হিন্দুত্ববাদ নিয়ে কয়েক বছর ধরে বহু লেখালেখি হয়েছে। এই কট্টর আদর্শের উদ্দেশ্য হলো ভারতকে একটা আগ্রাসী হিন্দু রাষ্ট্র বানানো, যেখানে মুসলিমরা হবে বড়জোর দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যখন ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হলেন, হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা তখন এটাকে এজেন্ডা বাস্তবায়নের মহাসুযোগ হিসেবে দেখেছে। এই হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের মনোজগতে ও কল্পনায় এমন একটা রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় ভাবাদর্শ বিরাজ করছে, যেখানে মুসলিম ও অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা ভারতের জন্য সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক।
ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি এমন সব নীতি গ্রহণ করেছে, যেগুলোর কারণে নিরাপত্তা, ধর্মীয় পরিচয়, অর্থনৈতিক কল্যাণ ও রাজনীতিতে অংশগ্রহণের প্রশ্নে ভারতীয় মুসলিমদের শঙ্কা বহু গুণ বেড়ে গেছে। মুসলিম আর ইসলাম নিয়ে বিজেপি এবং তাদের আদর্শিক সহযোগী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএসের যেসব এজেন্ডা রয়েছে, সেগুলো রীতিমতো আতঙ্কজনক।
ভারতে মুসলমানের সংখ্যা ২০০ মিলিয়নের বেশি। কয়েক দশক ধরে, এমনকি কংগ্রেস পার্টির শাসনামলেও সরকারি ও বেসরকারি খাতে বৈষম্যের স্বীকার হয়েছেন মুসলিমরা। কিন্তু বিজেপি এটাকে চরম পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
ভারতের মুসলমানদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে সম্প্রতি একটি বই প্রকাশ করেছেন নয়াদিল্লির জামিয়া মিল্লিয়া ইসলামিয়া ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মুজিবুর রেহমান। বইয়ের নাম ‘শিকওয়ায়ে হিন্দ : দ্য পলিটিক্যাল ফিউচার অব ইন্ডিয়ান মুসলিমস’। লেখক বলেছেন, আগ্রাসী হিন্দুত্ববাদী ক্ষমতা দিয়ে ভারতকে ইসলামশূন্য করার চেষ্টা চলছে।
চলতি বছরের জুনে তৃতীয়বারের মতো পাঁচ বছর মেয়াদের জন্য প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। মুসলিমবিদ্বেষ ইস্যুটা তাই আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মোদির প্রথম দুই মেয়াদে হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের যে রাজনীতি ছিল, তার প্রধান শিকার ছিলেন মুসলিমরা। হিন্দুত্ববাদের উত্থান এখনো যেভাবে চলছে, তাতে ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা জানিয়েছেন এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী।
ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্র যেভাবে বদলে যাচ্ছে, সেটা খুব গভীরভাবে দেখেছেন রেহমান। শুধু অ্যাকাডেমিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং হিন্দুত্ববাদের সমস্যার অনেক কিছুই তিনি সরাসরি প্রত্যক্ষ করেছেন। বিজেপি সরকার যখন বিতর্কিত সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট বা সিএএ গ্রহণ করল, তখন ২০১৯ সালে এর বিরুদ্ধে প্রথম বিক্ষোভ করেছিল এই জামিয়া মিল্লিয়ার শিক্ষার্থীরা। তখন এই শিক্ষার্থীরা যে বর্বর পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তার নজির অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পাওয়া যাবে না।
‘মোদি’স ইন্ডিয়া : হিন্দু ন্যাশনালিজম অ্যান্ড দ্য রাইজ অব এথনিক ডেমোক্রেসি’ নামে আরেকটি বই প্রকাশিত হয়েছে ২০২১ সালে। বইটির লেখক ফরাসি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ক্রিস্তোফে জ্যাফরেলোট। হিন্দুত্ববাদ কী আর কীভাবে তারা কাজ করছে, সেটা তিনি তুলে ধরেছেন এই বইয়ে। ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বোঝাতে গিয়ে জ্যাফরেলোট হিন্দু জাতীয়তাবাদের সংজ্ঞা দিয়েছেন, হিন্দুত্ববাদের কৌশলগুলো ফাঁস করেছেন, আর মোদির অধীনে মুসলিমরা কী অবস্থায় আছেন, তার চিত্র তুলে ধরেছেন।
প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য
নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় মুসলিমদের গুরুত্বহীন করে তোলা সমস্যার একটা দিক। নরেন্দ্র মোদির মন্ত্রিসভায় এমনকি প্রতীকী অর্থেও কোনো মুসলিম মন্ত্রী নেই। যদিও ভারতের জনসংখ্যার ১৫ শতাংশ হলো মুসলিম। ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এ ঘটনা প্রথমবারের মতো ঘটছে। ৫৩৪ সদস্যের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে মুসলিম সদস্য আছেন মাত্র ২৪ জন। তাদের মধ্যে কেউই বিজেপি জোটের অংশ নন।
মুসলিম সংসদ সদস্যদের বেশির ভাগই এমন সব জায়গা থেকে নির্বাচিত হয়ে এসেছেন, যেখানে মুসলিম ভোটারদের সংখ্যা বেশি। হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা এটা দেখে আরও ক্ষুব্ধ হয়েছে। এখন তারা নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কারচুপির নতুন কৌশল খুঁজছে। অথবা নির্বাচনী এলাকার সীমানা বদলে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করছে।
মুজিবুর রেহমান লিখেছেন, হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি মনে হয় যেন খুব সহজ একটা যুক্তি দ্বারা চালিত হয়। সেটা হলোÑ আর কোনো মুসলিম নন। মসজিদ, ওয়াকফ জমি, দরগাহ, হিজাবÑ মুসলিমদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবকিছুর ওপর বহুমুখী হামলা করা হচ্ছে। এগুলো দেখে বোঝা যায়, তাদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো ভারতকে ইসলামমুক্ত করা।
মুসলিমদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ থেকে রেহমান বলেন, মুসলিমদের কি রাজনীতিতে কিছু বলার জায়গা আছে? বিজেপি কোনো মুসলিম প্রার্থী দেয় না। রাজ্যসভা থেকে নিয়ে জাতীয় পার্লামেন্টÑ সব জায়গায় মুসলিমদের প্রতিনিধিত্ব অস্বীকার করার জন্য তারা সচেতনভাবে প্রচারণা চালিয়েছে। তবে, রেহমান মনে করেন, হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির বাইরের দলগুলোর রাজনীতিও সন্দেহজনক হয়ে উঠেছে।
তিনি লিখেছেন, কোনো রাজনৈতিক দলই চাচ্ছে না যে, মুসলিমরা মুসলিম হয়ে উঠুক। প্রত্যেকেই চাই, মুসলিমরা তাদের মতো করে মুসলিম হোক।
মুজিবুর রেহমান বলেন, বহু রাজনীতিবিদ আর দল ভারতে সেক্যুলার রাজনীতির প্রয়োজনটা বোঝেন। কিন্তু বিজেপির আগ্রাসী আচরণ তাদের শঙ্কিত করে তুলেছে। সে কারণে তারা মুসলিম ইস্যু নিয়ে কথা বলা বা এমনকি তাদের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টাও বন্ধ করে দিয়েছে।
ব্রাহ্মণ আর উচ্চবর্ণের নেতৃত্বাধীন হিন্দুত্ববাদী শ্রেণির মুসলিমদের টার্গেট করার একটা কারণ আছে। তাদের যে সংখ্যাগরিষ্ঠবাদী প্রকল্প, সেটা বাস্তবায়নের পথে তারা এই মুসলিম সম্প্রদায়কে প্রধান বাধা মনে করে। হিন্দুত্ববাদীরা যেভাবে অগ্রসর হচ্ছে, তার প্রভাব শুধু বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল ভারতের মধ্যে সীমিত থাকবে না, বরং এর প্রভাব আরও ব্যাপক পরিসরে, এমনকি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে।
মুজিবুর রেহমান বলেন, এখন পর্যন্ত ভারতে মুসলিমদের নিয়ে যেটুকু কথা হয়, সেটা তাদের অধিকারকেন্দ্রিক। আমি যেটা দেখেছি, সেটা হলো ভারতকে মুসলিমশূন্য করার একটা প্রচারণা ও প্রকল্প শুরু হয়েছে।
আধিপত্যবাদী রাজনৈতিক শক্তি
এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ভারতে আদর্শিক যুদ্ধ চলে আসছে। বিশেষ করে ১৯২৫ সালে যখন আরএসএস সৃষ্টি হয়, তখন থেকে এটা শুরু হয়েছে।
মুজিবুর রেহমান বলেন, ২০১৪ সালে আরএসএস আর বিজেপি সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তি হয়ে ওঠে। তাদের বিরুদ্ধে কোনো সিরিয়াস লড়াই হচ্ছে না। কংগ্রেস প্রায় কিছুই করছে না। আরএসএসের প্রশিক্ষণ ক্যাম্পগুলো শাখা নামে পরিচিত। হিন্দুত্ববাদী বাহিনী এসব শাখা আর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বহুমুখী হামলা চালাচ্ছে।
মুসলিমদের টার্গেট করার জন্য হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো সব ধরনের অজুহাত কাজে লাগাচ্ছে। কখনো তারা অদ্ভুত সব গল্প ফাঁদছে। তারা দাবি করছে, ঐতিহাসিক বড় বড় মসজিদ আর স্মৃতিস্তম্ভের নিচে নাকি হিন্দু মন্দির চাপা পড়ে আছে। জরিপের নামে এই মসজিদগুলোয় আগ্রাসন চালানোর জন্য তারা আদালতের দ্বারস্থ হচ্ছে। আবার অনেক সময় মুসলিমদের বাড়িতে ফ্রিজে গরুর মাংস থাকায় তাদের বিরুদ্ধে পুলিশে অভিযোগ করা হচ্ছে।
অনেক সময় শুধু হিন্দু মেয়ে বন্ধু বা কর্মক্ষেত্রের নারী সহকর্মীদের সঙ্গে থাকার কারণে মুসলিম তরুণদের ওপর হামলা করা হচ্ছে। হিন্দু নারীদের সঙ্গে মুসলিম পুরুষদের যেকোনো মেলামেশাকে ‘লাভ জিহাদ’ নাম দিয়ে তাদের ওপর নির্যাতন চালানো হচ্ছে।
অবৈধভাবে নির্মাণের অভিযোগ তুলে মুসলিমদের সম্পদকে টার্গেট করা হচ্ছে। হিন্দু এলাকায় মুসলিম হকার ও ফেরিওয়ালাদের পণ্য বিক্রি করতে বাধা দিচ্ছে উগ্র হিন্দু জনতা। মুসলিমদের কেউ অধিকারের দাবিতে সোচ্চার হলে বা ছোটখাটো অপরাধের দায়ে পুলিশ আর স্থানীয় কর্তৃপক্ষ কোনো আইন বিচার ছাড়াই তাদের ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দিয়েছে। আদালত এসব অন্যায় দেখেও মুখ বন্ধ করে রেখেছে।
মুজিবুর রেহমান বলেন, যেকোনো অজুহাতে মুসলিমদের ওপর হামলা করা হচ্ছে। মুসলিমদের সবকিছুই যেন অবৈধ। তারা চায়, তাদের যেমন ইচ্ছা এবং তারা যেভাবে বলবে, মুসলিমরা সেভাবেই চলবেন।
ইতিহাসের পুনর্লিখন
আজকের যে দক্ষিণ এশিয়া, এই অঞ্চলটি একসময় বহু রাজ্যে বিভক্ত ছিল। একসময় প্রতাপশালী মুঘল সম্রাটদের অধীনে পুরো ভারতবর্ষ শাসিত হয়েছে। হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা এখন তাদের অবদানের কথাও শুনতে চায় না।
সম্রাট বাবর ১৬ শতকে এই মুঘল সাম্রাজ্যের যাত্রা শুরু করেছিলেন। তার মৃত্যুর পর অন্য শাসকরা এর সীমানা আরও বড় করেন। ১৭০৭ সালে সম্রাট আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর এই সাম্রাজ্যের অবনতি শুরু হয়।
ইতিহাসের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের কথা তুলে ধরেছেন মুজিবুর রেহমান। প্রথমটি হলো ১৮৫৭ সাল, যখন ভারতীয় মুসলিমরা ব্রিটিশ উপনিবেশের অধীনে প্রজা হয়ে যান। দ্বিতীয় হলো ১৯৪৭ সালের দেশ ভাগ, যখন পাকিস্তান আর ভারত নামের আলাদা দেশ গঠিত হয়। আর তৃতীয় হলো ২০১৪ সালের নির্বাচন, যখন নরেন্দ্র মোদি বিজয়ী হন।
গত এক দশকে ভারতের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে গেছে। কিন্তু এটা স্বল্পমেয়াদি কোনো রাজনৈতিক অস্থিরতা নয়। যদিও অনেক দিশেহারা মুসলিম তেমনটাই ভাবতে চান। ইতিহাসের এই অধ্যায়ে ভারতের অভিজাত মুসলিম শ্রেণির অবস্থান কোথায়? এই অভিজাত শ্রেণি কি মুসলিম সম্প্রদায়ের সর্বস্তরের মানুষকে দিকনির্দেশনা দিতে পারছেন?
সেই ১৯৪৭ সাল থেকে কংগ্রেস পার্টি তাদের প্রতীকী সেক্যুলারিজমকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য কৌশলে মুসলিম অভিজাত শ্রেণিকে ব্যবহার করেছে। এই প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে অভিজাত মুসলিম শ্রেণির বিরাজনীতিকীকরণ হয়ে গেছে। খুবই সংকীর্ণ স্বার্থের মধ্যে তাদের মনোযোগ আটকে গেছে।
মুজিবুর রেহমান বলেন, মুসলিম অভিজাত শ্রেণির বিরাজনীতিকীকরণ হওয়াটা একটা বড় সমস্যা। অন্যায়ের বিরুদ্ধে তারা আওয়াজ তুলতে পারেন। কিন্তু নিজ নিজ স্বার্থের কারণে তারা নীরব হয়ে আছেন।
ভারতের মুসলিমদের সংখ্যা স্পেন, ফ্রান্স আর জার্মানির সম্মিলিত জনসংখ্যার চেয়েও বেশি। এই সম্প্রদায় যদি রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকে, তাহলে সামনে আরও বড় বিপদ অপেক্ষা করছে।
মুজিবুর রেহমান তার বইয়ে সতর্ক করে দিয়ে লিখেছেন, রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হলেই শুধু ভারতের মুসলিমরা তাদের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে দর-কষাকষি করতে পারবেন। ভারতীয় মুসলিমদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ যেভাবে পরিকল্পিতভাবে দুর্বল করে দেওয়া হচ্ছে, সেটা অব্যাহত থাকলে ভারতের মুসলিম সম্প্রদায় একসময় চরম দরিদ্রতায় ডুবে যাবে, স্থায়ীভাবে দুর্ভোগে নিপতিত হবে। এ অবস্থায় তাদের কোনো অধিকার থাকবে না আর অন্তহীন নির্যাতনের মধ্যে তাদের জীবন কাটাতে হবে।
লেখক : ভারতীয় সাংবাদিক
ডেইলি সাবাহ অবলম্বনে ভাষান্তর : জুলফিকার হায়দার
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

