্যকে তার প্রতিষ্ঠাতা পিতাদের কল্পিত গণতান্ত্রিক ভিত্তি থেকে সরিয়ে দিচ্ছে।

এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। এই সংগঠনটির শেকড় হিন্দু জাতীয়তাবাদী মতাদর্শে গভীরভাবে প্রোথিত। দলের কট্টরপন্থিরা বিশ্বাস করেন, ভারত মূলত এক ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ ছিল, আর মুসলিম ও খ্রিষ্টানদের মতো সংখ্যালঘুরা বাইরের আক্রমণ ও উপনিবেশের মাধ্যমে এখানে এসেছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি ভারতের হাজার বছরের সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন ও বহুত্ববাদকে অস্বীকার করে ‘ভেতরের’ ও ‘বাইরের’ মানুষের সরলীকৃত বিভাজন তৈরি করে।

বিজ্ঞাপন

এই আদর্শ শুধু ইতিহাস বিকৃতি নয়; এটি আজকের রাষ্ট্রনীতিকে প্রভাবিত করছে। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA), ‘লাভ জিহাদ’ বিরোধী প্রচারণা, সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ঘনঘন গণপিটুনি ও দলিতদের ওপর সহিংসতা—সবই দেখায় যে মতাদর্শ এখন নীতির আকার ধারণ করেছে। এই জাতীয়তাবাদী ভাবনার শিকড় উনিশ শতকের শেষভাগ ও বিশ শতকের গোড়ার দিকে। ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সময় উচ্চবর্ণ হিন্দু অভিজাতদের একাংশ ভারতীয় পরিচয়কে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে চেয়েছিল। এই প্রেক্ষাপটে ১৯২৫ সালে জন্ম নেয় রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস)। এর অন্যতম মতাদর্শিক স্থপতি ছিলেন বিনায়ক দামোদর সাভারকর, যিনি হিন্দুত্ব ধারণা প্রচার করেন। তার মতে, সত্যিকারের ভারতীয় হওয়ার শর্ত হলো হিন্দু হওয়া। মুসলিম ও খ্রিষ্টানদের তিনি ‘বিদেশি উপাদান’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন, যত গভীরই তাদের শিকড় ভারতীয় মাটিতে হোক না কেন।

আরএসএস গড়ে উঠেছিল আংশিকভাবে মুসোলিনির ইতালি ও হিটলারের নাৎসি জার্মানির অনুপ্রেরণায়। তাদের নিয়মিত মহড়া, শৃঙ্খলা ও অন্ধ আনুগত্যের চর্চা ছিল এক ধরনের আধা সামরিক অনুশীলন, যার উদ্দেশ্য ছিল হিন্দুদের শারীরিক ও মানসিকভাবে লড়াইয়ের উপযুক্ত করে তোলা। এটি আসলে ছিল এক কর্তৃত্ববাদী জাতীয়তাবাদী প্রকল্পের প্রস্তুতি।

প্রায় এক শতাব্দী পর আরএসএসের রাজনৈতিক শাখা বিজেপি এখন ভারতের ক্ষমতার কেন্দ্রস্থলে। মোদির নেতৃত্বে রাষ্ট্রের প্রায় সব প্রতিষ্ঠান—বিচার বিভাগ, গণমাধ্যম ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ক্রমেই শাসকদলের মতাদর্শের সঙ্গে একাকার হয়ে যাচ্ছে। বিরোধী নেতাদের হয়রানি, গ্রেপ্তার বা মামলায় জড়ানো আজ নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা।

