বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে জানা যায়, গত ৩ জানুয়ারি মধ্যরাতে মার্কিন ডেল্টা ফোর্স একটি বিশেষ অভিযান চালিয়ে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট এবং তার স্ত্রীকে আটক করে নিউ ইয়র্ক ডিটেনশন সেন্টারে নিয়ে যায়। তার বিরুদ্ধে মাদক ও সন্ত্রাসবাদকে সহায়তা করার অভিযোগে মামলা করা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—এভাবে কি একটি দেশ অন্য একটি স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে আন্তর্জাতিক নিয়মের তোয়াক্কা না করে বিচার করতে পারে কি না। এ বিষয়ে জাতিসংঘসহ বিশ্বের অনেক দেশ একটি স্বাধীন দেশের সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপের কারণে উদ্বেগ প্রকাশ ও প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। কারণ এটি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের হস্তক্ষেপমূলক কর্মকাণ্ডের ইতিহাস, ক্ষমতার রাজনীতি এবং আস্থাসংকটের প্রতিফলন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এর আগেও একাধিকবার দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে আন্তর্জাতিক আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে একই ধরনের অভিযান পরিচালনা করেছে।
অন্য একটি স্বাধীন দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে এভাবে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে হস্তক্ষেপ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাতিসংঘসহ বিশ্বের বহু রাষ্ট্র এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করার শামিল বলে মনে করছে। কারণ, সার্বভৌমত্ব শুধু একটি আইনি ধারণা নয়—এটি একটি জাতির আত্মমর্যাদা, নিরাপত্তা এবং অস্তিত্বের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। যখন কোনো শক্তিধর রাষ্ট্র নিজের রাজনৈতিক, কৌশলগত বা অর্থনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করে, তখন তা শুধু একটি দেশের ওপর প্রভাব ফেলে না; বরং পুরো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দেয়। এই উদ্বেগ হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের হস্তক্ষেপমূলক কর্মকাণ্ডের ইতিহাস, ক্ষমতার রাজনীতি এবং আস্থাহীনতার অভিজ্ঞতা থেকেই এই প্রতিক্রিয়ার জন্ম। অতীতের দিকে তাকালে দেখা যায়, বিভিন্ন সময় বিশ্বের নানা অঞ্চলে তারা আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের মূল চেতনাকে উপেক্ষা করে সামরিক অভিযান, গোপন অপারেশন, সরকার পরিবর্তনের প্রচেষ্টা কিংবা অর্থনৈতিক অবরোধ চাপিয়ে দিয়েছে। পানামা, ইরাক, লিবিয়া ও আফগানিস্তান—এসব এর প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। এসব পদক্ষেপ প্রায়ই ‘গণতন্ত্র রক্ষা’, ‘মানবাধিকার’ বা ‘নিরাপত্তা’র নামে চালানো হলেও বাস্তবে তার ফল হয়েছে উল্টো—রাষ্ট্রকাঠামোর ভাঙন, সহিংসতা বৃদ্ধি, মানবিক বিপর্যয় এবং দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা।
এ ধরনের আচরণ বিশ্বব্যাপী একটি গভীর আস্থাসংকট সৃষ্টি করেছে। বহু দেশ আজ মনে করে, আন্তর্জাতিক আইন সবার জন্য সমান নয়; বরং শক্তিশালীদের জন্য এক ধরনের এবং দুর্বলদের জন্য আরেক ধরনের। যখন কোনো রাষ্ট্র বারবার আন্তর্জাতিক আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েও জবাবদিহির বাইরে থেকে যায়, তখন জাতিসংঘের মতো বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। ফলে ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রগুলো নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে আরো শঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পরিবর্তে আত্মরক্ষামূলক, কখনো কখনো সংঘাতমুখী নীতির দিকে ঝুঁকে যায়। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে শান্তি বিঘ্নিত হওয়ার পেছনেও এই হস্তক্ষেপমূলক নীতির বড় ভূমিকা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য, লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা কিংবা এশিয়ার বিভিন্ন অংশে দেখা গেছে—একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বাহ্যিক হস্তক্ষেপ দেশটিকে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়েছে, উগ্রপন্থা ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থান ঘটেছে, লাখ লাখ মানুষ শরণার্থী হতে বাধ্য হয়েছে। এসব সংকট শুধু সংশ্লিষ্ট দেশেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; প্রতিবেশী অঞ্চল ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার ওপরও তার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘসহ বহু রাষ্ট্র যে উদ্বেগ প্রকাশ করছে, তা আসলে একটি বৃহত্তর বার্তার বহিঃপ্রকাশ। সেই বার্তা হলো—আন্তর্জাতিক সম্পর্ক যদি শক্তির একতরফা প্রয়োগের ওপর দাঁড়ায়, তবে স্থায়ী শান্তি অসম্ভব। সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের সংস্কৃতি যত বাড়বে, ততই প্রতিশোধ, প্রতিরোধ এবং বিভাজনের রাজনীতি শক্তিশালী হবে। বিশ্ব আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে পারস্পরিক সম্মান, আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা এবং বহুপক্ষীয়তার প্রতি সত্যিকারের অঙ্গীকার ছাড়া শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষা করা যাবে না। এই বাস্তবতা অনুধাবন করাই বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার দ্বন্দ্ব কয়েক দশক ধরে চলমান এবং এটি শুধু কোনো একক রাজনৈতিক ঘটনার ফল নয়। এর শিকড় রয়েছে মতাদর্শিক সংঘাত, জ্বালানি ভূরাজনীতি এবং লাতিন আমেরিকায় মার্কিন আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধে। হুগো চাভেজের সময় থেকে শুরু হয়ে নিকোলাস মাদুরোর নেতৃত্বে ভেনেজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর অর্থনৈতিক কাঠামো প্রত্যাখ্যান করেছে, তেল খাত জাতীয়করণ করেছে এবং প্রকাশ্যে ওয়াশিংটনের প্রভাবমুক্ত পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করেছে। রাশিয়া-চীন-ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলা ওয়াশিংটনের কাছে ভেনেজুয়েলাকে একটি কৌশলগত চ্যালেঞ্জে পরিণত করে। বিশ্বের বৃহত্তম প্রমাণিত তেল মজুতের মালিক হওয়ায় ভেনেজুয়েলা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ আর সে কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে দেশটি শুধু একটি রাজনৈতিক সমস্যা নয়, একটি ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
সরাসরি সামরিক আগ্রাসনের পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে যে পথ বেছে নিয়েছে, অনেক বিশ্লেষক একে ‘হাইব্রিড যুদ্ধ’ বলে অভিহিত করেন। এর মধ্যে রয়েছে কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, তেল রপ্তানি ও ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে অবরুদ্ধ করা, কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা, গোয়েন্দা চাপ, বিরোধী শক্তিকে সমর্থন এবং আন্তর্জাতিক বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রচেষ্টা। ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র যখন বিরোধী নেতা হুয়ান গুইদোকে ভেনেজুয়েলার ‘অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, তখন বহু রাষ্ট্র এটিকে একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়াবহির্ভূত ক্ষমতা পরিবর্তনের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখেছিল। এই সিদ্ধান্তের পর থেকেই ভেনেজুয়েলা ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য নিয়ে বিশ্বব্যাপী সন্দেহ আরো গভীর হয়। ২০২০ সালে ব্যর্থ ‘অপারেশন গিডিয়ন’—যেখানে সশস্ত্র ভাড়াটে যোদ্ধারা সমুদ্রপথে ভেনেজুয়েলায় ঢোকার চেষ্টা করেছিল—এই সন্দেহকে আরো গভীর করে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে, তথাপি সাবেক মার্কিন নিরাপত্তা ঠিকাদারদের উপস্থিতি বিশ্বজনমনে একটি ধারণা তৈরি করে যে, ওয়াশিংটন অন্তত নীরব সমর্থন দেয়। এই প্রেক্ষাপটেই ‘অপহরণ’ বা ‘রেইড’-এর মতো ঘটনা অনেকের কাছে অসম্ভব মনে হয় না।
বিশ্ব প্রতিক্রিয়া এই প্রশ্নে স্পষ্টভাবে বিভক্ত। পশ্চিমা মিত্ররা শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান সমর্থন করলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা পিছিয়ে আসে। কারণ নিষেধাজ্ঞা রাজনৈতিক পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হলেও সাধারণ জনগণের জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে তোলে। মেক্সিকো, আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের মতো দেশগুলো হস্তক্ষেপবিরোধী অবস্থান গ্রহণ করে এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বের পক্ষে কথা বলে। অন্যদিকে রাশিয়া, চীন, ইরান, তুরস্ক ও কিউবা যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে স্পষ্টভাবে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করে। জাতিসংঘের বিভিন্ন বিশেষ প্রতিবেদক যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা নিষেধাজ্ঞাকে মানবিক বিপর্যয়ের জন্য দায়ী করেন এবং বলেন—এগুলো কার্যত সাধারণ মানুষের ওপর সমষ্টিগত শাস্তি চাপিয়ে দেয়। এতে করে বিশ্বব্যাপী এক নতুন বিতর্ক তৈরি হয় : নিষেধাজ্ঞা কি কূটনৈতিক হাতিয়ার, নাকি অর্থনৈতিক অবরোধের আধুনিক রূপ?
এই পরিস্থিতির প্রভাব বৈশ্বিক রাজনীতিতে গভীর। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের কথা বলে অন্য দেশের নেতৃত্ব নির্ধারণের চেষ্টা অনেক রাষ্ট্রের কাছে দ্বিচারিতা হিসেবে ধরা পড়েছে। ফলে গ্লোবাল সাউথে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। দ্বিতীয়ত, ভেনেজুয়েলার মতো দেশগুলো বিকল্প জোট ও ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকেছে। রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে জ্বালানি ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বেড়েছে, ডলারনির্ভর লেনদেন কমানোর চেষ্টা জোরদার হয়েছে। যদিও ভেনেজুয়েলা একা বৈশ্বিক আর্থিক কাঠামো বদলে দিতে পারে না, তবে এই প্রবণতা বৃহত্তর ‘ডি-ডলারাইজেশন’ প্রক্রিয়াকে উৎসাহিত করেছে। তৃতীয়ত, এই অভিজ্ঞতা বিশ্বকে দেখিয়েছে যে আধুনিক যুগে শাসন পরিবর্তনের কৌশল বদলেছে। সরাসরি সামরিক আগ্রাসনের বদলে এখন নিষেধাজ্ঞা, আইনি চাপ, মিডিয়া যুদ্ধ ও কূটনৈতিক স্বীকৃতি ব্যবহার করা হয়। এতে অনেক দেশ আশঙ্কা করছে—সার্বভৌমত্ব আর নিঃশর্ত নয়, বরং শক্তিধর রাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থের ওপর নির্ভরশীল। সবশেষে, দীর্ঘদিনের চাপ সত্ত্বেও নিকোলাস মাদুরোর ক্ষমতায় টিকে থাকা ওয়াশিংটনকেও নীরবে কৌশল বদলাতে বাধ্য করেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটে যুক্তরাষ্ট্র আংশিকভাবে তেল নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে এবং কারাকাসের সঙ্গে যোগাযোগ আবার শুরু করে। এতে স্পষ্ট হয়—ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা প্রায়ই আদর্শিক অবস্থানকে ছাপিয়ে যায়। এই ইস্যু বিশ্ব রাজনীতিতে শক্তির ভারসাম্য, আস্থা সংকট এবং একটি ক্রমেই পরিবর্তনশীল আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।
লেখক : নিরাপত্তা বিশ্লেষক, গবেষক ও লেখক
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


শরিকদের ছেড়ে দেওয়া ৪টি আসনেও বিদ্রোহী প্রার্থী বিএনপি নেতারা
দিনাজপুরে বেড়েছে শীতের তীব্রতা, তাপমাত্রা নামল ৯ ডিগ্রিতে