আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ভারতীয় প্রোপাগান্ডার রাজনৈতিক অর্জন

রেজাউল করিম রনি

ভারতীয় প্রোপাগান্ডার রাজনৈতিক অর্জন

১.

অনেকে বলছেন, বাংলাদেশের হিন্দু নাগরিকদের অবস্থা নিয়ে ভারতীয় মিডিয়া যেটা করছে, তা মিসইনফরমেশন বা ডিসইনফরমেশন। কিন্তু অনেক সময় মানুষ ভুল করেও মিসইনফরমেশন ও ডিসইনফরমেশন প্রচার বা চর্চা করতে পারে কিন্তু ভারত যা করছে তা ভুল করে করছে তা মনে করার কোনো কারণ নেই। কারণ বাংলাদেশের হিন্দুদের অবস্থা নিয়ে ভারত যা করছে, তা স্রেফ প্রোপাগান্ডা। নগ্ন প্রোপাগান্ডা।

বিজ্ঞাপন

বিভিন্ন জরিপে বের হয়েছে, ভারত শুধু পৃথিবীর বৃহৎ গণতন্ত্রের দেশই নয়। এখন ভুয়া তথ্য উৎপাদনের প্রধান হাব হলো ভারত। তাতে ভারত প্রথম। এটা একটা বিশাল ইন্ডাস্ট্রিতে পরিণত হয়েছে। যেহেতু অন্য একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে এ ধরনের খবর তথাকথিত ভারতীয় মূলধারার মিডিয়াতেও ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে, তার সঙ্গে ভারত রাষ্ট্রের অন্তত ডিপস্টেটের পলিসির যে কোনো ভিন্নতা নেই, তা সহজেই বলা যায়। রাষ্ট্র যদি এ বিষয়ে ভিন্ন অবস্থান নিত তাহলে আমরা এটাকে স্রেফ সাংবাদিকতা বা মিডিয়ার মতলববাজি হিসেবে দেখতে পারতাম। কিন্তু এখানে যা ঘটছে, তা হলো- ভারত রাষ্ট্রের বাংলাদেশ নীতিকে সঠিক প্রমাণের জন্য ভারতীয় মিডিয়া প্রাণপণে চেষ্টা করে যাচ্ছে।

২.

পর্নোগ্রাফিক সিনড্রম

বাংলাদেশের বিষয়ে ভারত যে ধরনের প্রোপাগান্ডার রাজনীতি শুরু করেছে, তাকে আমি পর্নোগ্রাফিক সিনড্রম আকারে পাঠ করতে চাই। ছোট করে বলি-

পর্নোগ্রাফিতে যৌনতার যে উপস্থাপনা থাকে, তাতে সব থাকে। কিন্তু বাস্তব যৌন জীবনের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক থাকে না। মানে- যৌনতাকে কেন্দ্র করে যত ধরনের কুআচার, বিকৃতি, উৎকল্পনা তার সবই পর্নোগ্রাফিতে থাকে না শুধু প্রকৃত যৌনতা। কিন্তু এই যৌনতাকেই যতটা সম্ভব অতিরঞ্জিত করে প্রকাশের ফলে এটা সমাজ ও মানুষের জীবনে বিরাট কুপ্রভাব তৈরি করে।

ভারত বাংলাদেশের হিন্দুদের নিয়ে ঠিক এই কাজটিই করছে। এটা সত্য, বাংলাদেশে হিন্দু আছে এবং তাদের একটা বড় অংশ আওয়ামী ফ্যাসিবাদের সঙ্গে যুক্ত হওয়া বা রাজনৈতিকভাবে অশিক্ষা বা ভারতীয় বয়ানের প্রভাবের কারণে আওয়ামী লীগের সমর্থক। ফলে তাদের মধ্যে লীগবিহীন দেশে বাস করার বিষয়ে একটা অস্বস্তি আসবে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু তাদের বিষয়ে বা তাদের স্বার্থ দেখভালের নামে ভারতীয় মিডিয়া যা করছে, তা মূলত পর্নোগ্রাফিক সিনড্রমেরই বহিঃপ্রকাশ। হিন্দুদের প্রকৃত অবস্থা যাই হোক, তার মনের বিকৃত বাসনার আলোকে তাদের বিষয়ে প্রচার করছে। ঠিক নীল ছবিতে যা হয়।

বাংলাদেশের বিষয়ে ভারতও ঠিক এ কাজটিই করছে। এখন প্রশ্ন হলো, ভারত কেন এমনটি করছে?

কারণ- এখানে ঘটনা যাই ঘটুক, ভারত বাংলাদেশ বিষয়ে যে পজিশন নিয়ে বসে আছে এক এগারোর সময় থেকে সেটাকেই প্রতিষ্ঠিত করতে মরিয়া। এ জন্য ফটোশপ সাংবাদিকতা এমন এক উচ্চতায় নিজেকে নিয়ে গেছে, যা ভারতীয় মিডিয়ার বিষয়ে বিশ্ববাসীর মনোভঙ্গিকে ব্যাপকভাবে নেগেটিভ করে তুলেছে। কারণ, এখন ফ্যাক্টচেকের বিভিন্ন পদ্ধতি অনেকে পারসোনাল লেভেলেও জানেন। ভুল তথ্যের যেমন রমরমা প্রসার ঘটেছে, পাশাপাশি ফ্যাক্টচেকেরও পদ্ধতি দিন দিন সহজতর হচ্ছে।

ভারত কেন এ ধরনের সিনড্রম থেকে বের হতে পারছে না? কারণ, সে তার বাংলাদেশে পলিসি পরিবর্তন করতে রাজি না। সে আওয়ামী লীগের বাইরে আর কারও সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে রাজি না। আওয়ামী লীগ ছাড়া- বাংলাদেশে সে কীভাবে তার নীতি ঠিক করবে এ বিষয়ে সে চিন্তা করতে অক্ষম। তাই সে যে রিডিং বা ধারণা তৈরি করে রেখেছে, তাকেই প্রতিষ্ঠা করার জন্য ফিকশনাল লেভেলকেও হার মানায় এমন সব প্রোপাগান্ডায় মেতে উঠেছে।

বাংলাদেশে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের উত্থানে ভারতের নগ্ন ভূমিকার কারণে লীগের পতনকে একই সঙ্গে ভারতের পতন হিসেবে দেখে থাকেন জনগণ। আর লীগ নেত্রীকে ভারতে আশ্রয় দিয়ে ভারত এই পরাজয়ের অংশীদার হয়ে গেছে। ফলে এখন যখন ভারত ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এই ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের ন্যারেশনকে পাল্টানোর জন্য সাদা চোখেই দেখা যায়- এমন কাঁচা মিথ্যার আশ্রয় নিতে থাকে, তখন ভারতের বিদেশনীতির অক্ষমতাকে আসলে উদাম হতেই দেখা যায়।

ভারত মনে করেছে, সারা দুনিয়া যেটা জানে তা প্রোপাগান্ডা দিয়ে ভুল প্রমাণ করতে পারবে। এর আগে ভারত অনেকবারই বয়ানের রাজনীতি করে সফল হয়েছে বাংলাদেশে। বিশেষ করে ৭১-এর যুদ্ধের বয়ান ভারতের বাঙালিদের তৈরি করা। ফলে এই কনফিডেন্স এবারও কাজ করে থাকতে পারে। অন্যদিকে বাংলাদেশের কিছু মিডিয়া, যারা খুবই পাওয়ারফুল ও প্রভাবশালী তাদের ওপর ভারতীয় বয়ানের নিয়ন্ত্রণ থাকায় ভারতও এ বিষয়ে অতি আত্মবিশ্বাসী। ভারতের প্রোপাগান্ডায় এই ধরনের মিডিয়ার খবর রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করা হয়। মানে- প্রোপাগান্ডার কনটেন্ট এখানে বাংলাদেশেই প্রাথমিকভাবে ছাপা হয়। পরে ভারতে এগুলো ম্যাসিভভাবে প্রচার করা হয়। এর মধ্যে বাংলাদেশের তথাকথিত কিছু মূলধারার মিডিয়াও আছে। কাজেই এ বিষয়ে ভারতের আত্মবিশ্বাসী হওয়ার কারণ ভারতে তৈরি হচ্ছে তা না। তৈরি বা সাপ্লাই হচ্ছে বাংলাদেশ থেকেই।

৩.