গণমাধ্যম ও শিক্ষাঙ্গন স্বাধীনতা হারাচ্ছে। সমালোচকের কণ্ঠস্বর দমন করা হচ্ছে সেন্সরশিপ, ভয়ভীতি বা আর্থিক চাপ দিয়ে। নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলো বিদেশি অর্থায়নের অজুহাতে সীমাবদ্ধ করা হচ্ছে। ভিন্নমতকে ‘দেশবিরোধী’ তকমা দেওয়া হচ্ছে, যা একেবারে ফ্যাসিবাদী কৌশলের প্রতিধ্বনি। অন্যদিকে মোদির ‘অপরাজেয় নেতা’ হিসেবে পূজা এক ধরনের ব্যক্তিপূজা তৈরি করছে, যা একসময় কর্তৃত্ববাদী শাসকদের হাতিয়ার ছিল। এটি শুধু মতাদর্শিক সমস্যা নয়; অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতাকেও গভীর করছে। বেকারত্ব, কৃষি সংকট, অসমতা—এসব বাস্তব ইস্যু আড়াল করতে হিন্দুত্ববাদী আবেগ কাজে লাগানো হচ্ছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়কে ইতিহাসের ক্ষোভে উসকে দেওয়া হচ্ছে, আর সংখ্যালঘুদের শত্রুতে পরিণত করা হচ্ছে। ফলে সমাজ ভেঙে যাচ্ছে, পারস্পরিক আস্থা নষ্ট হচ্ছে, যা রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্য মারাত্মক হুমকি।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গতিপথ নিয়ে উদ্বেগ দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে যখন একজন ইউরোপীয় কূটনীতিক প্রকাশ্যে মন্তব্য করেন, ভারতের ভুল নীতি দেশটিকে বিচ্ছিন্নতার পথে ঠেলে দিচ্ছে, তখন তা নিছক ব্যক্তিগত মত নয়, বরং বৈশ্বিক পর্যবেক্ষকদের অভ্যন্তরীণ উদ্বেগের প্রতিফলন। কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এ ধরনের মন্তব্য সাধারণত এড়িয়ে চলা হয়, কারণ এগুলো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখা যেতে পারে। কিন্তু তবুও যখন এই সতর্কতা উচ্চারিত হয়, তা স্পষ্ট করে যে ভারতের অভ্যন্তরীণ সংকট আর কেবল ভারতের সমস্যা নয়—এটি এখন আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন।

একসময় ভারতকে এশিয়ায় স্বৈরতান্ত্রিক শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে একটি ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে গণ্য করা হতো। তার গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য, বহুত্ববাদী সমাজব্যবস্থা ও ‘বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র’ পরিচয় তাকে আন্তর্জাতিক মহলে এক ধরনের নৈতিক নেতৃত্ব দিয়েছিল। আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলো ভারতের দিকে তাকিয়ে শিখত কীভাবে বহুত্ববাদ ও গণতন্ত্র একসঙ্গে টিকে থাকতে পারে; কিন্তু আজ ভারতের বাস্তবতা ভিন্ন। বিরোধী কণ্ঠ দমন, সংখ্যালঘুদের প্রান্তিককরণ, বিচার বিভাগ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়া—সবকিছুই এক ধরনের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করছে। এতে শুধু দেশের ভেতরে রাজনৈতিক স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হচ্ছে না, বরং আন্তর্জাতিকভাবে ভারতের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। যেসব মিত্র দেশ ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রেখেছিল গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের কারণে, তারাও এখন প্রশ্ন তুলছে—‘ভারত কি আর সত্যিই সেই মূল্যবোধের প্রতিনিধিত্ব করছে?’

এর ফলে ভারতের কূটনৈতিক পরিসর সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। পশ্চিমা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো ভারতের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক রাখতে চাইবে বটে, তবে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রশ্নে ক্রমবর্ধমান অস্বস্তি তৈরি হলে সেই সম্পর্ক দুর্বল হতে পারে। আঞ্চলিকভাবেও প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো ভারতের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও বিভাজনকে একটি ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তার উৎস হিসেবে দেখতে শুরু করবে। অতএব ভারতের অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক সংকট শুধু তাদের নিজেদের রাষ্ট্রের সমস্যা নয়; এটি বৈশ্বিক ভূরাজনীতি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।

ভারতের বর্তমান অভ্যন্তরীণ সংকট বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে ভেঙে পড়া দুটি রাষ্ট্র—সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুগোস্লাভিয়ার সঙ্গে ভয়াবহ সাদৃশ্য বহন করছে। উভয় দেশই নিজেদের শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ হিসেবে উপস্থাপন করেছিল; অথচ একনায়কতন্ত্র, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও জাতিগত জাতীয়তাবাদের সংঘাতে সেটি ভেঙে যায়। ভারত আজ একই ধরনের বিপজ্জনক লক্ষণ দেখাচ্ছে।

কাশ্মীরের জনগণের বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোভাব ২০১৯ সালে ৩৭০ অনুচ্ছেদ প্রত্যাহারের পর আরো গভীর হয়েছে। উত্তর-পূর্বে নাগাল্যান্ড, মণিপুর ও আসামের বিদ্রোহ এখনো দমেনি। পাঞ্জাবে খালিস্তান আন্দোলনের ছায়া রয়ে গেছে, বিশেষত প্রবাসী নেটওয়ার্কের অর্থায়নে। দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ুতে ‘হিন্দি-হিন্দু’ আধিপত্যের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ আবার মাথা তুলছে। প্রতিটি অঞ্চলই সম্ভাব্য বিস্ফোরক। অর্থনৈতিক বৈষম্যও মারাত্মক। দক্ষিণী রাজ্যগুলো, যেমন তামিলনাড়ু ও কেরালা মনে করে তারা কর বেশি দিচ্ছে, অথচ তহবিল কম পাচ্ছে। যুগোস্লাভিয়ার স্লোভেনিয়া ও ক্রোয়েশিয়ার মতোই, যারা দরিদ্র প্রদেশগুলোকে ভর্তুকি দিতে দিতে ক্ষুব্ধ হয়েছিল—ভারতেও সেই একই অসন্তোষ জমছে।

ধর্মীয় মেরূকরণ আরেকটি গভীর ফাটল। প্রায় ২০ কোটি মুসলমানসহ সংখ্যালঘুদের প্রান্তিককরণ দেশকে দ্বিধাবিভক্ত করছে। যুগোস্লাভিয়ার ভাঙনের পেছনে যেমন জাতিগত ও ধর্মীয় বিভাজন ছিল, ভারতেও তার পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে। সবচেয়ে গুরুতর হলো কেন্দ্রীয় সরকারের কর্তৃত্ববাদী কৌশল, যা ভারতীয় ফেডারেল কাঠামোকে দুর্বল করছে। গভর্নরদের অপব্যবহার, বিরোধী রাজ্য সরকারকে দমন এবং কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ চাপিয়ে দেওয়া—সব মিলিয়ে মস্কোর মতোই দিল্লির আধিপত্য আঞ্চলিক প্রতিরোধ উসকে দিচ্ছে। ভারতের বহুত্ববাদ, যা একসময় শক্তি ছিল, আজ সেই একই বহুত্ববাদ নষ্ট হচ্ছে একরূপীকরণের নীতিতে। ভিন্নমত দমন ও একক পরিচয় চাপিয়ে দিয়ে বর্তমান সরকার সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুগোস্লাভিয়ার মতো ভাঙনের উপাদানই তৈরি করছে।

আরএসএসের লালন করা হিন্দুত্ববাদ আজ বিজেপির মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। ফলে ভারত যে পথে হাঁটছে, তা গণতন্ত্র নয়, বরং বিশ শতকের ইউরোপীয় ফ্যাসিবাদের পুনরাবৃত্তি। ইতিহাস দেখিয়েছে, যখন ভিন্নমত দমন করা হয়, সংখ্যালঘুদের শত্রু বানানো হয়, আর জনগণ স্বাধীনতার বিনিময়ে ‘জাতীয় গৌরবের’ মোহে পড়ে, তখন ফ্যাসিবাদ বিকশিত হয়। ভারত আজ সেই বিপজ্জনক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। যদি এই প্রবণতা রোধ করা না যায়, তবে তা ভারতকে ঐক্যের পথে নয়, বরং ভাঙন, অস্থিতিশীলতা ও সহিংসতার দিকে ঠেলে দেবে। এতে শুধু গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যই ধ্বংস হবে না, রাষ্ট্র হিসেবেও ভারতের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন