আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

প্রাথমিক শিক্ষায় নজর দিতে হবে

মো. মশিউর রহমান

প্রাথমিক শিক্ষায় নজর দিতে হবে

শিক্ষাকে দীর্ঘদিন ধরে সমাজের মহাসমতার মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এটি এমন একটি সোপান, যার মাধ্যমে সমাজের একজন সাধারণ মানুষও সাফল্যের শিখরে পৌঁছাতে পারেন। তবে এই যাত্রার সূচনা হয় প্রাথমিক শিক্ষার মাধ্যমে। যখন একটি শিশু তার প্রথম শ্রেণিকক্ষে পা রাখে, তখনই তার জীবন গঠনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়, যা শেষ পর্যন্ত দেশের ভবিষ্যৎকে গঠন করে। একটি শক্তিশালী প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা শুধু একটি শিক্ষা বিষয় নয়, এটি একটি জাতীয় প্রয়োজনীয়তা।

বিজ্ঞাপন

প্রতিটি সমৃদ্ধ জাতির ভিত্তি তাদের উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা। বাংলাদেশে ৩৬ জুলাইয়ের পর সময় এসেছে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর। প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষায় সুচিন্তিত পরিকল্পনা নেওয়ার সময় চলে এসেছে। শিক্ষা একটি দেশের উন্নয়নের মূল স্তম্ভ, যা ভবিষ্যতের কর্মশক্তি গড়ে তোলে, সামাজিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে এবং উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করে। কিন্তু অনেক সরকার উচ্চশিক্ষা ও প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের দিকে বেশি মনোযোগ দেয়, অথচ শিক্ষার মৌলিক স্তর প্রাথমিক শিক্ষাকে অবহেলা করে। বাস্তব সত্য হলো, একটি শক্তিশালী দেশ গড়তে হলে প্রথমে শক্তিশালী প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। প্রাথমিক শিক্ষার প্রথম কয়েক বছর কোনো মানুষের জ্ঞানের প্রসার এবং সামাজিক ও মানসিক বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় দেখা যায়, প্রাথমিক শিক্ষার মান জীবনব্যাপী শেখার ক্ষমতা, কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা, এমনকি নাগরিক অংশগ্রহণের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। শক্তিশালী প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা ছাড়া কোনো দেশ দক্ষ পেশাজীবী, উদ্ভাবনী চিন্তক ও দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরি করতে পারে না।

যদি কোনো দেশ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, সামাজিক সাম্য ও বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির স্বপ্ন দেখে, তবে প্রথমেই শিশুদের মানসিক বিকাশে বিনিয়োগ করতে হবে। একটি শক্তিশালী প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা কেবল একটি একাডেমিক বিষয় নয়, এটি একটি জাতীয় অগ্রাধিকার। ইতিহাস প্রমাণ দেয়, যেসব দেশ প্রাথমিক শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, তারা দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি, স্থিতিশীলতা ও উদ্ভাবনের সুফল ভোগ করেছে এক দশক পর। উদাহরণ হিসেবে ফিনল্যান্ডের কথা বলা যেতে পারে। এই ছোট নর্ডিক দেশটি একসময় কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল ছিল, কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়ে এটি বিশ্বের অন্যতম উন্নত জ্ঞানভিত্তিক সমাজে পরিণত হয়েছে। ফিনল্যান্ডের শিক্ষা মডেল মুখস্থবিদ্যা বা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং এটি সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং সব শিশুর জন্য সমান সুযোগের ওপর জোর দেয়, তাদের পারিবারিক পটভূমি যা-ই হোক না কেন। ফিনল্যান্ডে শিক্ষকরা অত্যন্ত সম্মানিত, প্রশিক্ষিত এবং তাদের শ্রেণিকক্ষ পরিচালনার স্বাধীনতা দেওয়া হয়। আর এর ফলে ফিনল্যান্ডের শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক শিক্ষামূলক মূল্যায়নে ধারাবাহিকভাবে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে এবং দেশটি প্রভূত অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক কল্যাণ সাধন করছে।

কেবল ফিনল্যান্ড নয়, সুইডেন, নরওয়ে ও ডেনমার্কও উচ্চমানের প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করে তাদের অর্থনৈতিক সাফল্য গড়ে তুলেছে। তারা শিক্ষাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে বিবেচনা করে, বিশেষ সুযোগ হিসেবে নয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে সহায়তা করেছে, যেখানে সাক্ষরতা, উদ্ভাবন ও সামাজিক সংহতি বিকশিত হয়েছে। এর বিপরীতে যেসব দেশে প্রাথমিক শিক্ষায় পর্যাপ্ত তহবিল বরাদ্দ করা হয়নি এবং শিক্ষার গুরুত্ব কমিয়ে দেখা হয়েছে, সেখানে কম সাক্ষরতার হার, উচ্চ ড্রপআউট হার এবং আধুনিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য অপ্রস্তুত শ্রমশক্তির মতো নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। যদি একটি দেশের প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি দুর্বল হয়, তবে সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী অর্থনৈতিক নীতিগুলোরও ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

