শিক্ষকদের বলা হয় জাতির বিবেক। কোনো শিক্ষক মহান শিক্ষকতার পেশায় প্রবেশ করে তার জীবন-যৌবন সবই বিলিয়ে দিয়ে অবসর গ্রহণ করেন। এ পেশায় দুটি ধারা আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে—একটি সরকারি, অন্যটি বেসরকারি। সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যারা শিক্ষকতার পেশায় নিয়োজিত, তারা হয়তো ভাগ্যবানই বটে।
পক্ষান্তরে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যারা শিক্ষকতা করেন, তাদের অধিকাংশই আর্থিক অসচ্ছলতার মধ্য দিয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে খেয়ে না খেয়ে জীবনযাপন করছেন। এভাবে যেতে যেতে মনের অজান্তেই যেন একদিন কোনো শিক্ষকের কর্মজীবনের বিদায়ঘণ্টা করুণ সুরে বেজে ওঠে। এতকাল তিনি আর না হোক মাসান্তে কিছু অর্থকড়ি পেতেন। কিন্তু এখন তো আর তার ভাগ্যে সেটুকুও জুটছে না। জীবনসায়াহ্নে দারিদ্র্যের কশাঘাতে এভাবে নিষ্পেষিত হতে হয় এই মহান পেশায় নিয়োজিত অসংখ্য শিক্ষককে।
কিছুদিন হতে চলল আমিও ওই কাফেলার একজন সদস্য বনে গেছি। তাই নিছক প্রয়োজনের তাগিদেই ব্যানবেইস অফিসে গিয়েছিলাম। দেখলাম, সেখানে বহু বয়োবৃদ্ধ মানুষের মিলনমেলা। ভাবলাম, প্রতিদিন তো এখানে এভাবেই এসব মানুষের সমাগম ঘটে। মনে মনে ভাবলাম, সবই তো অপরিচিত, কার কাছে জানব আমার প্রয়োজনের কথা? কিছুদূর এগিয়ে দেখলাম অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের কল্যাণ ভাতা দেওয়ার বিভাগীয় সচিবের কক্ষ।
কক্ষের বারান্দায় একটি বেঞ্চের ওপর বসা এক বয়স্ক মানুষ। সহসা বুঝতে পারলাম, তিনি আমার মতো একই প্রয়োজনে এখানে এসেছেন । কিছুটা কৌতূহলী হয়ে তার আগমনের বিষয়টি জানতে চাইলাম, আর স্বভাবসুলভ ভাষায় তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আপনি নিশ্চয়ই একজন শিক্ষক।’ তিনি বললেন ‘হ্যাঁ, তবে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক।’ আমার বুঝতে বাকি রইল না কেন তিনি এসেছেন।
জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনার প্রাপ্য টাকাকড়ি পেয়েছেন কি?’ তিনি ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বললেন, ‘এখন তো আর মাসের শেষে বেতনাদি পাই না; ধার-কর্জ করে কোনোমতে চলছে আমার জীবন। ঋণের বোঝায় জর্জর এখন এই ভারী বোঝা বহন করা বড়ই দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। ভেবেছিলাম সরকারি তহবিলে সঞ্চিত কল্যাণভাতা ও অবসরভাতার টাকাগুলো পেলে হয়তো জীবনের শেষ প্রান্তে এসে একটু নিশ্চিন্তে কাটাতে পারব। কিন্তু তা আর হলো না, এভাবেই হয়তো একদিন জীবনপ্রদীপ নিভে যাবে।’
যাই হোক, এই করুণ আর্তনাদ শুধু একজন শিক্ষকের কণ্ঠেই ধ্বনিত হয়নি, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অগণিত শিক্ষক অবসরে এসে এমন আর্তনাদের কাফেলায় শামিল হচ্ছেন। যখন কোনো মানুষের কর্মজীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে, তখন স্বভাবতই তিনি মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন। তদুপরি তার অর্থনৈতিক দিকটা যদি দুর্বল হয়, তাহলে তো তার দুঃখের সাগরে ডুবে মরা ছাড়া গত্যন্তর থাকে না। বলাবাহুল্য, শিক্ষককল্যাণ তহবিল ও অবসরভাতা শিক্ষকদের কর্মজীবনের সমাপ্তির পর যথাসম্ভব শিগগিরই প্রদানের বিহিত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজন ।
কথায় আছে, শিক্ষক মানুষ গড়ার কারিগর। কিন্তু অবসর জীবনে আসা এ হতদরিদ্র শিক্ষকদের দুঃখ-দুর্দশা যেন কারো দৃষ্টিগোচর হয় না। অথচ কত মানবাধিকার সংস্থা মানবকল্যাণে কাজ করলেও হাজার হাজার শিক্ষক অবসরে এসে আর্থিক বিপর্যয়ের কশাঘাতে ধুঁকে ধুঁকে মরছেন। কেউ যেন তাদের পাশে দাঁড়ানোর মতো নেই ।
অবসরে যাওয়া শিক্ষকদের কল্যাণ ও অবসরভাতা প্রদানের জন্য দুটি বিভাগই কাজ করছে। ভেবেছিলাম, এই বিভাগে যারা দায়িত্ব পালন করছেন তারা সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারী; কিন্তু তা নয়, তারা বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত কতিপয় ভাগ্যবান ব্যক্তি। তাদের দয়া ও অনুকম্পায় দু-তিন বছর অথবা তারও বেশি সময় অতিবাহিত হওয়ার পর এই বয়োবৃদ্ধ শিক্ষকদের ভাগ্য প্রসন্ন হতে পারে, তবে এ দীর্ঘ সময় লাগার কারণ কী? তা তো অজানাই থেকে গেল । যদি অর্থের ঘাটতি থাকে, তা হলে সরকারি তহবিল থেকে বরাদ্দের দাবি জানানো যেতে পারে। এর আগে সরকার এ ঘাটতি পূরণের জন্য একাধিক বার বরাদ্দ প্রদান করেছে।
বলাবাহুল্য কোনো শিক্ষক যদি বৃদ্ধ বয়সে তার ন্যায্য প্রাপ্য যথাসময়ে না পান, আর যদি অর্থের অভাবে খেয়ে না খেয়ে থাকেন, অথবা রোগে-শোকে বিনা চিকিৎসায় মারা যান, তাহলে এ করুণ পরিণতির জন্য সান্ত্বনার বাণী কোথায় মিলবে? তার জীবদ্দশায় এহেন দুর্দিনে তার প্রাপ্য অর্থ কোনো কাজেই লাগল না। যা হোক কোনো শিক্ষক যদি তার প্রাপ্য অর্থ না পেয়ে মৃত্যুবরণ করেন, তাহলে তার উত্তরাধিকারী ব্যক্তিরা ওই অর্থের মালিক হবেন। এক্ষেত্রে দেখা যায়, বিরাট জটিলতা।
তাদের উত্তরাধিকারী ব্যক্তিরা স্বত্ব প্রমাণের জন্য বিভিন্ন অফিস-আদালতে ঘোরাঘুরি করলেও যেন জটিলতার শেষ হয় না। অবশেষে একপর্যায় এসে মৃত শিক্ষকের সন্তানেরা নিজেদের হতভাগ্য মনে করে ওই অর্থ লাভের আশা ছেড়ে দিয়ে ঘরে ফিরে যান। আবার তাদের কেউ কেউ নাছোড়বান্দা হয়ে কঠোর সাধ্যসাধনা সহ্য করে মৃত বাবা-মায়ের কল্যাণ ও অবসরভাতার অর্থ লাভে সক্ষম হন। বস্তুত এভাবেই চলছে অগণিত শিক্ষকদের ভাগ্যের চাকা। সার্বিক পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে অবসরে যাওয়া বয়োবৃদ্ধ শিক্ষকদের করুণ আর্তনাদের ভাষা উপলব্ধি করে যথাযথ কর্তৃপক্ষ এগিয়ে আসবে এবং সহানুভূতিশীল হয়ে বিষয়টির স্থায়ী সমাধানের ব্যবস্থা করবে—ভারাক্রান্ত হৃদয়ে এ প্রত্যাশা রইল ।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