অভ্যুত্থানের স্পিরিটকে পাল্টে দেওয়ার চেষ্টা

ভারত যেহেতু আওয়ামী লীগের বাইরে আর কোনো বিকল্প ভাবতে পারছে না, ফলে লীগের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের কারণ ও স্পিরিটকে এখন চেঞ্জ করার চেষ্টা করছে। এ জন্য ন্যারেশন তৈরি ও প্রোপাগান্ডার প্রয়োজনে ভুয়া তথ্য একটা ইন্ডাস্ট্রিয়াল রূপ নিয়েছে। ভারত মূলত দুটি জায়গায় ফোকাস করছে এখানে।

এক. ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ছিল আওয়ামী ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে। কিন্তু এটাকে সে রিফ্রেইম করতে চাচ্ছে প্রগতিশীলতার বিরুদ্ধে ইসলামি বিপ্লব বলে। কিন্তু ভারতের সহযোগিতায় হাসিনা এখানে পরপর তিনটা ভোটবিহীন নির্বাচন করেছেন। ফলে জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার চূড়ান্ত রূপ হিসেবে এই অভ্যুত্থান হয়েছে এটা সারা দুনিয়া জানে। এখানে ভারতের সহযোগিতায় মুক্তিযুদ্ধের যে বয়ান ও প্রগতিশীলতার যে বয়ান চালু ছিল, তা যেহেতু এটা চূড়ান্ত ফ্যাসিবাদ কায়েম করেছিল, ফলে এই বয়ানের বিরুদ্ধেই অভ্যুত্থান হয়েছে। ফলে এটাকে মুখস্থভাবে রাইট উইং অভ্যুত্থান হিসেবে প্রচারের নীতি ও কৌশল নিয়েছে ভারত এবং লীগ। মনে করেছে এতে পশ্চিমারা সহজেই কনভিন্স হবে। কারণ, ডানপন্থাকে পশ্চিমেও সহজেই ফ্যাসিবাদী প্রবণতা আকারে দেখা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে হয়েছে উল্টাটা। এটা সব মতের মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণে সফল হওয়া একটা অভ্যুত্থান। কিন্তু তাতে ডানপন্থিদের ব্যাপক অংশগ্রহণ ছিল এবং এটাকে ডানপন্থি অভ্যুত্থান বলাই যেতে পারে কিন্তু এটা ফ্যাসিবাদী ডানপন্থা না। বরং এই ডানপন্থা দীর্ঘ ১৫ বছর ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে আসছে। ফলে এটাকে আপনি এন্টিফ্যাসিস্ট বা নন-ফ্যাসিস্ট ডানপন্থা বলতে পারেন। বা আপনি এটাকে র‌্যাডিক্যাল সেন্ট্রিস্ট অভ্যুত্থান হিসেবেও দেখতে পারেন। আপনি যেভাবেই দেখেন না কেন, এটাকে কোনোভাবেই ইসলামি জঙ্গি বিপ্লব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত হওয়া এই গণতন্ত্রকামী অভ্যুত্থানকে ভারত রিফ্রেইম করতে চাচ্ছে- ইসলাম বনাম প্রগতিশীলতার সংঘাত হিসেবে। কিন্তু এটা ওয়ার আন টেররের আমলে হলে হয়তো কিছুটা পাত্তা পেত। কিন্তু এখন একদমই পাত্তা পাবে না। পাচ্ছেও না।

দুই. আরও একটা পয়েন্টে ভারত এ বিষয়টা রিফ্রেইম করতে চাচ্ছে, তা হলো- এই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে হিন্দুদের ওপর অত্যাচার নেমে আসছে। জনতা বনাম লীগ– এই লড়াইটাকে ভারত ফ্রেইম করতে চাচ্ছে- হিন্দু বনাম বাংলাদেশি জনতা। এখানে যে সহিংসতার ঘটনাগুলো হয়েছে, তা ফ্যাসিস্ট শক্তির বিরুদ্ধে জনতার প্রতিরোধের ফলে হয়েছে। কমন শত্রু ছিল আওয়ামী লীগ। তাতে কোনো ধর্ম পরিচয় ছিল না। লীগের সমর্থক যারা তারা আক্রমণের মধ্যে পড়েছে। তাতে বেশি আক্রমণের মধ্যে পড়েছে অবশ্যই মুসলমানরা। আর হিন্দুরা যেহেতু বড় অংশে লীগের সমর্থক ছিল, ফলে তাদেরও অনেকে আক্রমণের মধ্যে পড়েছে কিন্তু সেটা পড়েছে ফ্যাসিবাদের সহায়ক হিসেবে। হিন্দু হিসেবে নয়। ভারত এটাকে হিন্দুদের বিরুদ্ধে আক্রমণ হিসেবে ফ্রেইম করতে চাচ্ছে।

প্রোপাগান্ডার অর্জন

এখন এসব উদ্ভট কর্মকাণ্ডের ফলে ভারতের হিন্দুরা উগ্রবাদী হয়ে বাংলাদেশের হাইকমিশনে আক্রমণ করেছে আগরতলায়। তাতে ভিয়েনা কনভেনশন লঙ্ঘন হয়েছে। ভারত তাতে বিশ্বদরবারে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাদের দেশের উগ্র হিন্দুত্ববাদ প্রসারে এটা হেল্প করলেও গণতান্ত্রিক ভারতের গৌরব তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বাংলাদেশের হিন্দুরা ভারতের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। কারণ তারা প্রকৃত ঘটনা সবচেয়ে ভালো জানেন। তারা যখন দেখছে, ভারত তাদের লাশ নিয়ে রাজনীতি করছে। যে নিহত হয়নি তার নিহত হওয়ার খবর প্রচার করে ফায়দা নিতে চাচ্ছে। যে ঘটনা ঘটেনি তার ফটোশপ হাজির করছে মিডিয়ায়, তখন সে বুঝে গেছে এমন প্রতারক ও মিথ্যাবাদী যদি তার বন্ধু হয় এবং তাকে বিশ্বাস করলে আখেরে বিপদ আছে। ফলে এতে ভরতের গ্রহণযোগ্যতা দিন দিন কমবে। আর নিজ দেশের বিবেকবান ও উগ্র হিন্দুত্ববাদবিরোধী এবং গণতন্ত্রমনা মানুষদের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের ঐক্য সুদৃঢ় হবে, যা মোদি সরকারের জন্য মোটেও সুখের হবে না।

অন্যদিকে বাংলাদেশের ডায়সপোরা কমিউনিটি ও নতুন প্রজন্মের রাজনীতিবিদ এবং কিছু লেখক ইংরেজিতে ভালোই পারদর্শী। সংখ্যায় কম হলেও তারা বিশ্ব মিডিয়ায় প্রকৃত সত্য তুলে ধরছে, যা ভারতকে একতরফা ফায়দা নেওয়ার বদলে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। মোট কথা, প্রোপাগান্ডার রাজনীতি একটি ফ্যাসিবাদী প্রবণতা। ভারত নিজের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের বদলে এ ধরনের রাজনীতিতে নামলে তখন ভারতকে কেউ আর গুরুত্ব নিয়ে বিবেচনা করবে না। অন্তত গণতান্ত্রিক শক্তি হিসেবে বিবেচনা করবে না। ফ্যাসিস্ট তকমাই জুটবে। ফলে দেশটির বিদেশনীতি বিশেষ করে বাংলাদেশে নীতি নিয়ে ভারতের সিরিয়াসলি চিন্তা করার সময় এসেছে মনে হয়।

লেখক : রাজনৈতিক চিন্তক ও সম্পাদক জবান ম্যাগাজিন

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন