১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি—বাংলার ইতিহাসে চিরস্মরণীয় এক দিন। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্রদের ওপর পুলিশ গুলি চালালে শহীদ হন সালাম, রফিক, বরকত, জব্বারসহ আরো অনেকে। ঢাকা শহর তখন রক্তে ভেসে উত্তাল। সেই রক্তস্নাত আবহেই জন্ম নেয় এক অমর সংগীত—‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি?’
তরুণ সাংবাদিক আব্দুল গাফফার চৌধুরী লিখেছিলেন গানের কথা। প্রথমে সুর দেন তরুণ শিল্পী আব্দুল লতিফ। পরবর্তী সময়ে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আলতাফ মাহমুদ নতুন সুরারোপ করেন, যা আজ সর্বাধিক প্রচলিত এবং একুশে ফেব্রুয়ারির প্রতীকী সংগীতে পরিণত হয়েছে। তবে ইতিহাস ভুলে যায় না, এ গানের প্রথম সুরারোপক ছিলেন আব্দুল লতিফ।
আব্দুল লতিফ শুধু একজন সুরকার বা গীতিকার ছিলেন না, তিনি ছিলেন সংগ্রামী বাংলার কণ্ঠস্বর, চেতনার জাগরণী প্রহরী। তার গান আন্দোলনরত জনতার জন্য ছিল সাহসের বাতিঘর, শক্তির জ্বালানি, আবার ছিল দুঃখে-শোকে নিরাময়ের সান্ত্বনা। গণসংগীতের তিনি প্রাণপুরুষ। ১৯৫২ থেকে শুরু করে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত প্রতিটি গণআন্দোলনেই আব্দুল লতিফের গান জনতার কণ্ঠে কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে। তার লেখা ও সুরারোপিত গান আন্দোলনকারীদের অকুতোভয় সাহস জুগিয়েছে, সংগ্রামী মনোবল অটুট রেখেছে।
তিনি লিখেছিলেন—‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন করিলিরে বাঙালি, ঢাকা শহর রক্তে ভাসাইলি’, ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইরা নিতে চায়’ প্রভৃতি। এসব গান শুধু আবেগ নয়, ছিল প্রতিবাদের তীব্র অস্ত্র।
লোকসংগীতে বিপুল অবদান রেখেছেন তিনি। আব্দুল লতিফ ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। ভাটিয়ালি, মারফতি, মুর্শিদি, পল্লিগীতি—যে ধারাই তিনি ছুঁয়েছেন, সেখানেই অমর সৃষ্টি রেখে গেছেন।

তার সৃষ্টি—‘সর্বনাশা পদ্মা নদী তোর কাছে শুধাই, বল আমারে তোর কি আর কুল কিনারা নাই।’ এই ভাটিয়ালি গানে কণ্ঠ দিয়েছিলেন লোকসংগীতের কিংবদন্তি আব্দুল আলিম। আজও গানটি শুনলে অন্তরে হাহাকার জাগে।
আবার তিনি লিখেছেন—‘দুয়ারে আইসাছে পালকি নাইওরি গাও তোলো, মুখে আল্লাহ-রসুল সবে বলো’, ‘পরের জায়গা পরের জমি ঘর বানাইয়া আমি রই, আমি তো সেই ঘরের মালিক নই।’ কথা, সুর আর গায়কী—সব মিলিয়ে এসব সৃষ্টি আজও আমাদের গভীর উদাসে ভরিয়ে দেয়।
এক বৈশাখে তিনি লিখেছিলেন—‘ঝড় এলো এলো ঝড়, আম পর আম পর, এই যাহ্ এলো বুঝি বৃষ্টি।’ প্রথমে কণ্ঠ দিয়েছিলেন তার ছেলে সিরাজুস সালেকিন, যিনি পরবর্তী সময়ে খ্যাতিমান রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী হিসেবে পরিচিতি পান। পরে শিমুল বিল্লাহর কণ্ঠে গানটি জনপ্রিয়তা পায়।
দেশাত্মবোধক গানের ক্ষেত্রেও আব্দুল লতিফ ছিলেন অগ্রগামী—‘আমার দেশের মতো এমন দেশ কি কোথাও আছে’, ‘দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা, কারো দানে পাওয়া নয়, দিচ্ছি প্রাণ লক্ষ কোটি জানা আছে জগৎময়।’
শাহনাজ রহমতউল্লাহর কণ্ঠে তার লেখা ও সুর করা গান—‘সোনা সোনা লোকে বলে সোনা, সোনা নয় তত খাঁটি, তার চেয়ে খাঁটি বাংলাদেশের মাটি।’ আজও হৃদয়ের মণিকোঠায় এটি অনুরণিত হয়।
