ফারাক্কা বাঁধ গঙ্গা-পদ্মার অববাহিকা ও তৎসংলগ্ন অঞ্চলের পরিবেশ-প্রতিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। বাঁধটি দুই দেশের জন্যই ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোর জনজীবন, চাষাবাদ ও মৎস্যসম্পদের পাশাপাশি ভারতের বিহার এবং পশ্চিমবঙ্গের মানুষের জন্যও ফারাক্কা বাঁধ অনেক সমস্যা তৈরি করেছে।
বাঁধটি ভেঙে ফেলার মাধ্যমে কলকাতা বন্দরের নাব্য রক্ষার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে বিহারের ভাগলপুর থেকে ফারাক্কা পয়েন্ট পর্যন্ত ১৩৯ কিলোমিটার এবং ফারাক্কা পয়েন্ট থেকে কলকাতা বন্দর পর্যন্ত ৪০ কিলোমিটার নদীপথ সারা বছর ড্রেজিং করলেই গঙ্গার স্বাভাবিক গতিপথ অক্ষুণ্ণ থাকবে।
বিহার থেকে গোটা নদীব্যবস্থা স্বাভাবিক হলে উজানে বন্যা ও চর পড়া বন্ধ হবে, নৌপথে চলাচল স্বাভাবিক হবে এবং বিহারের জনগণ ও সরকারের দীর্ঘদিনের দাবিও ন্যায্যতা পাবে। ড্রেজিং করপোরেশন অব ইন্ডিয়া প্রতিবছর ৭৮৬ মিলিয়ন টন পলিমাটি সরানোর যে কাজ করে যাচ্ছে, তার চাপও অনেকটা কমে আসবে।
এই বাঁধ নিয়ে ফারাক্কার উজান ও ভাটির নদীতীরবর্তী মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ রয়েছে। প্রতিবছরই ভারত সরকারকে এই নদীপথ ড্রেজিং করতে হয়। বাঁধটি ভেঙে ফেলা হলে পশ্চিমবঙ্গের মালদহ অঞ্চল প্রতিবছর বন্যার কবল থেকে রক্ষা পাবে। আশির দশকে নদীয়া জেলার গঙ্গারামপুরের জলন্ধী নদীর রেগুলেটর এবং এর পাঁচ মাইল ভাটিতে ভৈরবের উৎসমুখে নির্মিত ক্রস ড্যামটি সরিয়ে ফেললে বাংলাদেশ শুষ্ক মৌসুমে পানি পাবে। পদ্মা ব্যারাজের মতো ব্যয়বহুল প্রকল্পের প্রয়োজন হবে না। মোদ্দা কথা, ফারাক্কা যেহেতু উভয় দেশের প্রকৃতি ও পরিবেশের ক্ষতি করছে, তাই এটি ভেঙে ফেলাই দুই দেশের জন্য উইন-উইন পরিস্থিতি তৈরি করবে। বাঁধটি ভেঙে গঙ্গার স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি।
ভারতের কলকাতা বন্দরের নাব্য রক্ষার জন্য যে বাঁধটি নির্মাণ করা হয়েছিল, তা এখন আর কোনো দেশেরই কাজে লাগছে না। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলজুড়ে ফারাক্কার ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে। ভারতের অংশেও ফারাক্কার উজান ও ভাটিতে এর প্রভাব দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। পরিস্থিতি এখন এমন এক অবস্থানে দাঁড়িয়েছে যে ফারাক্কা বাঁধ উভয় দেশের লাখ লাখ মানুষের জন্য অভিশাপে পরিণত হয়েছে।
গঙ্গা নদী উজান থেকে বছরে ৭৩৬ মিলিয়ন টন পলিমাটি নিয়ে আসে। এর মধ্যে ৩২৮ মিলিয়ন টন পলি শুধু ফারাক্কার উজানে জমা হচ্ছে। উজানের বিভিন্ন স্থানে চর ও শ্যাওলা জেগে উঠছে। বন্ধ্যত্বের ফলে নৌ-চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে। আবার ফিডার ক্যানেলের মাধ্যমে মিঠাপানি প্রবাহিত করার ফলে ভাটিতে এর বহুমুখী প্রতিক্রিয়া হয়েছে। নদীর তলদেশ ক্রমাগত ক্ষয়ে যাওয়ায় গোটা গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকার বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন ধীরে ধীরে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এ অঞ্চলে বর্তমান সময়ে আবহাওয়ার গুণগত পরিবর্তনও লক্ষ করা যাচ্ছে। উজানে পলি জমার ফলে বর্ষা মৌসুমে গঙ্গার বামতীর ভয়াবহ ভাঙনের কবলে পড়ে। এর ফলে ভারতের মালদহ ও এর আশপাশের এলাকায় প্লাবন ঘটে।
ভারতের কেন্দ্রীয় পানি কমিশনের মতে, মালদহ অঞ্চলের এই ভয়াবহ ক্ষতির কারণ ফারাক্কা বাঁধ। মূল ফারাক্কা বাঁধটির ভুল অবকাঠামোর কারণে গঙ্গার দক্ষিণ পাড়ে এই প্লাবন দেখা দেয়। ভারতের কেন্দ্রীয় হিসাব নিরীক্ষা বিভাগ ২০০৬-২০১২ সাল পর্যন্ত ফারাক্কা বাঁধের হিসাব নিরীক্ষার একটি সমীক্ষা প্রকাশ করে। এতে বিষয়টিকে ‘একটি অনিচ্ছাকৃত ফলাফল’ হিসেবে অভিহিত করা হয়।
প্রতি ১০ দিন অন্তর ভাটিতে পানির হ্রাস-বৃদ্ধির ফলে নদীর তলদেশের পানির পুনর্ভরণে জটিল পরিবর্তন হচ্ছে। ফারাক্কার উজানে ও ভাটিতে নদীতীরবর্তী মানুষের মধ্যে ক্রমাগত অসন্তোষ বাড়ছে। ভারতের পানি বিশেষজ্ঞরা বিহারের রাজধানী পাটনায় বিষয়টি নিয়ে সমীক্ষা চালিয়েছেন। বিহারের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার ফারাক্কা বাঁধ ভেঙে ফেলার জোর দাবি জানিয়েছিলেন।
ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা গৃহীত হয় ১৯৫২ সালে। পাকিস্তান সরকারের তীব্র আপত্তি সত্ত্বেও ভারত ১৯৭০ সালে বাঁধটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে। বাঁধটি ২ দশমিক ৬২ কিলোমিটার লম্বা এবং এতে ১০৯টি গেট রয়েছে। ফিডার ক্যানেলের দৈর্ঘ্য ৩৮ দশমিক ৩ কিলোমিটার এবং এর প্রবাহক্ষমতা ৪০ হাজার কিউসেক। অন্যদিকে, জঙ্গিপুর ব্যারাজটির দৈর্ঘ্য ২১২ দশমিক ৭০ মিটার এবং এতে ১৫টি গেট রয়েছে।
ফারাক্কার মাধ্যমে ভাগীরথীতে পানি নিঃসরণের ফলে বাংলাদেশের পরিবেশ ও অর্থনীতির ওপর ভয়াবহ দুর্যোগ নেমে এসেছে। আমাদের মোট আয়তনের ৩৭ শতাংশ অঞ্চল ও মোট জনসংখ্যার ৩৩ শতাংশের ওপর এর ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে। পদ্মার প্রবাহ কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের সমগ্র দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, শিল্প, মৎস্যসম্পদ, নৌ-চলাচল, লবণাক্ততা ও পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ জনগণের জীবন-জীবিকা এই অববাহিকার ওপর নির্ভরশীল।
বৃহত্তর রাজশাহী, কুষ্টিয়া, খুলনা ও যশোর অঞ্চলে পানির স্তর দিন দিন নিচে নেমে যাচ্ছে। গড়াই নদীতে মিঠাপানির প্রবাহ না থাকায় বঙ্গোপসাগরের লবণাক্ত পানি উজানে ঢুকে যাচ্ছে। বিগত কয়েক বছর ধরে ঝিনাইদহ, মাগুরা, যশোর, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর ও কুষ্টিয়ার আবহাওয়ার দ্রুত পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে।
আশির দশকে ভারতের নদীয়া জেলার গঙ্গারামপুরের জলন্ধী নদীর ওপর একটি রেগুলেটর এবং এর পাঁচ মাইল ভাটিতে বাংলাদেশের ভৈরব নদের উৎসমুখে একটি ক্রস ড্যাম নির্মাণের ফলে শুষ্ক মৌসুমে ভৈরবের পানির উৎস একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। চুক্তিটির ১২টি আর্টিকেলের মধ্যে ৯ নম্বর আর্টিকেলে সমতা, ন্যায় এবং কোনো পক্ষের ক্ষতি না হওয়ার ভিত্তিতে পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা ও সব অভিন্ন নদীর পানি সমস্যার সমাধানে উভয় দেশ কাজ করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিল।
৪০ বছরের গড় হিসাব করে প্রতিবছর শুকনো মৌসুমে ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত প্রতি ১০ দিনের চক্রে প্রবাহের হিসাব অনুযায়ী পানি ভাগাভাগি নির্ধারণ করা হয়েছিল। এখানে রয়েছে একটি শুভঙ্করের ফাঁকি। মোট প্রবাহের গড় হিসাব করা হয়েছে ৭০ হাজার কিউসেক। অথচ কোনো সময়ই প্রবাহ ৭০ হাজার কিউসেক ছিল না। যে প্রেক্ষাপটেই হোক, কলকাতা বন্দর পর্যন্ত ৪০ হাজার কিউসেক পানি ভারত সরিয়ে নিচ্ছে। ফারাক্কা বাঁধটি উভয় দেশের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনছে না। এটি অবিলম্বে ভেঙে গঙ্গার স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনলে উভয় দেশই উপকৃত হবে।
লেখক : লেখক ও গবেষক
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