যদি আমরা শক্তিশালী ও টেকসই দেশ গড়তে চাই, তবে আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার হতে হবে প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা। প্রতিটি শিশুর আর্থসামাজিক অবস্থা নির্বিশেষে উচ্চমানের শিক্ষার অধিকারী হওয়া উচিত। এটি কেবল তাদের ভবিষ্যতের বিনিয়োগ নয়, বরং গোটা দেশের ভবিষ্যতের জন্য একটি বিনিয়োগ। তাই প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার জন্য সরকারকে অবশ্যই দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে। এজন্য যথেষ্ট সম্পদ বরাদ্দ করা, দক্ষতার সঙ্গে শিক্ষক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা এবং এমন পাঠ্যক্রম তৈরি করা প্রয়োজন, যা শিশুদের দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বের জন্য প্রস্তুত করবে। আর এটি শুরু হয় শ্রেণিকক্ষে যেখানে তরুণ মন গঠিত হয়, লালিত হয় এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের জন্য প্রস্তুত হয়।

কোনো ভবন কখনো দুর্বল ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারে না। একইভাবে কোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি বা সামাজিক সমৃদ্ধির মূল ভিত্তি তার প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা। যখন একটি শিশু মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা পায়, তখন সে শুধু পড়া, লেখা ও গণিত শেখে তা নয়, বরং তার যৌক্তিক চিন্তাভাবনা, সৃজনশীলতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক সচেতনতার বিকাশ ঘটে। ইউনেস্কোর গবেষণা প্রমাণ করেছে, প্রাথমিক শিক্ষায় বিনিয়োগ সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। উচ্চ সাক্ষরতার হার সাধারণত উন্নত নাগরিক অংশগ্রহণ, শক্তিশালী অর্থনীতি, এমনকি স্বাস্থ্যকর জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কিত।

প্রাথমিক শিক্ষায় ফিনল্যান্ড কেন সফল?

ফিনল্যান্ডে শিক্ষকতা পেশা ডাক্তার বা আইনজীবীদের মতোই মর্যাদাপূর্ণ। শিক্ষকদের মাস্টার্স ডিগ্রি বাধ্যতামূলক এবং তাদের কঠোর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হয়। শিক্ষকরা পাঠ্যক্রম পরিচালনার স্বাধীনতা পান, যা সৃজনশীলতা, সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা এবং ব্যক্তিগত শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেয়। অনেক দেশে যেখানে কঠোর পরীক্ষার মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হয়, সেখানে ফিনল্যান্ড ছাত্রদের সার্বিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেয়। মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে শিক্ষার আনন্দ, কৌতূহল ও উদ্ভাবনী চিন্তাধারাকে উৎসাহিত করা হয়।

ফিনল্যান্ডে শিশুদের ওপর পরীক্ষা ও নম্বরের চাপ কমিয়ে শেখার পরিবেশকে সহজ ও আনন্দদায়ক করা হয়েছে। বিনা মূল্যে প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত লেখাপড়ার সুযোগ প্রদান করা হয়। সরকার নিশ্চিত করে, প্রত্যেক শিশু তাদের পারিবারিক আর্থিক অবস্থার পরোয়া না করে সর্বোচ্চ মানের শিক্ষা পাবে। ফলে শহর ও গ্রামের স্কুলগুলোর মধ্যে তেমন কোনো বৈষম্য নেই। ফিনল্যান্ডের শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘ সময়ের ক্লাস এবং চাপে রাখার পরিবর্তে শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাদের স্কুলের সময় কম, খেলাধুলার সময় বেশি। গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুদের পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও খেলার সুযোগ দিলে তাদের সৃজনশীলতা ও শেখার আগ্রহ বাড়ে। দেশটিতে শিক্ষাকে শুধু পরীক্ষার জন্য নয়, বরং বাস্তব জীবনের দক্ষতা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই মডেলের শিক্ষার ফলে আন্তর্জাতিক শিক্ষামূলক সূচকে ধারাবাহিকভাবে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে ফিনল্যান্ড। শুধু তাই নয়, দেশটি উদ্ভাবন, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও উন্নত জীবনমানের জন্যও বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত। অন্যদিকে যেসব দেশ প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্ব বুঝতে ব্যর্থ হয়, তারা বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হয়। সেসব দেশে ড্রপআউট হার বেশি, দুর্বল প্রাথমিক শিক্ষার কারণে ছাত্ররা উচ্চশিক্ষায় প্রবেশ করতে ব্যর্থ হয় এবং মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দেয়।

যদি একটি দেশ সত্যিই উন্নত হতে চায়, তাহলে শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ করতে হবে, যাতে প্রত্যেক শিশু মানসম্মত শিক্ষা পায়।

এছাড়া দক্ষ ও অনুপ্রাণিত শিক্ষক ছাড়া ভালো শিক্ষাব্যবস্থা সম্ভব নয়। একইসঙ্গে শহর ও গ্রামের শিক্ষার মধ্যে পার্থক্য কমাতে হবে এবং দরিদ্র পরিবারের শিশুদের জন্য বিশেষ সুযোগ তৈরি করতে হবে। মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে সমস্যা সমাধান, সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা এবং সৃজনশীল শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষার্থীদের শিখতে আগ্রহী করে তুলতে মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হবে।

ইউরোপের দেশগুলোর মতো যদি আমরা সত্যিকার অর্থে একটি শক্তিশালী দেশ গড়তে চাই, তাহলে প্রাথমিক শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আজকের শিশুদের মানসম্মত শিক্ষা দেওয়া মানে আগামী দিনের দক্ষ নাগরিক তৈরি করা। প্রশ্ন হলো—আমরা কি সত্যিই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ৩৬ জুলাই-পরবর্তী একটি ভালো শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে প্রস্তুত?

লেখক : পিএইচডি গবেষক, পেনসিলভেনিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি, আমেরিকা

mashi.fpm84@gmail.com

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন