ফেনী বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী ও সমৃদ্ধ জনপদ। এখানকার আমজনতা প্রবলভাবে ফ্যাসিস্টবিরোধী। যখনই তারা সুযোগ পেয়েছে স্বৈরাচার ও তাদের ফ্যাসিস্ট দোসরদের ছুড়ে ফেলেছে। ২০২৪ সালেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট রোববার অন্যদিনের মতোই ছাত্র-ছাত্রীরা সমবেত হয়েছিলেন মহীপাল চত্বরে। উদ্দেশ্য মানুষের নাগরিক ও গণতান্ত্রিক অধিকারের সপক্ষে তাদের সংহতি ঘোষণা। তাদের কর্মসূচি ছিল আগাগোড়া শান্তিপূর্ণ। তারা না কাউকে আঘাত করেছে, না কারও গাড়ি ভাঙচুর করেছে।
সকালে পৌরসভায় জড়ো হয় খুনি লীগের সাঙ্গোপাঙ্গরা। তিন-চারশ লোক ছিল সেখানে। জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও আওয়ামী গডফাদারদের অন্যতম নিজাম উদ্দিন হাজারীর নির্দেশ ছিল, যেকোনো মূল্যে ছাত্র-জনতাকে প্রতিহত করতে হবে। তার পাশে ছিলেন সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শুসেন চন্দ্র শীল ও পৌর সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম স্বপন মিয়াজী।
এরপর মাস্টারপাড়া থেকে সাদা প্রাইভেট কারে ব্যাডমিন্টনের ব্যাগে আনা হয় শটগান। ৪০-৫০ জন বিভিন্ন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র এবং ১০০ থেকে ২০০ জন দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র, হকিস্টিক, ধামা, কিরিচ, রাম-দা ও লাঠিসোটা ইত্যাদি নিয়ে মহীপালের দিকে যায়।
বিগত দেড় দশকের মতো সেদিনও ফ্যাসিস্ট হাসিনার পুলিশ ছিল দোসরের ভূমিকায়। গোলাবারুদ শেষ হওয়া পর্যন্ত তারা অব্যাহত রেখেছিল নির্বিচার গুলি।
দুপুরের দিকে এলো আওয়ামী বাহিনীর সদস্যরা। হানা দিল ছাত্র-জনতার শান্তি ও অধিকারের সমাবেশে। শুরু হলো যেকোনো মূল্যে মানুষের আন্দোলন ঠেকানোর অমানবিক আক্রমণ। পড়তে লাগল নিরীহ ছাত্র-জনতার লাশের পর লাশ। নির্বিচার গুলিবর্ষণে থেমে থাকেনি তাদের নিষ্ঠুরতা। আহত মানুষের ওপরও দ্বিগুণ উন্মত্ততায় হামলে পড়তে তাদের বাধেনি। গুলিবিদ্ধ ছাইদুল যখন দৌড়ে স্টারলাইন কাউন্টারসংলগ্ন মহীপাল ফ্লাইওভারের ওঠেন, তখন তারা তাকে লক্ষ করে গুলি ছোড়েন। একটি-দুটি নয়, আরও ১৫-১৬টি! তারপর? মাটিতে লুটিয়ে পড়ার পর তাকে লোহার রড ও রাইফেলের বাট দিয়ে পিটিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে।
একই বর্বরতা দেখা যায় ছাগলনাইয়া আবদুল হক চৌধুরী ডিগ্রি কলেজের অনার্সপড়ুয়া শহীদ মাহবুবুল হাসান মাসুমের (২৫) ক্ষেত্রে। মহীপাল ফ্লাইওভারের নিচে শাহীন হোটেলের সামনে অবৈধ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা তাকে মাথা, বুক ও পিঠে গুলি করে। একপর্যায়ে তিনি রক্তাক্ত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। আহত সেই মাসুমকে হায়েনার দল হকিস্টিক, লাঠিসোটা ও ধামা-কিরিচের উল্টো পিঠ দিয়ে আঘাত করতে থাকে। যেন নিজের হাতে মানবসন্তানদের মৃত্যু নিশ্চিত করাকেই এই মুজিববাদীরা জীবনের ব্রত করে নিয়েছে।
ইসতিয়াক আহমদ শ্রাবণ, সাইদুল ইসলাম শাহী, ওয়াকিল আহমদ শিহাব, সরোয়ার জাহান মাসুদ, মাহবুবুল আলম মাসুম, মো. সবুজ (টমটম চালক), জাকির হোসেন সাকিল, জাহিদুল আলম আবিদ, একরাম হোসেন কাওছার, আবদুল গণি বোরহান, আবু বকর ছিদ্দিক শিবলু (চাকরিজীবী), জাফর আহম্মদ (টমটম চালক) ও সাইফুল ইসলাম আরিফ (ছাত্র) ছাড়াও রয়েছে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত অর্ধশতাধিক ছাত্র-জনতার নিরন্তর দীর্ঘশ্বাসের জীবন্ত দৃষ্টান্ত।
বিপ্লব-পরবর্তী প্রথম প্রহর থেকে আমরা একে বাংলাদেশের দ্বিতীয় স্বাধীনতা হিসেবে অভিহিত করে আসছি। কেউ কেউ বলছেন, অভূতপূর্ব অভ্যুত্থান। অনেকে এটিকে বাংলাদেশ ২.০ হিসেবে দেখছেন। আবার চব্বিশকে অনেকেই ভাবছেন আমাদের জাতিগত প্যারাডাইম শিফট হিসেবে। এর বাইরেও জুলাই বিপ্লবের একটা মহাজাগতিক বা রুহানি বিশেষত্ব আছে। আমরা মনে করি, এর ওপর ভিত্তি করে শহীদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে উঠবে নতুন এক বাংলাদেশ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