একাধারে তিনি শিক্ষক ও সংগীতগুরু। ষাট-সত্তরের দশকে প্রায় সব জনপ্রিয় শিল্পী তার কাছে তালিম নিয়েছেন। ফেরদৌসী রহমান, রওশন আরা, মাসুদ, লতিফা চৌধুরী, মিনা বড়ুয়া, আব্দুর রৌফ, হেলেন, নওশীন, লায়লা—অসংখ্য শিল্পী তার কাছ থেকে শিক্ষা নিয়েছেন।
সহজ ভাষা ও সাবলীল সুরে তিনি গানকে এমনভাবে পরিবেশন করতেন যে শিল্পীরা অনায়াসেই কণ্ঠে ধারণ করে নিতে পারতেন। বাংলাদেশ রেডিও ও টেলিভিশনের ইতিহাসে আব্দুল লতিফ তাই এক জীবন্ত প্রতিষ্ঠান। ব্যক্তিজীবন ও চরিত্রেও তিনি অনন্য। শিল্পী ও শিক্ষক হিসেবে যেমন তিনি অসাধারণ ছিলেন, তেমনি মানুষ হিসেবেও ছিলেন অত্যন্ত সহজ-সরল, দরদি ও হাস্যোজ্জ্বল। ছোটদের প্রতি তার মমতা এবং সবার সঙ্গে সহজভাবে মিশে যাওয়ার স্বভাব তাকে আলাদা মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছিল। অতি সাধারণ জীবনযাপন করলেও তিনি ছিলেন সবার প্রিয় ‘লতিফ ভাই’।
বাংলা সংগীতে অবদানের জন্য তিনি একুশে পদক এবং স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করেন। এই স্বীকৃতিগুলো শুধু ব্যক্তিগত সম্মান নয়, বরং বাংলা সংগীতের ইতিহাসে তার অসামান্য অবদানের প্রতি জাতির দেওয়া শ্রদ্ধাঞ্জলি। বাংলাদেশ টেলিভিশনে আমার প্রযোজনা জীবনে আব্দুল লতিফ ভাইকে নিয়ে বহু অনুষ্ঠান করার সৌভাগ্য হয়েছে। একটি ঘটনার কথা আজও মনে পড়ে।
আমার ডাকনাম ছিল ‘মেনকা’। কলেজে পড়ার সময় রেডিওতে অনুষ্ঠান ঘোষণা করতাম ‘মেনকা চৌধুরী’ নামে। টেলিভিশনে প্রযোজক হিসেবে যোগ দেওয়ার পর টেলপে আমার নাম যেত ‘মেনকা হাসান’। একবার ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে শিশুদের নিয়ে একটি অনুষ্ঠান প্রযোজনা করার দায়িত্ব পাই। আমি লতিফ ভাইকে উপস্থাপনার জন্য অনুরোধ করলে তিনি অত্যন্ত খুশি হয়ে রাজি হন। শিশুদের নিয়ে তিনি মিলাদুন্নবীর তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা করেন, আর শিশুরা হামদ-নাত পরিবেশন করে। অনুষ্ঠানটি ছিল অসাধারণ।
পরদিন অফিসে অনুষ্ঠান অধ্যক্ষ আতিকুল হক চৌধুরী আমার রুমে এসে কঠিন গলায় বললেন, ‘তুমি আর মেনকা হাসান নাম ব্যবহার করবে না, সার্টিফিকেটের নাম কামরুন নেসা হাসান ব্যবহার করবে।’ আমি হতভম্ব। পরে জানতে পারি ধর্মীয় অনুষ্ঠান প্রযোজনার সময় মেনকা নাম দেখে মন্ত্রণালয় ভেবেছে, হিন্দু প্রযোজক দিয়ে ইসলামিক অনুষ্ঠান করানো হয়েছে। সেই থেকে টেলপে আমার নাম হলো ‘কামরুন নেসা হাসান’। এই ঘটনাই প্রমাণ করেছিল আব্দুল লতিফ ভাইয়ের মতো মানুষেরা ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও সংগীতকে কতটা সম্মানের সঙ্গে দেখতেন, আর আমাদের প্রজন্মকে কতটা আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করতেন।
অনেক অনেক স্মৃতি। আব্দুল লতিফ ছিলেন একাধারে সংগীতশিল্পী, গীতিকার, সুরকার, শিক্ষক ও মানবিক মানুষ। তার গান আমাদের আন্দোলনের শক্তি, আমাদের আবেগের আশ্রয় এবং আমাদের সংস্কৃতির মেরুদণ্ড। তিনি চলে গেছেন, কিন্তু রেখে গেছেন এক অনিঃশেষ ভান্ডার, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে আমাদের পথ দেখাবে। আব্দুল লতিফ তাই কেবল একজন শিল্পী নন, তিনি বাংলা সংগীতের এক জীবন্ত ইতিহাস, জাতীয় চেতনার অগ্নিশিখা।
লেখক : সাবেক উপ-মহাপরিচালক, বাংলাদেশ টেলিভিশন
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

